শ্যামনিবাস
পাঁচ নম্বর পীতাম্বর চৌধুরি লেনের একতলার ভাড়াটে নকুলচন্দ্র বিশ্বাস যে খুন হয়েছে, বাড়িওয়ালা সদানন্দবাবুই সে-কথা প্রথম জানতে পারেন কি না, বলা শক্ত, তবে তার ডেডবডি যে তিনিই প্রথম দেখেছিলেন, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু সেসব কথা যথাসময়ে হবে। ভদ্রলোকের পরিচয়টা আগে দেওয়া দরকার।
সদানন্দবাবুর পুরো নাম সদানন্দ বসু। সস্ত্রীক তিনি দোতলায় থাকেন। আগে একটা সওদাগরি কোম্পানির শিপিং ডিপার্টমেন্টে কাজ করতেন, বার দুয়েক এক্সটেনশান পাবার পরে রিটায়ার করেছেন। তা সেও প্রায় বছর দশেক হল।
ভদ্রলোকের বয়স এখন বাহাত্তর। সন্তানাদি হয়নি, তবে তা নিয়ে তাঁর কোনও আক্ষেপ নেই। বরং অন্যেরা আক্ষেপ করলে বলেন, ‘রাখুন মশাই। ছেলে হলেই যে সেটা বনমানুষ না-হয়ে মানুষ হত, তার কোনও গ্যারান্টি আছে? গুন্ডার দলে নাম লিখিয়ে ব্যাটা হয়তো বোমবাজি করে বেড়াত, আর আমাকে তার হ্যাপা সামলাতে হত। না রে ভাই, তার চেয়ে এই দিব্যি আছি।
সদানন্দবাবু সত্যিই যে ‘দিব্যি’ আছেন, এটা যে নেহাত কথার কথা নয়, সে তাঁর মুখ দেখলেই বোঝা যায়। পার্ক সার্কাস এলাকার যে বাড়িটাতে এর আগে আমি থাকতুম, বাড়িওয়ালা সেটা বিক্রি করে দেওয়ায় বছর দশেক আগে আমি এখানে উঠে আসি। পাড়াটা ঘিঞ্জি, প্রথম প্রথম তাই একটুও ভাল লাগত না। কিন্তু সবই তো আস্তে-আস্তে সয়ে যায়, আমারও গিয়েছে। তা ছাড়া সদানন্দবাবুর মতো একজন প্রতিবেশী যে পৈয়েছি, এটাকেও আমার মস্ত একটা সৌভাগ্য বলে মনে হয়। সদানন্দ সত্যিই সার্থকনামা পুরুষ। মুখ নাকি মনের আয়না। তা সদানন্দবাবুর ক্ষেত্রে সেই আয়নাটা আমি কখনও ঝাপসা হতে দেখিনি, প্রশান্ত হাস্যে ভদ্রলোকের মুখখানা একেবারে ঝকঝক করত।
হালে অবশ্য সেই ঝকঝকে মুখেই একটু-একটু মেঘ জমতে শুরু করেছিল। কিন্তু সে-কথায় একটু পরে আসছি।
সদানন্দবাবুর বয়স যে সত্তর ছাড়িয়েছে, সেটা আমি তাঁর কাছে শুনি। দেখে অবশ্য বয়া বুঝবার উপায় নেই। ভদ্রলোকের চুল এখনও পুরোপুরি পাকেনি, সাদার হামলার বিরুদ্ধে কালো এখনও সমানে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। বছর দুয়েক আগে ছানি কাটিয়েছিলেন; দৃষ্টিশক্তি তার পরেও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি বটে, তবে দেহযন্ত্রের অন্য কোনও কলকবজায় জং ধরেছে বলে মনে হয় না। শরীর মোটামুটি পোক্ত। উদরে মেদ জমতে দেননি, টান হয়ে হাঁটাচলা করেন।
আমি রোগাভোগা মানুষ। একে তো খবরের কাগজে কাজ করি বলে স্বাস্থ্যের ব্যাপারে নিয়ম-টিয়ম মেনে চলার উপায়ই নেই, তার উপরে আবার নিয়ম-টিয়ম মেনে চলার উপায় থাকলেই যে মান্যি করতুম তাও নয়। বেশ কিছুকাল ধরেই আমাকে তার মাসুল গুনতে হচ্ছে। অম্বলের অসুখ তো আছেই, তার সঙ্গে জুটেছে গেঁটেবাতের যন্ত্রণা। শীত পড়লেই আঙুলের গাঁট ফুলে যায়, ভাল করে তখন কলমটা পর্যন্ত ধরতে পারি না, ব্যথায় যেন হাতখানা একেবারে ঝন্ঝন্ করতে থাকে।
সদানন্দবাবু বলেন, “সিগারেট ছাড়ুন মশাই। চা অবশ্য আমিও ছাড়তে পারিনি, আপনিও পারবেন বলে মনে হয় না, তবে এই যে দিনের মধ্যে পনরো-বিশ কাপ চা খাচ্ছেন, এটা তো একেবারে সর্বনেশে ব্যাপার। মেরেকেটে তিন কাপ পর্যন্ত চলতে পারে। ঘুম থেকে উঠে এক কাপ, সকালে জলখাবারের সময় এক কাপ আর বিকেলে এক কাপ। ব্যস ওই হচ্ছে লিমিট। তাও দুধ নয়, চিনি নয়, স্রেফ হালকা লিকার। দেখবেন, অম্বলের অসুখ একেবারে বাপ-বাপ বলে পালাবে।”
বেজার হেসে আমি বলি, “তা কি পারব?”
“পারতেই হবে। নইলে বাঁচবেন কী করে? আর হ্যাঁ, মর্নিং ওয়াকটা ধরুন। ভোরবেলায় ঘুম থেকে উঠে, চোখমুখ ধুয়ে হালকা এক কাপ চা খেয়ে রোজ মাইল দুয়েক হেঁটে আসুন দেখি, স্রেফ মাসখানেকের মধ্যেই টের পেয়ে যাবেন যে, শরীরের কলকবজাগুলো আবার ঠিকমতো “লতে শুরু করেছে।”
“আপনি রোজ মর্নিং ওয়াক করেন?”
“করি বই কী।” একগাল হেসে সদানন্দবাবু বলেছিলেন, “ঘড়িতে রোজ দম দিতে হয় না? ‘চা এই মর্নিং ওয়াকটা হচ্ছে শরীরকে দম দেওয়ার ব্যাপার। দমটা নিয়মিত দিচ্ছি বলেই ঘড়িটা এখনও বন্ধ হয়নি, একেবারে কাঁটায় কাঁটায় কারেক্ট টাইম দিয়ে যাচ্ছে।”
এ-সব কথা বছর দশেক আগেকার। সদ্য তখন আমি পার্ক সার্কাস থেকে মধ্য-কলকাতার এই গলিতে এসে ঢুকেছি। খবরের কাগজে কাজ করি, দুপুর এগারোটা বারোটা নাগাদ বাড়ি থেকে বেরোই, কাজ চুকিয়ে বাড়ি ফিরতে-ফিরতে রাত নটা-দশটা বেজে যায়। রবিবারটা ছুটির দিন, রাস্তায় কি বাজারে সে-দিন সদানন্দবাবুর সঙ্গে দেখাও হয়। দেখা হলে উনিও নমস্কার করেন, আমিও করি। কিন্তু কথাবার্তা বিশেষ এগোয় না।
এই রকমই এক রবিবারের সকালবেলা। বাজার থেকে ফিরে রান্নাঘরে আনাজ আর মাছের থলি নামিয়ে রেখে বসবার ঘরে ঢুকে সদ্য সেদিনকার কাগজের উপরে চোখ বুলোতে শুরু করেছি, এমন সময় কলিং বেল বেজে উঠল। দরজা খুলে দেখি সদানন্দবাবু দাঁড়িয়ে আছেন। বললুম, “আরে কী আশ্চর্য, আসুন আসুন।”
ভদ্রলোক হাসতে-হাসতে ঘরে ঢুকলেন, তারপর একটা সোফায় বসে হাসতে-হাসতেই বললেন, “আপনি নতুন এসেছেন, তাই খবর নিতে এলুম কোনও অসুবিধে হচ্চে কি না। অবিশ্যি আরও আগেই আমার আসা উচিত ছিল। কোনও ব্যাপারে যদি দরকার হয়, তো নিঃসংকোচে জানাবেন, যদি কিছু করতে পারি তো খুশি হয়ে করব। আমার বাড়িটা আপনি চেনেন তো?”
বললুম, “চিনব না কেন? বলতে গেলে আমাদের প্রায় উল্টোদিকেই তো আপনারা থাকেন, তাই না?”
সদানন্দবাবু বললেন, “হ্যাঁ, আমরা থাকি পাঁচ নম্বরে। দোতলায় থাকি।”
“একতলায় কারা থাকেন?”
“কেউ না। একতলাটা ফাঁকাই পড়ে আছে। ভাড়াটে বসাইনি, বসাবার ইচ্ছেও নেই।”
“কেন?”
“ও মশাই অনেক ঝঞ্ঝাট। আজ বলবে রান্নাঘরের কলের ওয়াশারটা কেটে গেছে, প্লাম্বার ডেকে সারিয়ে দিন, কাল বলবে শোবার ঘরের ছিটকিনিটা ঠিকমতো লাগানো যাচ্ছে না, ছুতোর ডেকে আনুন। ও-সব ঝঞ্ঝাট কে সামলাবে? এক-একটা ভাড়াটে এমন পাজি হয় যে, সে আর কহতব্য নয়।” আমার বাড়ি নেই, অন্যের বাড়িতে ভাড়াটে হয়ে আছি, তাই সদানন্দবাবুর কথায় আমি প্রাণ খুলে হাসতে পারলুম না। কাষ্ঠ হেসে বললুম, “তা বটে।”
সদানন্দবাবু বললেন, “ও কথা ছাড়ুন। এখন কী জন্যে এসেছি, তা-ই বলি। কাল বিকেলে আপনার মিসেস আমাদের বাড়িতে গিয়েছিলেন।”
বললুম, “ তাই বুঝি?”
“হ্যাঁ। আমার গিন্নিরও তাই আসা উচিত ছিল। কিন্তু তিনি বাতের রুগি, হাঁটাচলা করতে কষ্ট হয়, তাই আমাকে একাই আসতে হল। তা ছাড়া আরও এইজন্যে এলুম যে, আপনার অসুখের কথা আমি শুনেছি। ওটা আমি সারিয়ে দেব।”
অবাক হয়ে বললুম, “আমার আবার কী অসুখ?”
সদানন্দবাবু বললেন, “সে কী, আপনার হাইপার-অ্যাসিডিটি নেই? বুক-জ্বালা নেই? চোঁয়া-ঢেকুর ওঠে না? আপনার স্ত্রী তো আমার স্ত্রীকে কাল তা-ই বলে এলেন।”
বাসন্তী এসে ঘরে ঢুকল। সদানন্দবাবুর দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনার গলা শুনে এলুম। এক্ষুনি চলে যাবেন না যেন। চা করে আনছি।”
সদানন্দবাবু বললেন, “তা আনুন, তবে চায়ের সঙ্গে দুধ-চিনি চলবে না।”
জিজ্ঞেস করলুম, “ডাক্তারের নিষেধ?”
“ডাক্তারের নয়, গুরুর নিষেধ। গুরু মানে সাক্ষাৎ মহাগুরু, অর্থাৎ আমার পিতৃদেব। তিনি বলতেন, চা খাচ্ছ খাও, কিন্তু খবর্দার তার সঙ্গে দুধ-চিনি খাবে না। খেয়েছ কি মরেছ, সারা জীবন অম্বলের ব্যথায় কষ্ট পেতে হবে।”
আমি বললুম, “তাই?”
সদানন্দবাবু বললেন, “অফ কোর্স। সার পি সি রায় বলতেন, চা-পান মানেই বিষপান আর আমার স্বর্গত পিতৃদেব বলতেন, বিষপান তো বটেই, তবে কিনা দুধচিনি মিশিয়ে যদি খাই।”
বাসন্তী বলল, “ঠিক আছে, ঠিক আছে, আপনার জন্যে স্রেফ লিকার, কেমন?”
“হ্যাঁ, স্রেফ লিকার, তাও খুব হালকা হওয়া চাই।”
বাসন্তী চলে গেল।
সদানন্দবাবু আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “দিনে আপনি ক’কাপ চা খান?”
হেসে বললুম “কী করে বলব? গুনে তো কখনও দেখিনি।”
“তাও?”
“তা পনরো-বিশ কাপ তো বটেই।”
“দুধ-চিনি মিশিয়ে?’
“বিলক্ষণ।”
“সিগারেটও পনরো-বিশটা?”
“পনেরো-বিশটা কী বলছেন, চল্লিশ-পঞ্চাশটা তো হবেই।”
কথাটা শুনে ভদ্রলোক কিছুক্ষণ স্রেফ হাঁ করে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর একটা দীর্ঘনিশ্বাস ছেড়ে বললেন, “তা হলে মশাই আমি তো কোন্ ছার, বিধান রায় বেঁচে নেই, কিন্তু বেঁচে থাকলেই বা কী হত, তিনিও আপনাকে বাঁচতে পারতেন না। যদি বাঁচতে চান তো সিগারেট ছাড়ুন, আর চা’ও মাত্র তিন কাপ, তাও দুধ-চিনি না দিয়ে স্রেফ হালকা লি’র। পারবেন?”
“পারা শক্ত। কিন্তু যদি পারি, মানে ধরুন যে, আমি পেরেই গেলুম, তা হলেই কি আর অম্বল আমাকে জ্বালাবে না?”
চওড়া হেসে সদানন্দবাবু বললেন, “তবে আর বলচি কী! অম্বু কি আর আপনার একার অসুখ, এই কলকাতার অন্তত নাইনটি পার্সেন্ট লোক অম্বলে ভোগে। অঙ্ক আমার গিন্নিরও ছিল। কিন্তু এখন আর নেই। বেন নেই? না মাথার দিব্যি দিয়ে আমি তাঁর দুধ `নি দিয়ে চা খাওয়ার অভ্যেসটা ছাড়িয়েছি। বাতব্যাধিও সারিয়ে দিতে পারতুম। পারলুম না কে জানেন?”
“কেন?”
কাজের মেয়েটি এসে চা-জলখাবার দিয়ে গেল। সদানন্দবাবুর জন্যে স্রেফ হালকা লিকার। ভদ্রলোক তাঁর জলখাবারের প্লেটটা ছুঁলেন না পর্যন্ত। বললেন, “জলখাবার আমি খেয়ে এসেছি, এক সকালে দুবার জলখাবার খেতে পারব না। তবে হ্যাঁ, আপনাদের এখানে চা খেতে বলবেন, সেটা জানতুম তো, তাই বাড়িতে আর সেকেন্ড কাপ চা খাইনি।”
ভদ্রলোক চায়ে চুমুক দিলেন, তারপর বললেন, “ কী কথা যেন হচ্ছিল?”
“আপনার স্ত্রীর বাতব্যাধি কেন সারাতে পারলেন না, সেই কথা।”
“ও হ্যাঁ, তা হলে শুনুন, রোজ যদি আমার সঙ্গে বেরিয়ে দু’মাইল মর্নিং ওয়াক করতেন তা হলে ওটাও সেরে যেত। তা ভদ্রমহিলা সকাল সাতটার আগে বিছানা ছেড়ে উঠতেই পারেন না যে!”
“মাথার দিব্যি দিয়েছিলেন?”
“দিয়েছিলুম বই কী, কিন্তু তাও পারলেন না। আরে মশাই সাতটায় ঘুম থেকে উঠলে কি আর মর্নিং ওয়াক হয়? তখন রোদ্দুর উঠে যায়। হাঁটায় তখন আর মজা থাকে না।”
নিজের চায়ের পেয়ালা হাতে নিয়ে বাসন্তী ইতিমধ্যে ঘরে এসে ঢুকেছিল। বলল, “আপনি কখন ঘুম থেকে ওঠেন?”
“সাড়ে চারটেয়।”
“ওরে বাবা,” বাসন্তী যেন আঁতকে উঠল, “ওই সময়ে ওঠা যায় নাকি?”
“কেন যাবে না, তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লেই তাড়াতাড়ি ওঠা যায়। আর্লি টু বেড অ্যান্ড আর্লি টু রাইজ…..ছেলেবেলায় পড়া সেই ছড়াটা তো আর ভুলে যাইনি, তাই সাড়ে নটার মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ি, আর উঠেও পড়ি কাঁটায় কাঁটায় একেবারে সাড়ে চারটেয়। হিসেব করে দেখুন ঝাড়া সাত ঘন্টা ঘুমোই। কম হল?”
ঢোক গিলে বললুম, “না, তা হল না বটে, তবে অত সকাল-সকাল শুয়ে পড়ব কী করে? অফিস থেকে বাড়িতে ফিরতে ফিরতেই তো দশটা বেজে যায়। তারপর খাওয়া আছে, টুকটাক লেখাপড়ার কাজও থাকে, শুতে শুতে সেই বারোটা। সকাল সাতটার আগে তা হলে আর কী করে উঠব? মর্নিং ওয়াকই বা কী করে করব?”
সদানন্দবাবুর চা খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। বাসন্তীর দিকে তাকিয়ে বললেন, “তা হলে আর আমার কিছু করার নেই। মর্নিং ওয়াক না করলে আপনার কর্তার ওই গেঁটে বাত সারবে না। তবে সিগারেটটা যদি ছাড়িয়ে দিতে পারেন, আর দুধ-চিনি বাদ দিয়ে আমি যে রকম চা খেলুম, কিরণবাবুর যদি তাতে আপত্তি না হয়…….তবে হ্যাঁ, তিন কাপের বেশি খাওয়া চলবে না……অম্বল তা হলে সারবেই।”
বাসন্তী বলল, “ওষুধ খাওয়ার দরকার নেই?”
“কিছু না। আজ তা হলে চলি। পরে আবার খবর নেব।”
সদানন্দবাবু চলে গেলেন।
তা এ হল দশ বছর আগের কথা। সদানন্দবাবুর কথামতো আমি মর্নিং ওয়াকটা ইতিমধ্যে ধরতে পারিনি বটে তবে চায়ের পেয়ালা থেকে দুধচিনি একেবারে বাদ দিয়েছি। সিগারেটটা অবশ্য অনেক চেষ্টা করেও ছাড়তে পারছি না, তবে আগের চেয়ে অনেক কম খাই। মেরেকেটে চার-পাঁচটা। তা দেখছি, ভদ্রলোক মোটেই বাড়িয়ে বলেননি। সত্যি আর এখন আমার অম্বল হয় না, বুকজ্বালা করে না, চোয়া ঢেকুরও ওঠে না। গেঁটেবাতের ব্যাপারটা অবশ্য এখনও আমাকে সমানে জ্বালাচ্ছে। তাই ভাবছিলুম যে, শিগগিরই তো রিটায়ার করব, তখন তো আর রাত দশটায় বাড়ি ফিরতে হবে না, তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ব, উঠেও পড়ব তাড়াতাড়ি, তারপরে সদানন্দবাবুর সঙ্গে রোজ বেরিয়ে পড়ব মর্নিং ওয়াক করতে।
সদানন্দবাবুও আমাকে খুব উৎসাহ দিচ্ছিলেন। কথায় কথায় সেদিন বললেন, “দেখলেন তো, সিগারেটটা কমিয়ে দিয়ে শুধু যে অ্যাসিডিটির হাত থেকে বেঁচে গেলেন তা নয়, সর্দিকাশিও বলতে গেলে আর আপনার হয় না। তা ছাড়া দমও বেড়েছে। তা এখন ওই দমটাকে কাজে লাগান। মর্নিং ওয়াক করুন, রোজ শেষ-রাত্তিরে বেরিয়ে পড়ুন আমার সঙ্গে। মাইল দুয়েক হাঁটুন। ঘাম ঝরান। দেখবেন, অম্বল যেভাবে হটেছে গেঁটেবাতও ঠিক সেইভাবেই হটে যাচ্ছে। কী, বেরিয়ে পড়বেন আমার সঙ্গে?”
বললুম, “এখন নয়। রিটায়ার করি, তারপর বেরুব।”
সেই রকমই কথা ছিল, কিন্তু তা আর হল না। তার আগেই খুন হয়ে গেল নকুল বিশ্বাস। আর ভাড়াটে খুন হবার সঙ্গে-সঙ্গেই তার বাড়িওয়ালা সদানন্দ বসুও গ্রহের ফেরে পড়ে গেলেন।
২
সদানন্দবাবুর মুখে যে কিছু-কিছু মেঘ জমতে শুরু করেছিল, সে-কথা আগেই বলেছি। ব্যাপারটা আমি প্রথম লক্ষ করি চার-পাঁচ বছর আগে। রবিবার। সকালবেলা। কলেজ স্ট্রিট মার্কেটে বাজার করতে গিয়েছি, সেখানে ফলপট্টিতে হঠাৎ সদানন্দবাবুর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। ভদ্রলোক আমাকে দেখে হাসলেন, দুটো-চারটে কথাও হল, কিন্তু লক্ষ করলুম। হাসিটা একটু শুকনো, কথাবার্তাতেও যেন আগেকার সেই প্রাণখো “ ভাবটা আর নেই। ভণিতা না করে জিজ্ঞেস করলুম, “ব্যাপারটা কী, বলুন তো?”
“কীসের ব্যাপার?”
“এই মানে কেমন যেন ঝিম মেরে রয়েছেন। মিসেসের সেই বাতের কষ্টটা আবার বেড়েছে নাকি?”
ভদ্রলোক তাতে ক্লিষ্ট হেসে বললেন, “না মশাই, সে সব কিছু নয়, গিন্নি মোটামুটি ভালই আছে।”
“তা হলে?”
“তা হলে আবার কী, মাঝে-মধ্যে একটু গম্ভীরও হতে পারব না? ও কথা থাক, আপনি তো রোজ বৈঠকখানা বাজারে যান, আজ হঠাৎ এ-দিকে?”
বললুম, “বৈঠকখানা বাজারে রবিবার বড্ড ভিড় হয়, তাই আর আজ ওদিকে যাইনি।”
এর পরে আর কোনও কথা হল না। বুঝতে পারলুম কিছু একটা হয়েছে ঠিকই, তবে ভদ্রলোক সেটা চেপে যেতে চাইছেন। এ-সব ক্ষেত্রে বেশি-কিছু বলতে যাওয়াও ঠিক নয়, তাই আর কথা বাড়ালুম না, ফলপট্টিতে যা কেনাকাটা করার ছিল সেটা চুকিয়ে ফের বাজারে গিয়ে ঢুকলুম।
বাড়ি ফিরে বাজারের থলি দুটো বাসন্তীর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললুম, “সদানন্দবাবুর সঙ্গে দেখা হল।”
“কোথায়?”
“বাজারে। তা তুমি তো প্রায়ই ও বাড়িতে যাও, কিছু জানো?”
অবাক হয়ে বাসন্তী বলল, কী জানব?”
“এই মানে ভদ্রলোককে কেমন যেন বেজার ঠেকল।”
বাসন্তী বলল, “এই ব্যাপার? আমি ভাবলুম কী না কী! তা একটু বেজার তো উনি হতেই পারেন।”
“তার মানে?”
“মানে আর কী,” বাসন্তী বলল, “এই যে সারাজীবন আমরা ভাড়াবাড়িতে কাটিয়ে গেলুম, নিজের বাড়ি তৈরি করতে পারলুম না, এখন দেখছি একপক্ষে সেটা ভালই হয়েছে।”
বাসন্তীর অনেক গুণের মধ্যে এই একটা মস্ত দোষ। সব কথাই সে ঘুরি-েপেঁচিয়ে বলে, ফলে কী যে বলছে চট করে সেটা বোঝা যায় না।
বললুম, “কথাটা একটু বুঝিয়ে বলবে?”
“বুঝিয়ে বলার তো কিছু নেই। এ তো খুবই সহজ কথা। ধরো কলকাতা শহরে তোমার যদি একটা বাড়ি থাকত আর ভাড়াটে বসাতে চাও না বলে সেই বাড়ির একতলাটা যদি তুমি খালি ফেলে রাখতে আর পাড়ার ছেলেরা যদি এসে তোমাকে বলত যে, মেসোমশাই আপনার একতলাটা তো ফাঁকাই পড়ে রয়েছে, ওটা আমাদের দিয়ে দিন, আমরা ওখানে আমাদের ড্রামাটিক ক্লাব করব, তো তুমি বেজার হতে না?”
“পাড়ার ছেলেরা সদানন্দবাবুকে তা-ই বলেছে বুঝি?”
“কুসুমদি তো তা-ই বললেন।”
কুসুমদি মানে কুসুমবালা বসু। সদানন্দবাবু স্ত্রী। ভদ্রমহিলার শুনেছি অনেক গুণ। ছেলেপুলে হয়নি বলে হাতে বিস্তর সময় ছিল, সেই সময়টাকে নষ্ট না করে তিনি রান্না, সেলাই, এমব্রয়ডারি ইত্যাদি হরেক বিদ্যার চর্চা করেছেন। দেশি বিদেশি নানান রকম রান্না জানেন, পাড়ায় মেয়ে-বউরা সে-সব তাঁর কাছে শিখতেও যায়। তা ছাড়া যায় ব্লাউজ পাঞ্জাবি শার্ট স্কার্ট ইজের প্যান্ট ফ্রক ইত্যাদির ছাঁটকাট আর সেলাইয়ের ব্যাপারে তালিম নিতে। বাসন্তীও যায়।
বললুম, “ও বাড়িতে শেষ কবে গিয়েছিলে?”
“পরশু দুপুরে।” বাসন্তী বলল, “সোয়েটার বোনার একটা নতুন প্যাটার্ন শিখতে গিয়েছিলুম। তা কথায়-কথায় কুসুমদি বললেন, এ’কী উৎপাত হল বলো তো ভাই, হইচই চিৎকার-চেঁচামেচি সহ্য হয় না বলে একতলাটা ভাড়া দিইনি, এখন পাড়ার ছেলেরা এসে বলছে যে, একতলাটা তাদের ড্রামাটিক ক্লাবের জন্যে ছেড়ে দিতে হবে।”
“ওরেব্বাবা, সে তো আরও মারাত্মক ব্যাপার। ড্রামাটিক ক্লাব মানেই তো রিহার্সাল আর রিহার্সাল মানেই তো তুমুল হট্টগোল। বলতে গেলে আমাদের সামনেই তো ওদের বাড়ি। কান্ডটা কী হবে, সেট বুঝতে পেরেছ?”
বাসন্তী বলল, “পারব না কেন। ওখানে যদি ড্রামাটিক ক্লাব হয় তো তার রিহার্সালের ঠেলায় শুধু সদানন্দবাবুদের কেন, আমাদের কানও ঝালাপালা করে ছাড়বে।”
“এর চেয়ে ভাড়াটে বসানো অনেক ভাল ছিল।”
“ছিলই তো। কুসুমদিও সে-কথা বুঝতে পেরেছেন। বলছেন যে ভাড়াটে বসালে আজ আর এই ঝঞ্ঝাটে পড়তে হত না।”
“তা সেটা তো এখনও বসানো যায়।”
“যায়ই তো। সদানন্দবাবু শুনলুম দালালও লাগিয়েছেন তার জন্যে। বলেছেন যে, সেলামি চাই না, ভাড়াও যা পারে দিক, তবে কিনা দেরি করা চলবে না, সামনের মাসের পয়লা থেকেই ভাড়াটে বসাতে হবে।”
হেসে বললুম, “বোঝো ব্যাপার। কলকাতা শহরে আজকাল বাড়ি ভাড়া বলতে গেলে পাওয়াই যায় না, দুখানা ঘরের জন্যে লোকে মাথা খুঁড়ে মরছে আর এদিকে সদানন্দবাবুর অবস্থা দ্যাখো, না চান বেশি ভাড়া, না চান সেলামি, স্রেফ একটি ভাড়াটে পেলেই ভদ্রলোক এখন বর্তে যান।”
একটু অপেক্ষা করতে পারলে নিশ্চয় মোটামুটি শিক্ষিত আর ভদ্র একটি পরিবারকে ভাড়াটে হিসেবে পাওয়া যেত। তাড়াহুড়োর ফলে সেটা পাওয়া গেল না। সদানন্দবাবুকে সেজন্যে দোষ দেওয়া অর্থহীন, ভদ্রলোকের সত্যিই তখন অপেক্ষা করবার অবস্থা নয়। একেবারে শিরে-সংক্রান্তি অবস্থা। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, ভাড়াটে বাছাবাছি করতে গেলে যে কালক্ষেপ হবার সম্ভাবনা, একতলাটা তার মধ্যে হয়তো হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে।
তা নকুলচন্দ্র বিশ্বাস যে আজ থেকে মোটামুটি চার বছর আগে ৫ নম্বর পীতাম্বর চৌধুরি লেনের একতলার তাড়াটে হয়ে এই গলিতে এসে ঢুকেছিল এই হচ্ছে তার ইতিহাস। দিনটার কথা এখনও আমার স্পষ্ট মনে আছে। সেও ছিল এক রবিবার। অফিসে আমার অফ ডে। দুপুরের খাওয়া-দাওয়ার পাট ঢুকেছে। মে মাসের মাঝামাঝি। আষাঢ়স্য প্রথম দিনটিকে যদি বর্ষাকালের সূচনা-দিবস বলে গণ্য করি তো সেই হিসেবমতো বর্ষা নামতে এখনও অন্তত মাস খানেক বাকি, অথচ গত পনরো দিনের মধ্যে একটিবারও কালবৈশাখীর ঝড় ওঠেনি, ফলে তাপাঙ্ক যেন চড়চড় করে চড়ে যাচ্ছিল। রাস্তায় পিচ-টিচ গলে গিয়ে একেবারে একাক্কার। মনে হচ্ছিল দুপুরের গনগনে রোদ্দুরে গোটা শহর যেন ঝলসে যাচ্ছে। তার আঁচ থেকে বাঁচবার জন্যে জানলা-দরজা বন্ধ করে আমাদের শোবার ঘরটাকে একেবারে অন্ধকার করে নিয়ে, মেঝের উপরে একটা বালিশ ফেলে সদ্য তখন আমি দিবানিদ্রার উদ্যোগ করছি, এমন সময় বাসন্তী এসে বলল, “দেখে যাও।”
রাস্তার দিকের বারান্দায় গিয়ে দেখলুম সদানন্দবাবুর বাড়ির সামনে একটা ঠেলাগাড়ি এসে থেমেছে। ঠেলার পাশে যারা দাঁড়িয়ে আছে, দেখলেই বোঝা যায় যে, তারা স্বামী-স্ত্রী। স্বামীটির বয়স বছর চল্লিশ, বউটির বয়স ত্রিশ-বত্রিশের বেশি হবে না। দুপুরের রোদ্দুরে দরদর করে ঘামতে ঘামতে তারা ঠেলাওয়ালার সঙ্গে ধরাধরি করে মালপত্রগুলিকে একটা-একটা করে বাড়ির ভিতরে নিয়ে ঢোকাচ্ছে। সদানন্দবাবুও উপর থেকে নেমে এসে তাদের সাহায্য করছেন সাধ্যমতো। মিনিট পনরো-কুড়ির মধ্যে সবকিছু ভিতরে ঢুকে গেল।
সদানন্দবাবু আমাদের দেখতে পেয়েছিলেন। যথারীতি হাসলেন। মনে হল, হাসিটা যেন আর তত ক্লিষ্ট নয়। আমিও হাসলুম। কিন্তু কোনও কথা হল না।
ঠেলাওয়ালা ভাড়া নিয়ে চলে গেল। বউটি আগেই বাড়ির মধ্যে ঢুকে পড়েছিল। এবারে ভাড়াটেকে নিয়ে সদানন্দবাবুও রাস্তা থেকে ভিতরে ঢুকলেন। সদর দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
ভাড়াটের নাম কী, আগে কোথা? থাকত, কাজকর্ম কী করে, সে-সব কথা তখনও আমি কিছুই জানি না।
পরদিন জানা গেল।
মনে আছে যে, অন্যান্য দিনের তুলনায় সেদিন অনেক সকাল-সকাল আমাকে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়তে হয়েছিল। বলতে গেলে প্রায় ভোরবেলাতেই বাসন্তী আমার ঘুম ভাঙিয়ে দিয়ে বলেছিল যে, কাজের মেয়েটি আজ আর আসতে পারবে না বলে খবর পাঠিয়েছে, তাই আমাকেই যেতে হবে হরিণঘাটার দুধ আনতে।
চটপট মুখ-চোখ ধুয়ে রাস্তায় বেরিয়েছি, সদানন্দবাবুর সঙ্গে দেখা।
বললুম, “কোথায় গিয়েছিলেন?”
“দুধ আনতে। রোজই তো এই সময়ে আমি দুধ নিয়ে ফিরি।”
“তাই বুঝি? আমি দেখছি কিছুই জানি না।”
একগাল হেসে সদানন্দবাবু বললেন, “কী করে জানবেন? আপনার ঘুমই তো মশাই সাতটার আগে ভাঙে না। তা আজ এত সকাল-সকাল উঠে পড়েছেন যে।”
বললুম, “কাজের মেয়েটি আসেনি। তাই আমাকেই আজ দুধ আনতে হবে।”
“ভাল ভাল, খুব ভাল।” সদানন্দবাবু বললেন, “কাজের মেয়েটি যদি মাঝে-মাঝেই এইরকম কামাই করে তো খুব ভাল হয়। রোজ না হোক, অন্তত মাঝে-মাঝে তা হলে আর আপনার সকাল-সকাল না উঠে উপায় থাকে না।”
কথাটার উত্তর না দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলুম, পিছন থেকে সদানন্দবাবু আবার ডাকলেন। বললেন, “একটা কথা আপনাকে বলা হয়নি। নকুল কিন্তু লোকটি নেহাত খারাপ নয়।”
“কে নকুল?”
“ওই কাল দুপুরে যাকে দেখলেন। নকুল বিশ্বাস… মানে একতলাটা যাকে ভাড়া দিলুম আর কি। ভাড়া অবিশ্যি খুবই কম, মাত্র একশো টাকা। তা কী আর করা যাবে, খুব তাড়াহুড়ো করে ভাড়াটে বসাতে হল তো, নইলে নিশ্চয় অনেক বেশি ভাড়া পাওয়া যেত।”
বললুম, “তা যেত বই কী।”
সদানন্দবাবু বললেন, “ তা হোক, আমি তো আর টাকার জন্যে ভাড়া দিইনি, ভাড়া না-দিলে গোটা একতলাটাই ওই বখাটে ছেলেগুলো দখল করে নিত, তাই দিয়েছি। ভাড়া নাহয় কমই পেলুম, হল্লাবাজির হাত থেকে বাঁচলুম তো, সে-ই ঢের।” তারপর একটু থেমে বললেন, আর তা ছাড়া একশো টাকার বেশি দেবেই বা কী করে?”
আমার দেরি হয়ে যাচ্ছিল। এর পরে গেলে হয়তো শুনতে হবে যে, দুধ ফুরিয়ে গেছে। বললুম, “পরে কথা বলব, এখন চলি।”
দুধ নিয়ে বাড়ি ফিরে বাসন্তীকে বললুম “শুনেছ?”
রান্নাঘর থেকে বাসন্তী বলল, “কী শুনব?”
“সদানন্দবাবু তাঁর একতলাটা মাত্র একশো টাকায় ভাড়া দিলেন।”
“শুনেছি।”
বললুম “তুমি তো বলো কুসুমদির মতন মানুষ নাকি হয় না, অথচ কই, তোমাকে তো একবারও ওঁদের একতলাটা ভাড়া নেবার কথা বলেননি।”
“বলেছিলেন তে।”
“সে কী, এখানে আমরা তিনশো টাকা ভাড়া দিচ্ছি, তার জায়গায় একশো টাকাতেই হয়ে যেত। তবু রাজি হলে না?”
কাজের মেয়ে না-আসার জন্যেই বোধহয় বাসন্তীর মেজাজ বিশেষ ভাল ছিল না। রান্নাঘর থেকেই চড়া গলায় বলল, “কেন রাজি হব? একে তো একটা বাড়ি করতে পারোনি, তার উপরে আবার দোতলার ফ্ল্যাট থেকে একতলায় নামাতে চাইছ। কিনা ভাড়া মাত্তর একশো টাকা! তোমার লজ্জা করে না?”
ওরেব্বাবা, এ তো দেখছি রেগে একেবারে যজ্ঞিবাড়ির উনুন হয়ে রয়েছে। আর কথা না বাড়িয়ে বাইরের ঘরে এসে খবরের কাগজের হেডলাইনে চোখ বুলোতে লাগলুম।
খানিক বাদেই সদানন্দবাবু এলেন। বললেন, “অসময়ে এসে বিরক্ত করলুম না তো?”
বললুম, “আরে না মশাই, কী যে বলেন। বসুন, চায়ের কথা বলে আসছি।”
সদানন্দবাবু বললেন, “আপনার যদি খেতে হয় তো খান, আমি এখন চা খাব না। আমার সেকেন্ড কাপ অলরেডি খাওয়া হয়ে গেছে। আর থার্ড কাপ খাব সেই বিকেলবেলায়। আপনি তো জানেনই যে, তিন কাপের বেশি চা আমি খাই না, ‘ওটাই হচ্ছে লিমিট।”
সত্যি কথা বলতে কী, সদানন্দবাবু যে এখন চা খাবেন না, এইটে জেনে ভারী স্বস্তি পাওয়া গেল। বাসন্তীর যা মেজাজ দেখলুম, তাতে তাকে চায়ের কথা বলতে বিশেষ ভরসা হচ্ছিল না।
বললুম, “তখন দুধ আনতে যাচ্ছিলুম তো, তাই তাড়া ছিল, আপনার কথা ঠিকমতো শোনা হয়নি। তা ভাড়াটে তা হলে ভালই পেয়েছেন?”
সদানন্দবাবু বললেন, “তা-ই তো মনে হচ্ছে। আমি মশাই শান্তিপ্রিয় লোক, আমদানি না হয় একটু কমই হল, লোকটা মোটামুটি ঠান্ডা স্বভাবের হলেই আমি খুশি। তা নকুলকে তো ঠান্ডা স্বভাবের লোক বলেই মনে হচ্ছে। এখন দেখা যাক।”
“আগে ওঁরা কোথায় থাকতেন?”
“শ্রীমানী মার্কেটের পাশের গলিতে। একটা মাত্তর ঘর নিয়ে থাকত। তাতে অসুবিধে হচ্ছিল। নকুলের কাছে লোকজন আসে, তা ঘর তো একটাই, বাইরের লোককে ঘরে ঢুকিয়ে কথাবার্তা বলতে হলে বউয়ের অসুবিধে হয় তাই দু-কামরাওলা ফ্ল্যাট খুঁজছিল।
“কী করেন ভদ্রলোক?”
“অর্ডার সাপ্লাই। ডালহৌসি-পাড়ার অফিসে-অফিসে ঘুরে খোঁজ নেয় কার কী দরকার, তারপর মাল সাপ্লাই করে। ওই আর কি সস্তায় মাল কিনে কিছুটা মার্জিন রেখে বিক্রি করার ব্যাপার। খুব একটা হাতিঘোড়া রোজগার করে বলে মনে হয় না, তবে চলে যায়!”
ভাড়াটে হিসেবে নকুলের সবচেয়ে বড় প্লাস পয়েন্ট যা বুঝলুম সেটা অবশ্য এই যে তারা লোক মাত্র দুটি।
ণদানন্দবাবু উঠে পড়লেন। তারপর চলে যেতে-যেতে দরজা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে একগাল হেসে বললেন, “কী জানেন, সংখ্যাটা যে আর বাড়বে, তাও মনে হয় না। বউটির বয়েস অন্তত তিরিশ তো হবেই, তা এখনও যখন ছেলেপুলে হয়নি, তখন আর কবে হবে?”
ভদ্রলোক বেরিয়ে গেলেন। খানিক বাদে বাসন্তী এসে ঘরে ঢুকল। বললুম, “সদানন্দবাবু এসেছিলেন।”
“কী বললেন?”
“বললেন যে উনি যেমন নিঃসন্তান, ওঁর ভাড়াটেরও তেমনি নাকি ছেলেপুলে হবার কোনও সম্ভাবনা নেই। ভদ্রলোককে খুব খুশি বলে মনে হল।”
বাসন্তী হেসে বলল, “খুশি তো হবেনই। যেমন বাড়িওয়ালা, তেমনি ভাড়াটে। এ তো একেবারে সোনায় সোহাগা।”
তা এও হল চার বছর আগের কথা।
৩
এই কাহিনীর শুরু হয়েছে একেবারেই দিন কয়েক আগের একটা ঘটনা দিয়ে। কিন্তু তার পরেই আবার পিছিয়ে গিয়েছি। কখনও বলেছি বছর দশেক আগের কথা, কখনও বলেছি বছর চারেক আগের। এমনটা কিন্তু মাঝে মাঝেই ঘটতে পারে। অর্থাৎ কখনও পিছিয়ে যাব, আবার কখনও এগিয়ে আসব। ঘটনাগুলিকে পর-পর সাজিয়ে দিতে পারতুম। কিন্তু এই কাহিনীর রস তা হলে জমত না।
আমার মনে হয় আমাদের এই গলিটার একটা বর্ণনা এখানে দেওয়া দরকার। পীতাম্বর চৌধুরি লেন যে মধ্য-কলকাতার শেয়ালদা অঞ্চলে, সেটা অবশ্য আগেই বলেছি। এর একটা মুখ আপার সার্কুলার রোডে অর্থাৎ আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় রোডে পড়েছে, আর অন্য মুখ পড়েছে হ্যারিসন রোডে অর্থাৎ মহাত্মা গান্ধী রোডে। এখান থেকে শেয়ালদা ইস্টিশানে হাঁটাপথে মাত্র তিন-চার মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে যাওয়া যায়, আর বাসে উঠে-রাস্তায় যদি না জ্যাম থাকে তো—হাওড়া ইস্টিশানে পৌঁছতে মিনিট পনেরোর বেশি সময় লাগে না। ইস্কুল-কলেজের সুবিধেও বিস্তর! রাস্তা পার হলেই রিপন কলেজ অর্থাৎ সুরেন্দ্রনাথ কলেজ। মিনিট পাঁচেক হাঁটলেই বঙ্গবাসী। হিন্দু স্কুল, হেয়ার স্কুল, মিত্র মেইন, প্রেসিডেন্সি কলেজ, সংস্কৃত কলেজ, সবই হাঁটা পথের চৌহদ্দির মধ্যে। তা ছাড়া আপার সার্কুলার রোড ধরে রাজাবাজারের দিকে খানিকটা হাঁটলেই ভিক্টোরিয়া কলেজে পৌঁছে যাচ্ছেন। যেমন ছেলেদের তেমনি মেয়েদেরও লেখাপড়ার এত সুবিধে এই শহরের আর কোথাও আছে বলে জানি না। সেন্ট পলস কলেজও এখান থেকে মাত্র দশ মিনিটের হাঁটা পথ।
হাট-বাজারেরও বিস্তর সুবিধে। যেমন এদিকে রয়েছে বৈঠকখানা বাজার আর কোলে মার্কেট, তেমনি ওদিকে রয়েছে কলেজ স্ট্রিটের বনেদি বাজার। বাস ট্রাম ইত্যাদিও একেবারে দোরগোড়ায়। সত্যি বলতে কী, এত সব সুবিধে পাচ্ছি বলেই পীতাম্বর চৌধুরি লেনের দোতলার এই ফ্ল্যাটটা আমার পছন্দ হয়ে গিয়েছিল।
বাসন্তীর পছন্দ হয়নি। ঠোট উল্টে বলেছিল, “কী যে তোমার পছন্দ, বুঝি না বাপু। এইরকমের ঘিঞ্জি জায়গায় মানুষ থাকতে পারে! আমার তো দম বন্ধ হয়ে আসছে।”
তা পাড়াটা যে ঘিঞ্জি, তাতে সন্দেহ নেই। গলিটাও একে এঁদো, তায় সিধে-সরল নয়। এদিককার বড়রাস্তা থেকে শুরু হয়ে তিন-চারটে পাক খেয়ে তারপর ওদিকবার বড়রাস্তায় গিয়ে পড়েছে। লাঠির বাড়ি লাগলে সাপ যেভাবে মোচড় খায়, এও প্রায় সেই রকমের ব্যাপার।
পীতাম্বর চৌধুরি লেনের যাঁরা বাসিন্দা, তাঁদের কেউই যে খুব অবস্থাপন্ন ব্যক্তি, এমন মনে হয় না। তাদের মধ্যে ছোটখাটো ব্যবসায়ী; দোকানদার ও দালাল-শ্রেণীর লোক জনাকয় আছেন বটে, তবে অধিকাংশই চাকুরে। পুরুষানুক্রমে তাঁরা সরকারি ও বেসরকারি অফিসে চাকরি করে যাচ্ছেন। সকাল ন’টা সাড়ে ন’টার মধ্যে তাঁরা বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েন, তারপর সারাটা দিন অফিসে কাটিয়ে বিকেল ছটা সাড়ে-ছটা নাগাদ বাড়িতে ফিরে স্নান সেরে, কিঞ্চিৎ জলযোগ করে নিয়ে বাড়ির সামনের রোয়াকে বসে গল্প-গুজব করেন, আর কোঁচার খুট কি রুমাল ঘুরিয়ে হাওয়া খান।
বাড়িগুলো যে তাঁদের বাপ-ঠাকুদার আমলে কি তারও আগে তৈরি হয়েছিল তা বুঝতে কারও অসুবিধে হবার কথা নয়। চুন-সুরকি দিয়ে গেঁথে তোলা মোটা-দেওয়ালের পেটাছাতের বাড়ি। সে কালের কর্তারা হয়তো মিস্ত্রি ডেকে মাঝে-মধ্যেই ছোটখাটো মেরামতি কি দাগরেজির কাজ করিয়ে নিতেন। এ-কালের কর্তাদের না আছে তেমন ট্যাকের জোর, না আছে ভাগের বাড়িতে পয়সা ঢালার উৎসাহ। ফলে মেরামতি যেমন হয় না, তেমনি জানলা দরজাতেও আর নতুন করে রঙের প্রলেপ পড়ে না। কোনও কোনও বাড়িতে বোধহর গত কুড়ি-পঁচিশ বছরের মধ্যে চুনকামের কাজও হয়নি। অধিকাংশ বাড়ির অবস্থাই অতি লঝড়। চৌত্রিশ সালে সেই যে একটা ভয়ঙ্কর ভূমিকম্প হয়েছিল, তার ধাক্কাটা যে এ-সব বাড়ি কী করে সামলে নিল তা কে জানে, তবে কিনা আবার যদি তেমন কোনও ভূমিকম্প হয় তো এ গলির প্রত্যেকটা বাড়িই নির্ঘাত হুড়মুড় করে ধসে পড়বে। আলসের বটগাছের চারা, বর্ষাকালে ফাটা রেনপাইপ দিয়ে ছড়ছড় করে চতুর্দিকে জল পড়তে থাকে। রাস্তা দিয়ে তখন খুব সন্তর্পণে চলাফেরা করতে হয়। একটু অসতর্ক হলেই পাইপের নোংরা জল পড়ে জামাকাপড় ভিজে যাবার আশঙ্কা। বাইরের দেওয়ালের পল তারা খসে পড়েছে, ফলে ভিতরকার গাঁথনির ইে এমনভাবে দাঁত বার করে রয়েছে যে, তার উপরে চোখ পড়বামাত্র অতিশয় অশ্লীল একটা উপমা অনেকের মাথায় আসবে। মনে হবে বাড়িগুলো যেন তাদের পরনের কাপড় তুলে উদোম হয়ে সর্বজনকে নিজেদের খোস-পাঁচড়া দেখাতে পারার একটা উৎকট উল্লাসে সারাক্ষণ নিঃশব্দে হেসে চলেছে।
যে বাড়িতে আমরা আছি, সেটাও কিছু ব্যতিক্রম নয়, মোটামুটি এই একই রকমের। তিনতলা বাড়ি। মালিকের অবস্থা ভাল নয়। তিনি রিটায়ার করেছেন, কিন্তু তিনটে ছেলের একটাও মানুষ হয়নি, তা ছাড়া দুই মেয়ের বিয়ে এখনও বাকি। এদিকে ছেলে তিনটে যদিও কোনও কাজকর্ম করে না, তাদের মধ্যে বড় আর মেজো ইতিমধ্যে বিয়ে করে ফেলেছে। বাড়িওয়ালার পরিবারটি অতএব নেহাত ছোট নয়। তিনতলার তিনটে ঘর নিয়ে তিনি থাকেন। খুব যে হাত-পা ছড়িয়ে থাকেন না, সেটা সহজেই বুঝতে পারি। একতলার ভাড়াটেরা সম্ভবত গত পঞ্চাশ বছর ধরে এখানে রয়েছে। ভাড়া দেয় যৎসামান্য, তাও ঠিকমতো দেয় না শুনেছি, কিন্তু কিছু করারও নেই, মামলা করেও বাড়িওয়ালা তাদের তুলে দিতে পারছেন না। বাকি রইল দোতলা। সেখানে আমরা থাকি। আমরা মানে আমি বাসন্তী আর আমাদের ছোট মেয়ে। ছেলেকে কর্মসূত্রে বাইরে থাকতে হয়, বড় মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে, ছোট মেয়ে ব্রেবোর্ন কলেজে পড়ে, এখান থেকে বাসে উঠে চটপট কলেজে পৌঁছে যায়, কোনও অসুবিধে হয় না।
যা কিছু অসুবিধে ছিল তা এই পুরনো ভাঙাচোরা বাড়ির ফ্ল্যাটটা নিয়েই। তবে সেটাও আমি নিজের উদ্যোগে যতটা সম্ভব মিটিয়ে নিয়েছি। ফ্ল্যাটটা যখন দেখতে আসি, তখনই বুঝেছিলুম যে, দেওয়ালের পলস্তারা থেকে জানালা-দরজা অনেক কিছুই সারিয়ে সুরিয়ে নিতে হবে। বাড়িওয়ালাকে সেলামি-বাবদ পাঁচ হাজার টাকা দিতে হয়েছিল, কিন্তু মেরামতির বাবদে তা থেকে তিনি একটি পয়সাও খরচ করতে রাজি হলেন না। বললেন যে, অ্যাডভান্স বাবদ যদি আরও হাজার কয়েক টাকা দিই, তো তাই দিয়ে তিনি মেরামতি করিয়ে দেবেন। তা টাকাটা তাঁকে দিয়েওছিলুম, কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি কিছুই করলেন না। বারকয় তাগাদা দিতে লজ্জিত গলায় বললেন যে, তিনি অভাবী মানুষ, টাকাটা খরচ করে ফেলেছেন। ফলে যা-কিছু মেরামতির কাজ ছিল, আবার কিছু গাঁটগচ্চা দিয়ে সেগুলি করিয়ে নিয়ে তারপর আমাকে এই নতুন আস্তানায় এসে উঠতে হয়।
পাঁচ নম্বর বাড়িটার চেহারা কিন্তু এতসব পুরনো লজঝড় বাড়ির মধ্যেও একটু অন্যরকম। বয়স অবশ্য সেটারও কিছু কম হয়নি। সদর দরজার পাশে দেওয়ালের গায়ে বর্ডার-দিয়ে-বসানো শ্বেতপাথরের ট্যাবলেট পড়ে যেমন বোঝা যায় যে, বাড়িটার নাম শ্যামনিবাস, তেমনি সেই নামের নীচে ১৮৭০ দেখে মালুম হয় যে, আজ থেকে একশো বছরেরও বেশি আগে এ বাড়ি তৈরি হয়েছিল। তৈরি করিয়েছিলেন সদানন্দের প্রপিতামহ শ্যামানন্দ বসু। পাথরের ট্যাবলেটটা অবশ্য তাঁর লাগানো নয়। সদানন্দের পিতামহ দয়ানন্দ বসু ওটা এই শতাব্দীর গোড়ার দিকে লাগিয়ে দিয়ে তাঁর পিতৃভক্তির প্রমাণ রেখেছিলেন।
পীতাম্বর চৌধুরি লেনের বেশির ভাগ বাড়িই পার্টিশান হয়েছে। সেটাই স্বাভাবিক। কালক্রমে শরিকের সংখ্যা তো বেড়েই যায়, ছোটখাটো নানা ব্যাপার নিয়েও তখন ঝগড়াঝাঁটি লাগতে থাকে, যৌথ একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে চৌচির হয়, ফলে বাড়িটাও আর পার্টিশান না করে উপায় থাকে না। এখানেও সেই একই ব্যাপার হয়েছে। কিছু-কিছু বাড়িতে তো যত ঘর তত শরিক। পাঁচ নম্বর বাড়িটাও শরিকে-শরিকে ভাগ হয়ে যেতে পারত। তা যে হয়নি, তার কারণ আর কিছুই নয়, শ্যামানন্দের সময় থেকেই এ-বাড়ির মালিকদের কারও একাধিক পুত্র-সন্তান হয়নি। ব্যাপারটা পরিকল্পিত নয় নিশ্চয়ই, পরিবার পরিকল্পনা নেহাতই এ-কালের ব্যাপার, সদানন্দের পূর্বপুরুষেরা এতসব প্ল্যানিংয়ের ধার ধারতেন না। তবু যে তাঁদের প্রত্যেকেরই মাত্র একটি করে পুত্র, এটাকে একটা আকস্মিক ব্যাপারই বলতে হবে। শ্যামানন্দের একমাত্র পুত্রসন্তান দয়ানন্দ; দয়ানন্দের একমাত্র পুত্রসন্তান মহানন্দ; এবং মহানন্দেরও একমাত্র পুত্রসন্তান আমাদের এই সদানন্দ বসু। লাইনটা অবশ্য এখানেই শেষ। সদানন্দ যে নিঃসন্তান মানুষ, সে-কথা আগেই বলেছি।
যা-ই হোক, যে-কথা বলছিলুম সেটা এই যে, পূর্বপুরুষদের কারও একাধিক পুত্রসন্তান না-হওয়ায় এই পরিবারের স্থাবর অস্থাবর কোনও সম্পত্তিই কখনও ভাগ-বাঁটোয়ারা হয়নি। তা ছাড়া, সদানন্দবাবুর কাছেই শুনেছি, তাঁর পূর্বপুরুষদের কারও এমন কোনও বদ-খেয়ালও ছিল না যে, বাড়ি বন্ধক দিয়ে কি ঘটিবাটি বিক্রি করে টাকা জোগাড় করবার দরকার পড়বে। নেশা বলতে যা বোঝায়, তা ছিল একমাত্র দয়ানন্দের। তা সে-নেশাও ঘোড়া কিংবা মদ-মেয়েমানুষের নয়, ঘুড়ি আর পায়রা ওড়ানোর, যাকে কিনা বৃহৎ কোনও বদ-খেয়ালের পর্যায়ে ফেলা যাচ্ছে না।
জন্মসূত্রেই সদানন্দ তাই মোটামুটি সচ্ছল মানুষ। চাকরিটা খুব উঁচু দরের করেননি বটে, তবে মাঝে-মধ্যেই দু’চার টাকা উপরির ব্যবস্থা থাকায় তাঁর রোজগার নেহাত খারাপও ছিল না। ফলে বাড়িটা যতই পুরনো হোক বছরে অন্তত একবার মিস্ত্রি-মজুর লাগিয়ে তিনি তাতেই একটু চেকনাই ফুটিয়ে রাখতে পেরেছেন।
বাড়িটা বিশেষ বড়ও নয়। দোতলা-একতলা মিলিয়ে ঘর মাত্রই চারটে। উপরের তলায় দুটো আর নীচের তলায় দুটো। তবে দুটো তলাই এমনভাবে তৈরি হয়েছিল, উপর-নীচে ভাগাভাগির দরকার হলেও যাতে কোনও তলার শরিকের কোনও অসুবিধে না হয়। উপরতলায় যেমন রান্নাঘর, একফালি ভাঁড়ার আর বাথরুমে আছে, তেমনি আছে নীচের তলাতেও। সদানন্দবাবুর অবশ্য চারটে ঘরের দরকারও হয় না। মানুষ তো এ-সংসারে দুটি মাত্র, দোতলার দুখানা ঘরেই তাই তাঁর দিব্যি চলে যায়। একতলাটা তবু যে তিনি ফাঁকা ফেলে রেখেছিলেন, তার কারণ তো আগেই বলেছি, ভদ্রলোক ঝুট-ঝামেলা পছন্দ করেন না। শেষ পর্যন্ত অবশ্য পাড়ার ছেলেরা বেদখল করে নিতে পারে, এই ভয়েই তিনি তাড়াহুড়ো করে ভাড়াটে বসিয়ে দিলেন। তবে সেটা বসাবার আগে, ভাড়ার ব্যাপারে মাথা না ঘামালেও, এই একটা ব্যাপারে তিনি একেবারে ষোলো-আনা নিশ্চিত হয়ে নিয়েছিলেন যে, ভাড়াটে হয়ে যারা আসছে, তাদের লোকসংখ্যা খুবই কম।
পাড়ার ছেলেদের ভয়ে সদাহাস্যময় সদানন্দবাবুর মুখে তো মেঘ জমতে শুরু করেছিল। ভাড়াটে বসাবার পরে দেখলুম মেঘ কেটে গিয়েছে, সদানন্দবাবু আবার সেই আগের মতো হাসছেন। কথাবার্তাও বলছেন সেই আগের মতোই প্রাণ খুলে। দেখে আমি নিশ্চিন্ত হয়েছিলুম।
কিন্তু খুব বেশিদিন নিশ্চিন্ত থাকা গেল না। সে-কথায় একটু বাদে আসছি। তার আগে তাঁর দৈনন্দিন রুটিন আর ওই মর্নিং ওয়াকের কথাটা একটু বলে নেওয়া ভাল।
মর্নিং ওয়াকটাও অবশ্য তাঁর দৈনন্দিন রুটিনের মধ্যেই পড়ে। সবটা তো স্বচক্ষে দেখবার উপায় নেই, প্রায় বারো-আনাই শোনা-কথা। তা যে-সব কথা শুনি, তা যদি মিথ্যে না হয় তো বুঝতে হবে, সদানন্দবাবু প্রতিটি কাজ করেন একেবারে ঘড়ি ধরে, নির্দিষ্ট একটা রুটিন অনুয়ায়ী। কী শীত, কী গ্ৰীষ্ম, ভদ্রলোক ঘুম থেকে ওঠেন কাঁটায় কাঁটায় সাড়ে চারটের সময়, চোখে-মুখে জল দিয়ে নিজের হাতে স্টোভ ধরিয়ে জল ফুটিয়ে এককাপ চা খান। চা মানে ওই হালকা লিকার। তাতে সব মিলিয়ে মিনিট পঁচিশেক সময় যায়। স্টোভে যখন জল গরম হচ্ছে, তার মধ্যেই পালটে নেন তাঁর জামাকাপড় তারপর চা খেয়ে যখন সদর-দরজা খুলে মর্নিং ওয়াক করতে বেরিয়ে পড়েন, ঘড়িতে তখনও পাঁচটা বাজেনি, মিনিট কয়েক বাকি। সদর দরজায় গোদরেজের টানাতালা বসিয়ে নিয়েছেন। তার একটা চাবি সদানন্দবাবুর কাছে থাকে, আর অন্যটা থাকে ভাড়াটেদের কাছে। দরজা বন্ধ করবার জন্যে কাউকে ডেকে তুলবার দরকার হয় না, স্রেফ পাল্লাটা টেনে দিয়ে বেরিয়ে পড়লেই হল। যখন বেরিয়ে পড়েন, তখন তাঁর হাতে থাকে একটা লাঠি আর এখটা টর্চ। লাঠিটা আমি দেখেছি। এই রকমের লাঠি বড় একটা দেখা যায় না। মোটা বেতের লাঠি, তার মাথায় একটা লোহার বল বসানো।
কখনও আধা ঘন্টা হাঁটলেন, কখনও চল্লিশ মিনিট, সদানন্দবাবুর জীবনে এমনটা হবার উপায় নেই রোজ একেবারে নিয়ম করে তিনি ঠিক এক ঘন্টা হাঁটেন। শ্রদ্ধানন্দ পার্ক দূরে নয়, সে শনে গিয়ে গোটাকয় চক্কর মেরে একেবারে কাঁটায় কাঁটায় ছ’টায় তিনি বাড়িতে ফেরেন। ফিরে, দোলায় উঠে আবার স্টোভ ধরিয়ে চা বানাতে লেগে যান। এবারে বানান দুকাপ চা। গিন্নির ঘুম ভাঙিয়ে এককাপ তাঁর হাতে তুলে দেন, অন্য কাপ তাঁর নিজের জন্য। চা খেতে-খেতে গিন্নির সঙ্গে দুটো-একটা কথা হয়, তারপর বেরিয়ে পড়েন দুধ আনতে। দুধ এনে সাতটার সময় বেরিয়ে পড়েন বাজারে। বৈঠকখানা বাজারে রোজ যান না। বাজার আজকাল তার গন্ডি ছাড়িয়ে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে, হ্যারিসন রোডের দুধারেই সারে সারে আলু-পটোল-ঝিঙে-বেগুন আর মাছের ব্যাপারীরা বসে যায়, কিন্তু সদানন্দবাবুর কেনাকাটা তবু যে এক ঘন্টার আগে শেষ হয় না, তার কারণ তিনি ‘রেদস্তুর করতে ভালবাসেন, প্রতিটি জিনিস কেনেনও খুব বাছাই করে। বাড়ি ফেরেন আটটায়। তখন লেখাবার খান, কিন্তু তার সঙ্গে আর চা খান না। তৃতীয় কাপ চা খান বিকেল চারটেয়।
তা এ হল সকালবেলার হিসেব। বাকি দিনটাও এইরকমের রুটিনে বাঁধা। কোথাও কোনও নড়চড় হবার উপায় নেই। এইভাবে চললে নাকি শরীর সজুত থাকে, আয়ুবৃদ্ধি হয়। হবেও বা
সদানন্দবাবুকে আমি কখনও মর্নিং ওয়াকে বেরোতে দেখিনি, ফিরে আসতেও না। ওই স্বর্গীয় দৃশ্য কি আর আমার মতো অলস লোকের পক্ষে দেখা সম্ভব? রোজই যে আমি দেরি করে ঘুমোই তাই ঘুম ভাঙতে বেলা হয়ে যায়,তা অবশ্য নয়। অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ফিরতে পারলে, আর রাত জেগে যা শেষ করতে হবে এমন কোনও জরুরি কাজ হাতে না থাকলে, এক-একদিন তো দশটার মধ্যেই শুয়ে পড়ি। কিন্তু তাতেও দেখেছি সাতটার আগে ঘুম ভাঙে না। তা হলে আর সদানন্দবাবুর ভোর-পাঁচটার মর্নিং ওয়াক কী করে দেখব।
আমার ছোট মেয়ে পারুল অবশ্য দেখেছে। সেও দেখত না, যদি না সামনের এপ্রিলেই বি. এ ফাইনাল পরীক্ষায় বসবার জন্যে তাকে আদাজল খেয়ে তৈরি হতে হত। পার্ট ওয়ানের ফল বিশেষ ভাল হয়নি, এখন ফাইনালটা ভাল করে দেওয়া দরকার, গত মাস তিনেক ধরেই সে তাই নাকি শেষ-রাত্তিরে ঘুম থেকে উঠে পড়তে বসে যাচ্ছে।
সেদিন সকালবেলার জলখাবার খাবার সময় কথায়-কথায় সদানন্দবাবুর প্রসঙ্গ উঠেছিল। দিন কয়েক যাবৎ আমার গেঁটেবাতের যন্ত্রণা বড় বেড়েছে। বাসন্তীকে সে-কথা বলতে সে বলল, “দোষ তোমারও কম নয় বাপু, সদানন্দবাবুর পরামর্শ মতো এই যে দুধ-চিনি বাদ দিয়ে চা ধরেছ, এতে তোমার অ্যাসিডিটি যে অনেক কমে গেছে, সেটা তো স্বীকার করবে?”
বললুম, “বা রে, তা আমি অস্বীকার করব কেন?”
বাসন্তী বলল, “এবারে ওঁর মতো মর্নিং ওয়াকটাও ধরে ফ্যালো। ভদ্রলোক তো কতদিন ধরেই বলছেন, অথচ তুমিই গা করছ না। রোজ সকাল পাঁচটায় যদি ওঁর সঙ্গে বেরিয়ে পড়ে একটু ঘুরে আসতে, তো তোমার এই গেঁটেবাতের ব্যথাও নিশ্চয় খানিকটা অন্তত কমে যেত।”
হেসে বললুম, “ওরেব্বাবা, ও-সব আমার দ্বারা হবে না।”
পারুল বলল, “না-হবার কিছু নেই বাবা। বোস-জেঠু তো দেখি রোজ সকালে একেবারে কাঁটায়-কাঁটায় পাঁচটার সময় বেরিয়ে পড়েন। তা তিনি যদি অত সকাল-সকাল ঘুম থেকে উঠতে পারেন তো তুমিই বা পারবে না কেন?”
বললুম, “তুই কি সেই সময়ে ওঁকে দেখতে পাস নাকি? তুইও তো তখন ঘুমিয়ে থাকিস।
পারুল তাতে রেগে গিয়ে বলল, “এই হচ্ছে তোমার মস্ত দোষ। বাড়ির কোনও খবরই তুমি রাখো না, এমন কী, তোমার মেয়ে কখন ঘুম থেকে ওঠে, তাও তোমার জানা নেই। তা হলে শুনে রাখো, গত ডিসেম্বর মাস থেকেই রাত চারটেয় ঘুম থেকে উঠে আমি পড়তে বসে যাচ্ছি।”
“হঠাৎ এত সুমতি যে?”
জলখাবার খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। কাপ-প্লেট গোছাতে-গোছতেই বাসন্তী আমার দিকে অবাক চোখে তাকাল, তারপর মেয়ের দিকে তাকিয়ে তেতো-গলায় বলল, “তা হলেই বোঝ যে, তোর বাবা কত দায়িত্বশীল মানুষ। সামনের মাসেই যে মেয়ের ফাইনাল পরীক্ষা, তা পর্যন্ত জানে না!”
পারুল যেমন হঠাৎ-হঠাৎ রেগে যায়, তেমনি তার রাগটা আবার পড়েও যায় খুব তাড়াতাড়ি। বাসন্তীর কথায় আমি যে খুব অস্বস্তির মধ্যে পড়ে গিয়েছি এইটে বুঝে হেসে ফেলে বলল, “থাক, থাক, বাবাকে আর কিছু বোলো না মা। এমনিই তো বাতের ব্যথায় কষ্ট পাচ্ছে, বেশি যদি বকাঝকা করো তো ব্লাড প্রেশারও চড়ে যাবে।”
বাসনপত্র গুছিয়ে নিয়ে বাসন্তী ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। তখন পারুল বলল, “আমার পড়ার টেবিলটা তো জানলার ধারেই, রোজ পাঁচটায় সত্যি আমি বোস-জেঠুকে বেরিয়ে পড়তে দেখি। ডিসেম্বর মাস থেকেই দেখছি।”
“সত্যি?”
“তবে আর বলছি কী! এখন তো গরম পড়ে গেছে, শীতের সময়েও একেবারে কাঁটায় কাঁটায় পাঁচটায় উনি মর্নিং-ওয়াকে বেরিয়ে পড়তেন। উঃ তখন যে ওঁকে কী অদ্ভুত দেখাত, সে আর কী বলব!”
“অদ্ভুত দেখাত মানে?”
“যদি না বকো তো বলি। বলো, বকবে না তো?”
“না, না, বকব কেন? আমি কি কখনও কাউকে বকি নাকি? ওটা তো তোর মায়ের ডিপার্টমেন্ট।”
পারুল হেসে বলল, “ওর বাড়ির সামনেই স্ট্রিট-লাইট তো, তাই দেখতে কোনও অসুবিধে হত না। পায়ে বুটজুতো, গায়ে বিশাল অলেস্টার, তার উপরে আবার মাথায় মাঙ্কি-ক্যাপ… ওই যা পরলে শুধু চোখ দুটো আর নাকের ফুটোটা বেরিয়ে থাকে, বাদবাকি সব ঢাকা পড়ে যায়। তখন না….. তখন না…..বলি বাবা?”
বললুম, “অত কিন্তু-কিন্তু করছিস কেন, বলেই ফ্যাল না!”
“তখন ওঁকে টিভিতে যে রামায়ণ চলছিল না, তার জাম্বুবানের মতন দেখাত বাবা!”
কথাটা বলেই ঘর থেকে পারুল ছুটে বেরিয়ে গেল।
৪
সদানন্দবাবুর মুখে যে আবার হাসি ফিরেছে, এইটে দেখে সত্যি আমি বড় নিশ্চিন্ত হয়েছিলুম। কিন্তু খুব বেশিদিন যে নিশ্চিন্ত থাকা যায়নি, আগের পরিচ্ছেদেই তা বলা হয়েছে। ভদ্রলোকের মুখটা আজ থেকে বছর তিনেক আগেই আবার মেঘলা হতে শুরু করে। তার মানে এ হল গিয়ে নকুলচন্দ্ৰ তাঁর বাড়িতে ভাড়াটে হয়ে আসবার তা ধরুন বছর খানেক পরের কথা। রাস্তায় একদিন দেখা হয়ে যেতে সদানন্দবাবুকে তখন জিজ্ঞেস করেছিলুম যে, কী হল, আবার কোনও ঝামেলা বাধল নাকি।
সদানন্দবাবু তাতে বললেন, “আরে মশাই, ঝামেলা কার নেই বলুন তো। বেঁচে থাকাটাই একটা ঝামেলা। বয়েস তো নেহাত কম হল না, এখন গেলে বাঁচি!”
কথাটা আর-কেউ বললে অবাক হতুম না। সদানন্দবাবু বলছেন বলেই অবাক হতে হল। শরীরের কলকব্জাগুলোকে ঠিক রাখবার জন্যে যাঁর চেষ্টার অন্ত নেই, আর সেই চেষ্টার কথাটা যিনি সগর্বে ঘোষণা করে থাকেন, বলেন যে, তাঁর দৃষ্টান্ত অনুসরণ করলে আয়ুবৃদ্ধি একেবারে অবধারিত, সেই লোক বলছেন কিনা গেলে বাঁচি। এ-সব কথা আর-যাঁরই মুখে মানিয়ে যাক, সদানন্দবাবুর মুখে একেবারেই মানায় না।
কিন্তু তবু সে তাঁকে সেদিন আর এ নিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করিনি, তার কারণ আর কিছুই নয়, তাঁর উত্তর দেবার ধরন দেখেই আমি বুঝে গিয়েছিলুম যে, প্রসঙ্গটা তিনি এড়িয়ে যেতে চাইছেন।
দু’চার দিনের মধ্যেই অবশ্য ব্যাপারটা বোঝা গেল। এক রবিবার সকালে আমাদের বাড়িতে এলেন সদানন্দবাবু। যথারীতি হাল্কা এক কাপ লিকার খেলেন। তারপর অন্যান্য প্রসঙ্গে দু’চার কথা হবার পরে বললেন, “না মশাই, ভাড়াটে বাছতে ভুল করেছি, নকুলচন্দ্র লোকটা বিশেষ সুবিধের নয়।”
আমি বললুম, “বাছাবাছি আর করলেন কোথায়। পাড়ার ছেলেদের কথায় ঘাবড়ে গিয়ে হঠাৎ ঠিক করলেন যে, একতলাটা ভাড়া দেবেন, আর তার দুচার দিনের মধ্যেই তো নকুলচন্দ্র এসে গেল। সেই যে এক রাজার গল্প শুনেছি, রাত্তিরে ঠিক করলেন যে, সকালে ঘুম থেকে উঠে রাজবাড়ির বাইরে বেড়াতে বেরিয়ে প্রথম যার মুখে দেখবেন, তার সঙ্গেই মেয়ের বিয়ে দেবেন, আপনারও তো দেখলুম সেই ব্যাপার।”
সদানন্দবাবু বিমর্ষ মুখে বললেন, “সেইটেই বড্ড ভুল করে ফেললুম। নকুলটা মশাই অতি নচ্ছার লোক। যাদের কথার ঠিক নেই তাদের আমি মানুষ বলেই মনে করি না। নকুলটা মানুষ নয়।”
বললুম, “কথার ঠিক নেই বললেই তো আর হল না, বেঠিকটা কী দেখলেন?”
“তা হলে শুনুন মশাই, বাড়িতে যখন ভাড়াটে হয়ে ঢোকে, নকুল তখন আমাকে বলেছিল যে, স্রেফ ওরা স্বামী-স্ত্রী থাকবে, আর কাউকে এনে ঢোকাবে না। তা এক বছর পার হতে-না-হতেই দেখছি শ্বশুরবাড়ি থেকে একটি শালাকে এনে ঢুকিয়েছে। বলেছিল, হপ্তাখানেক থেকেই চলে যাবে, কিন্তু কই, শালাবাবুটির তো নড়বার কোনও লক্ষণই দেখছি না।”
পাঁচ নম্বরের একতলায় যে নতুন একজন লোক কিছুদিন ধরে রয়েছে, এ৩। ‘মামিও লক্ষ করেছি। বাসন্তীকে জিজ্ঞেসও করেছিলুম যে, লোকটা কে? তা বাসন্তী বলল, ও হচ্ছে নকুলের বউ যমুনার দাদা। মানে আপন দাদা নয়, মামাতো দাদা। গ্রামে থাকত, সেখান থেকে বোনের বাড়িতে এসে উঠেছে। এখন কিছুদিন কলকাতায় থেকে যা-হোক কিছু একটা কাজকর্ম জুটিয়ে নেবে।
তা সদানন্দবাবুর তাতে এত আপত্তি কেন, বোঝা গেল না। বললুম, “কাজকর্মের সন্ধানে এসেছে একটা কিছু জুটে গেলেই চলে যাবে নিশ্চয়। সব বাড়িতেই আত্মীয়স্বজনেরা এমন এসেই থাকে, চিরকালের জন্যে তো আর কেউ আসে না। ও নিয়ে আপনি এত ভাবছেন কেন?”
সদানন্দবাবু বললেন, “ভাবনার কারণ আছে বলেই ভাবছি। আপনি বলছেন, একটা কাজকর্ম জুটে গেলেই চলে যাবে। আরে মশাই কাজকর্ম কি মামার বাড়ির ক্ষীরের নাড়ু নাকি যে দিনরাত্তির আমি বিছানায় পড়ে রইলুম, আর আদর করে দিদিমা আমার মুখের মধ্যে গুঁজে দিয়ে গেল। কাজকর্ম জোটাতে হলে হাঁটাহাঁটি করাই যথেষ্ট নয়, রীতিমত দৌড়ঝাঁপ করা দরকার। তা বিষ্টু হতচ্ছাড়া সে-সব করছে কোথায়?”
“ওর নাম বুঝি বিষ্টু?”
“হ্যাঁ। বিষ্টুচরণ দাস।”
“সারাদিন বিছানায় পড়ে-পড়ে ঘুমোয় বুঝি?”
“যখন ঘুমোয় না, তখন হেঁড়ে গলায় যাত্রার গান গায়। আমার মশাই একটুও পছন্দ হয় না।” সদানন্দবাবু আর বসলেন না, বেরিয়ে গেলেন।
.
বাড়িওয়ালার সঙ্গে ভাড়াটের সম্পর্ক অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভাল হয় না। তার উপরে আবার বাড়িওয়ালা আর ভাড়াটে যখন একই বাড়িতে থাকে, সম্পর্কটা তখন প্রায়ই অতি তেতো হয়ে ওঠে। আমার বাড়িওয়ালার সঙ্গেও আমার সম্পর্ক বিশেষ মধুর নয়। মোটামুটি দশ বছর এখানে আছি, তার মধ্যে দুবার আমার ভাড়া বেড়েছে, তা নিয়ে আমি কোনও আপত্তিও তুলিনি, রেন্ট কন্ট্রোলে যাবার ভয় দেখানো তো দূরের কথা, মুখেও কখনও বলিনি যে, এইভাবে ভাড়া বাড়ানোটা মোটেই উচিত-কাজ হচ্ছে না, তবু দেখছি আমার বাড়িওয়ালাটি প্রায়ই ঠারেঠোরে এমন সব উক্তি করছেন, যাতে মনে হয়, আমি উঠে গেলেই তিনি বাঁচেন।
ভাড়াটে উঠে গেলেই যে বাড়িওয়ালার সুবিধে সেটা অবশ্য আমি অস্বীকার করি না। আর কিছু না হোক, নতুন ভাড়াটের কাছ থেকে ফের নতুন করে পাঁচ-দশ হাজার টাকা সেলামি আদায় করা যায়। সেটাই তো মস্ত লাভ। সম্ভবত সেই জন্যেই আমার বাড়িওয়ালা কিছুদিন যাবৎ গাইতে শুরু করেছেন যে, তিনতলায় আর তাঁর কুলোচ্ছে না, দোতলাটা যদি এবারে ছেড়ে দিই তো তাঁর বড্ড উপকার হয়।
কথাটা তিনি যেমন আমাকে বলেন, তেমনি বাসন্তীকেও বলেন। আমি বলি, “খোঁজাখুঁজি তো করছি, নতুন একটা ফ্ল্যাটের সন্ধান পেলেই এটা ছেড়ে দেব।” বাসন্তীও মোটামুটি সেই কথাই বলছিল। কিন্তু দিন কয়েক আগে বাড়িওয়ালা ফের যখন কাঁদুনি গাইতে শুরু করেন, বাসন্তী তখন দুম করে রেগে গিয়ে তাঁকে বলে বসে, “আপনার কুলোচ্ছে না তো আমরা কী করব? মেয়ে দুটোর বিয়ে দিয়ে শ্বশুরবাড়িতে পাঠিয়ে দিন, তা হলেই দেখবেন দিব্যি কুলিয়ে যাবে।”
বাস সেই যে বাড়িওয়ালা আমাদের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করেছেন, এখনও তিনি স্পিকটি নট্। দেখা হলেই মুখ ঘুরিয়ে নেন। বাক্যালাপ বন্ধ হওয়ায় অবশ্য আমাদের বিশেষ অসুবিধে হচ্ছে না, তবে ভয় হচ্ছে যে, এবারে হয়তো জল বন্ধ হবে। তা হলে মুশকিলে পড়ব।
জল বন্ধ হওয়ার এই ভয়টা শুরু হয়েছিল বছর তিনেক আগেই। বাড়িওয়ালার সঙ্গে আমার সম্পর্ক মোটামুটি তখন থেকেই খারাপ চলছে। ব্যাপারটা সেইসময়ে সদানন্দবাবুকে আমি জানিয়েওছিলুম। বলেছিলুম, আপনার সমস্যা ভাড়াটেকে নিয়ে, আর আমার সমস্যা বাড়িওয়ালাকে নিয়ে। কী যে করব, বুঝতে পারছি না। জল বন্ধ হলে তো বিপদে পড়ব, মশাই।”
শুনে জিভ কেটে সদানন্দবাবু বলেছিলেন, “ছি ছি, জল আবার কেউ বন্ধ করে নাকি। ও তো একটা ক্রিমিন্যাল অফেন্স।”
তা বছর তিনেক আগে যা-ই বলে থাকুন মাস ছয়েক আগে নিজের বাড়িতে কিন্তু সদানন্দবাবু সেই ক্রিমিন্যাল অফেন্সটাই করে বসলেন। প্রথমে তিনি নকুলচন্দ্রের জলের সাপ্লা২ + ন্ধ করলেন, তার পরে কাটলেন ইলেকট্রিক।
অর্থাৎ সদানন্দবাবু একেবারে তিতিবিরক্ত। তাঁর একতলার ভাড়াটেদের তিনি তাড়াতে চাইছেন। . তাড়াতে চাইবার কারণ মাত্র একটি নয়, অনেক। তাঁর কথাবার্তা শুনে বুঝতে পারছি যে, নকুল- পরিবারের বলতে গেলে প্রায় কোনও কিছুই তিনি পছন্দ করতে পারছেন না।
নকুলচন্দ্রের শালাবাবু বিষ্টুচরণের চেহারা যে খুব বদখত তা নয়, তা ছাড়া সদানন্দ নিজেও স্বীকার করেন যে, কথাবার্তায় লোকটা খুব বিনয়ীও বটে। কিন্তু ওই যে সে কাজকর্মের জন্যে দৌড়ঝাঁপ না করে গোটা দুপুরটা স্রেফ ঘুমিয়ে কাটায়, আর যখন জেগে থাকে, তখন মাঝে-মাঝেই হেঁড়ে গলায় যাত্রার গান গায়, এটা তাঁর পছন্দ নয়। নকুলচন্দ্রের বউ যমুনাকে কেউ কচিখুকিটি বলবে না, তার বয়েস নিশ্চয় তিরিশ পার হয়ে গেছে, অথচ এখনও সে যে চোখে পুরু করে কাজল দেয়, ঠোঁটে লিপস্টিক ঘষে, হাতকাটা ব্লাউজ পরে, আর কথাও বলে ‘ন্যাকা ন্যাকা’, এটা তাঁর পছন্দ নয়। এই বাড়িতে ভাড়াটে হয়ে আসবার বছর দুয়েক বাদে যে যমুনার একটি মেয়ে হয়েছে, ফলে বিষ্টুচরণকে হিসেবের মধ্যে ধরলে—ভাড়াটেদের লোকসংখ্যা যে মাত্র দুবছরের মধ্যেই সেন্ট পার্সেন্ট বেড়ে গিয়ে এখন দুয়ের জায়গায় চার হয়েছে, এটাও তাঁর পছন্দ নয়।
কিন্তু তাঁর সবচেয়ে অপছন্দের ব্যাপার হল নকুলচন্দ্রের ব্যাবসা।
নকুলচন্দ্র যখন ভাড়াটে হয়ে আসে, তখন সে অর্ডার সাপ্লাইয়ের কাজ করত। তাতে সুবিধে না হওয়ায় সে জমি কেনাবেচার লাইন ধরে। কিন্তু তাতেও সে চোট খেয়ে যায়। ফলে বছর খানেক হল সে মাছের ব্যাবসা ধরেছে। আর এই মাছের ব্যাবসা নিয়েই সদানন্দের ঘোর আপত্তি।
আপত্তি হত না, নকুল যদি না বাড়ির মধ্যে তার পাইকারি ব্যাবসার আড়ত বসিয়ে দিত। দুটো ঘরের একটায় তারা স্বামী-স্ত্রী আর বাচ্চাটি থাকে। অন্য ঘরটায় বিষ্টু থাকত। এখনও থাকে, তবে কিনা ঘরের বেশির ভাগটাই ভর্তি হয়ে থাকে মাছের ঝুড়িতে।
সদানন্দবাবু যে প্রথম-প্রথম এই নিয়ে খুব আপত্তি করেছিলেন, তা নয়। শুধু একদিন হাসতে-হাসতে আমাকে বলেছিলেন, “বিষ্টুকে এবারে পালাতে হবে মশাই।”
আমি বলেছিলুম, “কেন?”
“যতই হোক, মানুষ তো। গন্ধের দাপটেই পালাতে হবে।”
বললুম, “তা বটে। বিষ্টুকে যে মাছের ঘরে থাকতে হয়, সেটা আমার মনেই ছিল না।”
বিষ্টু কিন্তু পালাল না। নকুলচন্দ্রের মাছের ব্যাবসাও সমানে চলতে লাগল। সকাল সাড়ে পাঁচটা নাগাদ নাকি বাজারের খুচরো ব্যবসায়ীরা পাঁচ নম্বর বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায়, মাছ দেখে, পছন্দ হলে দামদস্তুর করে, দামে পোষালে মাছ ওজন হয়, তারপর পাওনাগন্ডা মিটিয়ে দিয়ে মাছের ঝুড়ি রিকশায় তুলে তারা ছ’টার মধ্যেই বাজারে চলে যায়। আমি তো অত সকাল-সকাল ঘুম থেকে উঠি না। তাই স্বচক্ষে এই কেনাবেচার ব্যাপারটা কখনও দেখিনি। তবে যেমন বাসন্তী আর পারুলের কাছে, তেমনি পাড়ার অন্য দুচারজন লোকের মুখে শুনেছি যে, গলিটা তখন আঁশটে গন্ধে ভরে ওঠে।
যে ঘরে মাছের আড়ত তারই একপাশে বিষ্টুর শোবার জায়গা। মাঝে-মধ্যে সদানন্দবাবুর বাড়িতে যাই। দোতলায় উঠবার সময় সিঁড়ি থেকে উঁকি মেরে দেখতে পাই, ঘরের মধ্যে পরপর মাছের ঝুড়ি আর সেই ঝুড়ির পাশে নোংরা একটা বিছানা। বিষ্টুচরণকেও দেখতে পাই। দিব্যি সে তার বিছানায় শুয়ে ঘুম লাগাচ্ছে। সদানন্দবাবু আশা করেছিলেন, বিষ্টু এবারে পালাবে, ওই আঁশটে গন্ধের মধ্যে সে টিকতে পারবে না। কিন্তু যেভাবে তাকে নাক ডাকিয়ে ঘুমোতে দেখি, তাতে আমার মনে হয় না যে, মাছের গন্ধে বিষ্টুর কোনও অসুবিধে হচ্ছে।
আসলে অসুবিধেটা যে সদানন্দবাবুরই হচ্ছে, সেটা বুঝতে পারলুম, যখন এর মাস ছয়েক বাদে তিনি আবার এক রবিবারে আমার বৈঠকখানায় এসে ঢুকলেন। সাধারণত একটা ভূমিকা করে নিয়ে তারপরে তিনি আসল প্রসঙ্গে আসেন। সেদিন কিন্তু কোনও ভূমিকার মধ্যে তিনি গেলেন না। ঘরে ঢুকেই হতাশ গলায় বললেন, “আর তো পারছি না মশাই।”
একটা বই বেরুবে, তার প্রুফ দেখছিলুম। সেটাকে সরিয়ে রেখে বললুম, “কেন, আবার কী হল?”
“হবে আবার কী, গন্ধে একেবারে পাগল হয়ে গেলুম!”
“রোজই কি গন্ধ ছড়ায় নাকি?”
“রোজ। তার উপরে আবার এক-একদিন এমন উৎকট গন্ধ ছড়ায় যে, সে আর কী বলব, গোটা শরীরটা যেন গুলিয়ে ওঠে। কী করি বলুন তো?”
জীবনে আমি মাছের ব্যাবসা কেন, কোনও ব্যাবসাই করিনি। তবে কিনা যেখানে মাছের আড়ত খোলা হয়েছে, সেখানে যে আঁশটে গন্ধে বাতাস সারাক্ষণ ভরাট হয়ে থাকবে, এটা বুঝবার জন্যে আলাদা কোনও ব্যাবসাবুদ্ধি থাকার দরকার হয় না, অল্পবিস্তর কান্ডজ্ঞান থাকাটাই যথেষ্ট। নকুলচন্দ্ৰ মাছের ব্যাবসা করে, বাড়িতেই তার মাছের আড়ত, খুচরো ব্যবসায়ীরা তার কাছ থেকে মাছ কেনে, কিন্তু তার আড়তের সব মাছই কি আর সঙ্গে-সঙ্গে বিক্রি হয়ে যায়? তা নিশ্চয় হয় না। স্টকের কিছুটা মাছ নিশ্চয় পড়ে থাকে। ঠিকমতো যদি না বরফ-চাপা দিয়ে রাখা হয়, তা হলে সেগুলো পচতে শুরু করে। তার গন্ধ তো তখন উৎকট হয়ে উঠবেই। আর তা যে উঠবে, সদানন্দবাবুর সে-কথা আগেই বোঝা উচিত ছিল।
বললুম, “কী আর করবেন। ভাড়াটে নেবার আগে একটা কনট্রাক্ট করে নিয়েছিলেন?”
“তা তো করিনি।”
“করা উচিত ছিল। তাতে এইরকম একটা শর্তও আপনার রাখা উচিত ছিল যে, একতলাটাকে শুধু রেসিডেন্সিয়াল পার্পাসেই ব্যবহার করা চলবে, ওখানে গোডাউন করা চলবে না। তা তেমন কোনও কনট্রাক্ট যখন নেই, তখন আর আপনি কী করবেন?”
“সে কী মশাই”, সদানন্দবাবু বললেন, “বাড়ি তো আর নকুলের নয়, বাড়ি আমার। নাকি তাও আপনি স্বীকার করবেন না?”
“তা কেন করব না?” হেসে বললুম, “বাড়ি আপনারই।”
“আর সেই বাড়িটাকে যদি কেউ নরককুন্ড বানিয়ে তোলে, তাও আমি কিছু করতে পারব না? বাড়ি ভাড়া দিয়ে কি আমি চোর-দায়ে ধরা পড়েছি নাকি?”
বললুম, “নিয়মিত ভাড়া দেয়?”
“তা দেয়।”
“তা হলে মামলা-টামলার মধ্যে যাবেন না, গিয়ে কোনও লাভ হবে না। বরং এক কাজ করুন। ওকে বুঝিয়ে বলুন যে, বসতবাড়ির মধ্যে এই যে ও মাছের আড়ত করেছে এটা ঠিক হচ্ছে না। তাতে যদি কাজ না হয় তো তার পরের কথাটা তখন ভাবা যাবে।”
সদানন্দবাবু বুঝিয়ে বলতে গিয়েছিলেন। তাতে কাজ হয়নি। মাছের আড়ত অন্য কোথাও সরিয়ে নিতে হবে, এই প্রস্তাব শুনে নকুলচন্দ্র নাকি হাত কচলে বলেছিল, “কোথায় সরাব মেসোমশাই? আমি রইলুম এখানে আর আড়ত রইল আর-এক জায়গায়, এই করে কি ব্যাবসা চলে?”
সদানন্দবাবু বলেছিলেন, “অন্যেরা চালায় কী করে?”
তাতে নকুল বলেছিল, “তারা পারে। তাদের পয়সা আছে। তারা মাছ পাহারা দেবার জন্যে দরোয়ান রাখে, মাছ বিক্রি করবার জন্যে আলাদা কর্মচারী রাখে। আমি ও-সব কী করে পারব?”
সদানন্দবাবুর কাছে সব শুনে আমি বললুম, “তা হলে ওকে উঠে যেতে বলুন। পাড়ার দু’চারজন ভদ্রলোককে সঙ্গে নিয়ে ওর কাছে যান। গিয়ে বলুন যে, এখানে ওর থাকা চলবে না।”
তা-ই বলা হল। নকুলচন্দ্র তাতে কাতর গলায় বলল, “কোথায় যাব মেসোমশাই? এত কম ভাড়ায় আর কোথায় দু’খানা ঘর পাব আমি?”
অগত্যা কী আর করেন, যে কাজকে নিজেই একদিন ক্রিমিন্যাল অফেন্স বলেছিলেন, উপায়ান্তর না-থাকায় হঠাৎ একদিন সেটাই করতে হল সদানন্দবাবুকে। ভাড়াটের জলের সাপ্লাই তিনি বন্ধ করে দিলেন।
কিন্তু তাতে কোনও লাভ হল না। এমন নয় যে, জল বন্ধ হবার ব্যাপারটা নিয়ে নকুল একটা হইচই বাধিয়ে দিল। তা সে করল না। এমনকি সদানন্দবাবুর কাছে এই নিয়ে কোনও প্রতিবাদও জানাল না সে। স্রেফ একজন ভারী লাগিয়ে রাস্তার কল থেকে সে জল আনিয়ে নিতে লাগল।
সদানন্দবাবু বুঝে গেলেন যে, শুধুই জল বন্ধ করে নকুলচন্দ্রকে জব্দ করা যাবে না। তখন তিনি লাইটের কানেকশনও কেটে দিলেন।
তার পরের দিনই আবার আমার ফ্ল্যাটে এসে কড়া নাড়লেন সদানন্দবাবু। থমথমে গম্ভীর মুখ; হাসির লেশমাত্র নেই।
বললুম, “ব্যাপার কী মশাই, আবার কী হল?”
“হপ্তাখানেক ধরে যে ওকে জল দিচ্ছি না সেটা জানেন তো?”
“জানতুম না। কাল রাত্তিরে বাসন্তীর কাছে শুনলুম।”
“তিনি কী করে জানলেন?”
“কাল বিকেলে কী একটা কাজে যেন আপনার মিসেসের কাছে গিয়েছিল, তাঁরই কাছে শুনেছে। কাজটা ভাল করেননি।”
“তা হয়তো করিনি,” সদানন্দবাবু বললেন, “কিন্তু এ ছাড়া উপায়টাই বা কী ছিল?”
“তা এতে কোনও কাজ হল?”
হতাশ গলায় সদানন্দবাবু বললেন, “কিসসু না। ভেবেছিলুম বাছাধন এবারে পথে আসবে। কিন্তু কোথায় কী, ভারী দিয়ে জল আনিয়ে নিচ্ছে। কাল রাত্তিরে তাই লাইটের কানেকশনও কেটে দিলুম।”
বললুম, “এটা আরও খারাপ করলেন। মামলা-টামলা যদি হয়ই, তা হলে এই দুটো ব্যাপারই কিন্তু ওর ফেভারে যাবে। আর মামলা তো পরের কথা, এক্ষুনি গিয়ে ও যদি থানার ডায়েরি লিখিয়ে আসে তো আপনি বিপদে পড়ে যাবেন মশাই।
সদানন্দবাবু বললেন, “বিপদে আমি অলরেডি পড়েছি।”
“তার মানে? নকুল কি এরই মধ্যে থানায় গিয়ে ডায়েরি করেছে নাকি?”
“না মশাই, বিপদ একেবারে উল্টো দিক থেকে এসেছে।”
শ্যামনিবাস-রহস্য – ৫
সদানন্দবাবু যে কী বলতে চাইছেন, কিছুই ঠাহর করতে পারলুম না। বললুম, “ব্যাপারটা একটু বুঝিয়ে বলুন তো।”
সদানন্দবাবু একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, সব তা হলে খুলেই বলি। দেখুন মশাই নকুল যে মোটেই সুবিধের লোক নয়, সে ওরা ভাড়াটে হয়ে আসবার এক বছর বাদেই আমি টের পেয়েছি। বলেছিল ওরা দুটিমাত্র প্রাণী এখানে থাকবে, অথচ বছরখানেক যেতে না যেতেই একটা উটকো লোককে আমার বাড়ির মধ্যে এনে ঢোকাল। তার মানে ওর কথার ঠিক নেই। না না, বিষ্টুচরণ যে খারাপ লোক তা আমি বলছি না। কাজকর্ম না খুঁজে ও যে পড়ে-পড়ে শুধু ঘুমোয় তাতেও আমার আপত্তি নেই। কিন্তু এমন তারস্বরে গান গাইবে কেন? তার উপরে আবার বছর দুয়েক আগে নলের একটা মেয়ে হয়েছে। রাত্তিরে সেটা এক-একদিন এমন ট্যা-ট্যা করে কাঁদে যে, আমার ঘুগ্মের বড় ব্যাঘাত হয়। আমি মশাই শান্তিপ্রিয় লোক, আমার গিন্নিটিও তা-ই, এতসব চিৎকার চেঁচামেচি আমাদের পছন্দ হয় না। তার উপরে আবার অশান্তি আজকাল আরও বেড়েছে।”
“আঁশটে গন্ধের কথা বলছেন তো?”
“আরে সে উৎপাত তো আছেই। মাছ যখন পচে, তখন তার গন্ধে আমাদের অন্নপ্রাশনের ভাত পর্যন্ত মুখে উঠে আসে মশাই।”
কথাটা সেদিন বাসন্তীর কাছেও শুনেছি। হাসতে-হাসতে বাসন্তী বলছিল, “কুসুমদির কাছে আজ উলের একটা প্যাটার্ন তুলতে গিয়েছিলুম, তা পচা-মাছের দুর্গন্ধে তো বসতেই পারলুম না। কুসুমদিরও একেবারে পাগল-পাগল অবস্থা। শাড়ির আঁচল নাকের উপর চেপে ধরে পরিত্রাহি চেঁচাচ্ছিলেন আর সদানন্দবাবুকে নাকিসুরে বলছিলেন, বিদেয় করো বিদেয় করো, আঁজই এই পাঁপ বিদেয় করো। প্যাটার্ন তুলব কী, আমি তখন পালাতে পরলে বাঁচি।’
সদানন্দবাবুকে বললুম, “আঁশটে গন্ধটা তো আর নতুন সমস্যা নয়, ওটা তো কিছুদিন ধরেই চলছে। নতুন অশান্তিটা কী হল?”
সদানন্দবাবু বললেন, “সেই কথাই তো বলছি। তা আপনি শুনছেন কই। ব্যাটা আজকাল বড্ড বাড়াবাড়ি করছে। মানে সবকিছুরই একটা মাত্রা থাকবে তো, তাও থাকছে না।”
ভদ্রলোকের সবই ভাল, কিন্তু মুশকিল এই যে বক্তব্যের চেয়ে ভূমিকাটাই বড় হয়ে দাঁড়ায়। বললুম, “অত বিতং দিয়ে কথা বলবেন না তো, স্পষ্ট করে বলুন যে কী হয়েছে।”
সদানন্দবাবু বললেন, “সে কী মশাই, কিছুই আপনার কানে যায় না নাকি।” তারপর একটু চুপ করে থেকে বললেন, “অবশ্য যাবেই বা কী করে? রাত্তিরে তো আপনারা পিছনের দিককার ঘরে থাকেন, তাই না?”
“হ্যাঁ, তো কী হয়েছে?”
“রাস্তার দিককার ঘরে যদি থাকতেন তো ঘুম ভেঙে যেত। উরে বাপরে বাপ্ সে কী চেঁচামেচি!”
“কে চেঁচামেচি করে?”
“কে আবার, ওই নকুল। ব্যাটা বরাবরই রাত করে ফিরত, তা আজকাল তো দেখছি রাত বারোটাও পেরিয়ে যাচ্ছে। ফিরে এসেই চেঁচামেচি জুড়ে দেয়, আর বউয়ের উপরে চোটপাট করতে থাকে। উপর থেকে যে আমি তাতে আপত্তি করিনি তাও নয়। বেশ কয়েকদিনই গলা চড়িয়ে বলেছি, ‘এ সব কী হচ্ছে, অ্যাঁ? এত হল্লা কিসের? এটা বস্তি নয়, এটা ভদ্রপাড়া।’ তা সে-সব কথা তো গেরাহ্যিই করে না। চেঁচাচ্ছে তো চেঁচাচ্ছেই, হল্লা করছে তো করছেই। ওরে বাবা রে বাবা, সে এক জগঝম্প কান্ড।”
“এত রাত করে ফেরে কেন, কখনও জিজ্ঞেস করেছিলেন?”
“তা করেছিলুম বই কী। রাত্তিরে তো আর নীচে নামতে ভরসা হয় না, তাই একদিন দিনের বেলায় দেখা হয়ে যেতে জিজ্ঞেস করেছিলুম যে বাড়ি ফিরতে আজকাল এত রাত হচ্ছে কেন?”
“তাতে কী বলল?”
“বলল যে, মহাজনের পাওনা মিটিয়ে ফিরতে হয় তো, তাই একটু রাত হয়ে যায়।” সদানন্দবাবু একটা চোখ একটু ছোট করে হাসলেন। তারপর গলার স্বর একটু নীচে নামিয়ে বললেন, “ও-ও বলল, আর আমিও বিশ্বাস করলুম! আসল কথাটা কী জানেন, ব্যাটা আজকাল খুব মাল টানছে।”
“তা টানুক না, আপনার পয়সায় তো আর টানছে না, তা হলে আর আপনার তা নিয়ে এত উতলা হবার দরকার কী? ওর ডানা গজিয়েছে তাই উড়ছে। তা উড়ুক না, আপনি তাতে বিচলিত হচ্ছেন কেন?”
সদানন্দবাবু অবাক চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর বললেন, “যাচ্চলে, আমি কেন বিচলিত হব? আরে না মশাই, কে মাল টানল না-টানল তাতে আমার কী। ও-সব নিয়ে আমি একটুও ভাবছি না। আমার সাফ কথা, যা করতে হয়, মুখ বুজে করো, হল্লাবাজি চলবে না। আর হ্যাঁ, বাড়ির মধ্যে পচা মাছের দুর্গন্ধ ছড়ানোও চলবে না। ওই আড়তটাকেও এখান থেকে সরাতে হবে।”
পারুল এসে ঘরে ঢুকল। বললুম “কী ব্যাপার, পড়া ছেড়ে উঠে এলি যে? কিছু বলবি?”
“মা বলছে, এবার চান করতে যাও, মার রান্না হয়ে গেছে।”
সদানন্দবাবু বললেন, “তা হলে চলি মশাই। আপনার অফিস যাবার টাইম হল।”
বললুম, “বসুন বসুন, পাঁচ মিনিট পরে গেলেও চলবে।” তারপর পারুলের দিকে তাকিয়ে বললুম, “তোর মাকে বল যে, বোসদা এসেছেন, তাঁর সঙ্গে কথা বলছি, মিনিট পাঁচেক বাদে কলঘরে ঢুকব।”
পারুল চলে গেল। সদানন্দবাবু বললেন, “মোট কথা, হল্লা যদ্দিন পর্যন্ত না বন্ধ হচ্ছে আর যদ্দিন পর্যন্ত না সরানো হচ্ছে এই মাছের আড়ত, আমিও তদ্দিন ছাড়ছি না।”
বললুম, “সেইজন্যেই যে জল আর লাইট কেটে দিয়েছেন, সে তো বুঝতেই পারছি।”
“ব্যাটারা ভারী দিয়ে জল আনাচ্ছে। সকালে যখন বাজার থেকে ফিরছে তখন আবার দেখলুম, এক হাতে বাজারের থলি, আর এক হাতে দুটো হ্যারিকেন।”
“লাইট যখন কেটে দিয়েছেন, তখন হ্যারিকেন আর হাতপাখা ছাড়া উপায় কী। কিন্তু এখনও বলছি, কাজটা আপনি ভাল করলেন না। শেষ পর্যন্ত একটা বিপদে না পড়ে যান।”
“সে তো পড়েইছি। না না, যা ভাবছেন তা নয়, নকুল এ নিয়ে কী করবে না-করবে জানি না, তবে এখনও থানা-পুলিশ করেনি।”
“বিপদটা তা হলে কীসের?”
“বিপদ একেবারে উল্টো দিকের।”
কথাটা যে সদানন্দবাবু গোড়াতেই বলেছিলেন, সেটা ভুলে গিয়েছিলুম। এতক্ষণে আবার মনে পড়ল। বললুম “হ্যাঁ হ্যাঁ, এইরকম একটা কথা আপনি বলছিলেন বটে, আমারই খেয়াল ছিল না। তা উলটো দিকের মানে কোন দিকের?”
একটু আগেও বেশ চড়া গলায় কথা বলছিলেন সদানন্দবাবু; এমন একটা ভাব দেখাচ্ছিলেন যেন নকুলচন্দ্রকে উচিত-শিক্ষা না-দিয়ে তিনি ছাড়বেন না। হঠাৎ যেন সেই ‘যুদ্ধং দেহি’ ভাবটা একেবারে মিলিয়ে গেল। মুখের উপরে আবার মেঘ ঘনিয়ে এসেছে, ভঙ্গিটাও ভারী কুণ্ঠিত। বেজার গলায় ভদ্রলোক বললেন, “বিপদটা ঘটিয়েছেন আমার গিন্নিই।”
“তার মানে?” অবাক হয়ে বললুম, “আপনার মিসেস আবার কী বলছেন?”
কাঁচুমাচু হয়ে সদানন্দবাবু বললেন, “বলছেন যে আমি মানুষ নই, একেবারে অমানুষ। আমার মধ্যে নাকি মনুষ্যত্ব বলতে কিছু নেই।”
ব্যাপারটা আসলে কী ঘটেছে, সেটা জানতে আমার ভীষণ কৌতূহল হচ্ছিল। অথচ সদানন্দবাবু যেভাবে অনাবশ্যক বিতং দিয়ে কথা বলেন, তাতে সন্দেহ হচ্ছিল যে, সমস্যাটা যে ঠিক কী, বিস্তর বাক্যব্যয় করেও তিনি সেটা ঠিক পরিষ্কার করে বুঝিয়ে বলতে পারবেন না। তাই মনে হল যে, ওর বাড়িতে গিয়ে সরাসরি ওঁর স্ত্রীর সঙ্গে একবার কথা বলা দরকার।
সদানন্দবাবুকে একটুক্ষণ অপেক্ষা করতে বলে তাই বৈঠকখানা থেকে রান্নাঘরে এসে বাসন্তীকে বললুম, “অফিসের আজ তেমন তাড়া নেই, ঘন্টাখানেক পরে গেলেও চলবে। চট করে একবার ও-বাড়ি থেকে ঘুরে আছি।”
বৈঠকখানায় ফিরে এসে সদানন্দবাবুকে বললুম, “চলুন আপনার মিসেসের সঙ্গে কথা বলব।” আমাদের বাড়ির প্রায় উল্টো দিকেই পাঁচ-নম্বর বাড়ি। গলিটা পার হয়ে বাড়িতে ঢুকে উপরে উঠে এলুম।
কুসুমবালা তাঁর শোবার ঘরের খাটের উপরে একটা তাকিয়ায় ঠেস দিয়ে বসে আছেন। আমাকে দেখে হেসে বললেন, “আসুন আসুন। আমি কিন্তু উঠতে পারব না, বাতের ব্যথাটা আবার খুব বেড়েছে।”
বললুম, “না না, উঠতে হবে না।”
সদানন্দবাবু একটা চেয়ার এগিয়ে দিয়ে আমাকে বসতে বসলেন। তারপর বললেন, “আমি তো দিনে তিন কাপের বেশি চা খাই না, তার মধ্যে দুকাপ ইতিমধ্যেই খাওয়া হয়ে গেছে। থার্ড কাপ খাব বিকেলে। কিন্তু আপনি তো আর অত হিসেব করে খান না, আপনার জন্যে একটু চা করি?”
বললুম, “আরে না মশাই চায়ের দরকার নেই। মিসেস বসুকে একটা কথা বলতে এসেছি। বলেই চলে যাব।”
কুসুমবালা হেসে বললেন, “আমার সঙ্গে আবার কী কথা?”
“সদানন্দবাবু যে একতলার লাইট কেটে দিয়েছেন, তাতে আপনারা আপত্তি আছে, তাই না?”
কুসুমবালার মুখ থেকে হাসিটা নিমেষে মিলিয়ে গেল। বললেন, “আছেই তো। এটা কি একটা মানুষের মতো কাজ হল?”
“এ কথা বলছেন কেন? কুলদের জন্যে আপনার এত ভাবনা কিসের?”
কুসুমবালা যেন ফুঁসে উঠলেন। বললেন, “ওদের জন্যে ভাবতে আমার বয়ে গেছে! না কিরণবাবু, আমি নকুলের কথাও ভাবছি না, যমুনার কথাও ভাবছি না, যমুনার নানা বিষ্টুর কথাও ভাবছি না। কিন্তু দু’বছরের একটা দুধের বাচ্চা. তার কষ্টের কথাটা তো একবার ভাবতে হবে।”
সদানন্দবাবু বললেন, “কমলির কথা বলছ? সে তো বলতে গেলে সারাটা দিন দোতলায় এসে তোমার কাছেই কাটায়।”
কুসুমবালা বললেন, “তা কাটায়। কিন্তু সারাটা রাত একতলায় তার মায়ের কাছে থাকে। চত্তির মাস, গরম পড়ে গেছে, গরমে কাল রাত্তিরে ওই মেয়েটা ঘুমোতে পারেনি। তা ছাড়া আমি জানি তো, মা’রাত্তিরে একবার হিটারে দুধ গরম করে ওকে খাইয়ে দিতে হয়। তা ইলেকট্রিক না থাকলে যেমন ফ্যান চলে না, তেমনি হিটারও চলে না। মাঝরাত্তিরে কাল তাই মেয়েটার নিশ্চয় কিছু খাওয়া হয়নি। তা এ-সব কথা কি তুমি ভেবে দেখেছিলে? একবারও ভাবোনি। দুম করে তুমি ইলেকট্রিকের লাইন কেটে দিলে। দিয়ে ভাবলে যে এই করে নকুলকে খুব জব্দ করা হল। কিন্তু নকুলকে জব্দ করতে গিয়ে একটা দুধের বাচ্চাকে যে কী কষ্টে ফেলা হল, তা ভেবেও দেখলে না। তুমি কি মানুষ? ছিছি!”
সদানন্দবাবুর মুখ দেখে মনে হচ্ছিল যে, তিনি একেবারে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গিয়েছেন। আমার দিকে তাকিয়ে করুণ মুখে বললেন, “আপনি কিছু বলবেন না?”
“কী আর বলব? আমার তো মনে হয়, মিসেস বসু যা বলেছেন ঠিকই বলেছেন।”
উঠে পড়লুম। সিঁড়ি দিয়ে নামতে-নামতে একটা বাচ্চা-মেয়ের কান্নার শব্দ কানে এল। সেইসঙ্গে একটা মেয়েলি গলার ধমক। “থাক্, জেঠির দরদ যে কত সে তো বোঝাই গেছে, ফ্যানের হাওয়া খাওয়ার জন্যে আর তোমার উপরে গিয়ে কাজ নেই।”
বুঝতে পারলুম যে, কমলি তার জ্যাঠাইমার কাছে যাওয়ার জন্য বায়না ধরেছে, কিন্তু তার মা তাকে যেতে দিচ্ছে না।
৬
রাইটার্সে একটা ফোন করবার দরকার ছিল। সংক্ষেপে যাকে পি. এ. বি. এক্স. বলে, ডায়াল ঘুরিয়ে সেই প্রাইভেট অটোমেটিক ব্রাঞ্চ এক্সচেঞ্জের সঙ্গে যোগাযোগ করতেই সেখানকার মেয়েটি বলল, “একটু আগেই এক ভদ্রলোক আপনাকে চাইছিলেন। আপনি নেই শুনে বললেন যে, খানিক বাদে আবার ফোন করবেন।”
“নাম বলেননি?”
“আমি জিজ্ঞেস করেছিলুম, উনি কিছু বললেন না। শুধু বললেন যে, উনি বাইরে থেকে এসেছেন, আপনাকে এই মেসেজটা দিয়ে দিলেই হবে।”
কিছুই বুঝতে পারলুম না। বাসন্তীর দাদা দিল্লিতে থাকেন, কিন্তু তাঁর তো এখন কলকাতায় আসবার কথা নয়, এলেও নিশ্চয় অফিসে না করে বাড়িতেই ফোন করতেন। ছেলে থাকে এলাহাবাদে। সে-ই কি হঠাৎ তার অফিসের কাজে কলকাতায় এল? অফিসে কোনও জরুরি কনফারেন্স আছে হয়তো, তাই স্টেশন থেকে একেবারে সরাসরি অফিসে চলে গিয়ে সেখান থেকে ফোন করেছে। কিন্তু সে-ই বা অফিসে ফোন করবে কেন?
এক্সচেঞ্জের মেয়েটিকে বললুম, “ঠিক আছে, এখন রাইটার্সকে একবার ডেকে দাও তো।”
বাইটার্সের সঙ্গে কথা শেষ করে সদ্য ডেস্কের কাজে হাত দিয়েছি, এমন সময় টেলিফোন বেজে উঠল।
“কেমন আছেন মশাই?”
এ যে কার গলা, সে আর বলে দিতে হয় না। হাজার লোকের গলার ভিতর থেকেও এই গলাটিকে একেবারে আলাদা করে চিনে নেওয়া যায়। চারু ভাদুড়ি।
বললুম, “কী কান্ড! কোথেকে ফোন করছেন?”
“কলকাতায় এসে বরাবর যেখানে উঠি সেখান থেকে।”
“তার মানে মালতীদের বাড়ি থেকে, তাই না?”
“বিলক্ষণ।”
“কিন্তু এখন তো আপনার কলকাতায় আসবার কথা ছিল না। গত হপ্তাতেই তো আপনার চিঠি পেয়েছ। তাতে লিখেছিলেন যে, পুজোর আগে কলকাতায় আসার কোনও প্ল্যান নেই।
“প্ল্যান সত্যিই ছিল না।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিন্তু হঠাৎ একটা কাজ পড়ে গেল। এমন কাজ যে, না এলেই নয়।
“কবে এসেছেন?”
“তা চার-পাঁচ দিন হল। …দাঁড়ান, দাঁড়ান, হিসেব করে বলছি। আজ তো বুধবার। আমি এসেছি গত শুক্রবার। তা শুক্র, শনি, রবি সোম, মঙ্গল—পাঁচ রাত্তিরই তো হল, মোট পাঁচ রাত্তির এখানে কাটিয়েছি।”
“কাজ মিটেছে?”
“পনরো আনা মিটেছে। আজ বিকেলে একজনের আসবার কথা আছে এখানে। সে এলে বাকি এক আনাও মিটে যায়। তা শুধু কাজ মিটলেই তো চলে না, তার একটা রিপোর্ট লিখে ক্লায়েন্টের হাতে দিতে হয়। কাল দুপুরে রিপোর্টটা লিখে ফেলব। ক্লায়েন্ট আসবে রাত্তিরে। রিপোর্টটা তার হাতে ধরিয়ে দিলেই আমার ছুটি।”
“তার মানে পরশুই ব্যাঙ্গালোরে ফিরবেন?”
“তা-ই তো ভেবেছিলুম। কিন্তু মালতী আটকে দিয়েছে। অরুণের শরীরটা বিশেষ ভাল যাচ্ছে না। তাই ব্যাঙ্গালোরে ফোন কবে বলে দিলুম যে, সামনের হপ্তাটাও আমি কলকাতাতেই থাকব।”
“অরুণের কী অসুখ?”
“সেই একই অসুখ। ওর যে একটা মাইল্ড স্ট্রোক হয়ে গিয়েছিল, তা তো আপনি জানেনই। তার পর থেকেই খুব সাবধানে থাকতে হয়। তা মালতী ওকে যথাসাধ্য সাবধানে রাখেও। তবু যে কেন প্রেশারটা এত ফ্লাকচুয়েট করে, বুঝতে পারি না। দিন কয়েক হল, ওই প্রেশারই একটু ট্রাব্ল দিচ্ছে। ….না না, চিন্তা করবেন না। মাঝে-মাঝে তো এ-রকম ওর হয়ই, আবার ঠিকও হয়ে যায়।”
“কবে যাব আপনার কাছে?”
“কাল পর্যন্ত ব্যস্ত আছি। পরশু থেকে একদম ফ্রি।”
“শুক্রবার আর শনিবার, দুটো দিন একটু ঝঞ্ঝাটে থাকব। অর্থাৎ পরও আর তরশু। তারপরেই তো রোব্বার। বলেন তো রোব্বার বিকেলেই যেতে পারি। ফোনে অবশ্য রোজই খবর নেব।”
“ঠিক আছে।” ভাদুড়িমশাই বললেন। “তা হলে রোব্বারই আসুন। তবে বিকেলে নয়, সকালে। …..এই নিন, মালতীর সঙ্গে কথা বলুন।”
“সকালেই চলে আসুন, কিরণদা।” ফোনে মালতীর গলা ভেসে এল। “দুপুরে এখানেই খাবেন বিকেলের আগে আপনাকে ছাড়া হচ্ছে না। পারুল আর বউদিকেও নিয়ে আসবেন কিন্তু।”
“আবার খাওয়া-দাওয়ার হাঙ্গামা বাধাচ্ছ কেন মালতী? অরুণের শরীর তো শুনলুম ভাল যাচ্ছে না। আর তা ছাড়া তোমার বউদি যে যেতে পারবে, এমন আশাও নেই। পারুলের জন্যেই পারবে না। সামনের মাসেই পারুলের বি.এ. ফাইনাল। সারা দিন পড়ছে। অর্থাৎ কিনা মরণকালে হরিনামের ব্যাগার। তা বাসন্তীও গত দুমাস ধরে পাড়া ছেড়ে কোথাও যায়নি। বলছে, মেয়ের পরীক্ষা যন্দিন না শেষ হয়, কোথাও যাবেও না।”
“ঠিক আছে, তা হলে আপনি একাই আসুন। অরুণকে নিয়ে ভাববেন না। আজ প্রেশার নেওয়া হয়েছিল, আগের চেয়ে অনেক ভাল আছে।”
ফোন নামিয়ে রেখে কাজে বসে গেলুম।
কাজকর্ম চুকিয়ে অফিস থেকে বাড়িতে ফিরতে-ফিরতে রাত দশটা। বাসন্তী বলল, “চটপট জামা কাপড় পালটে হাত-মুখ ধুয়ে নাও, সেই ফাঁকে আমি খাবারগুলো গরম করে ফেলি। দেরি কোরো না।”
বাথরুম থেকে বেরিয়ে দেখি, খাবার টেবিলে বাসন্তী সব সাজিয়ে ফেলছে। পারুন চটপট নাকে-মুখে দুটি গুঁজে উঠে পড়ল। বলল, “তোমরা ধীরেসুস্থে খাও, আমি গিয়ে পড়তে বসছি। আজ দুটো পর্যন্ত পড়ব।”
বাসন্তী বলল, “দেখিস, পরীক্ষার আগে আবার একটা অসুখ বাধিয়ে বসিস না। চারদিকে বড্ড জ্বরজারি হচ্ছে।”
পারুল গিয়ে পড়তে বসে গেল। বাসন্তীকে বললুম, “বাবা রে বাবা, ভাল করে খেল না পর্যন্ত, মেয়েটা তো দেখছি পড়তে-পড়তেই পাগল হয়ে যাবার জোগাড়।”
বাস্তী বলল, “বা রে, না-পড়লে চলবে কেন? পার্ট ওয়ানে অল্পের জন্যে ফার্স্ট ক্লাস পায়নি, ফাইনালে সেটা মেটাতে হবে না? ওহো একটা কথা তোমাকে তো বলা-ই হয়নি, ও-বাড়ির খবর শুনেছ?”
“কী করে শুনব? আমি তো এইমাত্র বাড়ি ফিরলুম। কেন, আবার কী হয়েছে?”
বাসন্তী হেসে বলল, “ভাড়াটেদের জল আর লাইট আজ বিকেল থেকে আবার চালু হয়ে গেছে।”
বললুম, “তা-ই নাকি? সদানন্দবাবু সুবুদ্ধি হয়েছে দেখছি।”
বাসন্তী বলল, “ওঁর আবার সুবুদ্ধি কী হল? যা-কিছু হয়েছে সবই কুসুমদির জন্যে। তুমি অফিসে চলে যাবার পরে ও বাড়িতে একবার গিয়েছিলুম তো, কুসুমদিই ওঁদের কাজের মেয়েটাকে দিয়ে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। তা গিয়ে দেখলুম কর্তা-গিন্নিতে একেবারে ধুন্ধুমার কাণ্ড হচ্ছে। কুসুমদি আমার সামনেই তাঁর কর্তাটিকে বলে দিলেন যে, আজ বিকেলের মধ্যেই ভাড়াটেরা যদি জল আর লাইট না পায় তো বাড়ি ছেড়ে তিনি যেদিকে দুচোখ যায় চলে যাবেন। তা সদানন্দবাবুও দেখলুম, গায়ে একটা পাঞ্জাবি চাপিয়ে সুড়সুড় করে অমনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেন। কুসুমদির অমনি অন্য চেহারা। একগাল হেসে আমাকে বললেন, ‘ভয় পাসনি রে বাসন্তী, মিস্ত্রি ডাকতে গেল, আমাকে ভীষণ ভয় পায় তো!’ বোঝো ব্যাপার!”
আমি বললুম, “বটে? সদানন্দবাবু যে এত স্ত্রৈণ তা তো জানতুম না।”
বাসন্তী মুখ টিপে হেসে বলল, “এতে এত অবাক হচ্ছ কেন? অল্প বয়েসে যে যা-ই করুক, বুড়ো বয়েসে তো বউ ছাড়া আর গতি থাকে না, তখন আর স্ত্রৈণ না-হয়ে উপায় কী।”
শুনে প্রায় বিষম খেতে যাচ্ছিলুম, অনেক কষ্টে সেটা সামলে নিয়ে বললুম, “তা বটে।”
“এত করেও কিন্তু কিছু হল না। কুসুমদির যেটা সমস্যা, সেটা রয়েই গেল।”
“তার মানে?”
বাসন্তী বলল, “তাও তোমাকে বুঝিয়ে বলতে হবে? সমস্যাটা যে কী, তা তুমি এখনও টের পাওনি?”
“না পাইনি। একটু বুঝিয়ে বলবে?”
“এত তো বুদ্ধির বড়াই করো, অথচ আসল ব্যাপারটাই তুমি ধরতে পারোনি। কুসুমদির সমস্যা ওই কমলিকে নিয়ে। বাদবাকি ভাড়াটেদের কী হল না হল তা নিয়ে ওঁর কিছু মাথাব্যথা নেই, কিন্তু ‘ কমলির যে অসুবিধে হচ্ছে, এইটে উনি সহ্য করতে পারছেন না।”
বললাম, “এ তো খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। ভদ্রমহিলার ছেলেপুলে হয়নি, তাই কমলির উপরে ওঁর যে একটা টান পড়ে যাবে, সে আর বিচিত্র কী। মেয়েটা তো শুনলুম সারাদিন ওঁরই কাছে থাকে।” বাসন্তী বলল, “আগে থাকত, কাল রাত্তির থেকে আর থাকছে না। কাল বিকেলের মধ্যেই তো জল আর লাইট আবার চালু হয়ে গেল, তার পরেও একবার সন্ধে-নাগাদ কুসুমদির কাছে গিয়েছিলুম। গিয়ে দেখলুম মুখ ভার করে বসে আছেন। কী ব্যাপার? না কমলিকে উপরে নিয়ে আসবার জন্যে ওঁদের কাজের মেয়েটিকে উনি একতলায় নকুলের বউয়ের কাছে পাঠিয়েছিলেন। তা নকুলের বউ তাকে খুব মুখঝামটা দিয়েছে। বলেছে, ‘থাক থাক, আর অত সোহাগ দেখাতে হবে না!’ কমলিকেও উপরে নিয়ে আসতে দেয়নি।”
বললুম, “তাই তো, সমস্যাটা দেখছি ক্রমেই ঘোরালো হয়ে উঠছে।”
বাসন্তী বলল, “পরকে আপন করার এই হচ্ছে বিপদ। ওই যে বলে না পরের সোনা কানে দিতে নেই, ঠিকই বলে। কখন হ্যাঁচকা টান মারবে, তার ঠিক কী। তখন সোনাও যাবে কানও যাবে।”
বললুম, “কমলির উপরে মিসেস বসুর এত মায়া না পড়লেই ভাল ছিল। ভদ্রমহিলাকে কষ্ট পেতে হবে।”
খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। মুখ ধুয়ে শোবার ঘরে এসে একটা সিগারেট ধরালুম। মনটা হঠাৎ খারাপ হয়ে গেল।
রাত্তিরে একবার ঘন্টাখানেকের জন্যে লোডশেডিং হয়েছিল। বাড়িতে একটা ইনভার্টার আছে বটে, কিন্তু সেটা পারুলের ঘরে থাকে। ফ্যান বন্ধ। ভাল ঘুম হল না। হাতপাখা চালাতে চালাতে শেষ রাত্তিরে ঘুমিয়ে পড়েছিলুম, ঘুম ভাঙল বেলা আটটায়। তাও ভাঙত না, যদি না বাসন্তী এসে ঠেলা মেরে আমাকে তুলে দিত।
চোখ খুলে বললুম, “কী ব্যাপার?”
“আর কত ঘুমোবে, উঠে পড়ো। সদানন্দবাবু সেই কখন থেকে বসে আছেন।”
“একটু বসিয়ে রাখো। বলো যে, হাত-মুখ ধুয়েই আমি বৈঠকখানায় যাচ্ছি। ওঁকে চা দিয়েছ তো?”
“দিয়েছি। এখন ওঠো তো।”
হাত-মুখ ধুয়ে চায়ের পেয়ালা হাতে নিয়ে বৈঠকখানা ঘরে ঢুকলুম। ঢুকেই বুঝলুম, অবস্থা সুবিধের নয়। সদানন্দবাবুর মুখ একেবারে অন্ধকার।
বললুম, “কী ব্যাপার মশাই, আবার কিছু হল নাকি?”
“আর বলবেন না!” সদানন্দবাবু বললেন, “আমি এবারে নির্ঘাত পাগল হয়ে যাব।”
“কেন পাগল হবার মতো কী ঘটল?”
“জল আর লাইট যে কাল বিকেলেই ফের চালু করে দিয়েছি, সেটা শুনেছেন তো?”
“শুনেছি। সে তো ভালই করেছেন।”
“কিন্তু ভালটা আমি কার জন্যে করলুম? এই বজ্জাতগুলো কি ভাল ব্যবহার পাবার যোগ্য? “
“এ-কথা বলছেন কেন?”
সদানন্দবাবু বললেন, “তা হলে শুনুন, যার কষ্টের কথা ভেবে আমার গিন্নির ঘুম হচ্ছিল না, সেই বাচ্চা মেয়েটাকে আজ সকালেও ওরা উপরে আসতে দেয়নি। কমলি আসতে চায়, কিন্তু ওরা আসতে দেবে না। কমলি তাই কাল থেকে সমানে কাঁদছে। তা সে কাঁদতেই পারে। ও যে এত বড়টা হয়েছে সে তো বলতে গেলে আমার গিন্নির হাতেই। সারাটা দিন তো তিনিই ওকে দেখতেন। রাত্তিরে গিয়ে মায়ের কাছে শুত; বাস, একতলার সঙ্গে ওইটুকুই ওর সম্পর্ক। সেই মেয়েকে ওরা কিনা উপরে আসতে দেবে না! ফলে একতলায় যেমন কমলি একটানা কেঁদে যাচ্ছে, তেমনি দোতলায় কাঁদছেন আমার গিন্নি। কাল থেকে সমানে কাঁদছেন। আমার হয়েছে মহা জ্বালা। কী যে করি, কিছুই বুঝতে পারছি না। একটা-কিছু পরামর্শ দিন তো।”
এ-সব ক্ষেত্রে কী আর পরামর্শ দেব। একবার ভাবলুম বলেই ফেলি যে, মাদার টেরিজার কাছ থেকে একটা বাচ্চাকে নিয়ে এসে আপনার গিন্নির কোলে ফেলে দিন। তাতে একটা অনাথ শিশুও যেমন বেঁচে যাবে, তেমনি বাঁচবেন আপনার গিন্নিও। কিন্তু সাত-পাঁচ ভেবে আর সে-কথা বললুম না। চুপ করে রইলুম।
সদানন্দবাবু বললেন, “তার উপরে আবার কাল রাত একটা-দেড়টার সময়ে বাড়ি ফিরে নকুল যে কান্ডটা করল, সে আর কহতব্য নয়। তখন লোডশেডিং চলছিল, কিন্তু হারামজাদা সে-কথা বুঝল না, ভাবল যে, আমিই বোধহয় ফের লাইট কেটে দিয়েছি। তাই প্রথমেই তো আমার চোদ্দোপুরুষ উদ্ধার করে গালাগাল করতে লাগল, তারপর শুরু হল ঠেঙানি। শুধু যে বউকে ধরে ঠেঙিয়েছে তা নয়, ব্যাটা একেবারে বেহেড মাতাল, দুধের বাচ্চাটাকেও ছাড়েনি, তাকেও বোধহয় চড়চাপড় দিয়েছে গোটাকয়। মেয়েটা যেমন ডাক ছেড়ে কাঁদছিল, তাতে তো মশাই সেইরকমই মনে হল।”
একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন সদানন্দবাবু। তারপর চেয়ার ছেড়ে উঠতে-উঠতে বললেন, “আপনি কিছু বলবেন না, কেমন?”
বললুম, “কী যে বলব, কিছুই তো বুঝতে পারছি না।”
“বেশ, আপনি তা হলে চুপ করেই থাকুন। কিন্তু এই আমি বলে গেলুম যে, আমিও ছেড়ে দেবার পাত্র নই। পাড়ার সক্কলকে আমি বলেছি যে, যদি দরকার হয় তো গুন্ডা লাগিয়ে আমি ওকে তাড়াব আর গুন্ডারই বা দরকার কী, এই যে লাঠিটা দেখছেন না, এটাই যথেষ্ট, এইটে দিয়েই ওর মাথা ফাটিয়ে ছাড়ব আমি।”
সদানন্দবাবু বেরিয়ে গেলেন।
এ হল বৃহস্পতিবার সকালের কথা। কাল ছিল শুক্রবার। কালও নকুলচন্দ্র নাকি অনেক রাতে বাড়ি ফিরেছিল। আর আজ শনিবার ভোরবেলায় একটা বিকট আর্তনাদ শুনে পাড়ার লোকেরা ছুটে গিয়ে যা দেখল, তাতে তাদের রক্ত একেবারে হিম হয়ে যাবার জোগাড়। সে এক ভয়াবহ দৃশ্য। পাঁচ-নম্বর বাড়ির একতলার সিঁড়ির ঠিক সামনেই তার নিষ্প্রাণ শরীরটা লুটিয়ে পড়ে আছে।
৭
সদানন্দবাবুই যে নকুলচন্দ্রকে খুন করেছেন, আমার পক্ষে এ-কথা বিশ্বাস করা খুব শক্ত। ভদ্রলোককে আমি চিনি, দশ বছর ধরে তাঁকে বলতে গেলে প্রায় রোজই দেখছি। তা একটা মানুষের ধাতটা যে ঠিক কীরকম, সে রগচটা না ঠান্ডা মাথার লোক, হাঙ্গামাবাজ না শান্তিপ্রিয়, তা বোঝার পক্ষে—আমার তো মনে হয়—দশ কেন, পাঁচটা বছরই যথেষ্ট। আমার বিশ্বাস, তিনি পরোপকারী, সজ্জন, উপরন্তু খুবই নিরীহ ব্যক্তি। মাঝেমধ্যে একটু রেগে যান ঠিকই, রেগে গেলে ‘হ্যান, করেঙ্গা, ত্যান করেঙ্গা’ বলেনও বটে, কিন্তু খুন তো খুন, কাউকে একটা চড়চাপড় মারাও তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়।
তবে কিনা বাইরে থেকে যাঁকে নেহাত ভালমানুষ বলে মনে হয়, খুন-টুন করা যে তাঁর পক্ষে একান্তই অসম্ভব একটা ব্যাপার, নিশ্চিত হয়ে তা-ই বা বলি কী করে? বললে সে-কথা আপনারা শুনবেনই বা কেন? তার উপরে আবার গল্পটা যেখানে শোনাচ্ছি, সেই কলকাতা শহরে সম্প্রতি খুব সমারোহ সহকারে চ্যাপলিন উৎসব হয়ে গেল। চ্যাপলিনের শতবর্ষ উপলক্ষে তাঁর যে-সব ছবি আবার নতুন করে দেখানো হল, তার মধ্যে মঁসিয়ে ভের্দুও ছিল বই কী। আপনারা সে-ছবি দেখেছেন নিশ্চয়। কেউ-কেউ হয়তো একাধিকবার দেখেছেন। ফলে আপনারা জেনেই গিয়েছেন যে, এমনিতে যে-লোক নেহাতই নিরীহ, এত নিরীহ যে, একটা পোকাকেও পিষে মারতে পারে না, সে-ও খুন করতে পারে। তাও একবার নয়, বারবার। সুতরাং সদানন্দবাবুকে যদি এক্ষুনি আমি একটা গুড কন্ডাক্ট সার্টিফিকেট দিয়ে দিই, তো সেটা আপনারা মেনে নেবেন না।
আর তা ছাড়া যাকে অকুস্থল বলা হয়, ঘটনাটা ঘটার সময়ে আমি যে সেখানে কিংবা তার আশেপাশে হাজির ছিলুম, তাও তো নয়। ফলে কিছুই আমি স্বচক্ষে দেখিনি। সবই আমার শোনা কথা। কিছুটা সদানন্দবাবুর কাছে শুনেছি, কিছুটা অন্যদের কাছে। অন্যদের কথা পরে হবে, আগে বরং সদানন্দবাবুর কাছে যা শুনেছি, সেটাই বলব।
কিন্তু তারও আগে বলা দরকার, শনিবার ভোরবেলায় একটা ভয়ংকর আর্তনাদ শুনে যখন পারুল আমাদের ঘরে এসে আমাকে জাগিয়ে দিয়ে বলে যে, পাঁচ-নম্বর বাড়িতে নিশ্চয় কিছু হয়েছে, এক্ষুনি আমার সেখানে যাওয়া উচিত, আর তার কথা শুনবামাত্র আমি ধড়মড়িয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে নীচে নেমে সদর-দরজা খুলে একছুটে রাস্তা পেরিয়ে যখন ও বাড়িতে গিয়ে ঢুকি, তখন সদানন্দবাবুকে আমি ঠিক কী অবস্থায় দেখেছিলুম। ভদ্রলোক তখন সিঁড়ির কয়েক ধাপ উপরে একেবারে পাথরের একটা মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছেন। সিঁড়ির তলায় সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে কী যেন দেখছে যমুনা আর বিষ্টুচরণ। যা-ই দেখুক, সেটা তাদের শরীরের আড়ালে পড়ে যাওয়ায় অন্তত সেই মুহূর্তে আমি দেখতে পাইনি। স্পষ্ট করে আমি দেখতে পাচ্ছিলুম শুধু সদানন্দবাবুকেই। তাঁর মাথার উপরে কড়া পাওয়ারের একটা ইলেকট্রিক বাল্ব জ্বলছে। তার আলোয় আমার মনে হল যে, ভদ্রলোকের মুখ একেবারে মড়ার মতন ফ্যাকাশে। চোখের দৃষ্টিও কেমন বিহ্বল। যেন কোনও কিছুই তিনি ঠিক দেখছেন না বা বুঝে উঠতে পারছেন না। সেই অবস্থাতেই হঠাৎ তিনি ধপ করে সেই সিঁড়ির ধাপের উপরেই বসে পড়লেন।
এ হল শনিবার ভোরবেলাকার ঘটনা। মনে হয় কথা বলবার মতো অবস্থাই তখন সদানন্দবাবুর ছিল না। বাইরের লোকেদের মধ্যে আমি আর আমার পাশের বাড়ির শম্ভুবাবুই ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রথম পৌঁছই। পরে এক-এক করে আরও অনেকে এসে পড়েন। মোটামুটি ছ’টার মধ্যেই বাড়ির বাইরে রাস্তার উপর ভিড় জমে যায়।
যমুনা আর বিষ্টুচরণের আড়ালে পড়ে গিয়েছিল বলে নকুলের লাশটা প্রথমে আমার চোখেই পড়েনি। ফলে আমি মিনিট খানেকের মধ্যে বুঝেই উঠতে পারিনি যে, ব্যাপারটা ঠিক কী হয়েছে। সেটা বুঝলুম শম্ভুবাবু গিয়ে বিষ্টুচরণকে একপাশে সরিয়ে দেবার পর।
তেতাল্লিশের দুর্ভিক্ষ আর ছেচল্লিশের দাঙ্গায় এই শহরের রাস্তাঘাটে নিত্য যেসব দৃশ্য আমি প্রত্যক্ষ করেছি, তাতে আর এখন একটা মৃতদেহ দেখে আমার শিউরে ওঠার কথা নয়। নকুলকে দেখে তবু যে আমি শিউরে উঠেছিলুম, তার কারণ নিশ্চয় এই যে, আমারই বয়সী আরও অনেকের মতো এখনও আমি একটা ইট কিংবা পাথরের মতো নিশ্চেতন পদার্থে পরিণত হইনি।
সিঁড়ির নীচে চিত হয়ে নকুল পড়ে আছে। শম্ভুবাবু এগিয়ে গিয়ে উবু হয়ে বসে, তার নাড়িতে হাত রাখলেন। তারপর মুখ তুলে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “ডেড।”
নকুল যে বেঁচে নেই, সে তার চোখ দেখেই আমি বুঝতে পেরেছিলুম। আমার বুকের মধ্যে দমাস-দমাস করে মুগুর পেটার শব্দ হচ্ছিল। ঠোঁট শুকিয়ে গিয়েছে, দুই কানের ভিতর দিয়ে বইছে গরম হাওয়া। অনেক কষ্টে প্রায় অস্ফুট গলায় শম্ভুবাবুকে বললুম “আপনি একটু থাকুন এখানে, আমি ডঃ চাকলাদারকে সব জানাচ্ছি, তারপর থানায় একটা ফোন করে দিয়ে এখুনি আবার ফিরে আসব।” রাস্তায় নামতেই চোখে পড়ল যে, বাসন্তী আর পারুল সদর দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। দুজনে প্রায় একই সঙ্গে জিজ্ঞেস করল “কী হয়েছে?”
বললুম, “সর্বনাশ হয়েছে।” তারপর উপরে এসে ফোনের ডায়াল ঘোরাতে লাগলুম।
ফোন আজকাল চট করে পাওয়া যায় না। ড. চাকলাদার কাছেই থাকেন, তাঁকে পেতে দেরি হয়নি, কিন্তু থানার লাইন পেতে পেতে মিনিট দশেক লাগল। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলুম, পাঁচটা পঁয়ত্রিশ। ওদিক থেকে যিনি ‘হ্যালো’ বললেন, গলা শুনেই বোঝা গেল যে, তিনি ঘুমোচ্ছিলেন তাঁর ঘুমের আমেজ এখনও কাটেনি।
বললুম, “আমি পীতাম্বর চৌধুরি লেন থেকে কথা বলছি। আমার নাম কিরণ চট্টোপাধ্যায়, আমি জার্নালিস্ট, দৈনিক সমাচার পত্রিকায় কাজ করি।”
“জার্নালিস্ট? খবর চাইছেন নিশ্চয়? না, আমাদের এলাকায় কাল রাত্তিরে বড়-কিছু ঘটেনি। রাস্তা থেকে গোটা দুয়েক মাতাল ধরে এনে লক-আপে পুরে দিয়েছি। আর আছে একটা রোড-অ্যাক্সিডেন্টের কেস। তাও মাইনর অ্যাক্সিডেন্ট, কেউ মারা-টারা যায়নি। ব্যস, আর কোনও খবর নেই।”
বললুম, “আরে মশাই, আমি খবর চাইছি না, খবর দিতে চাইছি। আমাদের রাস্তায় হঠাৎ একজন মারা গেছে। মনে হচ্ছে আপনাদের ও. সি.-র একবার আসা দরকার।”
“আমি ও. সি.। কী হয়েছে বলুন তো? মার্ডার?”
“তা তো জানি না। মার্ডার হতে পারে, অ্যাকসিডেন্টও হতে পারে। ঠিক কী যে হয়েছে, সেটা আপনারা এসে ঠিক করুন।”
“ঠিক আছে, আমরা যাচ্ছি। একটা কথা জিজ্ঞেস করি, ব্যাপারটা কোথায় ঘটেছে? মানে রাস্তায় না বাড়ির মধ্যে?”
“বাড়ির মধ্যে।”
“যে বাড়িতে ঘটেছে, আপনি কি তার কাছেই থাকেন?”
“খুবই কাছে। বলতে গেলে এটা আমাদের একেবারে উল্টো-দিকের বাড়ি।”
“তা হলে তো ভালই হল। আমরা একটু বাদেই ওখানে পৌঁছে যাব। কিন্তু তার আগে আপনি কাইন্ডলি একবার ওখানে গিয়ে সবাইকে জানিয়ে দিন যে, ঘটনাটা যেখানে ঘটেছে, সেখান থেকে কেউ যেন কিছু না সরায়। মানে যা-কিছু যেখানে যেমনভাবে আছে, ঠিক সেইখানে ঠিক তেমনিভাবেই যেন থাকে। আর হ্যাঁ, ডেডবডিটাকেও যেন কেউ টাচ না করেন। এটা জানিয়ে দিতে আপনার কোনও অসুবিধা হবে?”
“কিছুমাত্র না। এখুনি ওখানে গিয়ে জানিয়ে দিচ্ছি।”
ফোন নামিয়ে রাখলুম। পরক্ষণেই মনে হল, ভাদুড়িমশাই তো কলকাতাতেই আছেন। তাঁকে একবার ব্যাপারটা জানানো দরকার।
কপাল ভাল, এবারে আর লাইন পেতে দেরি হল না। দুচার কথায় যা জানাবার জানাতেই তিনি বললেন, “সম্ভবত আপনি চাইছেন যে, আপনার বন্ধু সদানন্দবাবুকে সাহায্য করবার জন্যে আমি একবার যাই। কিন্তু আমি এখন যাব না। আমার বদলে যাকে পাঠাচ্ছি, তাকে দেখলেই আপনি চিনতে পারবেন।”
বাসন্তী আর পারুল ইতিমধ্যে উপরে উঠে এসেছিল। পাশেই এসে দাঁড়িয়ে ছিল তারা। চুপচাপ আমার কথা শুনে যাচ্ছিল। ফোন নামিয়ে রাখতে বাসন্তী বলল, “ও-বাড়িতে অত কান্নাকাটি হচ্ছে কেন? কী হয়েছে? সদানন্দবাবুর কিছু হয়নি তো?”
বললুম, “সদানন্দবাবুর কিছু হয়নি। তবে যা ভয় করছি তা যদি সত্যি হয় তো ভদ্রলোক বিপদে পড়ে যাবেন। নকুল মারা গেছে।”
পারুল বলল, “সে কী! কখন মারা গেল? কী হয়েছিল?
বললুম, “কিছু জানি না। আমি একবার ও-বাড়িতে যাচ্ছি।”
বাসন্তী বলল, “আমিও তোমার সঙ্গে যাব।” তারপর মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “তোর যাবার দরকার নেই। তুই নিজের জন্যে এক কাপ চা বানিয়ে নে। কাল বিকেলে যে পায়েস করেছিলুম তার খানিকটা ফ্রিজে রয়েছে। সন্দেশও রয়েছে। তাড়াতাড়ি খেয়ে নিয়ে পড়তে বসে যা।”
আমি আর বাসন্তী চটপট নীচে নেমে রাস্তার উপরের ভিড় ঠেলে পাঁচ নম্বরে গিয়ে ঢুকলুম। ছ’টা বাজে। কিন্তু যতই বেলা বাড়ুক, মধ্য-কলকাতার এইসব এঁদো গলির অন্ধকার যেন আর কাটে না। সিঁড়ির উপরকার কড়া-পাওয়ারের আলোটা তখনও জ্বলছে। নইলে নিশ্চয় চৈত্র মাসের সকাল ছ’টাতেও জায়গাটা একেবারে অন্ধকার হয়ে থাকত।
নকুলের মাথার পাশে মেঝের উপরে চাপ-চাপ রক্ত। আগে এটা চোখে পড়েনি। বাসন্তী যে ভয় পেয়ে গিয়েছে সে তার মুখ দেখেই বুঝতে পেরেছিলুম। তাকে বললুম “তুমি আর এখানে দাঁড়িয়ে থেকো না, উপরে চলে যাও।”
শম্ভুবাবু চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছেন। বাসন্তী উপরে যাবার পরে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, “থানায় খবর দিয়েছেন?”
বললুম “দিয়েছি। ওরা একটু বাদেই এসে পড়বে। কিন্তু সদানন্দবাবুকে দেখছি না যে?”
“ভদ্রলোকের বয়স হয়েছে; বললেন যে, শরীরটা অস্থির-অস্থির করছে। মাথাটা বোধহয় একটু ঘুরে গিয়েছিল। একবার একটু বমিও করে ফেললেন। ওঁকে উপরে নিয়ে শুইয়ে দিয়েছি।”
পাড়ার যাঁরা ভিতরে এসে ঢুকেছিলেন, থানায় খবর দেওয়া হয়েছে শুনেই তাঁরা একে-একে সরে পড়তে লাগলেন। কী হয়েছে, সেটা জানবার জন্যে কারও কৌতূহলই কিছু কম নয়, কিন্তু যেমন কৌতূহল তেমনি অল্প-বিস্তর ভয়ও আছে প্রায় প্রত্যেকেরই। পুলিশ এসে জেরা করবে, মামলা হলে সাক্ষী দিতে বলবে, সাধ করে কে আর এ-সব ঝঞ্ঝাটে নিজেকে জড়াতে চায়।
শম্ভুবাবুকে ব্যতিক্রম বলেই গণ্য করতে হবে, তিনি গেলেন না। জিজ্ঞেস করলুম, “আপনার আজ অফিস নেই?”
“আজ তো শনিবার। আমার ছুটি। একবার অবশ্য বাজারে যাবার দরকার ছিল, তা সে কাল গেলেও চলবে।”
“ভালই হল, আপনি তা হলে আর-কিছুক্ষণ এখানে থেকে যান। ও হ্যাঁ, থানা থেকে বলল যে, কেউ যেন এখান থেকে কিছু না সরায়। ডেডবডিটাও না ছোঁয়।”
দেওয়ালের ধারে বসে হাপুস নয়নে যমুনা কাঁদছিল। বিষ্টুচরণ তার ঘরের দরজায় ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কথাটা মূলত ওদেরই উদ্দেশে বলা, কিন্তু শুনতে পেল কি না, কে জানে।
শম্ভুবাবু বললেন, “পুলিশ না আসা পর্যন্ত আপনিও এখানে থাকবেন তো?”
বললুম “থাকব। তবে এখন একটু উপরে যাচ্ছি। সদানন্দবাবুর অবস্থাটা একবার দেখে আসা দরকার।”
দোতলায় এসে দেখলুম, সদানন্দবাবুকে তাঁর খাটের উপরে শুইয়ে রাখা হয়েছে। মাথার কাছে দাঁড়িয়ে কাজের মেয়েটি বাতাস করছে তাঁকে। সদানন্দবাবুর স্ত্রী একদিকে একটা চেয়ারে বসে আছেন। পাশের চেয়ারে বসে বাসন্তী তাঁর সঙ্গে কথা বলছিল, আমি গিয়ে ঘরে ঢুকতে জিজ্ঞেস করল, “থানা থেকে এসেছে?”
বললুম, “না। পুলিশ কি এত তাড়াতাড়ি আসে নাকি?”
সদানন্দবাবু আমাকে দেখে ম্লান হাসলেন। বললুম “কেমন আছেন এখন?”
ক্লান্ত গলায় ভদ্রলোক বললেন, “অনেকটা ভাল। মাথাটা হঠাৎ ঘুরে গিয়েছিল।”
“যাবারই কথা। কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে না তো?”
“না।”
“তা হলে ব্যাপারটা একটু বুঝিয়ে বলুন দেখি।”
আবার হাসলেন সদানন্দবাবু। সেই ম্লান হাসি। তারপর বললেন, “কী আর বলব বলুন, সবই আমার গ্রহের ফের।”
বললুম, “সে তো বুঝতেই পারছি। কিন্তু আমার ভয় হচ্ছে যে, এই নিয়ে আপনি একটা ঝঞ্ঝাটে না জড়িয়ে যান। ঠিক কী হয়েছিল?”
সদানন্দবাবু উঠে বসতে যাচ্ছিলেন। আমি বাধা দিয়ে বললুম, “ওঠবার কোনও দরকার নেই। তাড়াহুড়ো করবারও না। যা বলবার আস্তেসুস্থে বলুন।”
অতঃপর তিনি যা বললেন, আপনাদেরও আমি সেটাই জানাচ্ছি।
চৈত্র মাস। রাত্তিরে বেজায় গরম পড়েছিল, তা ছাড়া মাঝরাত্তিরে মত্তাবস্থায় বাড়িতে ফিরে নকুলচন্দ্র কালও এমন হই-হট্টগোল বাধিয়ে দিয়েছিল যে, সদানন্দবাবুর ঘুম ভেঙে যায়। টর্চ জ্বেলে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখেছিলেন, রাত তখন একটা। তারপরে আর ভাল করে ঘুম হয়নি, ওই একটু তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে শুয়ে ছিলেন আর কি। মনে হয়, তার বেশ কিছুক্ষণ বাদে এই মোটামুটি তিনটে নাগাদ একতলায় কিছু একটা ভারী জিনিস পড়ে যাবার শব্দও শুনেছিলেন। কিন্তু সেটা যে কীসের শব্দ তা বুঝতে পারেননি। ভাল করে ঘুমোতে না-পারলেও রোজ যেমন ওঠেন তেমনি আজও ঠিক সাড়ে চারটেতেই তিনি বিছানা ছেড়ে উঠে পড়েন। স্টোভ ধরিয়ে তাতে জলের কেতলি বসিয়ে দেন। জলটা ফুটতে-ফুটতেই রোজকার মতো ধুয়ে নেন মুখ-চোখ। তারপর হালকা এককাপ লিকার খেয়ে, জামাকাপড় পাল্টে রোজকার মতোই মর্নিং ওয়াকে বেরুবার জন্যে যখন নীচে নামেন, পাঁচটা বাজতে তখনও মিনিট পাঁচেক বাকি। সিঁড়িটা অন্ধকার। উপর থেকে সুইচ টিপে সিঁড়ির আলো জ্বেলে নীচে নামা যায়। কিন্তু সিঁড়ির আলোটা তিনি কোনওদিনই এইসময় জ্বালেন না। আজও জ্বালেননি। না জ্বালবার কারণ আর কিছুই নয়, সিঁড়ির আলো জ্বালাবার আর নেবাবার জন্য যে টু-ওয়ে সুইচের ব্যবস্থা আজকাল প্রায় সব বাড়িতেই দেখা যায়, সদানন্দবাবুর বাড়িতে সেটা নেই। তাই উপর থেকে আলো জ্বেলে নীচে নামলে আর নীচ থেকে সেটা নেভাবারও উপায় নেই। মর্নিং ওয়াক শেষ করে যতক্ষণ না তিনি আবার বাড়িতে ফিরে আসছেন ততক্ষণ সেটা জ্বলতেই থাকবে। ভদ্রলোক অনেকদিন ধরেই ভাবছেন যে, একটা টু-ওয়ে সুইচের ব্যবস্থা করে নেবেন, কিন্তু এখনও সেটা করা হয়নি। অগত্যা তাঁকে টর্চ জ্বেলে নীচে নামতে হয়। ছোট্ট পকেট-টর্চ। আজ তার বোতাম টিপেই বুঝলেন যে, ব্যাটারির তেজ ফুরিয়ে এসেছে। একে তো ম্যাড়মেড়ে আলো, তায় ছানি কাটাবার পর থেকে চোখেও ভাল দেখতে পান না, খুবই সতর্কভাবে পা ফেলতে ফেলতে তাই নীচে নামছিলেন তিনি। কিন্তু বারো-চোদ্দো ধাপ নেমেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়েন। ম্লান আলোতে আবছামতন তিনি দেখতে পান যে, সিঁড়ির শেষ ধাপের ঠিক সামনেই একটা লোক মেঝের উপরে হাত-পা ছড়িয়ে চিত হয়ে পড়ে আছে। লোকটা যে নকুলচন্দ্র সে-কথা বুঝতে তাঁর কয়েক সেকেন্ড সময় লেগেছিল। তারপরেই তিনি বিকটভাবে চেঁচিয়ে ওঠেন।
নকুল যে মারাই গিয়েছে, চিৎকার করে উঠবার মুহূর্তেও অবশ্য সদানন্দবাবু তা বুঝতে পারেননি। তাঁর চিৎকার শুনে সিঁড়ির দু’দিকের দুটো ঘর থেকে যখন যমুনা আর বিষ্টুচরণ ছুটে বেরিয়ে আসে তখনও না। তিনি ভেবেছিলেন, মোদো-মাতাল লোকটা হয়তো শেষ-রাত্তিরে একবার বাথরুমে যাবার জন্যে টলতে টলতে তার ঘর থেকে বেরিয়েছিল; তখন, কিংবা বাথরুম থেকে বেরিয়ে আবার ঘরে ফিরবার সময়ে, অন্ধকারের মধ্যে দেওয়ালে ধাক্কা লেগে আর টাল সামলাতে পারেনি, আছাড় খেয়ে মেঝেতে পড়ে গিয়ে জ্ঞান হারিয়েছে। কিন্তু আসল ব্যাপারটা যে তা নয়, আরও ভয়াবহ, একটু বাদেই তা বোঝা গেল। চিৎকার শুনে কুসুমবালারও ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। তৎক্ষণাৎ তিনি দোতলায় তাঁদের শোবার ঘর থেকে বেরিয়ে এসে সিঁড়ির আলোটা জ্বেলে দেন। টর্চের ম্যাড়মেড়ে আলোয় সবকিছু এতক্ষণ স্পষ্ট দেখা যায়নি। এবারে ইলেকট্রিকের আলো জ্বলে উঠতেই দেখা গেল যে, মেঝের উপর চাপ-চাপ রক্ত, আর সেই রক্ত নেমে এসেছে নকুলচন্দ্রের মাথা থেকেই। যেমন নিথর, নিস্পন্দ হয়ে সে পড়ে আছে; তাতেই সদানন্দ বুঝতে পেরে যান যে, সে বেঁচে নেই। তাঁর এক হাতের লাঠি ও অন্য হাতের টর্চ খসে পড়ে যায়। সিঁড়ির রেলিং আঁকড়ে ধরে তিনি তখন দ্বিতীয়বার চেঁচিয়ে ওঠেন।
৮
ডাক্তার চাকলাদারকে সংক্ষেপে সব জানিয়ে রেখেছিলুম। তিনি এলেন সাড়ে ছটায়। একতলায় এসে আমার খোঁজ করতে শম্ভুবাবু তাঁকে সঙ্গে নিয়ে দোতলায় উঠে আসেন। ডাক্তার চাকলাদারকে একটা চেয়ার এগিয়ে দিয়ে শম্ভুবাবুকে বললুম “আপনি একটু থেকে যান। অন্তত যতক্ষণ না থানা থেকে ওরা এসে পৌঁছচ্ছে। নীচেই থাকুন, নইলে, কে কী নাড়াচাড়া করবে, কোথার থেকে কোন জিনিসটা সরিয়ে রাখবে, তার ঠিক কী।
শম্ভুবাবু নীচে নেমে গেলেন। ডাক্তার চাকলাদার বললেন, “ওরেব্বাবা, এতটা তো ভাবিনি। একতলায় তো রক্তারক্তি কান্ড। কী হয়েছিল মশাই?”
বললুম, “ঈশ্বর জানেন। কিন্তু ও তো মারাই গেছে, ওকে নিয়ে আর ভাববার কিছু নেই। যিনি বেঁচে আছেন তাঁকে দেখুন।”
ডাক্তার চাকলাদার খাটের কাছে তাঁর চেয়ারটাকে সরিয়ে আনলেন। সদানন্দবাবুর কপালে হাত রাখলেন, টেম্পারেচার নিলেন,বুকে-পিঠে স্টেথোস্কোপ বসিয়ে লম্বা করে নিঃশ্বাস টানতে বললেন, তারপর ব্লাড প্রেশার নিয়ে বললেন, “কিছু না, শুধু প্রেশারটা একটু বেড়েছে। একটা ওষুধ লিখে দিচ্ছি, খান, আর আজকের দিনটা চুপচাপ শুয়ে থাকুন, নড়াচড়া করবেন না। কাল সকালে কাউকে দিয়ে প্রেশারটা আর-একবার দেখিয়ে নেবেন।”
কুসুমবাল। আলমারি খুলে টাকা বার করে এনেছিলেন, চাকলাদার হেসে বললেন, “টাকা কীসের? জানেন তো আমি কারও বাড়িতে যাই না।”
কথাটা মিথ্যে নয়। ডঃ চাকলাদার আসলে প্যাথলজিস্ট। পাশের গলির মোড়েই তাঁর ল্যাবরেটারি। জ্বরজারি হলে আমরা তাঁর কাছে যাই বটে, প্রেসক্রিপশনও লিখিয়ে নিই, কিন্তু তার জন্যে তিনি এক পয়সাও নেন না। বাড়িতেও যান না কারও। আজ যে এসেছেন, সেটা একেবারে না এসে উপায় ছিল না বলেই।
চাকলাদার উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। বললেন, “চলি তা হলে।”
ঘর থেকে ভদ্রলোক বেরিয়েওছিলেন, কিন্তু সিঁড়ির মাথা থেকেই ফিরে এসে বললেন, “যাওয়া হল না। মনে হচ্ছে আটকে গেলুম।”
“কেন কী হল?”
“পুলিশ এসে গেছে।”
বললুম, “তা হলে একটু থেকেই যান। অসুবিধা নেই তো?”
“অসুবিধে আর কী, ল্যাবরেটারিতে ক’টা টেস্ট করবার ছিল, তা সে ঘন্টা-খানেক বাদে করলেও ক্ষতি নেই। চলুন, নীচে যাওয়া যাক।”
বাসন্তীও উঠে দাঁড়াল। বলল, “চলি কুসুমদি। মেয়েটা একলা রয়েছে। পরে আবার আসব।”
তিনজনে মিলে নীচে নেমে এলুম।
আমাদের থানা অফিসার গঙ্গাধর সামন্তকে আমি আগে কখনও দেখিনি। নামটাই মাত্র শোনা ছিল। এও শুনেছিলুম যে, মানুষটি ধান্ধাবাজ নন; পোলিটিক্যাল পেট্রনেজের ধার ধারেন না; এলাকার শান্তি যাতে মোটামুটি বজায় থাকে, তার জন্যে যেটা করা দরকার বলে তাঁর মনে হয়, সেটাই করেন। আর তা ছাড়া খুব পরিশ্রমীও নাকি।
তা পরিশ্রম করার জন্য যে-রকম স্বাস্থ্য চাই, সামন্তমশাইয়ের স্বাস্থ্য দেখলুম সেইরকমই। চওড়া কাঁধের ছ’ফুট লম্বা মানুষ; শরীর একেবারে লোহা-পেটানো। মোটা একজোড়া গোঁফ থাকায় যেন ভদ্রলোকের চেহারার বাহার আরও খোলতাই হয়েছে। ঝুলো গোঁফ নয়, আদ্যন্ত সমান করে ছাঁটা; ওই যাকে ইংরেজিতে টুথব্রাশ-গোঁফ বলে সেই বস্তু।
বাসন্তী আর দাঁড়াল না। সিঁড়ির সামনের জায়গাটুকু দেওয়াল ঘেঁষে সন্তর্পণে পার হয়ে রাস্তায় নেমে বাড়ির দিকে চলে গেল। সামন্তমশাই আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনিই তো মিঃ চ্যাটার্জি?”
“হ্যাঁ। আমিই আপনাকে ফোন করেছিলুম।”
“এইমাত্র যিনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেন, তিনি কে?”
“আমার স্ত্রী। বলতে গেলে উল্টো দিকের বাড়িতেই থাকি আমরা। টেলিফোনেই তো সে-কথা আপনাকে বলেছি।”
গঙ্গাধর সামন্ত ডাক্তার চাকলাদারের দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন, তারপর তাঁর গলায়-ঝোলানো স্টেথোস্কোপ আর ডান-হাতে ধরা ব্লাড প্রেশার মাপবার যন্ত্রটার উপর চোখ বুলিয়ে বললেন, “আপনি তো দেখছি ডাক্তার। এদের ফ্যামিলি-ফিজিশিয়ান?”
“আজ্ঞে না। আমি ডাক্তার ঠিকই, তবে প্র্যাকটিস করি না। আমি প্যাথলজিস্ট, কাছেই আমার ল্যাবরেটারি রয়েছে। সব রকমের পরীক্ষা হয় সেখানে।”
“আপনার নামটা জানতে পারি?”
“বিলক্ষণ। হরষিত চাকলাদার। এ-পাড়ার সবাই আমাকে চেনেন। সাধারণত কারও বাড়িতে আমি রোগী দেখতে যাই না। তবে পাড়ায় থাকি যখন, এ-সব ক্ষেত্রে আসতেই হয়।”
“যিনি মারা গেছেন, তাঁকে পরীক্ষা করে তারপর উপরে গিয়েছিলেন?”
ডাক্তার চাকলাদার অবাক হয়ে গঙ্গাধর সামন্তের দিকে তাকালেন, তারপর বললেন, “যিনি মারা গেছেন, তাঁকে আবার পরীক্ষা করব কী। পরীক্ষা করবার কথা উঠছেই বা কেন? আমি তো ময়না-তদন্ত করি না। যিনি বেঁচে আছেন তাঁকেই আমি পরীক্ষা করে এলুম।”
“অর্থাৎ?”
“অর্থাৎ আমি বাড়িওয়ালা সদানন্দ বসুকে দেখতে গিয়েছিলুম। এখন আমি যেতে পারি?”
“একটু থেকে যান।” গঙ্গাধর সামন্ত বললেন, “না না, আমি জোর করছি না, অনুরোধ করছি মাত্র। আমাদের পুলিশ-ডিপার্টমেন্টের ডাক্তার সুরেশ গুপ্তকে খবর দিয়েছি, তিনি এক্ষুনি এসে পড়বেন। এলেই আপনার ছুটি। অবশ্য যা দুর্গন্ধ এখানে, কাউকে থাকতে বলতেও সঙ্কোচ হয়।”
দুর্গন্ধের কারণ আর কিছুই নয়, মাছের ঘরের দরজা খুলে বিষ্টুচরণ ইতিমধ্যে থানা অফিসার আর আমাদের জন্যে খান তিন-চার টিনের চেয়ার বার করে এনেছিল। গঙ্গাধর সামন্ত পকেট থেকে একখানা রুমাল বার করে গেঁফের উপরে সেটাকে ঠেসে ধরে বললেন, “ওরে বাবা, এ যে মারাত্মক গন্ধ মশাই। কীসের গন্ধ?”
আমি বললুম, “পচা মাছের। ও-ঘরটায় মাছ থাকে। যা গরম, কিছু মাছ নিশ্চয় পচেছে।”
“তা হলে ও-ঘরের দরজা খুললেন কেন?” বিষ্টুচরণের দিকে তাকিয়ে সামন্তমশাই বললেন, “শিগগির বন্ধ করুন। নইলে একজন তো মরেইছে, এবারে আমরাও মারা পড়ব।”
বিষ্টুচরণ তক্ষুনি দরজা বন্ধ করে দিল। গন্ধটা তবু ঝুলেই রইল, মিলিয়ে গেল না।
নাক থেকে রুমাল নামিয়ে গঙ্গাধর সামন্ত বললেন, “সদানন্দবাবুকে কেমন দেখলেন?”
চাকলাদার বললেন, “প্রেশারটা একটু বেড়ে গেছে, আর কোনও ট্রাব্ল নেই।”
“যিনি মারা গেছেন, তাঁর স্ত্রী আর শালা ছুটে এসে তো শুনলুম সদানন্দবাবুকেই সিঁড়ির কয়েক ধাপ উপরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিলেন, তা-ই না?”
বিষ্টুচরণ বলল, “হ্যাঁ, স্যার।”
বাইরে রাস্তার উপরে একটা গাড়ি এসে থামার শব্দ হল।
সদর দরজায় যাকে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিল, সেই কনস্টেবলটি ভিতরে এসে জিজ্ঞেস করল, “ইখানে কোই কিরোনবাবু আছেন?”
বললুম, “আমিই কিরণ চ্যাটার্জি। কী দরকার?”
কনস্টেবলটি উত্তর দেবার আগেই যে এসে সদর দরজায় দাঁড়াল, তাকে দেখে তো আমি অবাক। ভাদুড়িমশাই অবশ্য বলেছিলেন যে, নিজে না এলেও কাউকে তিনি পাঠিয়ে দিচ্ছেন, আর যে-লোকটিকে পাঠাচ্ছেন তাকে আমি চিনতেও পারব, কিন্তু সে যে কৌশিক, তা আমি ভাবতেও পারিনি।
কৌশিককে আমি প্রথম দেখি বছর পনরো আগে, সেই যে-বারে আমরা মুকুন্দপুরের মনসামূর্তি উদ্ধার করতে নর্থ বেঙ্গল গিয়েছিলুম তখন। কৌশিক তখন তীর্থপতি ইনস্টিটিউশনে পড়ত, আর এখন একেবারে জবরদস্ত যুবাপুরুষ।
বললুম, “দাঁড়াও, দাঁড়াও, মিঃ সামন্তের সঙ্গে তোমার আলাপ করিয়ে দিই। মিঃ সামন্ত, আপনি চারুচন্দ্র ভাদুড়ির নাম নিশ্চয় শুনেছেন?”
“চারুচন্দ্র ভাদুড়ি…চারুচন্দ্র ভাদুড়ি….” নামটাকে দু’বার জিভের উপরে নাচিয়ে নিয়ে সামন্ত বললেন, “আপনি কি সি. সি. ভাদুড়ির কথা বলছেন? মানে এখন যিনি ব্যাঙ্গালোরে থাকেন?”
“আরে হ্যাঁ, মশাই।”
“ওরেব্বাবা,” সামন্ত বললেন, “তিনি তো স্বনামধন্য ইনভেস্টিগেটার। আমাদের লাইনে তাঁকে কে না চেনে! তা ইনি তাঁর কেউ হন নাকি?”
বললুম, “এ হল কৌশিক সান্যাল। তাঁর ভাগ্নে। আর কৌশিক, ইনি মিঃ গঙ্গাধর সমান্ত, আমাদের থানার ও. সি.।”
নমস্কার বিনিময়ের পরে সামন্ত বললেন, “তা মিঃ সান্যাল, আপনিও কি মামার লাইন ধরেছেন নাকি?”
কৌশিক হাসল। বলল, “এখনও ঠিকমতো ধরিনি, তবে চেষ্টায় আছি। কিরণমামা আজ সকালে মামাবাবুকে ফোন করেছিলেন। তা মামাবাবুর একটা কাজ পড়ে গেছে, তাই আসতে পারলেন না, আমাকে বললেন, তুই গিয়ে ব্যাপারটা একটু দেখে আয়।”
আমি বললুম, “গোয়েন্দা হিসেবে কৌশিকও কিন্তু এরই মধ্যে বেশ নাম করেছে।”
সামন্ত বললেন, “বটে? তা মিঃ ভাদুড়ি এখন কলকাতায়?”
“হ্যাঁ, একটা কাজে এসেছেন, সামনের হপ্তাটা থেকে যাবেন।
“ভাল, ভাল, খুব ভাল।” সামন্তমশাই হেসে বললেন, “ভাল করে সব দেখে যান। কাউকে যদি কিছু জিজ্ঞেস করতে হয় তো করুন। তারপর মিঃ ভাদুড়িকে গিয়ে বলুন যে, কী বুঝলেন। দরকার হলে, আমিও তাঁর পরামর্শ নিতে যাব। তবে দরকার হবে বলে মনে হয় না। এ তো যদ্দুর বুঝতে পারছি একেবারেই সিম্পল ব্যাপার। ওই যাকে ইংরেজিকে ‘ওপন অ্যান্ড শাট্ কেস্’’লা হয় তাই আর কি।”
বলেই ডাক্তার চাকলাদারের দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন সামন্ত। বললেন, “কী, ঠিক বলিনি?”
চাকলাদার হকচকিয়ে বললেন, “কী ঠিক বলেননি? মানে আপনাব কথাটা ঠিক বুঝতে পারছি না।”
সামন্ত বললেন, “না-বুঝবার তো কিছু নেই। ইটস এ প্লেন অ্যান্ড সিম্পল কেস অভ মার্ডার। তা প্র্যাকটিস করুন আর না-ই করুন আপনি একজন ডাক্তার তো বটেন, খুনটা কান হয়েছে বলে আপনার মনে হয়?”
চাকলাদার চুপ করে রইলেন। বুঝতে পারছিলুম যে, তিনি সাবধানী লোক, চটপট কোনও সিদ্ধান্ত করতে চাইছেন না। সামন্ত বললেন, “কী হল, কিছু বলুন।”
চাকলাদার বললেন, “দেখুন মশাই, এটা খুন কি না, তা বলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তবে আনন্যাচারাল ডেথ অবশ্যই। তা পড়ে গিয়ে মাথা কেটে মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে, আবার কেউ ভারী কিছু… এই ধরুন থান-ইট কি পাথর কি মশলা-বাটার নোড়ার মতো কিছু দিয়ে মারবার ফলে মাথা ফেটেছে, এমনটাও হওয়া সম্ভব। সত্যি বলতে কী, যদি শুনি যে, আগেই ভদ্রলোক হার্ট-ফেল করে মারা গিয়েছেন, তারপর পড়ে যাবার ফলে মাথা ফেটেছে, তো তাতেও আমি অবাক হব না। তেমন কেসও আমি দেখছি। তা এর মধ্যে কোনটা এক্ষেত্রে ঘটেছে, অর্থাৎ এটা অ্যাকসিডেন্ট না মার্ডার, নাকি ন্যাচারাল ডেথ ইন আনন্যাচারাল সারকামস্ট্যান্সেস, তা আমি কী করে বলব, তার জন্যে তো আপনাদের এক্সপার্টরাই রয়েছেন।”
সামন্ত বললেন, “অর্থাৎ আপনি কিছু কমিট করতে চাইছেন না, কেমন? তা না-ই করুন, অন্তত একটা কথা তো বলতে পারেন।”
“কী বলব?”
“ঘটনাটা কতক্ষণ আগে ঘটেছে? না না, মিনিট আর সেকেন্ড মিলিয়ে কাঁটায় কাঁটায় নির্ভুল সময় আপনাকে বলতে হবে না, তা আমাদের এক্সপার্টদের পক্ষেও বলা সম্ভব নয়, আপনি একটা আন্দাজের কথা বলুন।”
চাকলাদার এক পা এগিয়ে গিয়ে ডেডবডির পাশে উবু হয়ে বসলেন। ভেবেছিলুম, নকুলের মৃতদেহের উপরে হাত রেখে তিনি তার উত্তাপ পরীক্ষা করবেন। দেখে নেবেন যে, শরীর কতটা ঠান্ডা হয়ে এসেছে। এইভাবেও অনেককে মৃত্যুর সময়টা আন্দাজ করতে দেখেছি। চাকলাদার কিন্তু সে-সব কিছু করলেন না। মৃতদেহের মাথার পাশে মেঝের উপরে যে চাপ-বাঁধা রক্ত দেখা যাচ্ছিল, সেই রক্তের দিকে খানিকক্ষণ চেয়ে রইলেন তিনি। পকেট থেকে একটা ম্যাচবক্স বার করলেন। তার থেকে একটা কাঠি বার করে নিয়ে চাপ-বাঁধা রক্তের একপাশে সেটাকে চেপে ধরলেন একটু। কী যেন ভাবলেন। তারপর দাঁড়িয়ে উঠে বললেন, “আমার ধারণা, খুব বেশিক্ষণ আগের ব্যাপার এটা নয়।”
সামন্ত বললেন, “অ্যাবসলিউটলি কারেক্ট। এবারে ওই লাঠিটা দেখুন।”
প্রথম যখন এই বাড়িতে এসে ঢুকি, লাঠিটা আমি তখনই দেখেছিলুম। সদানন্দবাবুর লাঠি। যেমন সদানন্দবাবুর টর্চ, তেমনি তাঁর লাঠিটাও সিঁড়ির নীচে পড়ে আছে। দুটো বস্তুতেই অল্পবিস্তর রক্ত লেগে রয়েছে দেখলুম।
সামন্ত বললেন, “দেখেছেন?”
চাকলাদার বললেন, “লাঠির আর কী দেখব?”
“আরে মশাই, আমি কি আর লাঠি দেখতে বলছি? আসলে দেখতে বলছি ওর মাথায় বসানো লোহার বলটাকে।”
আমি বললুম, “মনে হচ্ছে, আপনি কিছু বলতে চান।”
সামন্তমশাই হাসলেন। বললেন, “চাই-ই তো। ব্রহ্মাস্ত্রটি কার?”
“লাঠিটার কথা বলছেন তো? ওটা আমার।”
গলা শুনেই চমকে গিয়েছিলুম। তাকিয়ে দেখলুম দেড়তলা-বরাবর একটা বাঁক নিয়ে সিঁড়িটা যেখানে দোতলায় উঠে গিয়েছে, সদানন্দবাবু সেই ল্যান্ডিংয়ে এসে দাঁড়িয়ে আছেন।
৯
চাকলাদার বললেন, “এ কী, আপনি বিছানা থেকে উঠে এলেন কেন? প্রেশার বেড়েছে, মাথা ঘুরে গিয়েছিল, এখন আপনার কমপ্লিট রেস্ট দরকার। না না, এইভাবে উঠে আসা আপনার মোটেই উচিত হয়নি।”
সদানন্দবাবু ম্লান হাসলেন। বললেন, “এখন অনেকটা সুস্থ বোধ করছি। মাথাও আর ঘুরছে না।” সামন্ত বললেন, “আপনিই সদানন্দ বসু?”
“হ্যাঁ।”
“এই বাড়ির মালিক?”
“হ্যাঁ।”
“নীচে এসে একটু বসতে পারবেন?”
“তা কেন পারব না? ভালই তো আছি।”
“বেশ, তা হলে একটু নীচে এসে বসুন। আপনাকে দু-একটা কথা জিজ্ঞেস করব।”
রেলিং ধরে সিঁড়ির ধাপগুলি সাবধানে ভেঙে সদানন্দবাবু নীচে নেমে এলেন। আমি তাঁকে একটা চেয়ার এগিয়ে দিলুম।
কৌশিক পটাপট ছবি তুলে যাচ্ছিল। হঠাৎ সে সদানন্দবাবুর সামনে এসে দাঁড়াল। বলল, “মিঃ সামন্ত আপনাকে যে-প্রশ্নই করুন, আপনি কিন্তু তার উত্তর দিতে বাধ্য নন। দরকার বোধ করলে একজন ল-ইয়ারও রাখতে পারেন। উত্তর যা দেবার, আপনার হয়ে তিনিই দেবেন।”
সামন্ত হেসে বললেন, “ওরেব্বাবা, এ তো দেখছি নরাণাং মাতুলক্রমঃ। ঠিক আছে ঠিক আছে, সদানন্দবাবুকে আমি যে-সব প্রশ্ন করব, ইচ্ছে হয় তো উনি তার উত্তর দেবেন, না হয় তো দেবেন না।”
সদানন্দবাবু বললেন, “ইচ্ছে-অনিচ্ছের কথা উঠছে কেন? তবে হ্যাঁ, উত্তরটা জানা থাকলে তবেই দেব, তা নইলে আর দেব কী করে?”
সামন্ত বললেন, “ফেয়ার এনাফ। এখন অবশ্য সামান্য দু-একটা প্রশ্নই করব, দরকার বুঝলে অন্য-সব প্রশ্ন পরে করা যাবে। তা হলে শুরু করি?”
“করুন।”
“আমার প্রথম প্রশ্ন, ডেডবডি তো আপনিই প্রথম দেখেছিলেন, তা-ই না?”
প্রশ্নের মধ্যে যে ফাঁদটা ছিল, ভেবেছিলুম, সদানন্দবাবু নির্ঘাত তার মধ্যে পা বাড়িয়ে দেবেন। কিন্তু না, সন্তর্পণে তিনি সেটা এড়িয়ে গেলেন। বললেন, “তা কী করে বলব? আমি কখন কী অবস্থায় ডেডবডিটা দেখেছিলুম, শুধু সেটাই আপনাকে বলতে পারি।”
সামন্ত বললেন, “বেশ, তা-ই বলুন।”
অতঃপর সদানন্দবাবু যা বললেন, তা আগেই বলেছি। এই একটা ব্যাপার লক্ষ করলুম যে, ভদ্রলোক খানিক আগে আমাকে যা বলেছিলেন আর এখন গঙ্গাধর সামন্তকে যা বললেন, তা একেবারে হুবহু এক রকমের, কোথাও কোনও অসঙ্গতি নেই।
সামন্ত তাঁর দ্বিতীয় প্রশ্ন করলেন লাঠিটা নিয়ে। আমাদের সঙ্গে কথা বলবার সময়ে তাঁর চোখ যে বারবার লাঠিটার দিকেই ঘুরে যাচ্ছিল আগেই সেটা দেখেছিলুম। মৃতদেহের পাশে শুধু রক্ত নয়, বেশ-খানিকটা জায়গা জুড়ে জলও ছড়িয়ে আছে। ঠিক জলও নয়, ধুলোর উপরে জল পড়লে যেমন হয়, তেমনি; কাদা-কাদা। সেই কাদা-জলও অবশ্য প্রায় শুকিয়ে গেছে। তবু পাছে পা হড়কে যায়, তাই সামন্ত খুব সাবধানে সেই কাদার উপর দিয়ে দু-পা এগিয়ে লাঠিটার কাছে উবু হয়ে বসলেন, তারপর বিষ্টুর দিকে তাকিয়ে বললেন, “খানিকটা ন্যাকড়া দিতে পারেন?”
ঘর থেকে বিষ্টু খানিকটা ন্যাকড়া এনে দিল। সেই ন্যাকড়ার ফালি নিয়ে যেখানটায় রক্ত নেই, খুব সন্তর্পণে সেইখানে ধরে লাঠিটাকে মেঝের উপর থেকে তুলে এনে মিনিট খানেক সেটাকে নিরীক্ষণ করে নিয়ে যখন সামন্ত আবার সদানন্দবাবুর দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন, তখন দেখলুম যে, তাঁর ঠোঁটের উপরে খেলা করছে একটা রহস্যময় হাসি, আর চোখ দুটিও ঈষৎ কুঁচকে গেছে।
বললেন, “এটা তা হলে আপনারই?”
প্রশ্নটা যে-ভাবে করলেন, তাতেই সম্ভবত সদানন্দবাবুর গলায় কিঞ্চিৎ শ্লেষ্মা জমে গিয়েছিল। ঘড়ঘড়ে গলায় তিনি বললেন, “লাঠিটার কথা বলছেন তো? আজ্ঞে হ্যাঁ, ওটা আমারই। সে তো একটু আগেই বললুম।”
“এর মাথায় লোহার বল বসানো কেন?”
“না বসিয়ে উপায় ছিল না, তাই বসিয়েছি। আসলে ভোরবেলায় রোজই আমি এক চক্কর মর্নিং ওয়াক করতে বেরোই তো, তখন কুকুরগুলো বড্ড উৎপাত করে। গত বছর একদিন যখন শ্রদ্ধানন্দ পার্কে মর্নিং ওয়াক সেরে বাড়ি ফিরছি, তখন ওই পার্কের উত্তর-পশ্চিম দিকের ফুটপাথে যে ময়লা ফেলার ভ্যাটটা রয়েছে না, একটা নেড়িকুত্তা হঠাৎ সেই ভ্যাটের পাশ থেকে ছুটে এসে আমাকে কামড়েও দিয়েছিল।”
সদানন্দবাবু তাঁর ধুতিটা একটু সরিয়ে ডান পায়ের একটা জায়গা দেখিয়ে বললেন, “এই দেখুন, সেই কামড়ের দাগ এখনও মিলিয়ে যায়নি। তা সেইজন্যে আমাকে গুচ্ছের ইঞ্জেকশান নিতে হয়েছিল স্যার। এই তো ডাক্তার চাকলাদারও তো রয়েছেন এখানে। ওঁকে জিজ্ঞেস করে দেখুন, উনিও সব জানেন। যা-ই হোক সে-যাত্রা রক্ষে পেয়ে গেলুম, কিন্তু নেড়িকুত্তার ভয়ে তো আর মর্নিং ওয়াক বন্ধ করতে পারি না, তাই লাঠির মাথার ওই লোহার বলটা বসিয়ে নিয়েছি।”
ডঃ চাকলাদারের দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন সামন্ত। চাকলাদার বললেন, “সত্যি ওকে জলাতঙ্কের ইঞ্জেকশান নিতে হয়েছিল।”
সামন্ত আবার সদানন্দবাবুর দিকে তাকালেন। “লাঠিতে লোহার বল বসিয়ে নেবার পরে আর কুকুরগুলো আপনাকে তাড়া করে না, কেমন?”
“আজ্ঞে তার পরেও তাড়া করত। কিন্তু ওইটে দিয়ে একদিন একটা নেড়িকুত্তাকে আমি মোক্ষম এক-ঘা বসিয়ে দিই। ব্যাস তারপর থেকে আর তেড়ে আসে না। ওই যা দূর থেকেই খেউ-খেউ করে, কিন্তু লাঠি উঁচিয়ে ঘুরে দাঁড়ালেই ছুটে পালায়।”
লাঠিটা পড়ে ছিল রক্তের ধারে, আর তার পাশেই পড়ে ছিল টর্চটা। কিন্তু সেটা যেহেতু নেহাতই এক-ব্যাটারির পকেট-টর্চ এবং অতটুকু একটা জিনিসকে যেহেতু গঙ্গাধর সামন্তের পক্ষেও ব্রহ্মাস্ত্র কি পাশুপত অস্ত্রের সঙ্গে তুলনা করা সম্ভব নয়, তাই আর তিনি টর্চটা নিয়ে কিছু বললেন না।
বাইরে একটা গাড়ির শব্দ পাওয়া গেল। সদর দরজার দিকে এগোতে এগোতে সামন্ত বললেন, “রওনা হবার আগে যেমন আমাদের ডাক্তার গুপ্ত তেমনি ডি.সি. কেও একটা ফোন করে সব জানিয়ে এসেছিলুম। বোধহয় তাঁরাই এলেন।”
গাড়ি থেকে যাঁকে নাগতে দেখলুম, হাতের স্টেথিসকোপ দেখেই বোঝা গেল যে, তিনি ডাক্তার গুপ্ত। ডি.সি. আসেননি। সামান্য একটা মৃত্যুর খবর পেয়ে তাঁর আসবার কথাও নয়। শুনলুম, কোথায় কোন পোলিটিক্যাল পার্টির অফিসে নাকি বোমা পড়েছে, তিনি সেখানে গিয়েছেন।
ডাক্তার সুরেশ গুপ্ত বাড়িতে ঢুকেই কাজে লেগে গেলেন। বেশ কিছুক্ষণ ধরে নানান দিক থেকে মৃতদেহটি নিরীক্ষণ করলেন তিনি, গায়ে হাত রেখে উত্তাপটা দেখে নিলেন, তারপর বেসিনে ভাল করে হাত ধুয়ে, পকেট থেকে একটা রুমাল বার করে হাত মুছতে মুছতে সামন্তের দিকে তাকিয়ে বললেন, “অ্যাকসিডেন্ট নয়, এটা মার্ডার।”
সামন্ত বললেন, “কী করে বুঝলেন?”
ডাক্তার গুপ্ত বললেন, “কেন, আপনার তা মনে হয় না?”
“সে কথা হচ্ছে না। সত্যি বলতে কী, আম’র ধারণাও একই। কিন্তু আপনি সে।” কী করে বুঝলেন, সেটাই জানতে চাইছি।”
ডাক্তার গুপ্ত ধীরে-সুস্থে একটা সিগারেট ধরালেন। তারপর বললেন “সিম্পল ব্যাপার, বুঝবার জন্যে খুব বেশি মাথা খাটাবার দরকার নেই। কেউ যদি পা হড়কে কি দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে টাল সামলাতে না পেরে চিত হয়ে মেঝের উপরে দড়াম করে পড়ে গিয়ে মারা যায়, তা হলে তার খুলির পিছনের দিকটা ফাটবার কথা, আর যদি উপুড় হয়ে পড়ে তো সামনের দিকটা ফাটবে। তার কোনওটাই কিন্তু এ-ক্ষেত্রে ঘটেনি। এ লোকটির মথার খুলির না-ফেটেছে পিছনের দিকটা, না ফেটেছে সামনের দিক। ফেটেছে এর খুলির একেবারে উপরের দিকটা। অর্থাৎ সাধুভাষায় যাকে আমরা ব্রহ্মতালু বলি আর সাদা বাংলায় বলি চাঁদি, সেই জায়গাটা। মাথার উপরে ফ্যান কি ঝাড়লণ্ঠন ভেঙে পড়লে খুলির এই জায়গাটা এভাবে ফাটতে পারে।”
কৌশিক এতক্ষণ চুপচাপ সব শুনে যাচ্ছিল। ডাক্তার গুপ্ত একটু থামতেই সে বলল, “কিন্তু এখানে ওঁর মাথায় উপরে ফ্যানও ছিল না, ঝাড়লণ্ঠনও ছিল না। চাঁদিটা তা হলে ফাটল কী করে?”
হঠাৎ একজন অপরিচিত লোক তাঁর কথার মধ্যে ঢুকে পড়ায় স্পষ্টতই একটু বিরক্ত হলেন ডাক্তার গুপ্ত। সামন্তকে জিজ্ঞেস করলেন, “এঁকে তো চিনতে পারলুম না, আপনাদের নতুন রিক্রুট?”
সামন্ত বললেন, “ওঃহো, পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়নি। ইনি মিঃ কৌশিক সান্যাল। প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটার চারুচন্দ্র ভাদুড়িকে মনে আছে?”
“চারু ভাদুড়ি….মানে ওই যাঁকে আমরা সিসিবি বলতুম? তিনি তো এ-লাইনে একটা লিজেন্ড মশাই। শুনেছি এখন ব্যাঙ্গোলোরে থাকেন।”
“হ্যাঁ, তাঁরই কথা বলছি। ব্যাঙ্গোলোরেই থাকেন বটে, তবে দিন কয়েকের জন্যে নাকি কলকাতায় এসেছেন। তা মিঃ সান্যাল তাঁরই ভাগ্নে। মামার লাইন ধরেছেন আর কি।”
ডাক্তার গুপ্ত কৌশিকের দিকে তাকিয়ে বললেন, “বটে? সিসিবি তোমার মানা? ‘তুমি’ বলছি বলে আবার কিছু মনে কোরো না যেন।”
কৌশিক বলল, “মনে করব কেন? আপনি আমার চেয়ে অনেক বড়! ‘তুমিই তো বলবেন।”
“মামার লাইনে এসেছ…..মানে প্রাইভেট ইনভেস্টিগেশান? বাঃ বাঃ, চমৎকার। লাইক মামা লাইক ভাগ্নে। এক্সেলেন্ট। তা মামাবাবুকে বোলো, উই অল্ রিমেমবার হিম সো ফন্ডলি।”
কৌশিক বলল, “নিশ্চয় বলব। মামাবাবু প্রায়ই তাঁর কলকাতার বন্ধুবান্ধব দের গল্প করেন।”
সামন্ত বললেন, “মিঃ সান্যালের প্রশ্নের উত্তর কিন্তু এখনও আপনি দেননি গুপ্ত সাহেব।”
ডাক্তার গুপ্ত বললেন, “ও হ্যাঁ, প্রশ্নটা কী ছিল যেন? ফ্যানও নেই, ঝাড়-লই ও নেই, চাঁদিটা তা হলে ফাটল কী করে? তাই না?”
কৌশিক বলল, “হ্যাঁ, কী করে ফাটল?”
ডাক্তার গুপ্ত একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “আমার সন্দেহ, একটু উঁচু জায়গা থেকে, এই ধরো ঐ সিঁড়িটার দু-তিন ধাপ উপরে দাঁড়িয়ে আচমকা কেউ ভারী কিছু দিয়ে ওর মাথার ওই জায়গাটায় একটা আঘাত করেছিল। খুব জোরেই যে সেটা করেছিল, সে তো বোঝাই যাচ্ছে। তা নইলে নিশ্চয় খুলিটা এভাবে ফেটে যেত না।”
গঙ্গাধর সামন্ত বললেন, “পাড়ার এই ডাক্তারবাবুটি ইট কি পাথর আর নয়তো মশলা-বাটা নোড়ার কথা বলছিলেন।”
“না, না,” ডাক্তার চাকলাদার ব্যস্ত হয়ে বললেন, “নিশ্চিত হয়ে আমি কিছু বলিনি। একটা সম্ভাবনার কথাই বলেছিলুম মাত্র।”
কৌশিক তার কাজ বন্ধ করেনি। যে-সব কথা হচ্ছিল, তা শুনতে-শুনতেই তার মিনলটা ক্যামেরা দিয়ে ডেডবডির আরও কয়েকটা ছবি তুলে নিল সে। মৃতদেহের পাশে পড়ে থাকা কিছু ধুলোবালি আর কাঠের গুঁড়োর মতো কিছু জঞ্জাল কুড়িয়ে নিয়ে ছোট-ছোট দুটো প্ল্যাস্টিকের ব্যাগের মধ্যে রাখল। তারপর একটা ব্যাগ সামন্তের হাতে তুলে দিয়ে বলল, “একটা ব্যাগ আপনি রাখুন, অন্যটা আমি নিয়ে যাচ্ছি, মামাবাবুকে একবার দেখাব। আপনার আপত্তি নেই তো?”
গঙ্গাধর সামন্ত বললেন, “কাজটা ইরেগুলার, তবে কিনা সিসিবিকে দেখাবেন তো, তাই আপত্তি করার কোনও অর্থ হয় না। কিন্তু যত তাড়াতাড়ি পারেন ফেরত দেবেন মশাই, নইলে আমি মুশকিলে পড়ব।”
ডাক্তার গুপ্ত বললেন, “লোকে কী ভাবে জানো তো? ভাবে যে, পুলিশ ডিপার্টমেন্টের লোকেরা প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটারদের দু’চক্ষে দেখতে পারে না। তাদের দোষ দেব কী করে, গোয়েন্দা-ক হিনিগুলোতে যা লেখা হয়,তাতে ওইরকমই মনে হয় যে। আরে বাবা, ক্রাইমের কিনারা ক্রাটাই তো কাজ, তা বাইরের কেউ যদি সে-কাজে সাহায্য করেন তো তাতে আমাদের আপত্তি হবে কেন? ইন ফ্যাক্ট উই অলওয়েজ লুক ফরোয়ার্ড টু গেটিং সাম্ হেল্প ফ্রম পিপল লাইক সিসিবি।”
কৌশিক বলল, “আপনারা ভাবছেন এটা খুন, তা-ই না?”
ডাক্তারবাবু বললেন, “সে তো বললুমই। শুধু খুন বললে অবশ্য কমই বলা হয়। ইট্স এ গ্রুসাম মার্ডার।”
“ছবি তুলতে তুলতে আপনাদের কথা শুনছিলুম। কী দিয়ে খুন করা হয়েছে, তাও ভাবছেন নিশ্চয়?”
গঙ্গাধর সামন্ত বললেন, “ডাক্তার চাকলাদার ইট, পাথর আর মশলাবাটা নোড়ার কথা বলছিলেন।”
চাকলাদার আবার বললেন, “না না, আমি নিশ্চিত হয়ে কিছু বলিনি।”
কৌশিক বলল, “যদি খুনই হয়, অস্ত্রটা তা হলে ইট-পাথর কি একটা নোড়া অবশ্য হতেই পারে। তবে এক-সেরি কি দু’সেরি একটা বাটখারা হওয়াও কিছু বিচিত্র নয়।”
ডাক্তার গুপ্ত বললেন, “নয়ই তো। আবার শেষপর্যন্ত যদি প্রমাণ হয় যে, বড়সড় একটা রেঞ্চ কিংবা হাতুড়ি দিয়ে মাথা ফাটানো হয়েছে, তো তাতেও আমি অবাক হব না।…. কিন্তু ব্যাপার কী বলুন তো, এখানে আসা অবধি একটা দুর্গন্ধ পাচ্ছি। হঠাৎ যেন সেটা আরও বেড়ে গেল। ব্যাপার কী?”
তাকিয়ে দেখলুম, যে ঘরে মাছ রাখা হয়, হাওয়ায় তার দরজাটা খুলে গিয়েছে। গঙ্গাধর সামন্ত ও সেটা লক্ষ করেছিলেন। বললেন, “বন্ধ করুন, বন্ধ করুন, দরজাটা এখুনি বন্ধ করে দিন।”
বিষ্টুচরণ গিয়ে দরজাটা ফের বন্ধ করে দিল। এবারে হুড়কোটাও টেনে দিল সে, বাতাসে যাতে না দরজাটা আবার খুলে যায়।
সামন্ত বললেন, “মাছের গন্ধ। পচা মাছ। এইসব মাছ খেয়েই তো ক্যালকাটার মানুষদের স্বাস্থ্যের একেবারে বারোটা বেজে যাচ্ছে।”
শ্যামনিবাস-রহস্য – ১০
ভোরবেলায় যখন পাঁচ নম্বর বাড়িতে এসে ঢুকি, যমুনাকে তখন ডেডবডির পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিলুম। ফোন করে ফিরে আসার পর থেকে আর তাকে দেখতে পাইনি। অনেকক্ষণ থেকেই অবশ্য চাপা একটা কান্নার শব্দ শোনা যাচ্ছিল। তাতেই বুঝেছিলুম যে, সে তার শোবার ঘরে গিয়ে ঢুকেছে, সেখানে বসে কাঁদছে। একটানা কান্নার শব্দ। সেইসঙ্গে ভেসে আসছিল, টুকরো-টুকরো কিছু কথা। যে-রকমের কথা, তাতে মনে হচ্ছিল, কাঁদতে কাঁদতেই কাউকে সে সমানে গালমন্দ করে যাচ্ছে। কাকে গালমন্দ করছে, নিজের ভাগ্যকে না আর-কাউকে, তা অবশ্য বোঝা যাচ্ছিল না।
সদানন্দবাবুর স্ত্রী কুসুমবালা যে বাতের রুগি, আগেই সে কথার উল্লেখ করেছি। ভদ্রমহিলা বিশেষ হাঁটাচলা করতে পারেন না, করেনও না। সদানন্দবাবুর সঙ্গে তিনিও ইতিমধ্যে একবার নীচে নেমে এসেছিলেন। নীচে নেমে যমুনাদের ঘরেও ঢুকেছিলেন একবার। খুব সম্ভব সান্ত্বনা দিতেই গিয়েছিলেন, কিন্তু বেশিক্ষণ থাকেননি। ভিতরে একটা চেঁচামেচি শুনেছিলুম, কিন্তু সেটা যে কী নিয়ে তা বুঝতে পারিনি। তার পরেই অবশ্য যমুনার ঘর থেকে কুসুমবালা বেরিয়ে আসেন। দেড়তলার ল্যান্ডিংয়ে এখন একটা মোড়ার উপরে তিনি বসে আছেন। শুনছেন কে কী বলে। নিজে কিছু বলছেন না।
সদানন, তাঁকে বললেন, “বাচ্চাটাকে উপরে নিয়ে গিয়ে কিছু খাইয়ে দিলে পারতে। ও তো আজ কিছুই খায়নি। অবিশ্যি খাবেই বা কী, আজ তো দুধই আনতে পারলুম না।”
কুসুমবালা বললেন, “দুধের জন্যে আটকাচ্ছে না। ও তো আর হরিণঘাটা কি মাদার ডেয়ারির দুধ খায় না, টিনের দুধই খায়। সে-দুধ তো ওর জন্যে দু-টিন কিনেই রেখেছি।”
সদানন্দবাবু বললেন, “তা হলে আর দেরি কোরো না। ওর মাকে একটু বুঝিয়ে শুঝিয়ে ওকে উপরে নিয়ে যাও।”
কুসুমবালা বললেন, “বোঝাতেই তো গিয়েছিলুম, তা শুনছে কে। কমলিকে কিছুতেই ছাড়ল না।”
গঙ্গাধর সামন্ত কথা বলছিলেন ডাক্তার গুপ্ত আর কৌশিকের সঙ্গে। কিন্তু সদানন্দবাবু আর কুসুমবালার কথাবার্তাও তাঁর কানে যাচ্ছিল নিশ্চয়ই। হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে কুসুমবালাকে তিনি প্রশ্ন করলেন, “কমলিটা আবার কে?”
উত্তরটা কুসুমবালার বদলে সদানন্দই দিলেন। বললেন, “নকুলের মেয়ে।” তারপর কুসুমবালাকে বললেন, “যমুনাকে একটু ভাল করে বুঝিয়ে বলো। না-বুঝবার তো কিছু নেই।”
কুসুমবালা বললেন, “তবেই হয়েছে। যমুনা তখন আমাকে কী বলল জানো?”
সদানন্দবাবু কিছু বলবার আগেই সামন্ত তাঁকে আড়াল করে দাঁড়ালেন। তারপর খর চোখে কুসুমবালার দিকে তাকিয়ে বললেন, “কী বলল?”
কুসুমবালা কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু মুখ খুলবারও সময় পেলেন না। চারদিক থেকে ক্যানেস্তারা পিটিয়ে হাঁকোয়া করতে শুরু করলে রাগী বাঘিনি যেমন ক্রমাগত কোণঠাসা হতে-হতে তারপর হঠাৎ এক সময় জঙ্গলের আড়াল থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসে, মেয়েকে কোলে করে ঘর থেকে ঠিক তেমনি করেই ছুটে বেরিয়ে এসে যমুনা বলল, “বাপকে মেরে এখন মেয়েকে সোহাগ দেখানো হচ্ছে। ঝ্যাঁটা মারি তোদের সোহাগের মুখে। কী ভেবেছিস তুই রাক্ষুসি, অ্যাঁ? ভেবেছিস যে, কিছুই আমি জানি না! জানি, জানি, জানি। কমলির বাপকে তোরাই মেরেছিস। হ্যাঁ, হ্যাঁ, তোরাই!”
তারপরেই সে গঙ্গাধর সামন্তের সামনে এসে আছাড় খেয়ে পড়ল। চেঁচিয়ে বলল, “দারোগাবাবু, জলজিয়ন্ত মানুষটাকে ওরাই খুন করেছে। ওদের আপনি ফাঁসিতে লটকে দিন, দারোগাবাবু, ফাঁসিতে লটকে দিন!”
গোটা ব্যাপারটা এমন হঠাৎ করে ঘটল যে, আমি একেবারে হতবাক। সদানন্দবাবুর দিকে তাকিয়ে দেখলুম, তাঁর ঠোট থরথর করে কাঁপছে। যেন কিছু বলতে চাইছেন তিনি, কিন্তু মুখ দিয়ে কোনও কথা সরছে না। কুসুমবালা স্তব্ধ হয়ে বসে আছেন। কৌশিক, চাকলাদার আর ডাক্তার গুপ্তও স্তম্ভিত। শুধু গঙ্গাধর সামন্তই দেখলুম হকচকিয়ে যাননি। কড়া ধাতের থানা-অফিসার। যমুনা তাঁর পায়ের কাছে পড়ে ছিল। সেখান থেকে দু’পা পিছিয়ে এসে কঠিন গলায় তিনি যমুনাকে বললেন, “এখন ও-সব থাক। একটু বাদেই তো আপনার সঙ্গে আমরা কথা বলব। কাকে আপনার সন্দেহ হয়, সে-কথা তখনই শোনা যাবে! এখন আপনি ঘরে যান। আমরা কাজ করতে এসেছি। কাজ করতে দিন।”
মেঝের উপর থেকে হাত ধরে তুলে বিষ্টুচরণই যমুনাকে আবার তার শোবার ঘরে পৌঁছে দিয়ে এল। ডাক্তার চাকলাদার বললেন, “উরেব্বাবা, এই বুঝি নকুলবাবুর স্ত্রী?”
বিষ্টুচরণ বলল, “আজ্ঞে হ্যাঁ।”
“আর যাকে কোলে করে এনেছিল, সেই বাচ্চা মেয়েটি?”
“ওর মেয়ে কমলি।”
“মেয়েটা কবে হল?”
“গত বছরের আগের বছর চোতমাসে হয়েছে।” সিঁড়ির ল্যান্ডিং থেকে কুসুমবালা বললেন, “গত বুধবারই তো ওর জন্মদিন গেল।”
ডাক্তার চাকলাদার আর কিছু বললেন না। মাথা নিচু করে কী যেন ভাবতে লাগলেন। তারপর হঠাৎ এক সময় মুখ তুলে গঙ্গাধর সামত্তের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমার আর এখানে কোনও কাজ নেই তো?”
ডাক্তার গুপ্তকে সামন্ত বললেন, “ওকে দিয়ে কি আর কোনও দরকার আছে আমাদের?”
“কিছু না।” গুপ্ত বললেন, “এখন ওঁকে ছেড়ে দিন। পরে যদি দরকার হয় তো আমরাই বরং ওঁর ল্যাবরেটরিতে গিয়ে দেখা করব।’
সামন্ত বললেন, “ঠিক আছে, ডক্টর চাকলাদার, আপনি এবারে যেতে পারেন। অনেকক্ষণ আপনাকে আটকে রেখেছিলুম, তার জন্যে কিছু মনে করবে না।”
চাকলাদার চলে গেলেন।
থানা থেকে ইতিমধ্যে আরও দুজন লোক এসে পৌঁছেছিল। সদানন্দবাবু আর বিষ্টুচরণকে উদ্দেশ করে সামন্ত বললেন, “এরা এই বাড়িটা একটু সার্চ করে দেখবে, আপনাদের তাতে আপত্তি নেই তো?”
সদানন্দ বললেন, “কিছুমাত্র না।”
সামন্ত বললেন, “ধন্যবাদ। আপনারা কেউ এঁদের সঙ্গে থাকুন।” তারপর লোক দুটির দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন, “তা হলে তোমরা কাজ শুরু করে দাও। একেবারে ছাত থেকে শুরু করবে।”
যাকে বললেন, সে জিজ্ঞাসু চোখে তাকাতেই তাকে একপাশে খানিকটা সরিয়ে নিয়ে গিয়ে নিচু গলায় কিছু বললেন। কী খুঁজতে হবে, সেটাই জানিয়ে দিলেন সম্ভবত। লোক দুটিকে সঙ্গে নিয়ে উপরে চলে গেলেন সদানন্দবাবু। কুসুমবালা সেই থেকে সিঁড়ির ল্যান্ডিংয়েই বসে ছিলেন। এবারে তিনিও উঠে দাঁড়ালেন। স্বামীকে বললেন, “চলো, আমিও তোমার সঙ্গে যাচ্ছি।”
বিষ্টুচরণও ইতিমধ্যে ঘরে গিয়ে ঢুকেছিল। সম্ভবত তার বোনকে বলতে গিয়েছিল যে, একটু বাদেই একতলা সার্চ হবে।
সিঁড়ির সামনের জায়গাটায় এখন আমরা চারজন রয়েছি। সামন্ত, ডাক্তার গুপ্ত, কৌশিক আর আমি। পুলিশের পাহারাদারটিও রয়েছে অবশ্য। তবে সে ঠিক এই জায়গাটায় নেই। সদর-দরজার সামনে তাকে মোতায়ান করা হয়েছিল, সেইখানেই সে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে।
ডাক্তার গুপ্ত বললেন, “কী দিয়ে আঘাত করার ফলে মৃত্যু হয়েছে, তাই নিয়ে কথা হচ্ছিল। হ্যাঁ, ইট, পাথর, নোড়া, রেঞ্চ, হাতুড়ি, মুগুর বাটখারা, অনেক কিছু দিয়েই ও-রকম আঘাত করা সম্ভব। মানে এমন আঘাত যাতে মাথার খুলি ফেটে যায়। তা মিস্টার সামন্ত, আপনি কি আশা করছেন যে, সার্চ করে অমন-কিছু পাওয়া যাবে?”
সামন্ত বললেন, “দেখা যাক, তল্লাসি তো চলছে। ওই ধরনের জিনিস যা-কিছু পাওয়া যাক, পরীক্ষার জন্যে আটক করা হবে। গেরস্ত বাড়িতে ও-সব জিনিস কিছু-না-কিছু থাকেই। কিন্তু থাকলেই তো আর হল না, পরীক্ষা করে নিশ্চিন্ত হওয়া চাই যে, যে-সব জিনিস পাওয়া গেল, তারই কোনও একটা দিয়ে আঘাত করা হয়েছিল।”
ডাক্তার গুপ্ত বললেন, “তা তো বটেই, কিছু-একটা পাওয়াই যথেষ্ট নয়, পরীক্ষা করে দেখতে হবে। তার আগে কোনও সিন্ধান্ত করবার উপায় নেই।”
কৌশিক বলল, “মিস্টার সামন্ত ঠিক-কথাই বলেছেন। নোড়া, হাতুড়ি, রেঞ্চ কি এই ধরনের আরও নানা জিনিস যে গেরস্ত বাড়িতে থাকবে, সেটাই স্বাভাবিক। না-থাকলেই বরং আমি অবাক হব।”
সামন্ত বললেন, “এ সব জিনিস যে থাকতেই পারে একটু আগে আমিই সে কথা বলেছি, তা-ই না?”
ডাক্তার গুপ্ত বললেন, “ঠিকই বলেছেন।”
সামন্ত বললেন, “না মশাই ঠিক বলিনি।”
আমি বললুম, “সে কী, বেঠিকটা কী বললেন? যে-ক’টা জিনিসের নাম করা হল তার সবই তো গেরস্তবাড়িতে থাকে। রেঞ্চ হাতুড়ি কিংবা এই ধরনের জিনিসও গেরস্তকে রাখতে হয়। কল-টল সারাবার কাজ অনেকে নিজেই করে নেন, তাতেই ও-সব লাগে। সব সময়ে তো আর প্লাম্বারকে ডেকে পাওয়া যায় না, তাই রেঞ্চ আর হাতুড়ি না-রেখে উপায় নেই। অন্তত সদানন্দবাবুকে তো অনেক সময় এ-সব খুঁটিনাটি কাজ আমি নিজের হাতেই করতে দেখেছি।”
সামন্ত বললেন, “আরে মশাই, রেঞ্চ আর হাতুড়ির কথা আমি ভাবছি না।”
“তা হলে কিসের কথা ভাবছেন?”
“আমি ভাবছি নোড়ার কথা।”
“কেন নোড়াই বা কী অপরাধ করল?”
গঙ্গাধর সামন্ত বললেন, “তাও বুঝতে পারছেন না? তা হলে ভাবুন যে, নোড়া কোন্ কাজে লাগে।”
“কেন, মশলা বাটার জন্যেই তো নোড়া রাখতে হয়। নোড়া না-থাকলে মশলা বাটা হবে কী দিয়ে? “অবশ্য অবশ্য।” গঙ্গাধর সামন্ত হেসে বললেন, “তা হলে এবারে ভাবুন যে, ক’টা বাড়িতে আজকাল মশলা বাটা হয়। আরে মশাই, সব বাড়িতেই আজকাল গুঁড়ো মশলা দিয়ে কাজ চলছে, সুতরাং নোড়ার কোনও ভূমিকাই কোথাও নেই। দি রোল অফ নোড়া হ্যাজ বিন কমপ্লিটলি প্লেড আউট।”
গঙ্গাধর সামন্ত হাসতে লাগলেন। হাসি থামবার পরে আমি বললুম, “কথাটা কিন্তু ঠিক হল না।”
“কেন, এবারে আবার বেঠিকটা কী বললুম?”
“অনেকেই যে আজকাল গুঁড়ো মশলা ব্যবহার করছেন, সেটা বেঠিক কথা নয়। কিন্তু তাঁদের বাড়িতেও হয়তো নোড়ার সন্ধান মিলবে। কাজ ফুরিয়েছে বলেই যে নোড়াটা তাঁরা ফেলে দিয়েছেন এমন না-ও হতে পারে; হয়তো হেঁশেলের মধ্যেই সেটা ফেলে রেখেছেন। গেরস্ত-বাড়িতে এমন কত জিনিসই তো থাকে, আসলে যা কোনও কাজেই লাগে না।”
ডাক্তার গুপ্ত বললেন, “কথাটা আপনি মন্দ বলেননি।” তারপর সামন্তের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আই থিংক হি হ্যাজ এ পয়েন্ট দেয়ার!”
আমি বললুম, “আর তা ছাড়া এটাও ভেবে দেখুন যে, গুঁড়ো মশলার চলন হয়েছে কোন ধরনের পরিবারে। মোটামুটি সেইসব পরিবারেই হয়েছে, যেখানে গিন্নিরাও চাকরি-বাকরি করেন। কাজে বেরুবার তাগিদে রান্নার পাট তাঁদের চটপট চুকিয়ে নিতে হয়, ফলে মশলা-বাটাবাটির ঝামেলার মধ্যে তাঁরা যেতে চান না। নোড়াও অতএব আউট। পুরনো আমলের গিন্নিরা কিন্তু গুঁড়ো মশলায় অতটা বিশ্বাসী নন, তাঁরা এখনও শিলের উপরে নোড়া দিয়ে মশলা পিষে নেন। তা সদানন্দবাবুর গিন্নিটি যে পুরনো আমলের মানুষ, সে তাঁকে দেখেই আপনারা বুঝেছেন। তো আমার বিশ্বাস, অন্তত তাঁর হেঁশেলে শিল-নোড়ার ভূমিকা এখনও শেষ হয়নি।”
সামন্ত মশাই বললেন, “ঠিক আছে, আই উইথড্র মাই স্টেটমেন্ট। তবে কিনা নোড়া দিয়েই যে নকুলচন্দ্রের মাথা ফাটানো হয়েছে, তাও কিন্তু আমি ভাবছিলুম না।”
ডাক্তারবাবু বললেন, “তা হলে কী ভাবছিলেন?”
সদানন্দবাবুর লাঠিটা সামন্তের হাতে ধরাই ছিল। সেটার দিকেই খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন তিনি। তারপর বললেন, “আমি ভাবছিলুম অন্য কথা।”
কৌশিক চুপচাপ আমাদের কথা শুনছিল। এবারে সে এগিয়ে এসে বলল, “কী ভাবছেন সেটা বোঝা মোটেই শক্ত নয়। লাঠিটা একবার দেখতে পারি?”
কৌশিকের দিকে লাঠিটা এগিয়ে দিয়ে সামন্ত বললেন, “সাবধানে ধরুন। জায়গায় জায়গায় রক্তের ছিটে লেগে আছে, মুছে না যায়।”
লাঠির মাথায় যে লোহার বল বসানো, এইটে দেখেই কৌশিকের ভুরু দুটো একটু উপরে উঠে গিয়েছিল। খানিক বাদেই সে-দুটো আবার যথাস্থানে ফিরে এল। সামন্তের হাতে লাঠিটা ফিরিয়ে দিয়ে সে বলল, “আপনার ধারণা, এইটে দিয়েই খুন করা হয়েছিল, তাই না?”
সামন্ত বললেন, “করা কি অসম্ভব?”
কৌশিক বলল, “তা কেন বলব? বিশেষ করে যে-দিকটায় লোহার বল বসানো রয়েছে সেই দিক দিয়ে তেমন-তেমন জোরে মারতে পারলে মানুষ তো মানুষ হাতির মাথাও হয়তো ফাটিয়ে দেওয়া যায়। ….কিন্তু না, আর নয়, আপনি আপনার জেরার কাজ শুরু করুন। অনেক বেলা হয়েছে, আমি এবারে চলি।”
কৌশিক চলে যাচ্ছিল। হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে আমাকে বলল, “কাল তো আমাদের বাড়িতে আপনার আসবার কথা, তাই না?”
বললুম, “হ্যাঁ, কালই তো রবিবার।”
“আসবেন কিন্তু। মামাবাবু বিশেষ করে বলে দিয়েছেন।”
১১
পাড়ায় দেখলুম সদানন্দবাবুর যেমন আমার মতো কিছু শুভার্থী আছেন, তেমনি শত্রুও নেহাত কম নেই। বরং শত্রুর সংখ্যাই বেশি। তার কারণ অবশ্য আর কিছু-ই নয়, ঈর্ষা। সদানন্দবাবুর অবস্থা যে তাঁর প্রতিবেশীদের তুলনায় কিছুটা সচ্ছল সে-কথা আমরা আগেই বলেছি। যে-কথা বলা হয়নি, সেটা এই যে, স্রেফ সেই সচ্ছলতার কারণেই অনেকে তাঁর উপরে বিশেষ সন্তুষ্ট নন। ভাড়াটে খুন হয়েছে, আর খুনি হিসেবে সদানন্দবাবুকেই পুলিশ সন্দেহ করছে, এই কথাটা চাউর হতে খুব দেরি হল না। শুনে তাঁরা বলাবলি করতে লাগলেন, ঠিক হয়েছে, ব্যাটা যেন ধরাকে সরা জ্ঞান করছিল। এখন বোঝো ঠ্যালা। যেমন কর্ম তেমনি ফল! অর্থাৎ তাঁরা ধরেই নিয়েছিলেন যে, অপকর্মটা সদানন্দবাবুই করেছেন, আর তার ফল ভোগ না-করেও তাঁর নিস্তার নেই।
মনটা ভাল নেই। রাত হয়েছে, কোনওক্রমে খাওয়া-দাওয়া সেরে বিছানায় এসে শুয়ে পড়েছি, কিন্তু ঘুম আসছে না। ব্যাপারটা নিয়ে যত ভাবছি, মন যেন ততই আরও খারাপ হয়ে যাচ্ছে। সদানন্দবাবুর মুখখানা বারবার ভেসে উঠছে আমার চোখের সামনে। খানাতল্লাসির পর্ব শেষ হবার পর পুলিশ যখন তাঁকে গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে যায়, তখন যে তাঁকে কী অসহায় দেখাচ্ছিল।
যা দিয়ে একটা মানুষের মাথা ফাটিয়ে দেওয়া যায়, তল্লাসি করে এমন জিনিস নেহাত বম পাওয়া যায়নি। ইট, পাথর, নোড়া, রেঞ্চ আর হাতুড়ি তো বটেই, একটা বেশ মোটামতন শাবলও পাওয়া গিয়েছে। সবই সদানন্দবাবুর সম্পত্তি। তল্লাসিটা প্রথমদিকে চলেছিল উপর-উপর। পরে উইটনেস রেখে বাক্স-প্যাঁটরা- সিন্দক-আলমারি সবই হাঁটকে দেখা হয়। তাতে যেমন নকুলের মাছের আড়তে একগাদা বাটখারা পাওয়া যায়, তেমনি সদানন্দবাবুর আলমারি থেকেও একটা এক-কিলো ওজনের বাটারা বেরিয়ে পড়ে। তবে, সবচেয়ে বেশি মুশকিল বাধিয়েছে ওই লোহার-বল-বসানো লাঠিটাই। সামন্ত সম্ভবত ধরেই নিয়েছেন যে, ওই লাঠি দিয়েই নকুলের মাথা ফাটানো হয়েছিল। তাঁর কথা শুনে অন্তত সেইরকম মনে হয়।
খুনি হিসেবে যে সদানন্দবাবুকেই তিনি সন্দেহ করছেন, সেটাকে অবশ্য অস্বাভাবিকও বলা যায় না। তিনি বাড়িওয়ালা। ভাড়াটের উপরে তিনি প্রসন্ন ছিলেন না। ভাড়াটে যাতে উঠে যেতে বাধ্য হয়, তার জন্যে জল দেওয়া বন্ধ করেছিলেন, এমনকি ইলেকট্রিক লাইনও কেটে দিয়েছিলেন একদিনের জন্যে। তার উপরে আবার নকুলের লাশের কাছে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গিয়েছিল তাঁকেই। সামন্তের সন্দেহ তো হতেই পারে।
সন্দেহের একটা কাঁটা যে আমার মনেও খচখচ করছিল না, তা-ই বা কী করে বলি। একদিকে যেমন সদানন্দ বাবুর অসহায় দুখখানা আমার চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছিল, অন্যদিকে তেমনি বারবার আমার মনে পড়ে যাচ্ছিল সদানন্দবাবুর সেই কথাটা, বৃহস্পতিবার সকালে আমার বৈঠকখানা থেকে বেরিয়ে যাবার সময় যা তিনি খুব উত্তেজিতভাবে আমাকে বলে গিয়েছিলেন।
কী বলেছিলেন সদানন্দবাবু? ভাড়াটে তাড়াবার জন্যে দরকার হলে যে গুন্ডা লাগাতেও পিছপা হবেন না, শুধু এইটুকু বলেই তো ক্ষাও হননি তিনি, সেইসঙ্গে যোগ করেছিলেন এই ভয়ঙ্কর কথাটা যে, গুন্ডা লাগাবারই বা দরকার কী, “এই যে লাঠিটা দেখছেন না, এটাই যথেষ্ট, এইটে দিয়েই ওর মাথা ফাটিয়ে ছাড়ব।”
তা হলে কি শেষপর্যন্ত সেই কাজই তিনি করলেন? করা যে অসম্ভব, তাও বলা যাচ্ছে না। শারীরিক সামর্থ্যের দিক থেকে তো নয়ই। ভদ্রলোকের একমাত্র অসুবিধা চোখ নিয়ে। ছানি কাটিয়েছন ঠিকই….কিন্তু দৃষ্টির সেই আগের মতো জোর আর ফিরে পাননি। তবে শরীর এখনও রীতিমতো মজবুত। এই যে এতদিন এখানে আছি, সদানন্দবাবুকে একদিনও বিছানায় পড়ে থাকতে দেখলুম না। জ্বর নেই, জারি নেই, সর্দি নেই, কাশি নেই, ছেলেছোকরাদের মতোই টগবগে টনকো-তাজা স্বাস্থ্য, তাই নিয়ে একটু জাঁকও করেন, লোহার বল বসানো ওই লাঠিটা দিয়ে একটা নেড়িকুত্তার মাথাও ফাটিয়ে দিয়েছেন, মানুষের মাথা ফাটানোই বা তবে একেবারে অসম্ভব হবে কেন? বিশেষ করে সিঁড়ির দু’ধাপ উপরে যেখানে তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন, সেখান থেকে তো কাজটা আরও সহজ হবার কথা। গঙ্গাধর সামন্ত এই ব্যাপারটার উপরে দেখলুম খুবই জোর দিচ্ছেন।
কিন্তু সত্যিই কি কাজটা সদানন্দবাবু করেছেন? ভাড়াটেকে তুলে দেবার জন্য জল আর লাইটের লাইন কেটে দিয়েও যখন সুবিধে হল না, তখন তাকে খুনই করে বসলেন? ভেবে ভেবে কোনও কূলকিনারা পাচ্ছিলুম না। এক-একবার মনে হচ্ছিল যে, বিচিত্র কী, মানবচরিত্র বড়ই জটিল, বড়ই রহস্যময় ব্যাপার, তার কতটুকুই বা বুঝি আমরা? এ তো প্রায় সমুদ্রে ভাসমান সেই হিমশৈলের মতোই, জলের উপরে যার সামান্য অংশই আমরা দেখতে পাই, আর বেশির ভাগটাই গোপন থেকে যায় জলের তলায়। সদানন্দবাবুর ক্ষেত্রেও হয়তো সেটাই ঘটেছে। তাঁর চরিত্রের খুব সামান্যই আমি দেখেছি, বাদবাকিটার সম্পর্কে কোনও ধারণাই আমার ছিল না। বাইরে তিনি সদানন্দ, হাস্যময়, পরোপকারী প্রতিবেশী, কিন্তু ভিতরে ভিতরে হয়তো খুবই নিষ্টুর। এতই নিষ্ঠুর যে, একটা জলজ্যান্ত মানুষকে মেরে ফেলতেও তাঁর হাত কিছুমাত্র কাঁপেনি।
এক-একবার এইরকম ভাবছিলুম আমি, কিন্তু পরক্ষণেই মনে হচ্ছিল যে, না, এটা সম্ভব নয়, এটা হতে পারে না। সদানন্দবাবুর পক্ষে কাউকে খুন করা একেবারেই অসম্ভব একটা ব্যাপার।
ভদ্রলোক এখন থানা-হাজতে রয়েছেন। আজ আর আমি অফিসে যাইনি। বারোটা নাগাদ লাশ সরিয়ে নেবার ব্যবস্থা করা হল। তারপর জিপে তুলে সদানন্দবাবুকে নিয়ে যাওয়া হল থানায়। দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে আমি আর শম্ভুবার্ এই দৃশ্য দেখলুম। শম্ভুবাবুর অবস্থাও আমারই মতো। সদানন্দবাবুকে তিনিও বিশেষ শ্রদ্ধা করেন, ভালবাসেন। বললেন, “কী করা যায় বলুন তো?”
করবার কিছুই ছিল না। একে শনিবার, তায় বেলা একটা বাজে। তাই জামিনের ব্যবস্থা করা যায়নি। কালও করা যাবে না। যা-করবার সোমবারে করতে হবে।
এখন একমাত্র ভরসা ভাদুড়িমশাই। ভাগ্য ভাল যে, তিনি কলকাতায় রয়েছেন। সদানন্দবাবুকে যে আমি উপকারী একজন বন্ধু হিসেবে গণ্য করি, সকালে ফোনেই সে-কথা ভাদুড়িমশাইকে আমি জানিয়েছিলুম। নিজে আসতে না পারলেও নিশ্চয় সেইজন্যেই তিনি কৌশিককে এখানে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। আমি আর বাসন্তী যদি খুব মিনতি করে বলি যে, এই খুনের তদন্তের ভার তাঁকে নিতেই হবে, তা হলে কি দরকার হলে আরও কিছু দিন তিনি কলকাতায় থেকে যাবেন না? মনে তো হয় থেকে যাবেন।
কৌশিকের উপরেও আমার আস্থা অবশ্য নেহাত কম নয়। বয়স মাত্র ছাব্বিশ সাতাশ, কেমিস্ট্রিতে এম. এসসি. করে আর চাকরি-বাকরির চেষ্টা করেনি, মামার লাইন ধরেছে। অর্থাৎ গোয়েন্দাগিরিতে তার অভিজ্ঞতা মাত্র চার-পাঁচ বছরের। কিন্তু এরই মধ্যে যে কিছুটা নাম করেছে, তাতে বোঝা যায় যে, ছেলেটার অভিজ্ঞতা যতই কম হোক, বুদ্ধিটা পাকা। মেদবর্জিত ছিপছিপে লম্বা চেহারা, গায়ের রং বাবার মতো ফর্সা নয়, মায়ের মতো তামাটে। আর অসম্ভব রকমের ধারালো চোখ দুটি দেখে তার মামার কথাই বারবার আমার মনে পড়ে যাচ্ছিল।
নেবুতলার ঘটকবাড়ির জোড়া-খুন নিয়ে যে মামলা চলছিল, কৌশিকের পাকা বুদ্ধির প্রমাণ তাতেই প্রথম পাওয়া যায়। এ হল গত বছরের ঘটনা। তার আগেও সে খুচরো কয়েকটা কাজ করেছিল বটে, কিন্তু এটাই ছিল তার ব্রেক-থ্র। এই মামলায় যাবতীয় সাক্ষ্যপ্রমাণ সে এত নিপুণভাবে সাজিয়ে দিয়েছিল যে, নিশ্চিত প্রাণদন্ড থেকেও ‘সন্দেহের অবকাশে’ খুনের আসামিদের বাঁচিয়ে দেবার ব্যাপারে যিনি সিদ্ধহস্ত, সেই দুদে ব্যারিস্টার সুধাকান্ত মজুমদারও ঘটক অ্যান্ড চৌধুরি এন্টারপ্রাইজের জুনিয়ার পার্টনার অমরেশ চৌধুরিকে কিছুতেই খালাস করিয়ে আনতে পারেননি। আদালতের রায়ের যে অংশটাকে ওবিটার ডিক্টাম বলা হয়, হাইকোর্টের প্রবীণ জজ আবদুল কুরেশি তাতে কৌশিকের কর্মনৈপুণ্য ও কর্তব্যনিষ্ঠার খুব প্রশংসাও করেছিলেন। বলেছিলেন, স্রেফ পুলিশ বিভাগের গাফিলতির জন্যই অনেক ক্ষেত্রে তদন্তের কাজে অস্বাাবিক দেরি হয়ে যায়, আর তারই পরিণামে লোপাট হয়ে যায় অনেক সাক্ষ্যপ্রমাণ। ফলে, নেহাতই সন্দেহের অবকাশে আসামিদের সে-সব ক্ষেত্রে মুক্তি না দিয়ে আদালতের উপায় থাকে না। কিন্তু এ-ক্ষেত্রে সাক্ষ্যপ্রমাণ অতি দ্রুত সংগ্রহ করা হয়েছে, এবং যথাসময়ে সেগুলি দাখিল করবার ব্যাপারেও কোনও শৈথিল্য ঘটেনি বলেই সমাজের পক্ষে অতিশয় বিপজ্জনক ও অত্যন্ত নৃশংস এক অপরাধীকে সেই শাস্তি দেওয়া গেল, যা তার প্রাপ্য ছিল।
মিঃ জাস্টিস আবদুল কুরেশির রায় পাঠ করায় অনেকে অবাক হয়েছিলেন। আমি হইনি। তার কারণ সে ভাদুড়িমশাইয়ের ভাগ্নে। মামার ওণ যে কিছু-না-কিছু সে পাবেই, তা যেন আমি ধরেই নিয়েছিলুম। আসলে হত্যাকান্ডের ধরন দেখে খুনির চরিত্র কীভাবে অগ্রিম আন্দাজ করে নিতে হয়, হত্যার ফলে কে কোন দিক দিয়ে কতটা উপকৃত হচ্ছে, সেইটে বুঝে নিয়ে তদন্তের একটা ছক কীভাবে তৈরি করে নিতে হয়, এভিডেন্স কীভাবে সংগ্রহ করতে হয়, এবং মামলা কীভাবে কোন পথ ধরে এগোতে পারে, সে-দিকে খেয়াল রেখে যাবতীয় সাক্ষ্যপ্রমাণকে সাজাতেই বা হয় কীভাবে, মামার কাছেই কৌশিক সে-বিষয়ে যৎপরোনাস্তি তালিম পেয়েছে। সুতরাং তদন্তের ব্যাপারে সে যে কোনও পর্যায়েই কোনও ফাঁক রাখবে না, এটাই স্বাভাবিক।
নেবুতলার কেসটাতে সে মার্ডার-ওয়েপনটিও একেবারে ঝটিতি উদ্ধার করে, এবং সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে দেয় যে, অস্ত্রটি আর কিছুই নয়, আসলে সেটা অমরেশ চৌধুরিরই অফিস ঘরের কলমদানের মধ্যে অতিশয় যত্নে রাখা একটা নকশা-কাটা বিদেশি পেপার-নাইফ। নিহত ঘটক-দম্পতিই যে বিদেশ থেকে ঘুরে এসে ধারালো সেই কাগজ-কাটা ছুরিটি অমরেশ চৌধুরিকে উপহার দিয়েছিলেন, কাগজে এই ঘটনাটা সেদিন ‘নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাস’ বলে বর্ণিত হয়েছিল।
পাঁচ-নম্বর বাড়ির ক্ষেত্রে যে মার্ডার-ওয়েপন কোনটা তা এখনও জানা যায়নি। গঙ্গাধর সামন্ত অবশ্য ধরেই নিয়েছেন যে, লাশের পাশে যে লাঠিটা পড়ে ছিল, লোহার বল বসানো সেই লাঠি দিয়েই নকুলচন্দ্রের মাথা ফাটানো হয়েছে। তবে কৌশিকের মুখের ভাব দেখে মনে হল, সামন্তের এই সিন্ধান্ত সে ঠিক মেনে নিতে পারছে না। ঘটনাস্থল থেকে সে যখন চলে আসে, তাকে এগিয়ে দিতে আমিও তখন সদর দরজা পর্যন্ত এসেছিলুম। সেইসময়ে সে আমাকে বলে যে, সামন্তমশাই যা ভাবছেন, কেসটা তত সহজ-সরল নয়। তাতে আমি বলি, “তোমার কী মনে হয়, বলো তো। সদানন্দবাবুই খুনি?” প্রশ্ন শুনে কৌশিক একটুক্ষণ চুপ করে থাকে, তারপরে বলে, “উনি যে খুব বিপদে পড়েছেন, তাতে সন্দেহ নেই।
কৌশিক তার মারুতিতে উঠে স্টার্ট দেবার আগে ভাদুড়িমশাই সম্পর্কেও দুটো-একটা কথা হল। জিজ্ঞেস করেছিলুম, “তোমার মামাবাবু এবারে কী কাজ নিয়ে এসেছেন?” তাতে কৌশিক একগাল হেসে বলল, “আর বলবেন না কিরণমামা, একটা রেসের ঘোড়ার ব্যাপার।”
“তার মানে?”
“তা হলে শুনুন। মাদ্রাজ থেকে একটা রেসের ঘোড়াকে নাকি কলকাতায় পাঠানো হয়েছিল, কিন্তু মধ্যপথে ট্রেনের ওয়াগন থেকে সেটা হাপিস হয়ে যায়। ঘোড়ার মালিক কলকাতার এক বিরাট ব্যবসায়ী। বিস্তর টাকা খর্চা করে সে মামাবাবুকে কলকাতায় নিয়ে আসে। গ্র্যান্ডে তুলতে চেয়েছিল, কিন্তু মামাবাবুকে তো আমার চেয়ে আপনি অনেক ভাল জানেন, তিনি গ্র্যান্ডে উঠলেন না, এয়ারপোর্ট থেকে সরাসরি আমাদের ওখানে চলে এলেন। তা রেসের ঘোড়া উদ্ধার করবার জন্যে মামাবাবুকেই দেখলুম একেবারে রেসের ঘোড়ার মতো ছোটাছুটি করতে হচ্ছে। ক’টা দিন যা ধকল গেল ওঁর সে আর বলবার নয়।”
“ঘোড়াটা উদ্ধার হয়েছে?”
“বিলক্ষণ। কাজ কমপ্লিট; ঘোড়া এখন তার মালিকের আস্তাবলে। ব্যাপার কী জানেন, জাল কাগজপত্র দেখিয়ে মধ্যপথে একটা স্টেশনে একজন লোক ওয়াগন থেকে ঘোড়াটাকে নামিয়ে নিয়েছিল। হেঁজিপেঁজি লোক নয়, তারও প্রচুর পয়সা, মস্ত কারবার। মামাবাবুর তদন্তে তার জারিজুরি যখন ফাঁস হবার উপক্রম, তখন সে নিজেই এসে ঘোড়াটা ফেরত দিয়ে যায়। শুধু তার একটা অনুরোধ, স্ক্যান্ডালটা যেন খবরের কাগজ টের না পায়…..ওঃহো কথাটা আপনাকে বলে ফেললুম। আপনিও যে খবরের কাগজের লোক, তা আমার মনেই থাকে না।”
“কাল সকালে তুমি বাড়িতে থাকছ তো?”
“আপনি আসছেন আর আমি থাকব না?” কৌশিক হেসে বলল, “নিশ্চয় থাকব। আসবেন কিন্তু……উইদাউট ফেইল। …. মামি আর পারুলকেও নিয়ে আসুন। মা খুব বলছিল।”
বললুম, “পারুলের পরীক্ষা, তাই যেতে পারবে না। আর তোমার মামিই বা ওকে ছেড়ে এখন যায় কী করে?”
“ঠিক আছে, আপনিই আসুন।”
গলি থেকে বেরিয়ে বাঁ দিকে টার্ন নিল কৌশিকের গাড়ি। আমি আবার ভিতরে চলে এলুম।
শুয়ে শুয়ে এই সব কথাই ভাবছি। ঘুম আসছে না। কৌশিককে বিদায় দিয়ে ফিরে আসবার পরে গঙ্গাধর সামন্ত যে মন্তব্য করেছিলেন, সেটা মোটেই আশাপ্রদ নয়। সামন্ত বলেছিলেন, “প্রাইভেট ডিটেকটিভদের সম্পর্কে পুলিশের নাকি একটা অ্যালার্জি থাকে। কই মশাই, আমার তো কোনও অ্যালার্জি নেই। দরকার হলে ওঁদের সাহায্য নেব বই কি। তবে কিনা দরকার হবে বলে মনে হয় না। এ তো একেবারে জলের মতো সোজা ব্যাপার।”
ডাক্তার গুপ্ত কোনও কথা বলেননি। চুপ করে ছিলেন। তবে সামন্তের কথা শুনেই আমি বুঝতে পেরে গিয়েছিলুম যে, ভদ্রলোক মনঃস্থির করে ফেলেছেন। যে সিদ্ধান্ত করেছেন, তার আর নড়চড় হবার উপায় নেই।
এইসব ভাবতে-ভাবতেই ঘুমিয়ে পড়েছিলুম আমি।
.
পারুল এসে যখন আমার ঘুম ভাঙাল, তখন প্রায় আটটা বাজে। বলল “মা খুব রাগারাগি করছে, বিছানা ছেড়ে এবারে উঠে পড়ো বাবা।”
আম’কে তুলে দিয়ে পারুল আবার পড়তে চলে গেল। বাসন্তী ইতিমধ্যে ঘরে এসে ঢুকেছিল। বলল, “বাজার করতে হবে না? চটপট মুখ-হাত ধুয়ে বেরিয়ে পড়ো। তোমাকে রওনা করিয়ে দিয়ে আমি একবার ও-বাড়ি যাব।”
“কেন, ও-বাড়িতে আবার কী হল?
“নতুন-কিছু হয়নি। ওদের কাজের মেয়েটা একটু আগে একবার এসেছিল। বলল, কুসুমদি সারা রাত ঘুমোননি, সকালেও খুব কান্নাকাটি করছেন।”
“তা তো করবেনই। আজ রবিবার, ফলে আজ জামিনের ব্যবস্থা করা যাবে না। হুট করে যে কেন ওঁকে ধরে নিয়ে গেল। ভদ্রলোক কি তাঁর বাড়ি আর বউ ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছিলেন?”
বাসন্তী বলল, “আর কথা নয়, বাথরুমে যাও, তারপর বাজার করে নিয়ে এসো। তোমার নাহয় নেমন্তন্ন রয়েছে, আমাদের তো মুখে কিছু দিতে হবে। এদিকে বাড়িতে সব বাড়ন্ত। অন্তত মাছটাও যদি থাকত তো আজকের দিনটা চালিয়ে নিতুম। নাও চটপট বেরিয়ে পড়ো। তুমি বাজারে গেলে সেই ফাঁকে আমি কুসুমদির কাছ থেকে একটু ঘুরে আসব।”
বাথরুমে ঢুকে পড়লুম। বুঝতে পেরেছিলুম যে, বাসন্তীর গলা এখন ক্রমেই চড়তে থাকবে।
১২
ভাদুড়িমশাই এবারে কলকাতায় এসেছেন তা প্রায় বছর দুই বাদে। দেখে ভাল লাগল যে, তাঁর শরীর ইতিমধ্যে একটুও টসকায়নি। অরুণ সান্যালও দেখলুম ভালই আছেন। ভাদুড়িমশাই মাঝখানে একবার টেলিফোন ধরবার জন্যে ঘর থেকে উঠে গিয়েছিলেন। তখন মালতীকে জিজ্ঞেস করলুম, “ব্যাপার কী বলো তো? অরুণের শুনেছিলুম শরীর বিশেষ ভাল নয়, কিন্তু কই, তোমার কর্তাকে দেখে তো তা মনে হচ্ছে না।”
উত্তরটা অরুণই দিলেন। বললেন, “বুঝলেন না কিরণদা, ওই কথা বলে দাদাকে আটকে রাখা হয়েছে আর কি। নইলে তো কাজ মিটবার সঙ্গে-সঙ্গেই উনি চলে যাচ্ছিলেন।”
মালতী মুখ টিপে হাসল। তারপর বলল, “দাদা যে এই বয়সেও এত খাটাখাটি করছে কেন, বুঝতে পারছি না। একটামাত্র মেয়ে, তা সে তো তার স্বামীর সঙ্গে বিদেশে থাকে। বউদিও সেই কবেই স্বর্গে গেছেন। তা হলে আর এত খাটাখাটি করছে কার জন্যে? কোনও মানে হয়? এত বলি যে, ব্যাঙ্গালোরের অফিসটা গুটিয়ে ফেলে এবারে কলকাতায় ফিরে এসে একটু থিতু হয়ে বোসো, তা সে-কথা শুনছে কে। আপনি একটু বুঝিয়ে বললেও তো পারেন।”
কৌশিক বলল, “কালই তো কিরণমামাকে আমি বলছিলুম যে, মামাবাবুর এবারে বড্ড ধকল গেল। এই বয়সে এত দৌড়ঝাঁপ করা ওঁর ঠিক হচ্ছে না।”
বললুম, “সে তো আমি যখনই দেখা হয়, তখনই বলি। এও বলেছি যে, আপনার এখন আর এত ছোটাছুটি করা ঠিক নয়। আপনার ভূমিকা হওয়া উচিত কনসালট্যান্টের। লোকে আপনার কাছে পরামর্শ নিতে আসবে, আপনি একটা ফি নিয়ে বলে দেবেন যে, কোন পথে কীভাবে তদন্তটা হওয়া উচিত। ব্যাস, ঝামেলা মিটে গেল। তা উনি সে-কথায় কানই দেন না। যত বলি, তত হাসেন। আসলে ব্যাপারটা যে কী তা তো তোমাদের না-বুঝবার কথা নয়। মানুষটা আসলে কাজ- পাগলা, সবকিছু নিজের হাতে করতে ভালবাসেন।”
ভাদুড়িমশাই ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বললেন, “সব শুনেছি, সব শুনে ফেলেছি।”
“কী শুনলেন?”
“ওই আমাকে নিয়ে যে-সব কথা হচ্ছিল। ঠিক আছে, যা চাইছেন তা-ই হবে, অন্তত আপনাদের এই পীতাম্বর চৌধুরি লেনের কেসটাতে আমি নিজের হাতে কিছু করব না। করবার অবশ্য দরকারও নেই, কৌশিকই তো রয়েছে। আমি স্রেফ পরামর্শ দেব। এতদিন তো নিজের হাতে সব করেছি। এবারে দেখা যাক কনস্যালট্যান্ট হয়ে কদ্দুর কী করা যায়। তবে হ্যাঁ, জায়গাটা কিন্তু স্বচক্ষে একবার দেখব।”
“আজই বিকেলে চলুন।”
“আজ যাব না।”
“কেন, আবার কী অসুবিধে ঘটল? বলেন, তো আমি ফোন করে গঙ্গাধর সামন্তকে একটা খবর দিয়ে রাখি। হাতে কোন জরুরি কাজ না-থাকলে বিকেল নাগাদ তিনিও সেখানে হাজির থাকবেন।” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “অসুবিধে ওই গঙ্গাধর সামন্তকে নিয়েই। আজ বিকেলে সে তো ওখানে যেতে পারবে না। অন্য জায়গায় তার একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট রয়েছে যে!”
“কোথায়?”
ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “বুঝতে পারছেন না?”
কৌশিক বলল, “অত হেঁয়ালি কোরো না মামা।বু। বলেই দাও?”
মালতী বলল, “আমিই বলে দিচ্ছি কিরণদা, তোমাদের ওই থানা-অফিসারটিকে আজ বিকেলে আমাদের এখানে চা খেতে বলা হয়েছে। কিন্তু আন নয়, এবারে তোমরা খেয়ে নাও। তবে এখুনি বলে দিচ্ছি, খাবার টেবিলে বসে এ-সব খুন-জখম নিয়ে কিন্তু একটা কথাও বলা চলবে না। এ-সব কথা পরে হবে।”
তা-ই হল। কলকাতায় এখন চ্যাপলিন-উৎসব চলছে। তারই সূত্রে মঁসিয়ে ভের্দুর প্রসঙ্গটা একবার উঠছিল বটে, কিন্তু কৌশিক যে-ই না ভাদুড়িমশাইকে বলতে শুরু করেছে, ‘আচ্ছা মামাবাবু, পাথরের সঙ্গে একটা দড়ি বেঁধে আর দড়ির মাথায় একটা ফাঁস লাগিয়ে ভদ্রলোক ওই যেখানে তাঁর… মানে কী বলব… তাঁর নতুন বউয়ের গলায় সেটা…’ মালতী অমনি কটমট করে কৌশিকের দিকে তাকিয়ে বলল, “থাক, থাক, এখন আর ও-সব কথার দরকার নেই, যথেষ্ট হয়েছে।”
কৌশিক চুপ করে গেল। অরুণ একবার হাসিমুখে বলেছিলেন, “কেন, খুনের কথা বললে কী হয়? উইল দ্যাট স্পল ইয়োর অ্যাপিটাইট?” তাতে মালতী তাঁকেও এমন ধমক কষাল যে, অরুণ আর তারপরে একবারও মুখ খুলবার সাহস পেলেন না।
খাওয়া-দাওয়ার পরেই যে পীতাম্বর চৌধুরি লেনের প্রসঙ্গটা উঠল তাও নয়। ভাদুড়িমশাইয়ের ঘরে ঢুকে দুজনেই গড়িয়ে নিলুম খানিকক্ষণ। গড়ানো মানে ঘুম নয়, শুয়ে শুয়ে ঘন্টা দেড়েক হরেক বিষয়ে গল্প চলল। তিনটে নাগাদ চা নিয়ে এল মালতী। চা খেয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “সামন্তকে সাড়ে-চারটেয় আসতে বলেছি, নিজেদের মধ্যে কথাবাতাটা তার আগেই সেরে নেওয়া যাক।” তারপর মালতীর দিকে তাকিয়ে বললেন, “হ্যাঁ রে, কৌশিক বাড়িতে আছে তো?”
মালতী বলল, “কোথায় আর যাবে, শুয়ে শুয়ে রাজ্যের ম্যাগাজিনের পাতা ওলটাচ্ছে।”
“তা হলে ওকে একবার এ-ঘরে পাঠিয়ে দে।”
কাপ-প্লেট তুলে নিয়ে বেরিয়ে গেল মালতী। তার মিনিট খানেক বাদেই কৌশিক এসে ঢুকল। ভাদুড়িমশাই বললেন, “হ্যাঁ রে কৌশিক, ব্যাকগ্রাউন্ডটা তো মোটামুটি বুঝতে পেরেছি; তুই ওখানে যাবার পর যা-যা ঘটেছে, তারও একটা রিপোর্ট তোর কাছে কাল শোনা গেল। এখন বল তো সব্বাইকে বাদ দিয়ে একা ওই সদানন্দের উপরেই সামন্তের সন্দেহটা এ-ভাবে পড়ছে কেন?”
কৌশিক বলল, “ওর সন্দেহের কারণ আপাতত দুটি। প্রথমত, যে ভাড়াটেকে তুলে দেবার জন্যে বাড়িওয়ালা নানানভাবে চেষ্টা করছে, আর সেই চেষ্টার কথাটা বলেও বেড়াচ্ছে সবাইকে, তার উপরে আবার জল আর লাইটের লাইন কেটে দেবার মতো দু-দুটো ক্রিমিন্যাল অফেন্স করতেও ছাড়েনি, সেই ভাড়াটে যদি হঠাৎ এইভাবে বাড়ির মধ্যেই মারা পড়ে, তো বাড়িওয়ালাই যে তাকে মেরেছে, এমন সন্দেহ হওয়াটাই তো স্বাভাবিক। যেটাকে খুন-খারাবির ব্যাপার বলে মনে হচ্ছে, পুলিশ সেখানে মোটিভের সন্ধান করবেই। তা সদানন্দবাবুর ক্ষেত্রে যে সেটা ছিল, সে তো আর অস্বীকার করা চলে না।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “এটা তো প্রথম কারণ। দ্বিতীয় কারণটা কী?”
“সেটাও তুমি আন্দাজ করেছ নিশ্চয়। সামন্তর সন্দেহের প্রথম কারণ যদি হয় মোটিভ তো দ্বিতীয় কারণ সুযোগ। খুন করবার একটা সুযোগ চাই তো, তা সদানন্দবাবুর সেটা ভালই ছিল।”
“মোটিভ আর সুযোগ।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “খুনের একটা মোটিভ চাই, একটা সুযোগও চাই। ঠিক কথা। কিন্তু ও-দুটো বস্তু কি শুধু সদানন্দেরই ছিল? আর কারও ছিল না?”
কৌশিক বলল, “থাকতে পারে, না-ও থাকতে পারে। তবে সদানন্দবাবুর যে দুটোই ছিল সেটা মিথ্যে নয়। তার উপরে আবার ওই যে ওখানে লোহার বল লাগানো লাঠিটা পাওয়া গেল, সামন্তের সন্দেহ তার ফলে আরও জোরদার হয়েছে।”
“অর্থাৎ একেবারে ওয়ান-ট্র্যাক মাইন্ডের ব্যাপার। কিন্তু চোখ তো আর একটা নয়। তা হলে কথামালার সেই একচক্ষু, হরিণের মতো শুধু একটা দিকেই দেখছে কেন?”
কৌশিক বলল, “কী জানি। লাঠিটা অবশ্য দাঁড়াচ্ছে না।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “সে তো বুঝলুম। কিন্তু আমি ভাবছি অন্য কথা। হ্যাঁ রে কৌশিক, তুই তো আজ সকালে আমার নাম করে টেলিফোনে সামন্তর সঙ্গে কথা বললি। জেরায় কে কী বলেছে, সেটা বোঝা গেল?”
“সামন্ত কিছু বললে তবে তো বুঝব। আমাকে তো কিছু জানাতেই চায় না। যা-ই জানতে চাই উত্তরে শুধু বলে যে, বিকেলে তো যাচ্ছিই, তখন সিসিবিকে সব বলা যাবে।”
“ঠিক আছে।”
ভাদুড়িমশাই একটা সিগারেট ধরালেন।
আমি বললুম, “সিগারেটটা এখনও ছাড়তে পারলেন না?”
“আপনি ছেড়েছেন?”
“একেবারে যে ছেড়েছি, তা বলতে পারব না। তবে কমিয়েছি।”
“আমিও গোটা চার-পাঁচের বেশি খাই না।”
কৌশিক বলল, “আমি তা হলে নিজের ঘরে যাই মামাবাবু?”
ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “সিগারেটের কথা শুনেই উঠে পড়বার ইচ্ছে হল বুঝি? যা তা হলে, খেয়ে আয়। তবে বেশি দেরি করিস না।”
কৌশিক রেগে গিয়ে বলল, “কী যে বলো! ওই সব ছাইভষ্ম আমি খাই নাকি? ওর চেয়ে একটা রসগোল্লা খাওয়া ভাল।”
“রসগোল্লাও একটা-দুটোর বেশি খাস না। জানিস তো সর্বমত্যন্তং গর্হিতম্। কোনও কিছুরই অতিশয্য ভাল নয়। যেমন অন্য-সব ব্যাপার তেমনি খাওয়ার ব্যাপারেও এটা একেবারে খাঁটি কথা। যা-ই হোক, সিগারেট খাওয়ার তাড়া যখন নেই, তখন একটু বোস, তোর সামনেই কিরণবাবুকে দু-একটা কথা জিজ্ঞেস করি। সদানন্দবাবুর ব্যাপারে ওঁর মতামতও তোর শুনে রাখা ভাল।”
আমি বললুম, “কী জিজ্ঞেস করবেন করুন, আমি যা জানি সবই আপনাকে খোলাখুলি বলব।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “দেখুন মশাই, নকুলচন্দ্র কীভাবে কখন মারা গেল, আর এটা যদি খুনের ব্যাপারই হয়, তা হলে কে-ই বা খুন করল তাকে, তার বিন্দুবিসর্গও আপনার জানবার কথা নয়। তার কারণ ঘটনাটা যখন ঘটে, তখন সেখানে আপনি ছিলেন না। সুতরাং ও-ব্যাপারে আপনাকে কিছু জিজ্ঞেস করে কোনও লাভ নেই, আর তা আমি করছিও না। আমি আপনাকে এমন প্রশ্ন করব, যার উত্তর দেওয়া আপনার পক্ষে সম্ভব।”
“বেশ তো, তা-ই করুন।”
“সদানন্দবাবুকে আপনি কতদিন ধরে চেনেন?”
“যতদিন ও পাড়ায় আছি, ততদিন ধরেই চিনি। তা ধরুন দশ বছর তো হলই।”
“লোকটিকে আপনার কেমন লাগে?”
“ভালই তো লাগে। গায়ে পড়ে একটু উপদেশ-টুপদেশ দেন ঠিকই, ‘এটা খাবেন না, ওটা করবেন, না’ বলেন, তা সেও তো আমাদের ভালর জন্যেই বলেন। না মশাই, লোকটি খারাপ নন, পরোপকারী সজ্জন সদালাপী মানুষ
“উনি কাউকে খুন করতে পারেন বলে আপনার মনে হয়?”
“সেইটে ভেবেই তো কূলকিনারা পাচ্ছি না। এটা ঠিকই যে, নকুলচন্দ্রকে উনি ভুলে দিতে চাইছিলেন। ওর জল আর লাইটের কানেকশন যে কেটে দিয়েছিলেন, সেটাও মিথ্যে নয়। তা ছাড়া, নকুলের ডেডবডি তো কাল সকালে সিঁড়ির নীচে পড়ে থাকতে দেখা গেল, তার মাত্র দুদিন আগে অর্থাৎ বিষ্যুতবার সকালে আমার বৈঠকখানা থেকে বেরিয়ে আসবার সময় উনি এমন কথাও বলেছিলেন যে, কিছুতেই যখন নকুলচন্দ্রকে তাড়ানো যাচ্ছে না, তখন দরকার হলে ওঁর ওই লোহার বল বসানো লাঠিটা দিয়েই উনি নকুলের মাথা ফাটিয়ে ছাড়বেন।”
“এটা আপনি গঙ্গাধর সামন্তকে বলেছেন?”
“না, এটা বলিনি। তবে কথাটা উনি আমাকে যেমন বলেছিলেন, তেমনি আরও দু’চারজনকেও বলে থাকতে পারেন। তাদের কেউ গঙ্গাধর সামন্তকে এটা জানিয়েছে কি না, বলতে পারব না।”
“ঠিক আছে। আর-কেউ যদি বলে থাকে তো বলুক, আপনার অন্তত এক্ষুনি এটা জানিয়ে কাজ নেই। না না, পুলিশের কাছ থেকে কোনও তথ্য আমি আপনাকে গোপন করতে বলছি না। অন্য-কোনও সূত্রে এই খবরটা জেনে তারপর পুলিশ যদি আপনার কাছে এটার করোবরেশন চায়, তো তখন আপনাকে বলতেই হবে যে, হ্যাঁ, আপনার কাছেও অমন কথা সদানন্দ বলেছিলেন বটে। কিন্তু সেটা তো তারা এখনও চায়নি, তাই আপনারও আগ বাড়িয়ে কিছু বলবার দরকার নেই।”
“এটা বলছেন কেন?”
“এইজন্যে বলছি যে, সদানন্দের গলায় তা হলে ফাঁসটা আরও শক্ত হয়ে এঁটে যাবে। কৌশিক যে থটার কথা ভাবছে সেইটে ধরে এগিয়ে তখন আর বিশেষ লাভ হবে না। সেইজন্যেই বলছি, আপাতত আপনি চুপ করে থাকুন। নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন যে, যাকে সাপ্রেশান অভ এভিডেন্স বলে, এটা মোটেই সেই পর্যায়ে পড়ে না।”
“কৌশিক কোন পথের কথা ভাবছে?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “সেটা এখন আপনার জেনে কোনও লাভ নেই। কিন্তু আমার প্রশ্নের উত্তর এখনও পাইনি।’
“কী প্রশ্ন? যা যা বলছেন, সবকিছুরই তো উত্তর দিয়ে যাচ্ছি।”
“একটা প্রশ্নের উত্তর পাইনি। সদানন্দবাবু যে আদৌ কাউকে খুন করতে পারেন এটা আপনার বিশ্বাস হয়?”
“বড় ভাবনায় ফেললেন দেখছি।”
“বেশি ভাবনাচিন্তা করবেন না। ভাবনাচিন্তা না-করে যা বলবেন সেটাই আমার শোনা দরকার।’ পকেট থেকে প্যাকেটটা বার করে একটা সিগারেট ধরালুম। বুকের মধ্যে ধোঁয়া টেনে নিলুম অনেকটা। তারপর আস্তে-আস্তে ধোঁয়াটা ছেড়ে দিয়ে বললুম, “দেখুন মশাই, নজিরের অভাব নেই। এমনিতে যাকে নেহাত নিরীহ গোবেচারা কি ভালমানুষ বলে মনে হয়, সেও যে খুন করতে পারে, করেছে, এমন ঘটনার কথা আপনিও জানেন, আমিও জানি। শেষ পর্যন্ত হয়তো আদালতে এই গঙ্গাধর সামন্তই প্রমাণ করে ছাড়বে যে, আমাদের সদানন্দবাবুও আসলে একেবারে সেই রকমের একজন মানুষ। উপরে-উপরে খুবই ভদ্র খুবই শান্ত খুবই নিরীহ, কিন্তু ভিতরে ভিতরে যেমন নির্মম, তেমনি নিষ্ঠুর। কিন্তু তবু বলছি, না, সত্যিই যে উনি কাউকে খুন করতে পারেন তা আমি বিশ্বাস করি না।”
কৌশিক বলল, “ব্যস ব্যস, এইটুকুই আমার জানবার দরকার ছিল। জানো মামাবাবু, লোকটিকে দেখে সত্যি আমার বড় মায়া হচ্ছিল। খালি মনে হচ্ছিল লোকটা বোকা, বোকামি করে একটা জালের মধ্যে জড়িয়ে গেছে, এখন আর জাল কেটে বেরুতে পারছে না।”
আমি বললুম, “কৌশিক সম্ভবত ঠিক কথাই বলছে।”
কলিং বেল বেজে উঠল।
ভাদুড়িমশাই বললেন, “খুব সম্ভব গঙ্গাধর সামন্ত।”
১৩
গঙ্গাধর সামন্ত একা আসেননি, ডাক্তার গুপ্তকেও নিয়ে এসেছেন। সুরেশ গুপ্ত যে ভাদুড়িমশাইকে ভালই চেনেন, কালই তিনি সে-কথা বলেছিলেন। তবে তাঁকে দেখবামাত্রই ‘আরে সুরেশবাবু আপনি?’ বলে ছুটে এসে ভাদুড়িমশাই যে ভাবে তাঁকে অভ্যর্থনা জানালেন, তাতেই বুঝতে পারলুম যে, এটা নেহাত চেনা-জানার ব্যাপার নয়, এককালে দুজনের সম্পর্ক রীতিমতো ঘনিষ্ঠই ছিল।
যে-ঘরে ভাদুড়িমশাই থাকেন এতক্ষণ আমরা সেই ঘরে বসে কথাবার্তা বলছিলুম। এবারে সবাই বাইরের ঘরে এসে বসা গেল। চৈত্রমাস, সারা দিন বেশ গরম গিয়েছে, ভেবেছিলুম যে, বিকেলের দিকে ঝড় উঠতে পারে, কিন্তু ওঠেনি; একটু একটু মেঘ জমছিল বটে, কিন্তু এলোমেলো হাওয়ার দাপটে সে-মেঘ স্রোতের মধ্যে নোঙর-ছেঁড়া নৌকোর মতো কোথায় যে ভেসে গেল তার ঠিক-ঠিকানা নেই, বিকেলবেলার আকাশ এখন আবার আয়নার মতো ঝকঝক করছে।
কাজের লোকটির হাত দিয়ে মালতী পাঁচ গ্লাস ঘোলের শরবত পাঠিয়ে দিয়েছিল। গঙ্গাধর সামন্ত তাঁর শরবতের গ্লাসে চুমুক দেবার আগে দু’গ্লাস জলও খেয়ে নিলেন। তারপর রুমাল বার করে ঘাড় আর কপালের ঘাম মুছে বললেন, “উঃ, গরমে একেবারে মরে গেলুম!”
খানিক বাদেই জলখাবার এসে গেল। খেতে-খেতে যেমন কুশল-জিজ্ঞাসা আর পারস্পরিক বার্তা-বিনিময় চলতে লাগল, তেমনি অন্য রকমের টুকটাক কথাও হল কিছু-কিছু। তারপর ভাদুড়িমশাই-ই একসময়ে বললেন, “এবারে তা হলে পীতাম্বর চৌধুরি লেনের ওই ব্যাপারটার কথায় আসা যাক, কেমন? মিস্টার সামন্ত, আপনাকে যদি এই প্রসঙ্গে গোটা কয়েক প্রশ্ন করি, তা হলে তার উত্তর দিতে আপনার আপত্তি হবেনা তো? তা যদি হয়, তো এখনই বলুন, সে-ক্ষেত্রে আর আপনাকে আমি বিব্রত করব না।”
সামন্ত বললেন, “দেখুন মিস্টার ভাদুড়ি, এ-ব্যাপারে আমার তরফে যেটা বলবার কথা, সেটা খোলাখুলি বলা-ই ভাল। সরকারি নিয়মকানুন তো আপনার জানাই আছে। আপনি খুব ভালই জানেন যে, এ-সব ব্যাপার নিয়ে বাইরের কারও সঙ্গে কথা বলতে আমি বাধ্য নই, সাধারণত তা আমি বলিও না। তবে কিনা আপনার কথা আলাদা।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “কেন কেন, আমিই বা আর-পাঁচজনের থেকে আলাদা হলুম কীভাবে?”
গঙ্গাধর সামন্ত কিন্তু হাসলেন না। বললেন, “কথাটা আমার নয়, আমার উপরওয়ালার। আপনি যে এই পীতাম্বর চৌধুরি লেনের ব্যাপারটা নিয়ে আমার সঙ্গে কথা বলতে চান, আপনার ভাগ্নের ফোন পাবার পরে এটা আমার উপরওয়ালাকে আমি সঙ্গে-সঙ্গেই জানিয়েছিলুম। জিজ্ঞেস করেছিলুম যে, এ-ব্যাপারে যে-সব তথ্য ইতিমধ্যে আমাদের হাতে এসেছে, আপনাকে তা আমি জানাতে পারি কি না।”
“তিনি তাতে কী বললেন?”
“বললেন যে, নর্মালি উই ডোন্ট ডু দিস, তবে কিনা মিস্টার ভাদুড়ির কথা আলাদা, হি হ্যাজ অলওয়েজ কোঅপারেটেড উইথ আস। সো গো অ্যাহেড অ্যান্ড টক টু হিম অ্যান্ড সি ইফ হি ক্যান হেলপ আস ইন এনি ওয়ে।”
“সব কথাই আমাকে খুলে বলতে বলেছেন তিনি?”
“তা-ই তো বললেন। আপনার কাছে নাকি কোনও-কিছুই গোপন রাখবার দরকার নেই। বললেন যে, গিভ হিম অল দি ইনফর্মেশন অ্যান্ড ইন্টেলিজেন্স দ্যাট উই হ্যাভ উইথ আস্। দেয়ার’স অ্যাবসলিউটলি নো নিড টু হোল্ড এনিথিং ব্যাক।”
“বাঃ,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা হলে তো কোনও কথাই নেই। তা হলে শুরু করি, কেমন?” সামন্ত বললেন, “তার আগে এখানে আর যাঁরা উপস্থিত আছেন তাঁদের একটা কথা জানিয়ে রাখি। ব্যাপারটা এখন যে-স্টেজে রয়েছে, তাতে কোনও কিছুই ফাঁস হওয়াটা উচিত হবে না। হলে আমি তো বিপদে পড়বই। অন্য কিছু সমস্যাও দেখা দিতে পারে। সুতরাং আপনারা আমাকে কথা দিন যে, যা-যা আমি বলব তা শুধু আপনারাই জানবেন, আর কেউ নয়।
সামন্ত যদিও ‘আর যাঁরা, আপনারা’ ইত্যাদি সব শব্দ ব্যবহার করছিলেন, তবু বুঝতে আমার অসুবিধে হল না যে, তাঁর কথাগুলি আসলে একান্তভাবে আমাকেই বলা। আমি খবরের কাগজে কাজ করি, তাই ভদ্রলোক সম্ভবত ভয়।চ্ছেন যে, এই নিয়ে আমাদের কাগজে কিছু বেরিয়ে যেতে পারে।
বললুম, “আপনারা কথাবার্তা বলুন, আমি বরং ঘন্টাখানেকের জন্য একটু বাইরে যাই।” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “আরে বসুন বসুন।” তারপর সামন্তর দিকে তাকিয়ে বললেন “নিশ্চিত থাকুন, কিরণবাবু তো দীর্ঘদিন ধরে আমার সঙ্গে রয়েছেন, ফাঁস করতে হলে ঢের-ঢের এক্সপ্লোসিভ ব্যাপার উনি ফাঁস করে দিতে পারতেন। তা যখন করেননি, তখন এটাও করবেন না।”
সামন্ত একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বললেন, “বাঁচালেন মশাই। ঠিক আছে, এবারে তা হলে বলুন যে, আপনি কী জানতে ঢান।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “লাশ পরীক্ষা করা হয়েছে?”
“সে তো কালই হয়েছে।”
“রিপোর্টটা পাওয়া গেছে নিশ্চয়?”
“হ্যাঁ, তাও পেয়েছি।” সামন্ত বললেন, “তবে গুপ্তসাহেব নিজেই যখন উপস্থিত রয়েছেন এখানে, তখন আমি আর এ-ব্যাপারে কিছু বলব না; যা বলবার উনিই বলুন।”
ডাক্তার গুপ্ত বললেন, “শরীরটা চিত হয়ে পড়ে ছিল। ওইভাবে পড়ে যাবার ফলে যদি মাথা ফেটে থাকে, তা হলে মাথার পিছন দিকটা ফাটত।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “এমন যদি হয় যে, লোকটা উপুড় হয়ে পড়ে মাথা ফাটিয়েছিল, কিন্তু পরে তার শরীরটাকে চিত করে দেওয়া হয়েছে।”
“সেক্ষেত্রে ফাটত মাথার সামনের দিক, অর্থাৎ কপালের দিক। কিন্তু এখানে দেখছি, মাথাটা সামনের দিকেও ফাটেনি, পিছনের দিকেও না। ফেটেছে একেবারে খুলির উপরের দিকটা। ওই যাঁকে আমরা চাঁদি বলি।”
এ-সব কথা কালই আমরা শুনছি। কৌশিকের কাছে ভাদুড়িমশাইও নিশ্চিত শুনে থাকবেন। তবু তিনি এমন ভাব দেখাচ্ছেন যেন কিছুই জানেন না। বললেন, “বটে? তা এ থেকে আপনার কী মনে হয়?”
একটাই মাত্র কথা মনে হয়। সেটা এই যে, উপর থেকে ভারী-কিছু মাথার উপরে পড়লে কিংবা উপর থেকে ভারী কিছু দিয়ে কেউ মাথার ওখানে আঘাত করলে তবেই মাথার ওই জায়গাটা ও-ভাবে ফাটতে পারে। তা ওখানে তো মাথার উপরে ফ্যান কিংবা ঝাড়লণ্ঠন ছিল না, তাই উপর থেকে অমন কিছু খসে পড়বারও প্রশ্ন এ-ক্ষেত্রে উঠছে না। তা হলে আর এটাকে দুর্ঘটনা বলে কি হঠাৎ পড়ে গিয়ে মাথা ফাটবার ব্যাপার বলে মেনে নিই কী করে? একটাই মাত্র সিদ্ধান্ত এ-ক্ষেত্রে করতে পারি, সেটা হল ইটস এ ক্লিয়ার কেস অভ্ মার্ডার।”
“সেটা কীভাবে করা হল বলে আপনার মনে হয়?”
“ভারী কিছু দিয়ে খুব জোরে ওর মাথায় আঘাত করা হয়েছিল। আঘাতটা কিন্তু একই লেভেলে সামনে কিংবা পিছনে দাঁড়িয়ে করা হয়নি, করা হয়েছিল একটু উপর থেকে। একই লেভেলে দাঁড়িয়ে যে সেটা করা যায় না, তা অবশ্য নয়। যাকে আঘাতটা করা হচ্ছে, তার চেয়ে যদি যে আঘাত করছে তার হাইট আরও অন্তত ফুটখানেক বেশি হয়, তো একই লেভেলে দাঁড়িয়েও সেটা করা যেতে পারে। কিন্তু তেমন কোনও সম্ভাবনাকেও এ-ক্ষেত্রে আমল দিতে পারছি না।”
“এ-কথা কেন বলছেন?”
ডাক্তার গুপ্ত বললেন, “এইজন্যে বলছি যে, যাকে খুন করা হয়েছে, তার হাইট পাক্কা ছ’ফুট। একই লেভেলে দাঁড়িয়ে তার মাথার ওই জায়গায় যদি আঘাত করতে হয় তো খুনির অন্তত সাত ফুট লম্বা হওয়া দরকার। তা ও-রকম লম্বা লোক আমেরিকান বাস্কেট-বল টিমে অনেক থাকতে পারে, আমাদের দেশে খুব বেশি খুঁজে পাওয়া যাবে না।”
কৌশিক বলল, “আমি একটা কথা বলতে পারি?”
ডাক্তার গুপ্ত বললেন, “নিশ্চয়, নিশ্চয়।”
কৌশিক বলল, “ওই যে আপনি এক ফুট ব্যবধানের কথা বলছেন, ওটা তো কৃত্রিমভাবেও তৈরি করে নেওয়া হতে পারে?”
ডাক্তার গুপ্ত বললেন, “একটু বুঝিয়ে বলো তো বাবা।”
কৌশিক বলল, “ধরুন একই লেভেলে দাঁড়িয়ে মাথার ওইখানটায় আঘাত করে আমি যদি কাউকে মারতে চাই, তো তার জন্যে আমাকে সত্যি-সত্যি তার চেয়ে আরও এক ফুট বেশি লম্বা হতে হবে কেন? সে যদি একটা চেয়ারে বসে থাকে, আর আমি থাকি দাঁড়িয়ে, তা হলেই তো আমাদের দুজনের দৈর্ঘ্য এক হওয়া সত্ত্বেও কি তার চেয়ে আমি ইঞ্চি কয়েক খাটো হওয়া সত্ত্বেও, কার্যত আমি তার চেয়ে অন্তত তখনকার মতো এক ফুট বেশি লম্বা হয়ে যাচ্ছি। কিংবা তাকে চেয়ারেই বা বসতে হবে কেন? সে নাহয় দাঁড়িয়েই থাক। কিন্তু সে-ক্ষেত্রে ওই এক ফুট আমি গেইন করতে পারব, যদি কিনা একটা টুলের উপরে দাঁড়িয়ে আমি তার মাথা ফাটাই।”
ডাক্তার গুপ্ত বললেন, “ওয়েল ইউ হ্যাভ এ পয়েন্ট দেয়ার। এ ভেরি গুড পয়েন্ট, ইনডিড। এদিক থেকে ব্যাপারটা আমাদের ভেবে দেখা উচিত ছিল।”
গঙ্গাধার স’মন্তকে একটু গম্ভীর দেখাচ্ছিল। তিনি বললেন, “আমি যে এটা একেবারেই ভেবে দেখিনি, তা কিন্তু নয়। কিন্তু চেয়ারে বসে থাকার কথাটা এখানে খাটছে না। অত রাত্তিরে একটা লোক ওখানে চেয়ারে বসে থাকবে কেন? আর টুলের উপরে দাঁড়িয়েই বা খুন করবার দরকার কী? সিঁড়ির দু’ধাপ উপরে দাঁড়িয়েই তো সেটা করা যায়। কী গুপ্তসাহেব, যায় না?”
ডাক্তার গুপ্ত বললেন, “যায় বই কী, নিশ্চয়ই যায়।”
সামন্ত বললেন, “খুনি আর তা হলে অনর্থক টুল নিয়ে টানাটানি করতে যাবে কেন?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “ঠিক আছে, আপাতত এটাকে আমি খুন বলেই ধরে নিচ্ছি। তা সেটা কখন হয়েছে বলে আপনাদের ধারণা?”
ডাক্তার গুপ্ত বললেন, “একেবারে একজ্যাক্ট সময় তো বলা সম্ভব নয়। লাশ পরীক্ষা করে মনে হচ্ছে, ঘটনাটা ঘটেছে মোটামুটি তিনটে নাগাদ। কিন্তু এ-সব ক্ষেত্রে একটু মার্জিন তো রাখতেই হয় আমাদের, তাই একেবারে নিশ্চিত হয়ে যা বলা সম্ভব, সেটা এই যে, ব্যাপারটা ঘটেছে রাত দুটো থেকে চারটের মধ্যে।
আমি বললুম, “আড়াইটের আগে ঘটেনি।”
সামন্ত বললেন, “এ-কথা আপনি বলছেন কেন?”
“এইজন্যে বলছি যে, নকুল সেদিন রাত একটা নাগাদ বাড়ি ফিরেছিল বটে, কিন্তু চেঁচামেচি করেছিল দুটো পর্যন্ত।”
“কী করে জানলেন? আপনি কি তখন জেগে ছিলেন নাকি?”
“আমি জেগে ছিলুম না, কিন্তু আমার মেয়ে জেগে ছিল। …না না, তার ইনসমনিয়া নেই, আসলে সামনেই তার বি.এ. ফাইনাল, তাই অন্তত রাত দুটো পর্যন্ত সে এখন লেখাপড়া করে। কখনও-কখনও আড়াইটেও বেজে যায়। তার ঘর একেবারে রাস্তার ধারেই। সেদিন সে ভেবেছিল যে, তিনটের আগে ঘুমোবে না। কিন্তু বাড়ি ফিরে নকুল সেদিন এমন হৈচৈ লাগিয়ে দিয়েছিল যে, আমার মেয়ের পড়াশুনো একেবারে মাথায় উঠে যায়। আলো নিবিয়ে সে শুয়ে পড়ে। তার আগে টেবিল-ক্লকে অ্যালার্মের কাঁটা ঘোরাতে গিয়ে দেখতে পেয়েছিল যে, রাত তখন দুটো পঁচিশ।”
সামন্ত বললেন, “এই ব্যাপারে দেখছি সদানন্দবাবুর কথার সঙ্গে আপনার মেয়ের কথাটা মোটামুটি ট্যালি করে যাচ্ছে।”
বললুম, “জানি। কাল সকালে আপনি এসে পৌঁছবার আগে সদানন্দবাবুও কথাটা আমাকে বলেছিলেন। পরে দেখলুম আপনার জেরার উত্তরেও উনি একই কথা বললেন। তা ছাড়া, আর-একটা কথাও বলেছেন উনি। সেটা এই যে, রাত তিনটে নাগাদ উনি একতলায় কোনও ভারী কিছু পড়ে যাবার শব্দ পান। কথাটা, যদ্দুর মনে করতে পারছি, আপনাকেও উনি বলেছেন। তাই না?”
সামন্ত তাঁর অ্যাটাচি-কেস খুলে একটা নোটবই বার করলেন। ওই যাতে স্টেনোবা ডিক্টেশান নিয়ে থাকেন, সেই রকমের ছোট-সাইজের খাতা আর কি। খুব দ্রুত তার কয়েকটা গাতা উল্টে গিয়ে এক-জায়গায় হঠাৎ থেমে গেলেন তিনি। সেখানে যা লেখা ছিল, তার উপরে চোখ বুলিয়ে নিলেন। তারপর বললেন, “হ্যাঁ,কথাটা তিনি আমাকেও বলছেন।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “একতলায় নকুল ছাড়া আর কে-কে থাকে যেন?”
বললুম, “নকুলের বউ যমুনা, মেয়ে কমলি আর যমুনার দাদা বিষ্টুচরণ থাকে।”
ভাদুড়িমশাই সামন্তের দিকে তাকিয়ে বললেন, “এই যে রাত তিনটে নাগাদ একতলায় কিছু একটা পড়ে যাবার শব্দ হয়েছিল…অন্তত হয়েছিল বলেই সদানন্দবাবু জানাচ্ছেন, এটা নিয়ে কি যমুনা আর তার দাদাকে কোনও প্রশ্ন করেছেন আপনি?”
সামন্ত বললেন, “স্পেসিফিক্যালি যে এইটে নিয়ে কোনও প্রশ্ন করেছি, তা নয়। তবে অন্য অনেক প্রশ্ন তো করেছি, যমুনা আর বিষ্টুচরণ তার উত্তরও দিয়েছে। সে-রাতে যা হয়েছিল, উত্তরগুলো থেকে মোটামুটি তা আন্দাজও করা যায়। মানে একটা ছবি তার থেকে বেরিয়ে আসে ঠিকই।”
“যমুনা কী বলছে? সব কথা বলবার দরকার নেই, জরুরি পয়েন্টগুলোই শুধু জানতে চাইছি।”
“যমুনা বলছে নকুলচন্দ্র রোজই দেরি করে ফিরত, সেদিনও দেরি করেই ফিরেছিল, তবে সেদিন তার ফিরতে-ফিরতে একটা বেজে গিয়েছিল কি না, তা সে বলতে পারবে না। ফিরে যে অনেকক্ষণ চেঁচামেচি করেছিল, তাও ঠিক। তার ভাত ঢাকা দেওয়া থাকে, কিন্তু সেদিন আর “ ভাত-টাত খায়নি। বেশ কিছুক্ষণ চেঁচামেচি করে ঘরে ঢুকে ঘুমিয়ে পড়েছিল।”
“ভাল কথা। তারপর?”
“এই পর্যন্ত যা বলা হল, তার মধ্যে কোনও গোলমাল নেই। গোলমাল ঘটছে তার স্টেটমেন্টের শেষ-দিককার অংশটা নিয়ে।”
“সেটা কী?”
সামন্ত একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “যমুনা বলছে, রোজই রাত তিনটে থেকে সাড়ে-তিনটের মধ্যে তার স্বামী একবার বাথরুমে যেত। তারপর বাথরুম থেকে ফিরে এসে আবার ঘুমিয়ে পড়ত। তবে কিনা বেশিক্ষণের জন্যে নয়। খানিকক্ষণ ঘুমিয়েই ফের উঠে পড়তে হত তাকে। খুচরো দোকানিয়া সাত-সকালে পাইকিরি দরে মাছ কিনতে আসত, সেইজন্যেই বেশিক্ষণ ঘুমিয়ে থাকা চলত না।”
কৌশিক বলল, “লোকটা রাত করে ফিরত আবার উঠেও পড়ত সকাল-সকাল। তা হলে ঘুমোত কখন?”
“যমুনা বলছে, রাত্তিরে তো সাধারণত ঘন্টা তিনেকের বেশি ঘুমোত না, তাই দুপুরবেলায় টানা আবার ঘন্টা কয়েক ঘুমিয়ে নিত।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা এর মধ্যে গোলমালটা ঘটছে কোথায়?”
সামন্ত বললেন, “সেদিনও রাত তিনটে নাগাদ লোকটা বাথরুমে গিয়েছিল কি না, যমুনা সেটা বলতে পারছে না।”
ডাক্তার গুপ্ত বললেন, “গিয়েছিল নিশ্চয়। খুনের সময় তো দুটো থেকে চারটের মধ্যে। তা সেইসময় ঘর থেকে ওকে টেনে বাইরে নিয়ে এসে তো আর কেউ খুন করেনি। আর খুনটা যে ঘরের মধ্যে করে তারপর শরীরটাকে বাইরে টেনে নিয়ে এসে সিঁড়ির তলায় ফেলে রাখা হয়নি, তাও তো ও-ঘরের বিছানাপত্র পরীক্ষা করেই বোঝা গিয়েছে। তা ছাড়া এটাও ভেবে দেখুন যে, ঘর থেকে ওকে টেনে নিয়ে গেলে কি ঘরের মধ্যেই খুন করে লাশটাকে টেনে বাইরে নিয়ে গেলে তো ওর বউই সেটা টের পেয়ে যেত। তা কিন্তু যমুনা টের পায়নি। ….না মশাই, নির্ঘাত ও তখন বাথরুমে গিয়েছিল। তারপর বেরিয়ে এসে খুন হয়।”
কৌশিক বলল, “বাথরুমে হয়তো ঢোকেইনি, সেখানে যাবার পথেই হয়তো খুন হয়েছে। তাও কিছু বিচিত্র নয়।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “যমুনা কী বলছে?”
সামন্ত বললেন, “যমুনা বলছে, রোজই তো বাথরুমে যেত। তবে সেদিনও গিয়েছিল কি না, তা সে জানে না। তার কারণ, রাত-দুপুরে নকুলের চিৎকার-চেঁচামেচিতে তার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু নকুল এসে ঘরে ঢুকে ঘুমিয়ে পড়বার পর সে নিজেও আবার ঘুমিয়ে পড়েছিল। ভোর-পাঁচটায় সদানন্দবাবুর চিৎকার শুনে সে জেগে ওঠে, তার আগে আর তার ঘুম ভাঙেনি।”
ডাক্তার গুপ্ত ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকালেন। বললেন, “আপনার কী মনে হয়? যমুনা যা বলছে সেটা সত্যি?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “সত্যি তো হতেই পারে, তবে মিথ্যে হওয়াও বিচিত্র নয়।”
“যমুনা কেন মিথ্যে কথা বলবে?”
“জেগে থাকলেও সে-কথা কবুল করা সম্ভব নয় বলেই বলবে। ধরুন নকুল সেদিনও তার অভ্যাসমতো রাত-তিনটে নাগাদ একবার বাথরুমে গিয়েছিল। ধরুন, যমুনা সেটা টেরও পেয়েছিল। তা আমরা এখন জেনে গেছি যে, নকুলের মৃত্যু ঘটেছিল মোটামুটি ওই সময়েই। তো যমুনা যদি স্বীকার করে যে, সে তখন জেগে ছিল, তা হলে প্রশ্ন উঠবে ওই সময়ে তার স্বামীর মাথা ফাটল, লোকটা মেঝের উপরে পড়ে যাবার ফলে শব্দও হল একটা, তা হলে জেগে থাকা সত্ত্বেও যমুনা কিছু টের পেল না কেন?
সামন্ত বললেন, “আমার ধারণা যমুনা মিথ্যে কথা বলেনি, সত্যি সে ঘুমিয়েই ছিল তখন, নইলে শব্দটা শুনে সে ছুটে আসত নিশ্চয়।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনার ধারণা সত্যি হলে কি তদন্তের কোনও সুবিধে হয়?”
“হয় বই কী,” সামন্ত বললেন, “ব্যাপারটাকে যে-ভাবে আমি রিকনস্ট্রাক্ট করেছি সেটা তা হলে জোর পায়।”
কৌশিক বলল, “কীভাবে রিকনস্ট্রাক্ট করেছেন, একটু বুঝিয়ে বলুন।”
১৪
সামন্ত বললেন, “নকুলচন্দ্র যে রোজই রাত তিনটে থেকে সাড়ে তিনটের মধ্যে বাথরুমে যেত, আমার ধারণা সদানন্দ সেটা জানতেন। গভীর রাত, কেউ কোথাও জেগে নেই, খুন করবার পক্ষে এর চেয়ে চমৎকার সময় আর কী হতে পারে। আমার বিশ্বাস, সদানন্দ এর মধ্যে ঠিক করে ফেলেছিলেন যে, অনেক চেষ্টা করেও নকুলকে যখন তাড়ানো যাচ্ছে না, তখন তাকে খুনই করবেন তিনি। সেইজন্যেই সেদিন মোটামুটি তিনটে নাগাদ তাঁর দোতলার ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ির পাশে দাঁড়িয়ে তিনি অপেক্ষা করতে থাকেন। একতলার ঘর থেকে নকুল বেরিয়ে এল। বাথরুমের মধ্যে আলো জ্বলে উঠল। সদানন্দও তাঁর লোহার বল বসানো লাঠিটা হাতে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিঃশব্দে কয়েক ধাপ নীচে নেমে এলেন। বাথরুমের আলো নিবিয়ে নকুল যখন সিঁড়ির পাশ দিয়ে তার ঘরের দিকে যাচ্ছে, ঠিক তখনই সদানন্দ তার মাথা ফাটিয়ে দেন। নকুল একটা চিৎকার করবারও সুযোগ পায়নি, মাথায় লাঠির বাড়ি পড়বার সঙ্গে-সঙ্গে সে মেঝের উপরে লুটিয়ে পড়ে।’
কৌশিক বলল, “কাট। এই দৃশ্যটা আবার নতুন করে টেক করতে হবে। কিন্তু তার আগে স্ক্রিপ্টের এই অংশটা একটু অন্যভাবে লেখা দরকার।”
সামন্ত বললেন, “তার মানে?”
কৌশিক বলল, “মানে আর কী, ব্যাপারটা একেবারে ফিল্মের স্ক্রিপ্টের মতো লাগছে। এইখানে যদি ‘ক্যাঅ্যাচ’ করে একটা দরজা খোলার সাউন্ড লাগিয়ে দেন, কি সদানন্দবাবু তার ঘর থেকে বেরিয়ে আসবার ঠিক আগেই যদি ক্যামেরা চার্জ করে দেখিয়ে দেন যে, একটা দেওয়াল ঘড়ির ছোট কাঁটাটা তিনটের ঘরে এসে পৌঁছেছে, তো সে ভারী জমাট ব্যাপার হবে।”
সামন্ত বললেন, “অর্থাৎ আমার থিয়োরিটা আপনার বিশ্বাসযোগ্য ঠেকছে না, কেমন?”
কৌশিক কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু ভাদুডিমশাই এমন কটমট করে তার দিকে তাকালেন যে, সে আর মুখ খুলল না।
ভাদুড়িমশাই তখন সামন্তের দিকে তাকিয়ে বললেন, “এ-সব ছেলে-ছোকরাদের বিশ্বাস-অবিশ্বাসে কিছু যায়-আসে না মিস্টার সামন্ত। আপনি যা বলছেন বলুন। নকুল তো মেঝের উপর লুটিয়ে পড়ল। তারপর?”
সামন্ত বললেন, “তারপর আর কী, যমুনা আর বিষ্টুচরণ যদি তখন জেগে থাকত, তা হলে মেঝের উপর নকুলের পড়ে যাবার শব্দ শুনেই তারা যে-যার ঘর থেকে ছুটে আসত নিশ্চয়। কিন্তু কপাল ভাল সদানন্দবাবুর। দুজনেই তখন ঘুমিয়ে ছিল। নকুলচন্দ্রের পড়ে যাবার শব্দ তারা শোনেনি, তাই ছুটেও আসেনি।”
“তারপর?”
“কাজ সমাধা করে সদানন্দ আবার নিঃশব্দে উপরে যান। উঠে গিয়ে বেশ-খানিকক্ষণ সেখানে কাটিয়ে তারপর রোজকার মতোই পাঁচটা বাজবার খানিক আগে আবার নীচে নেমে আসেন। চিৎকারটাও করে ওঠেন তখনই। এমন একটা ভাব দেখান, যেন ডেডবডিটা এই তিনি প্রথম দেখলেন। বুঝতেই পারছেন, সবটাই একেবারে প্ল্যান-মাফিক ব্যাপার।”
কৌশিক বলল, “কিন্তু সদানন্দবাবুর হাত থেকে লাঠি আর টর্চ তো পড়ে গিয়েছিল। ও-দুটো জিনিস কখন পড়ল, সেটাও ভেবে দেখা দরকার। বিশেষ করে লাঠিটা। তার কারণ, ওটাকেই আপনি মার্ডার-ওয়েপন বলে সন্দেহ করছেন।”
সাম বললেন, “সন্দেহ করবার কারণ নেই, তা তো নয়।”
আমি বললুম, “কিন্তু সদানন্দবাবু তো বলছেন, কুসুমবালা যমুনা আর বিষ্টুচরণের সামনেই ওই লাঠি আর টর্চ তাঁর হাত থেকে খসে পড়ে গিয়েছিল।”
সামন্ত বললেন, “যমুনা আর বিষ্টুচরণ কিন্তু সে-কথা বলছে না। তারা বলছে, চিৎকার শুনে তারা যখন বেরিয়ে আসে, তখনই তারা নকুলের ডেড-বড়ির পাশে টর্চ আর লাঠি পড়ে থাকতে দেখেছিল। কুসুমবালা অবশ্য সদানন্দের কথা সমর্থন করছেন। কিন্তু তিনি যে তাঁর স্বামীকে বাঁচাবার জন্যে সেটা করছেন না, এমন কথা কে বলবে।”
ভাদুড়িমশাই চুপ করে আছেন। তাঁর দিকে তাকিয়ে আমি বললুম, “আপনার ধারণাও কি তা-ই? অর্থাৎ স্বামীকে বাঁচাবার জন্যে কুসুমবালা মিথ্যে কথা বলছেন?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “সে তো হতেই পারে। স্বামীকে বাঁচাবার জন্যে স্ত্রী একটা মিথ্যে কথা বলবেন, এ তো খুবই স্বাভাবিক।”
আমি একেবারে নিবে গেলুম। দেখলুম সামন্তমশাই হাসছেন। বিজয়ীর হাসি। বললেন, “আপনি তা হলে আমার থিয়োরিটাই মেনে নিচ্ছেন তো?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “তাও কিন্তু মেনে নিচ্ছি না।”
এবারে সামন্তের নিবে যাবার পালা। বললেন, “কেন?”
“কী করে মেনে নেব?” ভাদুড়িমশাই বললেন, “একে তো ওই লাঠিটাই যে মার্ডার-ওয়েপন, এখনও সেটা নিশ্চিতভাবে আমরা জানতে পারিনি, তার উপরে আবার আপনার থিয়োরির মধ্যে অন্য একটা ফাঁক রয়েছে।
“একটু বুঝিয়ে বলবেন?”
“বলছি। ফাঁকটা ছোট, কিন্তু ভাইটাল।”
ভাদুড়িশাই আবার একটা সিগারেট ধরালেন। চুপচাপ ধোঁয়া ছাড়লেন কিছুক্ষণ। তারপর আধাআধি যখন খাওয়া হয়েছে, তখন সেটাকে অ্যাশট্রেতে পিষে দিয়ে বললেন, “মাত্র একটা কথাই আমরা নিশ্চিতভাবে জানি। সেটা এই যে, নকুলচন্দ্র মারা গিয়েছে মোটামুটি রাত তিনটের সময়। মাথায় আঘাত করা হয়েছিল, তাতেই তার মৃত্যু ঘটে। সে মেঝের উপর পড়ে যায়। পড়ে যাওয়ার ফলে একটা শব্দ হয়েছিল। শব্দ শুনে যমুনা আর বিষ্টুচরণ ছুটে আসতে পারত। কিন্তু আসেনি। কেন আসেনি? না শব্দটা শুনতেই পায়নি তারা। কেন শোনেনি? না যে-যার ঘরে তারা দুজনেই তখন ঘুমিয়ে ছিল। কিন্তু তারা না শুনলেও শব্দটা যে কেউই শোনেনি, তা কিন্তু নয়। সদানন্দবাবু শুনেছিলেন। নিজের থেকেই আপনাকে তিনি সেটা জানিয়েছেনও। তাই না?”
সামন্ত বললেন, “তা জানিয়েছেন বটে।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “সত্যি বলতে কী, তিনি এটা জানিয়েছেন বলেই আমি একটু ধাঁধায় পড়ে যাচ্ছি। ধরা যাক আপনি যা বলছেন, সেটাই ঠিক। অর্থাৎ সদানন্দবাবুই খুনি। তিনটের সময় নীচে নেমে এসে সিঁড়ির দু’ধাপ উপর থেকে তিনি নকুলচন্দ্রের মাথা ফাটিয়ে দেন। নকুলচন্দ্র মেঝেতে পড়ে যায়। শব্দ হয়। কিন্তু যমুনা আর বিষ্টুচরণ ছুটে আসে না। তাতেই সদানন্দবাবু বুঝে যান যে, তারা ঘুমিয়ে আছে। কিন্তু তা-ই যদি তিনি বুঝে গিয়ে থাকেন, তা হলে আর এমন কথা তিনি বলতে যাবেন কেন যে, দোতলা থেকে শব্দটা তিনি শুনেছিলেন? কেউ যখন শব্দটা শোনেনি, তখন তাঁরও তো ব্যাপারটা চেপে যাবার কথা। কিন্তু তিনি চাপলেন না। বললেন যে, শব্দটা শুনেছিলেন তিনি। অর্থাৎ প্রকারান্তরে স্বীকার করে বসলেন বাড়ির মধ্যে সবাই যখন অঘোরে ঘুমোচ্ছে, তখন একা তিনি জেগে ছিলেন। কখন জেগে ছিলেন? না, খুনটা যখন হচ্ছে, তখনই। এ যে আগ বাড়িয়ে ধরা দেবার ব্যাপার, এ তো সদানন্দবাবুরও না-বুঝবার কথা নয়। খুনি কি কখনও এ-ভাবে আগ বাড়িয়ে ধরা দেয়? না মশাই, তাঁকে যে খুনি হিসেবে সন্দেহ করা হতে পারে, এটা বুঝেও এই যে তিনি নিজে। থেকেই একটা ভাইটাল ইনফর্মেশন আপনাকে দিয়ে দিলেন, এতেই আমার একটু ধাঁধা লেগে যাচ্ছে। কী ানে হচ্ছে জানেন?”
“কী মনে হচ্ছে?”
“মনে হচ্ছে যে, ইউ আর বার্কিং আপ দি রং ট্রি।”
“অর্থাৎ আপনি বলতে চান যে, সদানন্দবাবু খুনি নন?”
“না, তাও আমি বলছি না। সদানন্দবাবুর মোটিভ ছিল, সুযোগও ছিল। সুতরাং তাঁকে তো আপনি সন্দেহ করতেই পারেন। কিন্তু আমার বলবার কথাটা এই যে, ও-দুটো জিনিস আর-কারও ছিল কি না, সেটাও আপনার খুব ভাল করে ভেবে দেখা উচিত। অস্ত্রবিদ্যা কে কেমন শিখেছে, তার পরীক্ষা দেবার সময় অর্জুন যেমন সব-কিছু বাদ দিয়ে শুধু পাখিটাকেই দেখছিলেন……ভুল বললুম, পাখিরও সবটা তিনি দেখছিলেন না, দেখছিলেন শুধু পাখির মুন্ডুটিকে, আপনিও তেমনি সবকিছু বাদ দিয়ে শুধু সদানন্দবাবুকেই দেখছেন। কিন্তু আপনি তো অর্জুন নন, আপনি পুলিশ অফিসার গঙ্গাধর সামন্ত। আপনার উচিত তাই চারদিকে নজর রাখা। … না না, সদানন্দকে সন্দেহ করে আপনি কিচ্ছু অন্যায় করেননি, তবে কিনা সন্দেহের জালটাকে এবারে আর-একটু ছড়িয়ে দিন।”
সামন্ত বললেন, “কথাটা আপনি ঠিকই বলেছেন, কিন্তু সন্দেহ করবার মতো আর-কাউকে তো এ-ক্ষেত্রে পাচ্ছি না। নকুলকে খুন করবার সুযোগ হয়তো যমুনারও ছিল, বিষ্টুচরণেরও ছিল। কিন্তু শুধু সুযোগ থাকাটাই যথেষ্ট নয়, একটা মোটিভও থাকা চাই। তা সেটা না ছিল যমুনার, না ছিল বিষ্টুচরণের।”
কৌশিক বলল, “কিরণমামার কাছে আজই দুপুরে শুনলুম যে, রাত দুপুরে বাড়ি ফিরে নকুল নাকি বউয়ের উপরে খুব চোটপাট করত।”
সামন্ত আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “এটা আপনি কোত্থেকে জানলেন কিরণবাবু?”
বললুম, “সদানন্দবাবুই বলেছেন। পাড়ার আর-পাঁচজনও যে ব্যাপারটা জানে না, তা নয়।”
কৌশিক বলল, “চোটপাট নাকি রোজই করত। তা মারধোরও কি মাঝে-মাঝে করত না?”
সামন্ত বললেন, “বাস, সেটাই অমনি খুন করবার মোটিভ হয়ে গেল? আর তা ছাড়া যেভাবে খুন করা হয়েছে তাতে মনে হয় না যে, এটা কোনও স্ত্রীলোকের কাজ।”
ডাক্তার গুপ্ত বললেন, “তা হলে বাকি রইল বিষ্টুচরণ। তার কোনও মোটিভ থাকা সম্ভব নয়?”
একগাল হেসে সামন্ত বললেন, “আদৌ সম্ভব নয়। আরে মশাই, যে-গোরু দুধ দিচ্ছে, তাকে সে কেন মারতে যাবে? বিষ্টুচরণ গরিবঘরের ছেলে, চাকরি-বাকরি জোটাতে পারেনি, ভগ্নিপতির কাছে আশ্রয় মিলেছে, তাই দু’বেলা দুমুঠো খেতে পাচ্ছে। নকুল যে মরল, এতে সেই আশ্রয়টাই তার ঘুচে গেল। না মশাই, ভগ্নিপতির মৃত্যুতে বিষ্টুচরণের কোনও স্বার্থসিদ্ধি হচ্ছে না, বরং সে বেঁচে থাকলেই তার লাভ ছিল।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “একেবারেই কি স্বার্থসিদ্ধি হচ্ছে না? যমুনা কি তার স্বামীর ব্যাবসা সামলাতে পারবে? আর কমলি তো নেহাতই শিশু। খোঁজ নিয়ে দেখুন, বোন আর ভাগ্নির অভিভাবক সেজে সে তার ভগ্নিপতির মাছের ব্যাবসাটা হাতাতে চায় কি না।”
গঙ্গাধর সামন্ত তাঁর দক্ষিণ হস্তের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠটিকে দুদিকে আন্দোলিত করে বললেন, “সে-গুড়েও বালি। ব্যাবসার জমা-খরচের আর অন্য সব কাগজ।এ আটক করেছি তো। তা সেখানে দেখছি জমার ঘরে ঢুটু। পুরোটাই ধারের কারবার আর সেই ধারের পরিমাণ হাজার পনরো তো হবেই। আসলে নকুলচন্দ্রের মেজাজ যে ইদানীং খিঁচড়ে ছিল, সেটা এইজন্যেই। দেনার দায়ে লোকটার মাথার চুল পর্যন্ত বিকিয়ে যাবার উপক্রম হয়েছিল। ও-ব্যাবসা কে হাতাতে যাবে?”
ভাদুড়িমশাই একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “মার্ডার-ওয়েপনের কোনও হদিশ হল?”
“পেয়েছি তো অনেক কিছুই। ইট, পাথর, নোড়া, হাতুড়ি, বাটখারা। অর্থাৎ কিনা যা দিয়ে মাথা ফাটানো যায়, এমন বিস্তর জিনিস। তার উপরে সদানন্দবাবুর ওই লাঠি তো আছেই। কালই সব পরীক্ষা করতে পাঠিয়ে দিয়েছি। মনে হয় আগামী কাল বিকেল নাগাদ রিপোর্ট পেয়ে যাব।”
“পেলে আমাকে জানাবেন, কেমন?”
“নিশ্চয় জানাব।”
গঙ্গাধর সামন্ত উঠে পড়লেন। ডাক্তার গুপ্তকে বললেন, “আপনি চলুন। আপনাকে আপনার বাসায় নামিয়ে দিয়ে আমি থানায় ফিরব।”
শ্যামনিবাস-রহস্য – ১৫
কুসুমবালার সঙ্গে কথা বলে আমাদের চেনা একজন উকিলকে আমি আগেই সব জানিয়ে রেখেছিলুম। সদানন্দবাবুর জামিনের ব্যাপার নিয়ে সোমবার সকালে তাঁর সঙ্গে কথা বলছি, এমন সময় কৌশিক এল। অবাক হয়ে বললুম, “কী ব্যাপার?”
কৌশিক বলল, “একবার থানায় যাব। কয়েকটি বিষয়ে মিস্টার সামন্তর সঙ্গে একটু আলোচনা করা দরকার। হাতে সময় ছিল, তাই ভাবলুম যে, আপনার সঙ্গে দেখা করে যাই। মামিমা, পারুল—ওরা সব ভাল আছে তো?”
“তা আছে। তবে এলেই যখন, ওদের সঙ্গে একটু কথা বলে যাবে না?”
“আজ আর বসব না। পরে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করে নেব।”
কৌশিক উঠে পড়ল।
জামিনের ব্যবস্থা করা গেল না। সরকারি উকিল বললেন, একে তো এটা খুনের ব্যাপার, তার উপরে আবার কী দিয়ে খুন করা হয়েছে, এখনও সেটা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি, পুলিশ তাই আশঙ্কা করছে যে, আসামিকে যদি এখনই জামিন দেওয়া হয়, তা হলে তদন্তের অসুবিধে হবে। এখনও যা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি, তেমন কিছু-কিছু সাক্ষ্যপ্রমাণ এর ফলে লোপাট হয়ে যাওয়াও বিচিত্র নয়।
আমাদের উকিল বললেন, সদানন্দবাবু একজন মানী ব্যক্তি, তদন্তের অছিলায় এইভাবে তাঁকে হাজতে আটকে রাখা উচিত হচ্ছে না। তা ছাড়া এটাও আদালতকে বিবেচনা করে দেখতে হবে যে, ঘটনাস্থলে চব্বিশ ঘন্টার জন্যে পুলিশ-পাহারার ব্যবস্থা করা হয়েছে, সুতরাং সেখান থেকে সাক্ষ্য- প্রমাণ লোপাট হবার কোনও আশঙ্কাই নেই।
হাকিম দু’পক্ষের কথা শুনলেন; তারপর রায় দিলেন, আসামিকে আপাতত আরও তিন দিন থানা-হাজতে রাখা যেতে পারে; তবে আদালত আশা করছে যে, পুলিশের তরফে বুধবারের মধ্যেই তদন্তের কাজ শেষ করা হবে, তারপরে আর তাঁরা জামিন দেবার ব্যাপারে কোনও আপত্তি তুলবেন না। সদানন্দবাবুর বয়সের উল্লেখও করলেন তিনি; বললেন যে, এই বয়সের একজন বৃদ্ধকে যে দীর্ঘকালের জন্য হাজতে আটকে রাখা চলে না, তাতে যে তাঁর স্বাস্থ্যভঙ্গ হতে পারে, পুলিশের সে-কথা উপলব্ধি করা উচিত।
দেবনারায়ণ ঘোষ মশাই আমাদের উকিল। দুপুর দুটো নাগাদ আমার অফিসে ফোন করে তিনি এই খবর দিলেন। সব শুনে বললুম, “বেস্পতিবার জামিনের ব্যবস্থা হবে তো?”
“তা হবে।” ঘোষমশাই বললেন, “আজ হল না ঠিকই, তবে রায় শুনে মনে হয়, সেদিন আর কোনও অসুবিধে হবে না। আসামির বয়েস যে সত্তর, সেটা একটা মস্ত ফ্যাক্টর।”
‘আসামি’ শব্দটা খট্ করে কানে বাজল। বললুম, “শনির থেকে বুধ। শুনলে মনে হয় মোটে তো পাঁচটা দিন। তা এই বয়সে পাঁচ-পাঁচটা দিনও তো কম নয়। তার উপরে আবার যা গরম পড়েছে।”
“কী আর করা যাবে বলুন! সবই কপালের ভোগ।”“
ফোন নামিয়ে রাখলুম। তারপরেই মনে হল, কৌশিকের সঙ্গে গঙ্গাধর সামন্তর কী সব কথা হল, সেটা জানা দরকার। টেলিফোন অপারেটরকে মালতীদের বাড়ির ফোন নম্বরটা দিয়ে বললুম, “নম্বরটা একটু ডেকে দাও তো।”
ফোন মালতীই ধরেছিল। বললুম, “আমি কিয়দা। দাদা বাড়িতে আছেন?”
“তা আছে।”
“তাঁর সঙ্গে একটু কথা বলব। ঘুমুচ্ছেন না তো?”
“রাত্তিরেই দাদা ঘুমোয় না, তা দুপুরবেলায়। ধরুন, ডেকে দিচ্ছি।”
সেকেন্ড পাঁচেক বাদেই ভাদুড়িমশাইয়ের গলা ভেসে এলে। “কী খবর?”
“খবর তো কৌশিকের কাছে। গঙ্গাধর সামন্ত ওকে কী বললেন?”
“পরে বলব। আপাতত জেনে রাখুন, সামন্ত মোটেই খারাপ লোক নয়। একটু একবগ্গা ঠিকই, নাক-বরাবর যা চোখে পড়ে, তা ছাড়া আর অন্য-কিছু দেখতে পায় না। বাট সার্টেনলি নট ওয়ান অভ্ দোজ কনসিটেড অফিসারস। কোথায় ভুল হচ্ছে সেটা ধরিয়ে দিলে মেনেও নেয়। কৌশিকের সঙ্গে তো এখন পুরোপুরি কো-অপারেট করছে।”
“কৌশিক বাড়িতে আছে?”
“তাই থাকে কখনও? থানা থেকে একটা নাগাদ ফিরেছিল, তার আধঘন্টার মধ্যেই আবার গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেছে। মারুতি নিয়েই বেরুচ্ছিল, তা আমি বললুম, গরমে একেবারে সেদ্ধ হয়ে যাবি, বরং তোর বাবার অ্যাম্বাসাডরটা নিয়ে যা।”
“কোথায় গেল?”
“বাগনান আর কোলাঘাট, দু’জায়গাতেই যাবে।”
“ওখানে আবার কী?”
“বাগনানের কাছেই যমুনার বাপের বাড়ি, আর নকুলদের বাড়ি হল কোলাঘাট থেকে মাইল কয়েক পশ্চিমে একটা গ্রামে। ব্যাপারটা বুঝলেন তো?”
“কিছুই বুঝলুম না।”
“যমুনা আর নকুলের আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে কৌশিক একটু কথা বলতে চায়।”
“ফিরবে কবে?”
“ফিরবে তো বলল কাল বিকেল নাগাদ। কিংবা তা যদি না পারে তো পরশু দুপুরে। চিন্তা করবেন না, ও ঠিক-পথ ধরেই এগোচ্ছে।”
বললুম, “আমি কি আপনার ওখানে একবার যাব?”
ভাদুড়িমশাই সেকেন্ড তিন-চার চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “আজ তো সোমবার। মঙ্গল আর বুধ, দুটো দিন আমাকে একটু ভাবতে দিন। আপনি একেবারে বেস্পতিবার বিকেলে আসুন। মনে তো হয় তখন কিছু খবর দিতে পারব।”
ফোন নামিয়ে রাখলুম।
মঙ্গল আর বুধ, দুটো দিন যেন কাটতেই চাইছিল না। অফিস করলুম যথারীতি, কিন্তু কাজকর্ম যে বিশেষ করতে পারা গেল, তা নয়। শুধু অফিসের কাজ বলে কথা কী, কোনও কাজেই যেন ঠিক মন বসাতে পারছিলুম না। বাসন্তী সেটা বুঝতে পেরেছিল, দু একবার প্রশ্নও করে ইল তা নিয়ে, কিন্তু স্পষ্ট কোনও জবাব না-পেয়ে আর-কিছু বলেনি। আমার শরীরটাও দু-একদিন ধরে একটু অবসন্ন লাগছিল! বুধবার সকালে টেলিফোন করে ডাক্তার চাকলাদারকে সে-কথা জানাতে তিনি বললেন, “আজ বিকেলে একটু তাড়াতাড়ি অফিস থেকে ফিরতে পারবেন?”
“তা কেন পারব না?”
“ঠিক আছে, তা হলে ছ’টা নাগাদ আমার চেম্বারে চলে আসুন। ব্লাড শুগার বেড়ে যায়নি তো?”
“না মশাই, ও-সব ঝঞ্ঝাট আমার নেই।”
“তা হলে হয়তো প্রেশার বেড়েছে। চলে আসুন, দেখে দেব অখন। তা ছাড়া আমারও দু-একটা কথা বলবার আছে আপনাকে।”
“কী কথা?”
“আসুন, তখন বলব।”
চাকলাদার ফোন নামিয়ে রাখলেন।
অফিস থেকে ফিরতে-ফিরতেই পাঁচটা চল্লিশ। জামা-কাপড় আর পালটানো হল না। মুখ-হাত ধুয়ে, কোনওক্রমে এক কাপ চা খেয়ে, পাশের গলিতে চাকলাদারের চেম্বারে যখন পৌঁছলুম, তখন ছ’টা পাঁচ।
প্রেশার দেখে চাকলাদার বললেন, “ঠিকই আছে। মনে হচ্ছে এগ্জারশানের ব্যাপার। দু’দিন একটু বিশ্রাম নিন, সব ঠিক হয়ে যাবে।”
বললুম, “বিশ্রাম তো নিতেই পারতুম, কিন্তু এখন কী করে নিই বলুন তো। সদানন্দবাবুর ব্যাপারটার ফয়সলা হোক, তারপর নেওয়া যাবে।”
চাকলাদার বললেন, “আমি যা বলতে চাই, তাও কিন্তু ওই পাঁচ-নম্বর বাড়ির ব্যাপারেই।”
ভদ্রলোককে বড় গম্ভীর দেখাচ্ছিল। হাসিখুশি, বন্ধুবৎসল মানুষ; শুনেছি ছ’টা সাড়ে ছ’টা নাগাদ তাঁর চেম্বারে রোজই কিছু-না-কিছু বন্ধুবান্ধব আসেন, আড্ডা চলে আটটা-ন’টা পর্যন্ত। আজ কাউকে দেখা গেল না। বললুম, “ কী ব্যাপার বলুন তো? কাউকে দেখছি না কেন?”
“আমিই ফোন করে সবাইকে আসতে বারণ করে দিয়েছি। বলেছি, শরীরটা ভাল যাচ্ছে না, চেম্বারে না-বসে আজ একটু বিশ্রাম নেব।”
“শরীর সত্যি খারাপ নাকি?”
“না না, ও-সব কিছু নয়। আসলে আপনাকে এমন দু-একটা কথা বলতে চাই, অন্যদের যা না-শোনাই ভাল।”
“কী কথা?”
ডাক্তার চাকলাদার একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন। মুখ নিচু করে কী যেন ভাবলেন। তারপর মুখ তুলে বললেন, “এখুনি আমি বিস্তারিতভাবে কিছু বলব না, বলা উচিতও নয়। আমি ডাক্তার–মানুষ, এমন কিছু করা বা বলা আমার ঠিক হবে না, যা কিনা আমাদের পেশায় আন্-এথিক্যাল বলে গণ্য হয়ে থাকে। শুধু একটা কথা বলি। আপনি তো সদানন্দবাবুর বাড়ির একেবারে সামনেই থাকেন, আপনি একটু মিসেস বসুর উপরে নজর রাখুন।”
“সদানন্দবাবুর স্ত্রীর উপরে? কেন?”
“আর-কিছু জিজ্ঞেস করবেন না, প্লিজ। শুধু যা বললুম, দয়া করে সেটা মনে রাখবেন।… মানে, আপনারা একটু সতর্ক থাকুন। হ্যাঁ, আপনারা সবাই। আমার ধারণা, কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে।”
চাকলাদারের কথাবার্তা আমার কানে কেমন যেন অসংলগ্ন ঠেকছিল। মনে হল, ভদ্রলোকের শরীর সত্যি ভাল যাচ্ছে না। বিশ্রাম সম্ভবত ওঁরই সবচেয়ে বেশি দরকার।
চলে আসবার আগে একবার জিজ্ঞেস করেছিলুম, “কী হয়েছে, একটু খুলে বলুন তো মশাই।”
কিন্তু চাকলাদার আর একটি কথাও বললেন না।
.
চাকলাদার বলেছিলেন, কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। তা কিছু-একটা যে সেই রাত্রেই ঘটবে, তখন তা আমি কল্পনাও করিনি। খবর পাওয়া গেল ভোরবেলায়। না, আমাদের জন্যে তো ভদ্রলাক বড় উদ্বিগ্ন ছিলেন, আমাদের গলিতে কিন্তু কারও কিছু হয়নি, ক্ষতি যা হবার তা চাকলাদারেরই হয়ছে। তাঁর চেম্বারের জানলা ভেঙে মাঝরাত্তিরে চোর ঢুকেছিল। চেম্বারে তো বিশেষ-কিছু থাকবার কথা নয়, ছিলও না, তাই চোরও বিশেষ কিছু হাতিয়ে নিতে পারেনি। আমরা গিয়ে দেখলুম, চেম্বারের ঘরের মেঝের উপরে একরাশ কাগজপত্র ছত্রাকার হয়ে পড়ে আছে। পুলিশ এসেছে। ডাক্তার চাকলাদার তাদের সঙ্গে কথা বলছেন। আমাকে দেখে বললেন, “চলে যাবেন না, একটু বসুন, কথা আছে।”
পুলিশ চলে যেতে-যেতে আটটা বাজল। চাকলাদার আমাকে ভিতরের দিকের একটা ঘরে নিয়ে গেলেন। কাজের লোকটি এসে দু’কাপ চা দিয়ে গেল সেখানে। চাকলাদার বললেন, “খান।”
আমি বললুম, “আজকাল আর আমি এই রকমের চা নাই না, সদানন্দবাবুর পরামর্শমতো স্রেফ হাল্কা লিকার খাই।”
চাকলাদার বললেন, “তা হলে ওটা খাবেন না, পালটে দিতে বলছি।”
বললুম, “আরে দূর মশাই, আমি কি সদানন্দবাবুর মতো অত নিয়ম মানি? এটাই খেয়ে নিচ্ছি, পালটাতে হবে না। …কথাটা কী সেইটে এবারে বলুন তো?”
“ও, হ্যাঁ।” চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিয়ে ডাক্তার চাকলাদার বললেন, “আপনার কাছে মিঃ ভাদুড়ির কথা অনেক শুনেছি। তা সেদিন তো আপনারা বলছিলেন যে, তিনি এখন কলকাতায়। তাই না?”
বললুম, “হ্যাঁ। কেন বলুন তো?”
“শিগগিরই কি তাঁর কাছে আপনি যাবেন?”
“রবিবারে গিয়েছিলুম। আজ তো বেস্পতিবার, আজ বিকেলেও একবার যাব।”
“আজ অফিসে যাবেন না?”
“না। সদানন্দবাবুর জামিনের ব্যাপারটা আজ আবার উঠবে। মনে হচ্ছে আজ ওটা পেয়েও যাবেন উনি।”
“আপনি কি আদালতে যাবেন?”
“না না,” আমি বললুম, “আমার যাবার কিছু দরকার নেই। ভাল ল-ইয়ার দিয়েছি, যা করবার তিনিই করবেন। আমি বাড়িতেই থাকব। কেন থাকব, জানেন?”
“কেন?”
“হাজত থেকে উনি ফেরবার সঙ্গে-সঙ্গেই ওঁর সঙ্গে গিয়ে দেখা করব। যাতে না ওঁর মনে হয় যে, পুলিশে ধরেছিল বলে আমরা ওঁকে অদ্ভুত ভাবছি, ওঁকে এড়িয়ে যাচ্ছি।”
“সে তো ভালই।” চাকলাদার বললেন, “তা হলে মিঃ ভাদুড়ির ওখানে কখন যাচ্ছেন?”
“পাঁচটা নাগাদ বেরিয়ে পড়ব, তার আগে তো রোদ্দুরে সব তেতে থাকে।”
“আমিও আপনার সঙ্গে যাব তখন। ওঁর সঙ্গে আমার একবার দেখা করা দরকার।”
বললুম, “আপনি ওঁকে কিছু বলতে চান?”
“হ্যাঁ, একটা কথা ওঁকে জানাতে চাই আমি। না-জানানো পর্যন্ত আমি শান্তি পাচ্ছি না।”
“বেশ তো, যাবেন। পাঁচটা নাগাদ আপনার এখানে চলে আসব আমি, তারপরে দু’জনে মিলে বেরিয়ে পড়ব।”
চাকলাদারের বাড়ি থেকে বেরিয়েই বড়রাস্তা। দু’পা এগিয়ে বাঁদিকে মোড় নিয়ে পীতাম্বর চৌধুরি লেনে ঢুকলুম। দেখলুম, একটা থলে হাতে বিষ্টুচরণ বাজার করতে যাচ্ছে। কাপড়টা নোংরা, হাফ-হাতা শার্টটাও কাঁধের কাছে ছিঁড়ে গেছে। দেখে মায়া হল। ভগ্নিপতির আশ্রয়ে দু’বেলা দু’মুঠো খেতে পাচ্ছিল, এবারে মুশকিলে পড়বে।
১৬
বাড়ি ফিরে শুনলুম, ভাদুড়িমশাই ফোন করেছিলেন। একটু বাদে আবার করবেন। ঠিক ন’টায় ফোন বাজল। রিসিভার তুলে ‘হ্যালো’ বলতেই ও-দিক থেকে প্রশ্ন ভেসে এলে, “আজ বিকেলে আসছেন তো?”
“তা যাচ্ছি। কৌশিক ফিরেছে?”
“পরশু ফিরতে পারেনি, কালও দুপুরে ফেরা হল না, ফিরেছে কাল রাত্তিরে। অনেক খবর। বিকেলে আসুন, তখন বলব। আজ অফিসে যাচ্ছেন?”
“না, ছুটি নিয়েছি।”
“শরীর খারাপ?”
“না,” হেসে বললুম “সদানন্দবাবু আজ জামিন পাচ্ছেন। তাঁকে রিসিভ করতে হবে তো।”
“অর্থাৎ আপনি ধরেই নিয়েছেন যে, তিনি নির্দোষ। তাই না?”
বললুম, “ভাদুড়িমশাই, আমার কাছে এটা দোষ-গুণ বিচারের প্রশ্ন নয়, বিপদের মেয়ে বন্ধুর পাশে দাঁড়াবার প্রশ্ন। তা আপনি খুব ভালই জানেন যে, আই অলওয়েজ স্ট্যান্ড বাই মাই ফ্রেন্ডস।”
“জানি বলেই তো কৌশিককে পাঠিয়ে দিয়েছিলুম। কিন্তু সে-কথা থাক। দুগুরটা যখন হাতে রয়েছে, তখন একটা কাজ করুন দেখি।”
“কী কাজ?”
“বলছি। গত শনিবার সকালে চিৎকারটা শুনেই আপনি ও-বাড়িতে ছুটে গিয়েছিলেন। তাই না? “
“হ্যাঁ, তা প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই গিয়েছিলুম।”
“গিয়ে যা দেখেছিলেন…মানে কে কোথায় দাঁড়িয়ে কিংবা বসে ছিল, কে কী বলছিল কিংবা করছিল, ডিটেলসে সব লিখে ফেলুন। মানে ওই যাকে অকুস্থল বলা হয় আর কি, তার একেবারে হুবহু একটা রিপোর্ট আমি চাইছি। কিচ্ছু বাদ দেবেন না।”
“পারব কি?”
“খুব পারবেন। আপনার মেমারি যে সব কিছুকেই ধরে রাখে, তার পরিচয় আমি আগেও পেয়েছি। নইলে কি আপনার রিপোর্টটার উপরেই সবচেয়ে জোর দিতুম?”
“তার মানে? আরও কাউকে-কাউকে এটা লিখতে বলেছেন নাকি?”
“আরও তিনজনকে বলেছি। গঙ্গাধর সামন্ত, ডাক্তার গুপ্ত আর কৌশিক। সো, কিরণবাবু, ইউ আর ইন গুড কম্প্যানি। কৌশিক তো ব্রেকফাস্ট করেই খাতা-কলম নিয়ে লিখতে বসে গেছে। …তা হলে ছেড়ে দিই?”
“দাঁড়ান, দাঁড়ান, একটা কথা আপনাকে জিজ্ঞেস করা হয়নি।”
“কী কথা?”
“বিকেলে এক ভদ্রলোক আমার সঙ্গে আপনার ওখানে যেতে চান। নিয়ে যাব?”
“ভদ্রলোকটি কে?”
“ডাক্তার চাকলাদার। বলছেন যে, আপনাকে কিছু জানাতে চান।… পাড়ার ডাক্তারবাবু তো, খবরটা তাই ওঁকেই আগে দিয়েছিলুম।”
“আই সি। উনি তা হলে ঘটনাস্থলে ছিলেন?”
“তা তো ছিলেনই। কৌশিক ওঁকে দেখেওছে ওখানে।”
“আমাকে উনি কী জানাতে চান? …এনি আইডিয়া?”
“না, মশাই, কিছু আমার জানা নেই। শুধু বললেন যে, আপনাকে একটা কথা না-বলা পর্যন্ত ওঁর শান্তি হচ্ছে না।”
“ঠিক আছে,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “ওঁকে নিয়ে আসুন।”
লাইন কেটে গেল। রিসিভার ক্রেড্লে নামিয়ে রাখা হয়েছে।
.
কয়েকটা দিন হাজতবাসের ফলেই যে একটা লোকের চেহারা আর চরিত্র কতটা পালটে যেতে পারে, সদানন্দবাবুকে না-দেখলে সেটা বিশ্বাস করা শক্ত হত। এ কাকে দেবনারায়ণবাবু জামিনে ছাড়িয়ে আনলেন? বাড়িতে ফিরে এসেছেন, চারটে নাগাদ এই খবর পেয়ে, বাসন্তীকে নিয়ে পাঁচ-নম্বরের দোতলায় উঠে ‘কেমন আছেন সদানন্দবাবু’ বলে যাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়ালুম, আমাদের চেনা সদানন্দবাবুর সঙ্গে তাঁর আকাশ-পাতাল ফারাক। শুকনো মুখ, চোখের কোলে কালি, মাথার প্রায় সবটাই সাদা, মুখ নিচু করে যে মানুষটি বসে আছেন, বলতে গেলে তাঁকে আমরা চিনিই না। দেখে ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল। একই সঙ্গে বুঝতে পারছিলুম যে, তাঁর ব্যক্তিত্ব একটা মারাত্মক রকমের ঝাঁকুনি খেয়েছে, এটা সামলে উঠতে তাঁর সময় লাগবে। তা ছাড়া, জামিন পেয়েছেন বটে, কিন্তু রোজ একবার থানায় গিয়ে হাজিরা দিয়ে আসতে হবে।
মিনিট পনেরো ওখানে থেকে আমি বেরিয়ে এলুম। আসবার সময় নমস্কার করে বললুম, “আজ আসি, পরে আসব।” সদানন্দবাবু তাতে প্রতি-নমস্কার তো করলেনই না, একটু হাসলেন না পর্যন্ত। ফ্যালফ্যাল করে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
বাসন্তী বসে ছিল তার কুসুমদির পাশে। আমাকে উঠতে দেখে সেও উঠে পড়ল। বলল, “সন্ধের দিকে আবার আসব কুসুমদি।”
বাড়িতে ফিরে এসে বাসন্তী বলল, “উঃ, কেমন যেন দম আটকে যাচ্ছিল আমার।”
বললুম, “সে তো আমারও। কিন্তু তবু যেতে হবে। আগে তো তুমি রোজই যেতে, আমি যেতুম না। এখন থেকে আমিও রোজ যাব। কেন যাব, সেটা তুমি বুঝতেই পারছ।”
বাসন্তী বলল, “সে তো পারছিই। এখন না-গেলে কুসুমদি ভুল বুঝবেন। তা ছাড়া, দেখলে তো, এক শম্ভুবাবুর স্ত্রী ছাড়া আর কেউ ও-বাড়িতে যায়নি।”
বললুম, “সে তো দেখলুমই। তবে শম্ভুবাবু যাবেন। ভদ্রলোক অফিস থেকে এখনও ফেরেননি। ফিরে একবার যাবেন নিশ্চয়। নাও, এবারে চা করো, চা খেয়ে আমি বেরিয়ে পড়ব। দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
চা খেয়ে চাকলাদারের কাছে যেতে-যেতে পাঁচটা দশ বাজল। ভদ্রলোক তৈরি হয়েই বসে ছিলেন। আমাকে দেখে বললেন, “গ্যারাজ থেকে আমার মরিস-মাইনরটা এইমাত্র মেরামত হয়ে ফিরল। চলুন, ওটাতেই যাওয়া যাক। কেমন সারিয়েছে, সেটা বুঝতে পারা যাবে। চা খেয়ে বেরিয়েছেন তো?”
“তাতেই তো দেরি হয়ে গেল। গ্যাস ফুরিয়েছে, কেরোসিন নেই, তাই কাগজ পুড়িয়ে চা বানাতে হল, মশাই। ডবল সিলিন্ডার করে কী যে লাভ হল বুঝি না। যা দেখছি, ফের সেই ঘুঁটে-কয়লার ব্যবস্থা করতে হবে।”
চাকলাদার হাসলেন। বললেন, “তা যা বলেছেন, চলুন বেরিয়ে পড়ি।”
যতীন দাস রোডে মালতীদের বাড়িতে পৌঁছতে পৌঁছতে সওয়া ছ’টা বাজল। উপরে উঠে দেখি, বসবার ঘরে আসর একেবারে জমজমাট। গঙ্গাধর সামন্ত এসে গেছেন। বাকি শুধু ডাক্তার গুপ্ত। সামন্ত বললেন, “তিনিও এসে পড়বেন এবারে।”
বলতে-না-বলতেই ডাক্তার গুপ্ত এসে গেলেন। ঘরে ঢুকে হাত থেকে স্টেথোসকোপটা নামিয়ে রেখে একটা সোফায় বসতে-বসতে বললেন, “খুব দেরি হয়নি তো?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “আরে না। …তা হলে সামন্তমশাই, শুরু করা যাক, কেমন? নকুলের ব্যাবসার কাগজপত্র যা সিজ করেছেন, সবই নিয়ে এসেছেন তো?”
কৌশিক বলল, “কাগজপত্র তো বেশি নয়, খান তিনেক জমা-খরচের খাতা, আর কিছু রসিদ। সবই উনি এনেছেন। আমার ঘরে রেখে দিয়েছি। এতক্ষণ তো তারই উপরে চোখ বুলোচ্ছিলুম। এখানে নিয়ে আসব?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “এখন আনবার দরকার নেই। যখন দরকার হয়, বলব।”
সামন্ত বললেন, “সবই কিন্তু আজই আমি ফেরত নিয়ে যাব।”
“বেশ তো, নিয়ে যাবেন, একটা কুটোও আমি এখানে আটকে রাখব না। কিন্তু আগের কথাটা আগে হোক। যা-যা আটক করেছেন, তার মধ্যে মার্ডার-ওয়েপন বলে কোন্টা সাব্যস্ত হল?”
সামন্তমশাই একেবারে নিবে গেলেন। বললেন, “কোনওটাই না।”
কৌশিক বলল, “লাঠি দিয়ে যে মাথা ফাটানো হয়নি, সে তো আমি আগেই বুঝেছিলুম।”
গঙ্গাধর সামন্ত বললেন, “কী করে বুঝলেন?”
কৌশিক বলল, “বা রে, লাঠিটার এখানে-ওখানে রক্ত লেগে ছিল ঠিকই, কিন্তু যে-জায়গাটা দিয়ে মারলে মাথা ফাটানো সম্ভব, সেই লোহার বলটার গায়ে এক ছিটেও রক্ত ছিল না। সেটা আমি শনিবার সকালেই লক্ষ করেছিলুম। আমার শুধু ভয় ছিল যে, অসাবধানে নাড়াচাড়া করার ফলে ওই লোহার বলেও না রক্ত লেগে যায়। তা আপনি সাবধানে ওটা হ্যান্ডল করেছেন, তাই রক্তও লাগেনি।”
গঙ্গাধর সামন্ত বললেন, “লাঠিটাকে আমি মার্ডার-ওয়েপন বলে সন্দেহ করেছিলুম ঠিকই, কিন্তু তাই বলে অসাবধান হব কেন? কোনওভাবে যাতে কোনও ট্যাম্পারিং না হয়, সেদিকে আমি কড়া নজর রাখি। দোষীর শাস্তি হোক, এটা আমি চাই নিশ্চয়ই। কিন্তু আমি সন্দেহ করছি বলেই একটা লোক দোষী, আর আমারই ভুলে কিংবা অসাবধানতায় তার ফাঁসি হয়ে যাবে, এটা নিশ্চয়ই চাই না।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “মারণাস্ত্র হিসেবে ওই লাঠিটা ছাড়া আর কী কী যেন আটক করা হয়েছিল ও-বাড়ি থেকে?”
গঙ্গাধর সামন্ত বললেন, “তার লিস্টি আমি মিঃ সান্যালকে দিয়েছি। আটক তো করেছিলুম অনেক-কিছুই। ইট, পাথর, নোড়া, হাতুড়ি, বাটখারা, রেঞ্চ, বিস্তর জিনিস।”
“অন্যগুলো কী কাজে লাগে, সে তো বুঝতে পারছি। বাটখারা দিয়ে কী হত?”
“বাটখারা যেমন একতলা থেকে অনেকগুলো পেয়েছি, তেমনি অন্তত একটা পেয়েছি দোতলা থেকেও। একতলায় এত বাটখারা কেন জিজ্ঞেস করেছিলুম। তা বিষ্টুচরণ বলল, ওগুলো মাছ ওজন করার কাজে লাগে।”
“লাগতেই পারে।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “মাছের ব্যাবসা, বাড়িতেই খুচরো দোকানিদের মাছ বিক্রি করা হত, তা বাটখারা তো লাগবেই। কিন্তু সদানন্দবাবুর তো কোনও ব্যাবসা ছিল না, তাঁর বাটখারা কী কাজে লাগত?”
আমি বললুম “সদানন্দবাবু কী ব্যাখ্যা দিয়েছেন আমি জানি না, তবে কেন যে তিনি বাটখারা রাখতেন সেটা জানি। আসলে আমরা সকলেই পুরনো খবরের কাগজ কি অকেজো শিশিবোতল বিক্রি করি তো, তা ও-সব যারা কেনে, তাদের বাটখারাকে সদানন্দবাবু বিশ্বাস করতেন না। বলতেন, ‘ওরা ডাকাত মশাই, ডাকাত। যেটাকে ওরা এক কিলোর বাটখারা বলে চালায়, তার ওজন অন্তত বারো শো গ্রাম।’ নিজের বাটখারা ছাড়া তিনি তাই ও-সব জিনিস বিক্রি করতেন না। আমাকেও একটা বাটখারা কিনতে বলেছিলেন।”
ডাক্তার গুপ্ত হেসে উঠলেন। বললেন, “ওরব্বাবা, এ তো দেখছি ভীষণ হিসেবি লোক, এ-সব তো আমাদের মাথাতেই আসে না!”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “যাক, যে-সব জিনিস আটক করেছিলেন, তার একটাও তা হলে পরীক্ষায় ওতরায়নি, কেমন?”
গঙ্গাধর বললেন, “একটাও না। ছাতে যে জলের ট্যাঙ্ক রয়েছে, সেটার মধ্যেও লোক নামিয়েছিলুম। বাড়ির সামনে যে কর্পোরেশনের ডাস্টবিন রয়েছে, সেটাকেও হাঁটকে দেখতে ছাড়িনি। কিন্তু না, কিচ্ছু পাওয়া গেল না। মার্ডার-ওয়েপনটা একটা মিস্ত্রিই রয়ে গেল।”
আমি বললুম, “তা তো হল, আপনি যে রিপোর্টটা দিতে বলেছিলেন, সেটা আমি লিখে এনেছি।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “কৌশিকের রিপোর্টও লেখা হয়ে গেছে। সামন্ত মশাই, আপনি?”
“আমিও লিখে ফেলেছি।”
ভাদুড়িমশাই আমাদের তিনজনের লেখা তিনটে রিপোর্ট নিয়ে সেন্টার-টেবিলের উপরে একটা পেপার ওয়েট চাপা দিয়ে রাখলেন। তারপর ডাক্তার গুপ্তের দিকে হাত বাড়িয়ে বললেন, “আপনারটাও দিয়ে দিন।”
ডাক্তার গুপ্ত কাঁচুমাচু মুখে বললেন, “ইয়ে…আমারটা এখনও লেখা হয়নি।”
গঙ্গাধর সামন্ত বললেন, “আমাদের তিনটেই আপাতত পড়ে দেখুন।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “এখন নয়। রাত্তিরে নিজের ঘরে বসে ধীরেসুস্থে পড়ব। এখন বরং কৌশিকের কথা শুনুন।”
কৌশিক প্রথমে গিয়েছিল কোলাঘাটের মাইল কয়েক পশ্চিমে, রহমতপুর গ্রামে। সেখানকার কাজ শেষ করে সে বাগনানের কাছে বিষ্ণুহাটি গ্রামে যায়।
ডাক্তার গুপ্ত বললেন, “হঠাৎ আবার ও-সব জায়গায় যাবার দরকার হল কেন?”
গঙ্গাধর সামন্ত বললেন, “নকুলচন্দ্র রহমতপুরের লোক আর বিষ্ণুহাটিতে হল যমুনার বাপের বাড়ি। সোমবার সকালে মিঃ সান্যাল থানায় এসে আমার কাছ থেকে এই দুটো গাঁয়ের কথা জেনে গিয়েছিলেন!”
কৌশিক বলল, “একবার ভেবেছিলুম সরাসরি পাঁচ নম্বর বাড়িতে ঢুকে বিষ্টুচরণকে জিজ্ঞেস করে জেনে নিই যে, ওরা কে কোথাকার লোক। কলকাতার লোক যে নয়, সে তো ওদের কথা শুনেই বুঝতে পেরেছিলুম। পরে মনে হল, বিষ্টুচরণকে জিজ্ঞেস করবারই বা দরকার কী, জেরার সময়েই মিস্টার সামন্ত সে-সব জেনে নিয়েছেন নিশ্চয়। তাই আর পাঁচ-নম্বর বাড়িতে গেলুম না, একেবারে থানায় চলে গেলুম। তারপর আর কী, থানা থেকে ঠিকানা নিয়ে সেইদিনই বেরিয়ে পড়লুম কলকাতা থেকে।”
ডাক্তার গুপ্ত বললেন, “বেরিয়ে পড়বার দরকার হল কেন, সেটা কিন্তু এখনও বুঝতে পারছি না।” কৌশিক বলল, “দরকার হল মামাবাবুর জন্যে। আপনারা তো গত রবিবার এখানে এসেছিলেন। সেদিন রাত্তিরে আপনারা চলে যাবার পরেই মামাবাবু আমাকে জিজ্ঞেস করেন যে, নবু চন্দ্ৰ কোথাকার লোক তা আমি জানি কি না। তা আমি বললুম, নকুলের সঙ্গে কথা বলবার সুযোগ তো আমার হয়নি, আমি তার ডেডবডিটাই দেখেছি মাত্র, তবে যমুনা আর বিষ্টুচরণের কথা শুনে মনে হল যে, তারা কলকাতার লোক নয়। তখন মামাবাবু বললেন যে, নকুল যদি বাইরের লোক হয়, তো যেখান থেকে সে কলকাতায় এসেছে, সেখানেও একবার যাওয়া দরকার; সেইসঙ্গে যমুনার বাপের বাড়িতে গিয়েও একটু খোঁজখবর করলে ভাল হয়।”
গঙ্গাধর সামন্ত ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, “এমন কথা আপনার মনে হল কেন? খুন তো হয়েছে কলকাতায়। বাড়িওয়ালার সঙ্গে ভাড়াটের ঝগড়া, এ তো একেবারে স্ট্রেট কেস।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “ওপর ওপর দেখলে সেটাই মনে হয় বটে। কিন্তু প্রথম থেকেই আমার মনে হচ্ছিল যে, অত স্ট্রেট কেস এটা না-ও হতে পারে। অর্থাৎ খুনটা কলকাতায় হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তার কারণটাও যে কলকাতাতেই খুঁজে পাওয়া যাবে, এমন কথা তো নিশ্চিত হয়ে বলা যায় না।”
একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন ভাদুড়িমশাই। তারপর বললেন, “কজালিটি অর্থাৎ কার্যকরণের ব্যাপারটা আপনারা সবাই বোঝেন। কারণ ছাড়া কার্য হয় না। কিন্তু কাজটা যেখানে হল, কারণটাকেও যে সেখানেই খুঁজে পাওয়া যাবে, এমন তো কোনও কথা নেই। সত্যি বলতে কী, সেইজন্যেই কৌশিককে আমি কলকাতার বাইরে গিয়ে একটু খোঁজখবর করতে বলেছিলুম।”
গঙ্গাধর সামন্ত বললেন, “আপনি কি মনে করেন যে, খুনটা কেউ বাইরে থেকে এসে করেছে?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমি কী মনে করি না-করি, এখুনি তা বলছি না। বলা সম্ভবও নয়। তবে লক্ষণ যা দেখছি, তাতে মনে হয়, উই আর অন দি রাইট ট্র্যাক। কিন্তু সে-কথা থাক। কৌশিক কী বলছে, শুনুন!”
১৭
কৌশিক বলল, “সোমবারে দুপুর ঠিক দেড়টার সময় আমি বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ি। যা গরম, তাতে গাড়ি না-নিয়ে ট্রেনে গেলেই ভাল হত। কিন্তু আমি বুঝে গিয়েছিলুম যে, বিস্তর ঘোরাঘুরি করতে হবে, তাই গাড়িতেই যাই। একটু ঘুরপথে গিয়েছিলুম। পাছে হাওড়ায় ঢুকে ট্র্যাফিক-জ্যামে আটকে যাই, তাই বি.টি. রোড ধরে, দক্ষিণেশ্বরে গঙ্গা পেরিয়ে, খানিকটা এগিয়ে বাঁদিকে টার্ন নিয়ে লিঙ্ক রোড দিয়ে এন. এই সিক্স ধরে এগোই। তাতে বেশ কয়েক মাইল বেশি কভার করতে হল বটে, কিন্তু ট্র্যাফিক জ্যামে পড়তে হল না বলে বিকেল পাঁচটার মধ্যেই রহমতপুরে পৌঁছে গেলুম।”
ডাক্তার গুপ্ত বললেন, “ওইখানেই তো নকুলদের বাড়ি, তাই না?”
কৌশিক বলল, “হ্যাঁ। কুড়ি-পঁচিশ ঘর লোক নিয়ে ছোট্ট গ্রাম। মেচেদা ছাড়িয়ে এন. এইচ. সিক্স ধরে আরও খানিকটা এগিয়ে ডাইনে একটা কাঁচা রাস্তায় নেমে একটু ভিতরে ঢুকে যেতে হয়। বিশ্বাসদের বাড়িতে যাব বলতে একটা লোক আমাকে বাড়িটা দেখিয়ে দিল। তো সেখানে নকুলের এক ভাই থাকে। বড় ভাই। বয়েস মনে হল পঞ্চাশ-পঞ্চান্ন। অবস্থা যে মোটেই সুবিধের নয়, সে তার জামাকাপড় আর চেহারা দেখলেই বোঝা যায়। নিজের থেকেই লোকটা সে-কথা বললও। নাম শুনলুম যুধিষ্ঠির।”
“সুতরাং যা বলল, তা যে মিথ্যে, এম কথা ভাবা-ই চলে না!” ডাক্তার গুপ্ত বললেন, “কিন্তু যুধিষ্ঠিরের অন্য সব ভাই, মানে ভীম অর্জুন আর সহদেব, তারা কোথায় থাকে?”
কৌশিক হেসে বলল, “কথাটা নেহাত মন্দ বলেননি। নকুলের বাবার সম্ভবত পাঁচ ছেলেরই প্ল্যান ছিল, তবে নকুল অব্দি এগিয়ে তিনি মারা যান, ফলে সহদেব আর জন্মাতেই পারল না। চার ছেলের নাম অবশ্য মহাভারতের সঙ্গে মিলিয়ে রাখা। যুধিষ্ঠির, ভীম, অর্জুন আর নকুল। ভীম আর অর্জুন কোথায় থাকে, যুধিষ্ঠিরের তা জানা নেই। নকুলের খবরও বছর দশেক রাখেন না। আগে-আগে মাঝে-মধ্যে দাদাকে পাঁচ-দশ টাকা পাঠাত; বিয়ে করবার পর থেকে সেটা বন্ধ হয়ে যায়।”
গঙ্গাধর সামন্ত বললেন, “নকুল যে মারা গেছে, এই খবর শুনে কী বলল?”
কৌশিক বলল, “সেটাই তো তাজ্জব ব্যাপার! বলল, ‘তাই বুঝি? তা হবে।’ মানে রি-অ্যাক্টই করল না। অথচ, নকুল তার ছোট ভাই! ভাবা যায়? কী হয়েছিল, তাও পর্যন্ত জিজ্ঞেস করল না।”
ডাক্তার গুপ্ত বললেন, “তারপর?”
“তারপর আর কী, সেখান থেকে চলে এলুম। সন্ধে হয়ে গিয়েছিল, তাই সেদিন আর উজিয়ে আসিনি। উজিয়ে এলে লাভ হত না। রাত করে যদি বিষ্ণুহাটিতে পৌঁছতুম, তো যমুনার বাপের বাড়িটা নিশ্চয় খুঁজে পাওয়া যেত, তবে অসুবিধেয় পড়তুম রাত কাটাবার জায়গা নিয়ে। সে-দিন তাই নদীর ও-পারে দাইনানেই রয়ে গেলুম আমি।”
“জায়গা পাওয়া গেল?”
“ও-সব নিয়ে কোনও সমস্যা হয়নি।” কৌশিক বলল, “হাওড়া আর মেদিনীপুর, দুটো জেলার দুই এস.পি.-কেই মামাবাবু ফোন করে দিয়েছিলেন তো; কোথায় কোথায় যাব, তাও তাঁদের জানিয়ে দিয়েছিলেন। তা রহমতপুরেই দেখলুম পুলিশের একজন লোক আমার জন্যে অপেক্ষা করছে। দাইনান তো রূপনারানের ধারে। সে-ই সেখানে একটা বাংলোয় পৌঁছে দিয়ে গেল আমাকে।”
ডাক্তার গুপ্ত বললেন, “তা রাতটা সেখানে কাটিয়ে তারপর মঙ্গলবার ভোরবেলাতেই নদীর এ-পারে বাগনানে চলে এলে?”
কৌশিক বলল, “একেবারে ভোরবেলাতেই যে দাইনান থেকে বেরিয়ে পড়েছিলুম, তা নয়। দেখলুম, দুপুরের খাওয়াটা দাইনান থেকে চুকিয়ে যাওয়া ভাল। বাগনানে পৌঁছলুম দেড়টা-দুটো নাগাদ। সেখানে প্রথমেই গেলুম থানায়। থানা অফিসার বললেন, হাওড়ার এস.পি. তাঁকে সোমবারেই জানিয়ে রেখেছেন যে, আমি বাগনানে গিয়ে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করব। চমৎকার লোক, বললেন যে, দরকার হলে তিনি আমার সঙ্গে একজন লোক দিতে পারেন। বিষ্ণুহাটির পথের ডিরেকশান তো তাঁর কাছেই পেলুম। জিপও দিতে চাইলেন। আমি বললুম, বৃষ্টি তো আর হয়নি, রাস্তা জায়গায়-জায়গায় কাঁচা বটে, তবে কাদা-টাদা যখন নেই, একেবারে শুকনো খটখটে, তখন আর জিপ নেব না। আর তা ছাড়া পুলিশের জিপ নিয়ে গেলে অসুবিধে হতে পারে, ভয় পেয়ে লোকে হয়তো কথাই বলতে চাইবে না। আর, কেউ যদি না কথাই বলে তো খবর পাব কী করে?”
গঙ্গাধর সামন্ত বললেন, “খবর পাওয়া গেল?”
কৌশিক বলল, “তা গেল বই কী। মারাত্মক সব খবর। আসলে রহমতপুরে যে এক্সপিরিয়েন্স হয়েছিল, তাতে আমি একটু দমেই গিয়েছিলুম। ভেবেছিলুম যে, এখানেও ওই একই ব্যাপার হবে। তা কিন্তু হল না। বিষ্ণুহাটিতে গিয়ে পৌঁছবার পর ঘন্টা দুয়েকের মধ্যেই একটার পর একটা খবর পেতে লাগলুম! খবর তো নয়, তাজা এক-একটা বোমা!”
সামন্তমশাই নড়ে-চড়ে বসলেন। বললেন, “তার মানে?”
“বলছি, সব বলছি।” কৌশিক তার পকেট থেকে একতাড়া কাগজ বার করে বলল, “বুধবার অর্থাৎ গতকাল সারাটা সকাল নৌপালার বাংলোয় বসে এই রিপোর্ট তৈরি করেছি। যাবতীয় খবর রয়েছে এখানে। সব ডিটেল্সে বলব?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “রিপোর্টটা আমি কালই পড়েছি। আপনারা আপাতত সংক্ষেপে সব শুনুন। রিপোর্টটা না হয় পরে সময় করে দেখে নেবেন।”
কাগজের তাড়া পকেটে পুরে কৌশিক বলল, “সেই ভাল। খবরগুলো আপাতত সংক্ষেপে বলছি। আমার প্রথম খবর বিষ্টুচরণ আর যমুনার সম্পর্ক মোটেই মামাতো-পিসতুতো ভাইবোনের নয়।”
সামন্ত বললেন, “সে কী!”
“ওদের বাড়ি একই গ্রামে। যমুনার চেয়ে বিষ্টু বছর চার-পাঁচের বড়, তাই ‘দাদা’ বলত। ও-সব মামাতো-ভাইটাই স্রেফ বাজে কথা। যমুনার সঙ্গে বিষ্টুর বিয়ের কথাও হয়েছিল, কিন্তু সেটা ভেস্তে যায়।”
ডাক্তার গুপ্ত বললেন, “কেন?”
কৌশিক বলল, “সেটাই হচ্ছে দ্বিতীয় খবর। আপনাদের ধারণা বিষ্টুর অবস্থা খুব খারাপ, চাকরি-বাকরির চেষ্টায় কলকাতায় এসে সে তাই তার ভগ্নিপতির কাছে আশ্রয় নিয়েছিল।”
গঙ্গাধর সামন্ত বললেন, “কথাটা ঠিক নয়?”
“মোটেই ঠিক নয়।” কৌশিক বলল, “বিষ্টু খুবই ধনী পরিবারের ছেলে। গাঁয়ের লোকেদের কাছে শুনলুম, স্বনামে-বেনামে বিষ্টুর বাবার বিস্তর জমিজমা তো আছেই, তার সঙ্গে আছে তেজারতি ব্যাবসা। গয়নাগাঁটি বন্ধক রেখে তিনি গাঁয়ের মানুষকে টাকা ধার দেন। সুদের হার অসম্ভব রকমের চড়া, ফলে সুদে-আসলে মিলিয়ে অঙ্কটা যা দাঁড়ায়, তাতে বারো-আনা লোকের পক্ষেই আর পাওনাগন্ডা মিটিয়ে তাদের গয়নাগাঁটি ফেরত নেওয়া সম্ভব হয় না; বিষ্টুর বাবা কেষ্টচরণের লোহার সিন্দুকে জমতে-জমতে সেগুলো পাহাড় হয়ে যায়।”
সামন্ত বললেন, “বিষ্ণু যে বড়লোকের ছেলে, নকুল তা জানত না? এ তো বড় তাজ্জব কথা আরে মশাই, নকুল তো ওই গ্রামেরই জামাই। মাঝেমধ্যে শ্বশুরবাড়িতে যেতও নিশ্চয়। তা হলে সে এটা জানবে না কেন?”
“সেইটেই তো মজার ব্যাপার।” কৌশিক বলল, “আপনি বলছেন, শ্বশুরবাড়িতে মাঝে-মধ্যে যেত নকুল। মানে এটাই আপনার বিশ্বাস। তা বিশ্বাসটা যে একেবারে অবাস্তব, তাও নয়। কিন্তু গ্রামের লোকরা বলছে, সেই যে বিয়ের রাত্তিরে নকুল বিষ্ণুহাটিতে গিয়েছিল, তারপর আর একবারও সে ও-মুখো হয়নি।”
ডাক্তার গুপ্ত বললেন, “বলো কী হে?”
কৌশিক বলল, “আমি কিছুই বলছি না। গাঁয়ের লোকেদের কাছে যে খবর পেয়েছি, সেটাই আপনাদের শোনাচ্ছি মাত্র।”
ডাক্তার গুপ্ত বললেন, “নকুল কেন শ্বশুরবাড়ি যেত না, সে-সব কথা কিছু জানতে পারলে?”
“জানবার চেষ্টা করেছিলুম। তবে যাকেই জিজ্ঞেস করেছি, সে-ই বলেছে যে, কেন যেত না তা সে জানে না।”
“যমুনার বাপের বাড়ির অবস্থা কেমন”“
“খুব খারাপ। নুন আনতে পান্তা ফুরোয় বলে একটা কথা আছে না? প্রায় সেইরকম।”
“বাপ-মা বেঁচে আছে?”
“বিয়ের সময় বেঁচে ছিল, তার কিছুদিন পরেই তারা মারা যায়। থাকবার মধ্যে ভিটের উপরে একটি ঘর আছে। আর আছে একটা ভাই। তার সঙ্গে দেখা করেছিলুম। কাছেই একটা ইটখোলায় সে মজুর খাটে।”
“সে কিছু বলল?”
“ভগ্নিপতির নাম করতেই খেপে গেল সে। খেপবারই কথা। নকুল যখন শ্রীমানী মার্কেটের কাছে থাকত, বাপ মরবার পর যমুনার এই ভাই তখন নাকি সেখানে একবার গিয়েছিল। গিয়েছিল বাপের শ্রাদ্ধের জন্য কিছু টাকা চাইতে। তা ভগ্নিপতি তাকে দূর-দূর করে তাড়িয়ে দেয়।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “নকুল যে শ্বশুরবাড়িতে যেত না কেন, সেটা আন্দাজ করা তা হলে শক্ত হবে কেন? বিয়ের রাত্তিরেই সে বুঝতে পেরেছিল নিশ্চয় যে, এদের অবস্থা খুবই খারাপ, সুতরাং বেশি মাখামাখি করাটা ঠিক হবে না, ও-সব করতে গেলে এরা তার ঘাড়ে চেপে বসতে পারে। সম্ভবত সেইজন্যেই সে আর ও-মুখো হয়নি।”
ডাক্তার গুপ্ত বললেন, “তা তো হতেই পারে।”
কৌশিক বলল, “কারণ যা-ই হোক, নকুল তার শ্বশুরবাড়িতে সেই বিয়ের দিনের পরে আর একদিনও যায়নি। তবে গাঁয়ের লোকেদের কাছে শুনলুম, নকুল না-গেলেও যমুনা যেত। দু-মাস তিন মাস অন্তর-অন্তরই যেত। যাওয়া তো খুব শক্ত নয়, হাওড়া থেকে রেলগাড়িতে উঠে বাগনানে নেমে পড়লেই হল। ওখান থেকে বিষ্টুহাটিতে বাসেও যাওয়া যায়, আবার সাইকেল-রিকশাও তো সব-সময়েই চলছে। বাপের বাড়িতে যেতে যমুনার তাই কোনও অসুবিধে ছিল না। যেত, বিষ্টুর সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎও হত। গাঁয়ে এই নিয়ে কানাঘুষো হত না, এমনও নয়। যাই হোক, যমুনাও নাকি ইদানীং আর বাপের বাড়ি যেত না। অন্তত গত তিন বছরের মধ্যে যায়নি।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “বিষ্টুচরণও তো গত তিন বছর ধরেই নকুলদের সঙ্গে রয়েছে, তাই না?” সামন্ত তাঁর নোটবইয়ের পাতা চটপট উলটে বললেন, “হ্যাঁ, ঠিক তিন বছর।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “দ্যাট এক্সপ্লেনস?”
ডাক্তার গুপ্ত বললেন, “একটা কথার উত্তর কিন্তু এখনও পাইনি, বাবা। বিষ্টুচরণের সঙ্গে যমুনার তো বিয়ে হবার কথা হয়েছিল, সেটা ভেস্তে গেল কেন?”
“ভেস্তে গেল বিষ্টুর বাবার আপত্তিতে।”
“কী যেন নাম বললে লোকটার? কেষ্টচরণ, তাই না?”
“আজ্ঞে হ্যাঁ,” কৌশিক বলল, “এ হল কেষ্টবিষ্টুর ব্যাপার। বিষ্টুর সঙ্গে মেয়ের বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যমুনার বাবা গিয়েছিলেন কেষ্টচরণের কাছে। কেষ্ট তো শুনেই বোমার মতো ফেটে পড়লেন। একে তো যমুনার বাপ বংশে ছোট, তার উপরে আবার তাঁর আর্থিক অবস্থাও যাচ্ছেতাই, ডাইনে আনতে বাঁয়ে কুলোয় না, কেষ্টচরণ নাকি তাঁকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেন, ওই শুধু ঘাড়ধাক্কাটা দিতেই যা বাকি রেখেছিলেন। তিনি বিশাল বড়লোক, অমন হাঘরের ময়েকে ঘরে ঠাঁই দেবেন কেন? কাছাকাছি আর-এক গ্রামের এক ব্যবসায়ীর গলায় গামছা দিয়ে পঞ্চাশ হাজার টাকা বরপণ আর পঁচাশি ভরি গয়না নিয়ে তাঁর মেয়েকে তিনি পুত্রবধূ করে এনে ঘরে তুললেন।”
“তারপর?”
“তারপরে ঘটল এক ভয়ঙ্কর ঘটনা। বিয়ের মাস ছয়েক বাদে এক সকালবেলায় দেখা গেল, বিষ্টুদের বাড়ির ঠাকুরদালানের উঠোনে সেই নতুন বউয়ের রক্তাক্ত লাশ পড়ে রয়েছে, ওদিকে ঠাকুরঘরের ভিতর থেকে…”
“বিগ্রহটি উধাও নিশ্চয়?” ডাক্তার গুপ্ত প্রশ্ন করলেন।
কৌশিক হাসল। বলল, “বিগ্রহ তো এক্ষেত্রে একটি শালগ্রাম শিলা। কিছুকাল ধরেই মন্দিরে-মন্দিরে চোরের উৎপাত খুব চলছে, বটে, যেমন বিগ্রহ তেমনি আনুষঙ্গিক অন্য নানা জিনিসও নেহাত কম উধাও হচ্ছে না, তবে কিনা এ-সব জিনিস চুরি হচ্ছে মূলত তার আর্ট-ভ্যালুর জন্যে, বিদেশে যার প্রচন্ড বাজার-দর। কিন্তু শালগ্রাম-শিলার তো কোনও আর্ট-ভ্যালু নেই, অথচ আপনি ঠিকই ধরেছেন, সেই শিলাটিই এক্ষেত্রে হাপিস হয়ে গেল। তাজ্জব ব্যাপার, তাতে আর সন্দেহ কী! চোর যে কেন শালগ্রাম শিলা চুরি করতে গেল, সেটাই বুঝতে পারছি না।”
গঙ্গাধর সামন্ত বললেন, “পুলিশ-কেস হয়েছিল?”
কৌশিক বলল, “তা হয়েছিল বই কী। তবে, তখন যিনি থানা-অফিসার ছিলেন, তিনি বললেন, এও আসলে চুরির ব্যাপার। বিগ্রহ চুরি করবার জন্য চোর এসে মন্দিরে ঢুকেছিল, আর শেষ-রাত্তিরে ঘুম থেকে উঠে নতুন বউ গিয়েছিল পুজোর ফুল তুলতে। বাস্, হঠাৎ সে চোরের সামনে পড়ে যাওয়াতেই এই বিপত্তি। তার মাথা না-ফাটিয়ে চোরের কোনও উপায় ছিল না।”
“চুরি করবার মতো আর-কিছু ছিল সেখানে?”
“ছিল বই কী!” কৌশিক বলল, “পঞ্চপ্রদীপটাই তো ছিল। তার প্রদীপের অংশটা পিতলের বটে, কিন্তু পিলসুজের অংশটা সোনার পাতে বাঁধানো। ছিল রুপোর বিস্তর বাসনও। চোর সে-সব ছুঁয়েও দেখেনি, বউটাকে মেরে স্রেফ শালগ্রাম-শিলা নিয়ে পালিয়েছে।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “গ্রামের লোকেরা এই ব্যাপারে তোকে কী জানিয়েছে, সেটাও তা হলে এঁদের বল।”
কৌশিক বলল, “গ্রামের লোকেরা বলে বউকে মেরেছে বিষ্টুচরণই। বউটা বড়লোকের মেয়ে বটে, কিন্তু যেমন মোটা, তেমনি কালো, তাই মাথা ফাটিয়ে বিষ্টুই তাকে মেরেছে। ব্যাপারটা অবশ্য বেশিদূর গড়ায়নি। তার কারণ কেষ্টচরণ একে বড়লোক, তায় পঞ্চায়েতের কর্তাব্যক্তি। তা ছাড়া কাকে কীভাবে তুষ্ট করতে হয়, তাও তিনি বেশ ভালই জানেন। ফলে গোটা ব্যাপারটাই ধামাচাপা পড়ে গেল।”
সামন্ত বললেন, “বউয়ের মাথা কী দিয়ে ফাটানো হয়েছিল?”
“তা কেউ জানে না। পুলিশও না।” কৌশিক বলল, “যেমন পীতাম্বর চৌধুরি লেনের ঘটনায়, তেমনি হাওড়ায় গ্রামের এই ঘটনাতেও মার্ডার-ওয়েপনের কোনও হদিস নাকি মেলেনি।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “কেষ্টচরণের মন্দিরে নিশ্চয় নতুন শালগ্রাম-শিলা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে?”
“তা তো হয়েছেই।”
“বাড়িতে ইঁদারা আছে?”
“নেই।”
“পুকুর আছে?”
“তা আছে।” কৌশিক বলল, “পুকুর বললে কমই বলা হয়। বিরাট দিঘি।”
ভাদুড়িমশাই আমার দিকে তাকালেন। হাসলেন একটু। তারপর বললেন, “মুকুন্দপুরের মনসামূর্তির কথা মনে পড়ছে?”
“তা পড়ছে বই কী।” আমি বললুম “সেখানে তো মূর্তি দিয়েই মাথা ফাটানো হয়েছিল।”
“এখানে সম্ভবত শালগ্রাম শিলা দিয়েই মাথা ফাটানো হয়েছে।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “দিঘিতে জাল ফেলে ভালভাবে তল্লাশ চালালেই মনে হয় মার্ডার-ওয়েপনটা খুঁজে পাওয়া যেত।”
১৮
সবাই একেবারে চুপ। কেউ কোনও কথা বলছি না। প্রথম কিস্তির চা আর জলখাবার অনেকক্ষণ আগেই শেষ হয়েছে। এবারে দ্বিতীয় কিস্তির চা নিয়ে মালতীদের কাজের লোকটি এসে ঘরে ঢুকল। হাত বাড়িয়ে ট্রে থেকে তাঁর চায়ের পেয়ালা তুলে নিলেন গঙ্গাধর সামন্ত। পেয়ালায় চুমুক দিয়ে বললেন, “গোটা ব্যাপারটাই দেখছি অন্যদিকে ঘুরে যাচ্ছে।”
কৌশিক বলল, “মজাটা কী জানেন? বিষ্টুচরণের বাবার সঙ্গে আমি দেখা করেছিলুম। নিজের পরিচয় অবশ্য দিইনি। বলেছিলুম যে, ‘ কলকাতায় তাঁর ছেলের সঙ্গে আমার খুব চেনাশোনা, মাঝে-মঝেই আমাদের দেখা সাক্ষাৎ হয়। তাতে বিষ্টুচরণের বাবা যা বললেন, তাতে তো আমি অবাক। ভদ্রলোক আমাকে জিজ্ঞেস করলেন যে, বিষ্টু যেখানে থাকে, সেই হোটেলে তো খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা খুব ভাল নয়, সে কি এর মধ্যে নতুন কোনও হোটেলের সন্ধান পেয়েছে?”
সামন্ত বললেন, “তার মানে? বিষ্টু যে গত তিন বছর ধরে নকুলের বাড়িতে রয়েছে, তার বাবা তা জানেই না?”
কৌশিক বলল, “জানেন না বলেই তো মনে হল। ভদ্রলোকের ধারণা, বিষ্টু হোটেলে থাকে। কথায়-কথায় হোটেলটার নামও বললেন তিনি। মির্জাপুর এলাকার হোটেল। নাম ‘শান্তিধাম’। বিষ্টুর নামে ফি মাসে তিনি ওই হোটেলের ঠিকানাতেই টাকা পাঠান। চিঠিও লেখেন ওই ঠিকানাতেই।”
সামন্ত বললেন, “এখান থেকে একটা ফোন করতে পারি?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “বিলক্ষণ। কিন্তু তার দরকার হবে না। থানায় ফোন করে হোটেলে খোঁজ নিতে বলবেন তো?”
“হ্যাঁ।”
“কিচ্ছু দরকার নেই। আজ সকালেই কৌশিক ওখানে গিয়েছিল। হোটেলের ম্যানেজার বললেন, বিষ্ণু ওখানে থাকে না, তবে হোটেলের ঘরটাও সে ছাড়েনি। প্রতি সোমবারে একবার করে সে হোটেলটায় যায়। চিঠিপত্র থাকলে নিয়ে আসে।”
“কিন্তু টাকা?” সামন্ত বললেন, “বাবার কাছ থেকে তো নিয়মিত তার নামে টাকা আসে, হোটেলে তার হয়ে সে-টাকা রিসিভ করে কে?”
“সে-খবরও কি আর নেওয়া হয়নি ভাবছেন? টাকা রিসিভ করে হোটেলের ম্যানেজার। তাকে ‘লেটার্ অভ্ অথরিটি’ দেওয়াই আছে। না, সামন্তমশাই, হোটেলে লোক পাঠাবার দরকার নেই। তবে হ্যাঁ, থানায় একটা ফোন বোধহয় করাই ভাল। জানিয়ে দিন যে, পীতাম্বর চৌধুরি লেনে যে-লোকটাকে আপনি পাহারায় রেখেছেন, এক্ষুনি লোক পাঠিয়ে তাকে একটা কথা বলে দেওয়া দরকার।”
“কী বলে দিতে হবে?”
“বলতে হবে যে, বিষ্টুকে সে যেন বাড়ি থেকে আপাতত বেরুতে না দেয়। কথাটা বলছি কেন জানেন? সাধারণত সোমবার-সোমবার বিষ্ণু ওই হোটেলটায় যায় বটে, কিন্তু বলা তো যায় না, হঠাৎ যদি সে আজ একবার যায় ওখানে, আর গিয়ে শোনে যে, তার সম্পর্কে ওখানে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে, তা হলে সে যে ভয় পেয়ে গা-ঢাকা দেবে না, তার তো কোনও নিশ্চয়তা নেই। নাঃ, কথাটা আমার আগেই ভাবা উচিত ছিল।”
সামন্তমশাই উঠে গিয়ে ফোন করে ফের ফিরে এলেন। তারপর ধপাস করে তাঁর সোফাটায় বসে পড়ে বললেন, “ওরেব্বাবা, এ তো দেখছি ভয়ঙ্কর ব্যাপার! কেস তো একেবারেই ঘুরে গেল! আর আমি কিনা ভাবছি সদানন্দ বসুই কালপ্রিট, আর-একটু চাপ দিলেই তাঁর কাছ থেকে কনফেশনটা আদায় করে নেওয়া যেত।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “আর-একটু চাপ মানে? খানিকটা চাপ কি অলরেডি দিয়েছেন নাকি? পুরো পাঁচদিন তো ভদ্রলোককে একেবারে মুঠোর মধ্যে আপনি পেয়েছিলেন। কনফেশন আদায় করবার জন্যে থার্ড ডিগ্রির ব্যবস্থা করেননি তো?”
গঙ্গাধর সামন্ত বললেন, “আরে না না, আপনারা কি আমাদের অমানুষ ভাবেন নাকি? মারধরের কথা ভাবছেন নিশ্চয়? ও-সব কিছু হয়নি। ওই আমাদের কস্টেবল রামশরণ পান্ডেকে দিয়ে দু-চারটে চড়-থাপ্পড় মারাবার ব্যবস্থা করেছিলুম মাত্র, তাকে নিশ্চয়ই মারধর বলবেন না আপনারা? ওটুকু তো করতেই হয়।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “ছি ছি, মানী লোক, বয়সও হয়েছে সত্তর বছর, তাঁকে চড়-থাপ্পড় লাগাবার ব্যবস্থা করলেন? ছিছি, মিস্টার সামন্ত, কাজটা মোটেই ভাল করেননি।”
সামন্ত কুণ্ঠিতভাবে বললেন, “তা নিশ্চয় করিনি। কিন্তু কী করব বলুন, আমি তো ধরেই নিয়েছিলুম যে, এটা একেবারে ‘ওপ্ন অ্যান্ড শাট’ কেস।”
কৌশিকের সবই ভাল, কিন্তু একটু মুখফোঁড়। গঙ্গাধর সামন্তের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে সে বলল, “আজকাল খুব অ্যামেরিকান ক্রাইম-স্টোরি পড়ছেন বুঝি?”
গঙ্গাধর সামন্ত বললেন, “কেন, কেন, এ-কথা বলছেন কেন?”
কৌশিক বলল, “না… মানে মার্কিন গোয়েন্দা-গল্পে ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নিরা প্রায়ই ও-রকম ধরে নেয় কিনা, তাই বলছি। তবে শেষ পর্যন্ত অবশ্য দেখা যায় যে, তারা সাপ ধরতে গিয়ে ব্যাং ধরেছিল।”
সামন্ত বললেন, “ঠাট্টা করছেন? করুন। ভুল যখন একটা হয়েই গেছে, তখন এই ধরনের কথা তো কিছু শুনতেই হবে। কিন্তু একটা কথা আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “ভুল সকলেরই হতে পারে। আমিও বিস্তর ব্যাপারে বিস্তর ভুল করেছি। ভুল এক্ষেত্রে কৌশিকেরও হতে পারত। বিষ্ণুহাটিতে গেলেই যে নির্ভুল নিশানা মিলবে, ও-ই কি সেটা জানত নাকি? সত্যটা যে কী সেটা তো আর ও হিসেব কষে বার করেনি, ভাগ্য ওকে সাহায্য করেছে, হি জাস্ট্ স্টাম্বলড অন ইট।”
বুঝতে পারলুম যে, সামন্তকে একটা মারাত্মক লজ্জার হাত থেকে বাঁচাবার জন্যেই ভাদুড়িমশাই এ-কথা বলছেন। নয়তো আমি ভালই জানি যে, ভাদুড়ি মশাইয়ের প্রতিটি পদক্ষেপ একবারে হিসেব কষে করা। তিনি ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন যে, সদানন্দবাবু খুনি নন। তা হলে বাকি থাকে যমুনা আর বিষ্টুচরণ। খুন করবার সুযোগ ছিল তাদেরও। শুধু খুনের কোনও মোটিভ তাদের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছিল না। সেই মোটিভের সন্ধানেই কৌশিককে তিনি রহমতপুরে আর বিষ্টুহাটিতে পাঠিয়েছিলেন।
ভাদুড়িমশাই একটা সিগারেট ধরালেন। তারপর সামন্তকে বললেন, “কোন্ কথাটা আপনি বুঝতে পারছেন না বলুন তো। দেখি বুঝিয়ে দিতে পারি কি না। পারব যে, এমন কথা বলছি না কিন্তু, তবে চেষ্টা করতে পারি।”
সামন্ত বললেন, “বিষ্টুচরণের সঙ্গে যমুনার বিয়ের কথা হয়েছিল তা অন্তত দশ বছর আগে। অর্থাৎ এটা অনেক দিনের পুরনো ব্যাপার। অথচ কার্যত দেখছি, সেই পুরনো ব্যাপারের জের দশ বছর বাদেও মেটেনি। সত্যি কি এমন হতে পারে নাকি? হওয়া সম্ভব?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “কথাটা আপনি মন্দ বলেননি। এমন প্রশ্ন উঠতেই পারে। তবে কী জানে, ব্যাপারটা পুরনো হলেও প্রেমটা পুরনো নয়। আগুনটা ধিকিধিকি জ্বলছিলই। জ্বলত না, যদি যমুনা মাঝে-মাঝেই বাপের বাড়িতে না যেত। কিন্তু সে যেত, আর গাঁয়ের লোকেরা যদি না মিথ্যে ক বলে থাকে, তবে বিষ্টুচরণের সঙ্গে তখন দেখাসাক্ষাৎও হত তার। অর্থাৎ প্রেমের আগুনটা একেবারে নিবে যাবার সুযোগই ইতিমধ্যে পায়নি। আর তারপরে তো বিষ্টুচরণ কলকাতাতেই চলে এল। কিছুদিন একটা হোটেলে কাটিয়ে তারপর উঠলও গিয়ে নকুলের বাড়িতে। ফলে এতদিন যা ধিকিধিকি করে জ্বলছিল, সেই আগুন একবারে দাউদাউ করে জ্বলে উঠল!”
সামন্তমশাই বললেন, “তা তো বুঝলুম, কিন্তু নিজের শালাটিকে তো দূর-দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছিল নকুল। তা হলে যমুনা যাকে মামাতো ভাই বলছে, সেই মামাতো শালাটিকে সে তার ঘাড়ে চেপে বসতে দিল কেন? তাকেও তো নকুল ঘাড়ধাক্কা দিয়ে তাড়াতে পারত। বলুন, পারত না?”
“তা পারত বই কী।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিন্তু তাড়ায়নি কেন, তাও তো আপনার না-বুঝবার কথা নয়। নকুলের জমাখরচের যাবতীয় খাতা তো আপনি সিজ করেছেন; আমি দেখতে চেয়েছিলুম বলে কৌশিকের হাত দিয়ে সেগুলো পাঠিয়েও দিয়েছেন আমার কাছে। তা আপনি নিজে কি সেগুলি একবারও পড়ে দেখেননি?”
সামন্ত বললেন, “নিশ্চয় পড়েছি। কেন, ওর মধ্যে কিছু আছে নাকি?”
“আছেই তো। গত তিন বছর ধরে প্রত্যেক মাসের একেবারে পয়লা তারিখেই দেখবেন জমার ঘরে লেখা রয়েছে বি—৫০০.০০ টাকা। ওটার অর্থ বোধহয় আপনি বুঝতে পারেননি। বি মানে বিষ্টুচরণ। প্রতিমাসে সে তার খাইখরচা বাবদ নকুলের হাতে পাঁচশো টাকা তুলে দিত। থাকত মাছের আড়তের এক কোণে, খেতও এমন-কিছু হাতি-ঘোড়া নয়, অথচ তারই জন্যে মাসে-মাসে লোকটা পাঁচশো টাকা দিয়ে যাচ্ছে। এমন হাতের লক্ষ্মীকে কেউ পায়ে ঠেলতে পারে? নকুলও পারেনি। তবে আমার ধারণা, টাকার লোভে বিষ্টুচরণকে সে তার বাড়িতে থাকতে দিয়েছিল বটে, তবে শেষের দিকে হয়তো একটু-একটু সন্দেহ করতে শুরু করেছিল। চেঁচামেচির সেটাই সম্ভবত মস্ত কারণ।”
ভাদুড়িমশাই একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন। সিগারেটটা নিবে গিয়েছিল। অ্যাশট্রেতে পিষে দিলেন সেটাকে। তারপর বললেন, “আমার ধারণা, মাঝরাত্তিরে মত্তাবস্থায় বাড়িতে ফিরে চেঁচামেচি করবার সময়ে যমুনা আর বিষ্টুচরণের সম্পর্ক নিয়ে ইদানীং এমন দু-একটা কথাও সে হয়তো বলতে শুরু করেছিল, যাতে ওরা ভয় পেয়ে যায়। হয়তো তখন থেকেই ওরা নকুলকে সরিয়ে দেবার প্ল্যান আঁটতে থাকে। সদানন্দ যে নকুলকে তাড়াতে চাইছিলেন, জল আর লাইট কেটে দিয়েছিলেন, তাতে আরও সুবিধে হয়ে যায় ওদের। ওরা বুঝতে পারে, নকুল যদি খুন হয়, তা হলে সন্দেহটা সরাসরি সদানন্দবাবুর উপরে গিয়ে পড়বে। সামন্তমশাই, ওরা যে ভুল বুঝেছিল, অন্তত আপনি তো সে-কথা বলতে পারেন না। আপনি যে সদানন্দ বসুকেই খুনি বলে ধরে নিয়েছিলেন, তাতে তো আর সন্দেহ নেই।… না না, আমি আবার বলছি যে, আপনি অত লজ্জিত হবেন না। এ-ভুল আমারও হতে পারত। কেন হয়নি জানেন?
ডাক্তার গুপ্ত বললেন, “কেন?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমার যে ভুল হয়নি, তার মস্ত কারণ, সদানন্দ বসুর পক্ষে লাঠি দিয়ে যে একটা লোকের মাথা ফাটানো সম্ভব নয়, সেটা আমি বুঝতে পেরেছিলুম।”
“লোহার-বল-বসানো লাঠি দিয়েও না?”
“না, তাও নয়। জানি, আপনারা কী বলবেন। আপনারা বলবেন যে, বয়স সত্তর হলেও সদানন্দ বসুর স্বাস্থ্য টসকায়নি। কিন্তু তাঁর চোখের কথাটা আপনারা ভুলে যাচ্ছেন কেন? কিরণবাবুর কাছেই শুনেছি যে, মাত্রই কিছুকাল আগে ছানি কাটিয়েছেন সদানন্দবাবু, কিন্তু আগের মতো দৃষ্টিশক্তি এখনও ফিরে পাননি। এখন আপনারাই বলুন, যাঁর দৃষ্টিশক্তি বিশেষ ভাল নয়, আর স্বাস্থ্য মোটামুটি পোক্ত হলেও বয়েস অন্তত সত্তর, সেই মানুষের পক্ষে কি মাত্রই এক-হাতে লাঠি চালিয়ে কারও মাথা ফাটানো সম্ভব?”
সামন্ত বললেন, “দু-হাতে চালাতে বাধা কোথায়?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “বাধা থাকত না, যদি কিনা তাঁর দুটোর বদলে তিনটে হাত থাকে। কিন্তু মুশকিল এই যে, যেমন আমাদের তেমনি সদানন্দবাবুরও হাত মাত্র দুটি। তার মধ্যে একটা হাতে যদি টর্চ ধরে থাকতে হয় তো লাঠি চালাবার জন্যে দুটো হাতের সাহায্য তিনি পাবেন কী করে?”
“সিঁড়ির আলো জ্বেলে রাখলে কিন্তু টর্চ জ্বালবার দরকার হয় না।”
“কিন্তু যাকে খুন করা হবে, তাকে সাবধান করে দেওয়া হয়। বাথরুমের দরজা খুলে বেরিয়ে আসবার আগেই নকুল যদি দেখে যে, সিঁড়ির উপরকার ইলেকট্রিক আলোয় সব একেবারে ঝলমল করছে, তা হলে দরজা থেকেই সে সিঁড়ির দিকে তাকাবে নিশ্চয়, আর তখনই সদানন্দবাবুকে দেখতেও পেয়ে যাবে। তখন আর তার মাথা ফাটানো অত সহজ হবে না।”
ডাক্তার গুপ্ত বললেন, “কিন্তু এমন যদি হয় যে, সদানন্দের স্ত্রীও এর সঙ্গে জড়িত?”
ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “অর্থাৎ কিনা অন্ধকারে যেই নকুলচন্দ্র বাথরুম থেকে বেরিয়েছে, কুসুমবালাও অমনি দোতলা থেকে সুইচ টিপে সিঁড়ির আলো জ্বেলে দিয়েছেন, আর সদানন্দও অমনি দু’হাতে চালিয়েছেন লাঠি? না মশাই, ইউ আর স্ট্রেচিং ইয়োর ইমাজিনেশান টু মাচ্! একে তো কুসুমবালা বাতের রুগি, ভাল করে নড়াচড়াই নাকি করতে পারেন না, তার উপরে আবার তাঁরও বয়স অন্তত পঁয়ষট্টি। দুই অ্যামেচার বুড়োবুড়ি মিলে এইভাবে গোটা ব্যাপারটাকে একেবারে কাঁটায়-কাঁটায় সিনক্রোনাইজ করে একজনকে খুন করেছে, এ-কথা ভাবা-ই চলে না।”
সামন্ত বললেন, “অর্থাৎ আপনি বলতে চান যে, বিষ্টুচরণই খুনি?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “তার পক্ষেও এ-কাজ করা সম্ভব হয় না, যদি না সে যমুনার সাহায্য পায়। তা, খবর যা মোটামুটি জোগাড় হয়েছে তাতে তো মনে হয় যমুনা তাকে সাহায্য করতেই পারে।”
সামন্ত বললেন, “ঠিক আছে, আজই ওদের দুজনকে অ্যারেস্ট করে হাজতে ঢোকাবার ব্যবস্থা করছি।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “ও-কাজ এখুনি করবেন না। আগে মার্ডার-ওয়েপনটা খুঁজে বার করা চাই। আপাতত ওদের কড়া পাহারায় রাখুন, গ্রেফতার করবার দরকার নেই। তা ছাড়া নকুলের যে একটা দু’বছরের মেয়ে রয়েছে, তার কথাটাও ভাবুন। বিষ্টু আর যমুনাকে যদি হাজতে ঢোকান, তো ওই দুধের বাচ্চাটাকেও যে মায়ের কাছছাড়া করা যাবে না, সেটা কি ভেবে দেখেছেন?”
একজন এতক্ষণ একটিও কথা বলেননি, এককোণে বসে চুপচাপ অন্যদের কথা শুনে যাচ্ছিলেন। তিনি ডাক্তার চাকলাদার। এইবারে তিনি মুখ খুললেন। বললেন, “মিস্টার ভাদুড়িকে একটা কথা বলব বলেই আজ আমি এখানে এসেছি। ভেবেছিলুম, কথাটা একমাত্র উনিই জানবেন। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, আপনারা জানলেও ক্ষতি নেই। শুধু দয়া করে বলুন, কথাটা আপনারা আর কাউকে জানাবেন না।”
ডাক্তার গুপ্ত বললেন, “যদি বুঝি যে, কথাটা আর-কাউকে জানাবার দরকার নেই, তা হলে নাহক কেন জানাতে যাব? কী বলবেন বলে ফেলুন মশাই।”
ডাক্তার চাকলাদার বললেন, “একটু আগে কমলির কথা হচ্ছিল। আপনাদের ধারণা, ও নকুলের মেয়ে। সেটা ভুল ধারণা।”
গঙ্গাধর সামন্ত বললেন, “কী বলছেন আপনি?”
“ঠিকই বলছি। যমুনা ও-মেয়ের মা হতে পারে, কিন্তু নকুল বিশ্বাস ওর বাপ নয়।”
১৯
গোটা ঘর একেবারে নির্বাক। গঙ্গাধর সামন্তের নোটবইটা তাঁর হাত থেকে খসে মেঝের উপরে পড়ে গিয়েছিল। তবু যে তার শব্দ আমরা শুনতে পাইনি, তার কারণ আর কিছুই নয়, ডাক্তার অরুণপ্রকাশ স্যান্যালের এই ড্রয়িংরুমের গোটা মেঝেটাই পুরু কার্পেট দিয়ে মোড়া। নইলে নিশ্চয় একটা পিন পড়লেও তার শব্দ তখন শোনা যেত।
ডাক্তার চাকলাদারের কথায় যে ধাক্কা লেগেছিল, সেটাকে সামলে নিয়ে ভাদুড়িমশাই-ই প্রথম তাঁর মুখ খুললেন। বললেন, “নকুল নয়? তা হলে কে ওর বাপ?”
“সম্ভবত বিষ্টুচরণ।”
সামন্ত বললেন, “প্রমাণ কী?”
“প্রমাণ তো কম্লির মুখের উপরেই লেখা রয়েছে।” ডাক্তার চাকলাদার বললেন, “মেয়ের মুখের সঙ্গে বাপের মুখের এমন আশ্চর্য মিল বড়-একটা চোখে পড়ে না। শনিবার সকালে যখন পাঁচ-নম্বর বাড়িতে যাই, মিলটা তখনই আমার চোখে পড়ে। মানে যমুনা যখন তার মেয়েকে কোলে করে আপনার পায়ের সামনে এসে আছাড় খেয়ে পড়েছিল। বিষ্টুচরণও তো সেই সময়ে দাঁড়িয়ে ছিল সেখানে। বিষ্টুর মুখের সঙ্গে কমূলির মুখের মিলটা তবু আপনাদের চোখে পড়ল না? আশ্চর্য!”
সামন্ত বললেন, “ব্যভিচার যে একটা মোটিভ তাতে সন্দেহ নেই, কিন্তু মুখের মিলকে তো আর ব্যভিচারের প্রমাণ হিসেবে আদালতে দাখিল করা যাবে না। আসামি পক্ষের উকিল বলবে, অমন একটু-আধটু মিল অনেকের সঙ্গেই অনেকের থাকতে পারে। ও সব মিল-টিলের কথা ছাড়ুন। নকুল যে কম্লির বাপ নয়, তার এমন কোনও প্রমাণ কোথায়, আদালতে যা পেশ করলে আমাদের বোকা বনতে হবে না?”
ডাক্তার চাকলাদারকে দেখে মনে হল, তিনি বিন্দুমাত্র বিচলিত হননি। বললেন, “ঠিক আছে, দরকার যদি হয় তো তেমন প্রমাণই আমি দেব। তাও আমার কাছে রয়েছে।”
সামন্তর ভুরু কুঁচকে গেল। বললেন, “তা হলে সেটা প্রথম দিনই আমাদের দেননি কেন?”
প্রশ্নটার জবাব দিলেন না চাকলাদার। সামন্তর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে তিনি ডাক্তার সুরেশ গুপ্তের দিকে তাকালেন। তারপর বললেন, “কেন যে কিছু-কিছু কথা আমরা গোপন রাখি, একজন পুলিশ অফিসারের পক্ষে তা বোঝা সম্ভব নয়। কিন্তু মিস্টার গুপ্ত, পুলিশের ডাক্তার হলেও আপনি ডাক্তার তো বটেন, আপনি নিশ্চয় বুঝবেন যে, অনেক কথা জেনেও আমরা মুখ খুলতে পারি না, অন্য-কাউকে তার সামান্যতম আভাস দিতেও আমাদের এথিকসে বাধে। তা ছাড়া, এটা বিশ্বাসরক্ষার ব্যাপার। …রোগী তার ডাক্তারকে বিশ্বাস করে… তাঁকে সে এমন অনেক কথা জানায়, যা হয়তো তার অতি আপনজনকেও সে জানায় না …মানে জানাতে তার সংকোচ হয় …কী, হয় না?”
ডাক্তার গুপ্ত বললেন, “হয় বই কী।”
“অথচ ডাক্তারের কাছে তার কোনও সংকোচ নেই। কেন নেই? না সে ধরেই নিয়েছে যে, ডাক্তারকে সে যা বলছে, আর-কেউ তা ঘূণাক্ষরেও কখনও জানবে না। আমরাও জানি যে, রোগী যা বলছে, তা আমাদের বিশ্বাস করে বলেই বলছে। অন্য-কাউকে সেটা জানাবার কোনও প্রশ্নই নেই। জানালে সেটা ব্রিচ অভ্ ট্রাস্ট হয়ে দাঁড়ায়। কী, আমি ভুল বলছি?”
ডাক্তার গুপ্ত চুপ করে রইলেন, কোনও উত্তর দিলেন না।
চাকলাদার বললেন, “কী হল, কিছু বলছেন না কেন? যা হোক কিছু বলুন।”
“কী আর বলব, বলবার তো কিছুই নেই।” ডাক্তার গুপ্ত মাথা নাড়লেন, “ইউ আর অ্যাবসলিউটলি রাইট। রোগী আপনাকে বিশ্বাস করে যা বলছে, তা কারও কাছে ফাঁস করবার কোনও প্রশ্নই উঠতে পারে না। ইট উইল বি হাইলি আনএথিক্যাল। … না না, ও-সব কথা কাউকে জানাতে আপনি বাধ্য নন।”
চাকলাদার বিষণ্ণ হাসলেন। বললেন, “থ্যাঙ্ক ইউ ডক্টর গুপ্ত। কিন্তু আমার সমস্যা তাতেই মিটছে না। আমি পড়েছি উভয়-সংকটে। আমি যা জানি…মানে আমার পেশেন্ট আমাকে যা বলেছে, আর তাকে পরীক্ষা করে যা আমি জানতে পেরেছি, তা বলাও অন্যায়, আবার না-বলাও অন্যায়। হয়তো না-বলার অন্যায়টাই আরও মারাত্মক।”
সামন্ত বললেন, “বড্ড হেঁয়ালি হয়ে যাচ্ছে, ডাক্তার চাকলাদার। একটু ঝেড়ে কাসুন দেখি।”
সামন্তর কথাটাকে গ্রাহ্যও করলেন না চাকলাদার। তাঁর দিকে একবার ফিরেও তাকালেন না। ভাব দেখে মনে হল যেন তাঁর কথাটা তিনি শুনতেও পাননি। ডাক্তার গুপ্তের দিকেই তাঁর দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে বললেন, “আর সেই জন্যেই এখন আমার মনে হচ্ছে যে, কমলিকে কোলে নিয়ে যমুনা যখন তার ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে এল, আর তারপর যখন আমি শুনলুম যে, ও নকুলের মেয়ে, তখনই সব কথা আমার জানিয়ে দেওয়া উচিত ছিল। তা যদি জানাতুম, মিস্টার সামন্তর সন্দেহটা তা হলে নিশ্চয় তখনই অন্য দিকে ঘুরে যেত; আর-কিছু না হোক, তিনি বুঝতে পারতেন যে, নকুলকে খুন করবার মোটিভ একমাত্র সদানন্দবাবুরই নয়, অন্যদেরও থাকা সম্ভব। আর তা যদি তিনি বুঝতেন, তা হলে নিশ্চয় তড়িঘড়ি একজন বুড়োমানুষকে থানায় ধরে নিয়ে গিয়ে তাঁর কাছ থেকে কনফেশান আদায় করবার জন্যে তাঁকে চড়াচাপড় লাগাবার ব্যবস্থা করতেন না।”
একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন চাকলাদার। তারপর বললেন, “কথাটা আমার তখনই বলা উচিত ছিল। কিন্তু আমি বলিনি। কেন বলিনি? না পেশেন্টের রোগের ব্যাপারে যাবতীয় গোপনীয়তা আমাদের রক্ষা করতে হয়, ডাক্তারি পেশার সেটা মস্ত শর্ত। সেই শর্তটাকেই আমি মান্য করে চলছিলুম। কিন্তু ডাক্তার গুপ্ত, আমাকে মার্জনা করুন, কোনও শর্তই এখন আর আমি মান্য করতে পারছি না। আর তা ছাড়া, রোগটা যার, সে তো মারাই গেছে, এখন যদি তার একটা শারীরিক ত্রুটির কথা আমি প্রকাশ করি, তবে অন্তত তার তাতে কোনও ক্ষতি হবারও আশঙ্কা নেই।”
কৌশিক বলল, “কিসের ক্ষতি?”
চাকলাদার বললেন, “লোকের কাছে উপহাসের, ঠাট্টা-বিদ্রুপের পাত্র হওয়াটাই কি একটা মস্ত বড় ক্ষতির ব্যাপার নয় : সত্যি বলতে কী, অনেকটা সেই কারণেও এ-সব ত্রুটির কথা অনেকে গোপন করে রাখে, রাখতে বাধ্য হয়।”
সামন্ত আবার বললেন, “বড্ড হেঁয়ালি হয়ে যাচ্ছে, বড্ড হেঁয়ালি হয়ে যাচ্ছে। ও-সব আগড়ম-বাগড়ম বাদ দিয়ে এবারে কাজের কথায় আসুন তো। নকুল যে কমলির বাপ নয়, তার প্রমাণ কী?”
এক নিশ্বাসে বিস্তর কথা বলে ফেলে বোধহয় চাকলাদার একটু ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। আকস্মিক উত্তেজনাও বোধহয় তাঁর ক্লান্ত বোধ করবার একটা মস্ত কারণ। এতক্ষণে তিনি সামন্তর দিকে চোখ ফেরালেন। স্থির চোখে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর প্রতিটি শব্দকে পৃথকভাবে উচ্চারণ করে খুব শান্ত গলায় বললেন, “শুধু কমলি কেন, কারও বাপ হওয়াই নকুল বিশ্বাসের পক্ষে সম্ভব ছিল না।”
সামন্ত বললেন, “আমি প্রমাণের কথা বলছিলুম। আপনি প্রমাণ দিতে পারেন?”
ভাদুড়িমশাই এতক্ষণ কোনও কথা বলেননি। চুপচাপ সব শুনে যাচ্ছিলেন : এবারে বললেন, “তা যে উনি দিতে পারেন, সে তো আগেই বলেছেন।”
কৌশিক বলল, “আপনার দেখছি অনেক কথাই শুনে থাকে না, মিস্টার সামন্ত। রোজ ব্রাহ্মীশাক খেতে শুরু করুন; শুনেছি ওতে মেমারি খুব বেড়ে যায়।”
ভাদুড়িমশাই তাঁর ভাগ্নেকে একটা মৃদু ধমক দিয়ে বললেন, “আঃ, এ-সব কী হচ্ছে কৌশিক? ছেলেমানুষি কোরো না।”
গঙ্গাধর সামন্তও পাল্টা কিছু-একটা বলবেন বলে কৌশিকের দিকে একবার জ্বলন্ত চোখে তাকিয়েছিলেন। কিন্তু ভাদুড়িমশাই নিজেই যেহেতু ভাগ্নেকে ধমকে দিয়েছেন, তাই তিনি আর কৌশিককে কিছু বললেন না, চাকলাদারের দিকে চোখ ফিরিয়ে বললেন, “মুখের কথায় তো চিঁড়ে ভিজবে না ডাক্তান চাকলাদার, আমাকে কেস সাজিয়ে পাবলিক প্রসিকিউটরের হাতে তুলে দিতে হবে; আমি প্রমাণ চাই।”
চাকলাদার বললেন, “ প্রমাণ দিতে না-পারলে কি আর এ-সব কথা কেউ বলে? তা হলে শুনুন মিস্টার সামন্ত, নকুল তার শরীরের ব্যাপারে যা-কিছু পরীক্ষা করাবার, তা আমাকে দিয়েই করিয়েছি। তার যে বাপ হবার ক্ষমতা নেই, সেই রিপোর্ট তাকে আমি দিয়েওছিলুম। রিপোর্টের ওরিজিন্যাল তার কাছে ছিল, আর কপিটা আমার ফাইলে। ওরিজিন্যালটা আপনারা নকুলের বাড়িতে খুঁজে দেখতে পারেন। তবে আমার ধারণা, সেখানে সেটা পাবেন না। আপনাদের কথাবার্তা যা শুনলুম, তাতে তো মনে হয়, বিষ্টুচরণ অতি ধুরন্ধর ব্যক্তি, রিপোর্টটা সে নিশ্চয় গায়েব করেছে।”
সামন্ত বললেন, “ তল্লাশি চালিয়ে দু’চারটে প্রেসক্রিপশন, নাসিংহোমের বিল আর টুকটাক কিছু ওষুধপত্রের ক্যাশমেমো পাওয়া গেছে, তবে অমন কোনও রিপোর্ট আমরা পাইনি।”
চাকলাদার বললেন, “কী করে পাবেন, ওরা সেটা সরিয়ে ফেলেছে। আমার আরও একটা ধারণার কথা আপনাদের বলব?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “নিশ্চয় বলবেন। এ-ব্যাপারে যা কিছু আপনার মনে হয়, সবই খুলে বলবেন। যে লোকটি খুন হয়েছে, আপনি তার ডাক্তার–আপনার প্রতিটি কথাই আমাদের শোনা দরকার।”
চাকলাদার একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন আবার। মনে হল, কথাটা বলতে তিনি একটু দ্বিধা বোধ করছেন। শেষ পর্যন্ত অবশ্য দ্বিধাটা কাটিয়ে উঠলেন তিনি। বললেন, “দেখুন, আমার ভুল হতে পারে, তবু ভেবে দেখলুম যে, বলাই ভাল। আপনারা হয়তো জানেন না যে, কাল রাত্তিরে আমার চেম্বারে চোর ঢুকেছিল।”
সামন্ত বললেন, “এঁরা না জানতে পারেন, কিন্তু আমি জানি। ভোরবেলায় আপনার ফোন পেয়ে তো আমি লোকও পাঠিয়ে দিয়েছিলুম আপনার চেম্বারে। …ওই যাঃ, নকুলকে আপনি যে রিপোর্ট দিয়েছিলেন, সেটা তো পাঁচ-নম্বর বাড়িতে আমরা পাইনি, কিন্তু তার একটা কপি তো আপনার কাছে আছে বলছিলেন, সেটাও কাল রাত্তিরে আপনার চেম্বার থেকে চুরি হয়ে যায়নি তো?”
চাকলাদার বললেন, “চেম্বারে কোনও দামি জিনিস থাকে না। থাকবার মধ্যে ছিল কিছু কাগজপত্র, নোটবই আর ডায়েরি। চোর সেগুলো নেয়নি, তবে ড্রয়ার, আলমারি আর যাবতীয় কাগজপত্র যেভাবে হাঁটকে দেখেছে, তাতে মনে হয়, কিছু একটা খুঁজে বার করতেই সে এসেছিল। মিস্টার সামন্ত, ওইসব কাগজপত্র তো চেম্বারের মেঝেয় ছত্রখান হয়ে পড়ে আছে। ওর উপরে, কি টেবিলের উপরকার কাচের ঢাকনায় কি আলমারির পাল্লায় কি অন্য কোথাও তার আঙুলের ছাপ থেকে যাওয়া কিছু বিচিত্ৰ নয়। আপনারা কি সে-কথা ভেবে দেখেছেন?”
সামন্ত হেসে বললেন, “আপনারা আমাদের কী ভাবেন বলুন তো? ফিঙ্গার প্রিন্ট নিয়ে চিন্তা করবেন না, ও-ব্যাপারে যা ইনস্ট্রাকশন দেবার, তা আমি দিয়ে এসেছি। দেখা যাক কোনও দাগি চোরের আঙুলের ছাপের সঙ্গে মিলে যায় কি না।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “ডাক্তার চাকলাদার কোনও দাগি চোরের কথা ভাবছেন না। উনি ভাবছেন বিষ্টুচরণের কথা। ওঁর ধারণা, চেম্বারের কোথাও যদি আঙুলের ছাপ পেয়ে যান আপনারা, তো বিষ্টুর ফিঙ্গার প্রিন্টের সঙ্গে সেটা মিলেও যেতে পারে। কী ডাক্তার চাকলাদার, আমি কি ভুল বলছি?”
চাকলাদার বললেন, “মোটেই না। সব রিপোর্টেরই একটা কপি যে আমি ফাইল করে রাখি, বিষ্টু সেটা ভাল জানত।”
সামন্ত বললেন, “বটে?”
“কী করে জানত, বলি। বিষ্টুর একটু হাঁ, ‘নি-মতো আছে। অন্য সময়ে কষ্ট দেয় না বটে, তবে শীতকালে সেটা ওকে মাঝেমধ্যে ভোগার। ওর ডাক্তার ওকে তাই ব্লাড টেষ্ট করতে বলেছিলেন। তাঁর অ্যাডভাইস অনুযায়ী বিষ্টু আমার ল্যাবরেটরিতে টেস্টটা করিয়েছিল। তার রিপোর্ট আমি ওকে দিয়েওছিলুম। কিন্তু সেটা ও হারিয়ে ফেলে। আমাকে সে-কথা বলতে আমি বলি, ঠিক আছে, সব রিপোর্টেরই তো একটা কপি আমি ফাইল করে রাখি, এটাও আছে, কপি দেখে নতুন করে একটা রিপোর্ট লিখে দিচ্ছি। তো আমার ধারণা, নকুলকে যে রিপোর্ট আমি দিয়েছিলুম, বিষ্টু জানত যে, সেটার কপিও আমার কাছে রয়েছে, আর সেই কপিটা গায়েব করবার জন্যেই কাল রাত্তিরে সে আমার চেম্বারে এসে ঢুকেছিল। অবশ্য আমার ধারণাটা ভুলও হতে পারে।”
“ঢুকল কী করে?”
“জানলার কাচ খুলে। চেম্বারে তো আর দামি কিছু থাকে না। তাই জানালায় আর গ্রিলও বসাইনি।”
সামন্ত বললেন, “কপিটা গায়েব হয়ে যায়নি তো?”
চাকলাদার বললেন, “নিশ্চিন্ত থাকুন, সেটা দোতলায় থাকে। শুধু ওই একটা কপি নয়, যাবতীয় রিপোর্টের কপি আমার দোতলার ঘরে রাখি। ফলে সেটা খোয়া যায়নি। দরকার হলে জানাবেন, তার একটা জেরক্স কাল সকালেই আপনাকে পাঠিয়ে দেব।”
সামন্ত বললেন, “বাঃ, কাজ তো তবে চোদ্দো-আনাই মিটে গেল। বাকি রইল শুধু মার্ডার-ওয়েপনটা খুঁজে বরা করা। তা সেটারও একটা হদিস নিশ্চয় শিগগিরই করে ফেলতে পারব।”
কথাটা তিনি এমনভাবে বললেন যেন যাবতীয় হদিস এ-পর্যন্ত তিনিই করেছেন।
ডাক্তার গুপ্ত উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, “নটা বাজতে চলল, এবারে তা হলে যাওয়া যাক।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “কাল আপনারা একটু সময় দিতে পারবেন?”
সামন্ত বললেন, “কেন বলুন তো?”
“ব্যাপারটা নিয়ে আর-একবার বসবার দরকার ছিল।”
“এইখানে?” গঙ্গাধর সামন্ত যেন আঁতকে উঠলেন। “না মশাই, আমরা সেন্ট্রাল ক্যালকাটার মানুষ, রোজ-রোজ অ্যাদ্দুর ঠেঙিয়ে আসতে পারব না।”
“এখানে আসতে হবে কে বলল?” ভাদুড়িমশাই বললেন, “খুন যেখানে হয়েছে, সেই জায়গাটা তো আমি এখনও দেখিইনি। তাই ভাবছিলুম যে, কাল বিকেল ছ’টায় আমরা কিরণবাবুর বাড়িতে বসব। আপনি যে-সব খাতা আর কাগজপত্র সিজ করেছেন, সেগুলোও না হয় তখনই ফেরত দেওয়া যাবে। আজ সেগুলো আমার কাছেই থাক। কোনও আপত্তি নেই তো?”
গঙ্গাধর সামন্ত হেসে বললেন, “কিচ্ছু না। তবে হ্যাঁ, একটা কথা। জলখাবারের ব্যবস্থাটা যেন এইরকম হয়।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “নিশ্চিন্ত থাকুন, ওটা এর চেয়ে ঢের ভাল হবে। কিরণবাবুর স্ত্রী বাসন্তীকে আমি অনেক কাল ধরে দেখছি তো, অমৃত যে কাকে বলে, কালই আপনারা বুঝতে পারবেন।”
এবারে আমার আঁতকে ওঠার পালা। একে তো বাড়িতে গ্যাস নেই, কালকের মধ্যে সিলিন্ডারটা পাব কি না, তাও জানি না, তার উপরে আবার দিন কয়েক বাদেই মেয়ের পরীক্ষা শুরু হবে, এই সময়ে বাড়িতে বৈঠক বসছে শুনলে বাসন্তী না খেপে যায়।
অরুণ সান্যাল আর মালতী এসে দাঁড়িয়ে ছিল। তাদের কাছে বিদায় নিয়ে আমরা নীচে নেমে এলুম। ডাক্তার গুপ্তকে নিয়ে সামন্ত তাঁর জিপে উঠলেন, আমি উঠলুম চাকলাদারের মরিস মাইনরে।
সেলফের চাপি ঘোরাতেই ইঞ্জিন গোঁ-গোঁ করে উঠল। চাকলাদার বললেন, “ব্যাটা একেবারে বাঘের বাচ্চা! চলুন, মনটা হালকা হয়ে গেছে, একটু ঘুরপথে আজ বাড়ি ফিরব।”
“ঘুরপথে মানে?”
“পার্ক সার্কাস থেকে আর লোয়ার পার্কুলার রোড ধরব না, ডাইনে ঘুরে চার-নম্বর ব্রিজ পেরিয়ে বাইপাস ধরব। তারপর স্টেডিয়ামের কাছে বাঁয়ে টার্ন নিয়ে বেলেঘাটা মেন রোড ধরে শেয়ালদা ফ্লাই-ওভারে উঠলেই তো আমাদের পাড়ায় পৌঁছে যাচ্ছি?”
“ওরে বাবা, সে তো বিস্তর পথ।”
“পথ অবশ্যই বেশ কয়েক কিলোমিটার বেশি, তবে সময় লাগবে কম। একেবারে উড়ে চলে যাব। তা ছাড়া গাড়ির মেরামতিটা কেমন হল, তারও একটা পরীক্ষা হয়ে যাবে।”
বাইপাসে পড়েই অ্যাকসিলেটারে চাপ বাড়ালেন চাকলাদার। পুরনো আমলের গাড়ি, কিন্তু মনে হল যেন সতিই তার দু’পাশে দুটো ডানা গজিয়ে গেছে। পাস দেবার জন্যে পিছন থেকে একটা লরি ক্রমাগত হর্ন বাজিয়ে যাচ্ছিল, খানিক বাদে পিছনে তাকিয়ে সেটাকে আর দেখতে পেলুম না।
আধ ঘন্টার মধ্যেই পীতাম্বর চৌধুরি লেনে পৌঁছে গেলুম। সারাটা পথ চাকলাদার আর কোনও কথা বলেননি। এতক্ষণে তিনি মুখ খুললেন। রাস্তার একধারে গাড়িটাকে দাঁড় করিয়ে বললেন, “নকুল বিশ্বাস যে একটা ভুল বিশ্বাস নিয়ে তারা গেল, সেটা ভেবে দেখেছেন?”
“অর্থাৎ?”
“বুঝতে পারছেন না?” তিক্ত হেসে চাকলাদার বললেন, “বিষ্টুকে সে যমুনার মামাতো ভাই বলেই জানত। এদিকে সে নিজেকে পরীক্ষা করিয়ে জেনে গিয়েছিল যে, যমুনা বাঁজা নয়, আসলে তার নিজেরই নেই বাপ হবার ক্ষমতা। ফলে, যমুনা যখন প্রেগন্যান্ট হল, আর তারও কিছুকাল বাদে যমুনার মেয়ের মুখে যখন স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠল বিষ্টুচরণের মুখের আদল, নকুল তখন ধরেই নিল যে, মামাতো-পিসতুতো ভাইবোনের মধ্যে একটা ইনসেসচুয়াস সম্পর্কের জন্যেই এটা হয়েছে। আরে মশাই, বিষ্টু যে যমুনার মামাতো ভাই নয়, এটাই সে জানত না।”
শ্যামনিবাস-রহস্য – ২০
বাসন্তীকে নিয়ে একটু ভয় ছিল। সামনেই পারুলের পরীক্ষা, এই সময়ে বাড়িতে একগাদা লোক আসছে, তাদের জন্যে খাবার তৈরি করতে হবে, হইচইও হয়তো নেহাত কম হবে না, তাই ভাবছিলুম যে, বাসন্তী না খেপে যায়।
অথচ সে-ই দেখলুম দারুণ খুশি। গ্যাস নিয়ে অবশ্য ভাবনা নেই, কাল বিকেলেই নতুন সিলিন্ডার দিয়ে গিয়েছে, তবু ভাদুড়িমশাই যে আজ আমাদের বাড়িতেই বৈঠক ডেকেছেন, কাল রাত্তিরে বাড়িতে ফিরে বাসন্তীকে এই খবরটা দিয়ে একটু কিন্তু-কিন্তু করে বলেছিলুম, “রাজি না হলেই ভাল কত, তাই না?”
বাসন্তী তা-ই শুনে অবাক। গালে হাত দিয়ে বলল, “সে কী! চারুদা আসছেন, কৌশিক আসছে, এ তো দারুণ ব্যাপার! কদ্দিন যে চারুদাকে দেখিনি! কৌশিক অবশ্য মাঝেমধ্যে আসে। কিন্তু চারুদা এবারে অনেক দিন বাদে কলকাতায় এলেন! তুমি কিন্তু মালতী আর অরুণবাবুকেও আসতে বলতে পারতে!”
বললুম “বলো কী, পারুল এখন রাতদিন তার বইয়ের মধ্যে মুখ গুঁজে পড়ে রয়েছে, লোক আরও বেড়ে গেলে ওর অসুবিধে হত না?”
বাসন্তী বলল, “অসুবিধে হবে কেন, বরং সুবিধেই হত। মেয়েটা সারারাত পড়ে। কিন্তু অত পড়া ভাল নয়, বুঝলে? একটু গল্প-টল্পও করা দরকার।”
এবারে আমার অবাক হবার পালা।
ছটায় সকলের আসবার কথা। কৌশিককে নিয়ে ভাদুড়িমশাই কিন্তু পাঁচটার মধ্যেই এসে গেলেন। এসেই হাঁক পাড়লেন, “কই বাসন্তী, আমার প্রিয় পানীয়টি তৈরি আছে তো?”
ভাদুড়িমশাইয়ের যা প্রিয় পানীয়, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাষায় তা হল ‘বিল্ববাসিত তক্র’। অর্থাৎ কিনা বেলের সুবাসযুক্ত ঘোল। তা বাসন্তী সেই পানীয়ের পুরো দুটি গ্লাস ফ্রিজের মধ্যে ঢুকিয়েশরেখেছিল। উপর্যুপরি সেই গ্লাস দুটিকে নিঃশেষ করে ভাদুড়িমশাই আমাকে বললেন, “চলুন, চটপট এবারে ঘটনাস্থলটা একবার দেখে আসি।”
বাসন্তী বলল, “বা রে, আপনি তো আপনার প্রিয় পানীয় পেয়েছেন, এবারে কৌশিককে তার প্রিয় পানীয় তৈরি করে দিতে হবে না?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “কৌশিকের তো এখন আমার সঙ্গে যাবার কোনও দরকার নেই। ও চা খাক, পারুলের সঙ্গে গল্প করুক, কিরণবাবু আমার সঙ্গে থাকলেই হবে। দেরি হবে না, মিনিট পাঁচ-দশের মধ্যে আমরা ফিরে আসছি।”
ভাদুড়িমশাই আর আমি গিয়ে পাঁচ-নম্বর বাড়িতে ঢুকলুম। সিঁড়ির তলাটা আজ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, কোথাও ধুলো-ময়লা নেই। মাছের সেই গন্ধও নেই কোনওখানে। ভাদুড়িমশাই মিনিট কয়েক চুপচাপ সিঁড়ির সামনে দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর বললেন, “চলুন, এবারে ফেরা যাক।”
বললুম, “সদানন্দবাবু আর তাঁর স্ত্রী উপরে রয়েছেন। তাঁদের সঙ্গে একবার কথা বলবেন না?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “দরকার কী।” তারপর সদর-দরজা পর্যন্ত গিয়ে হঠাৎ আবার বললেন, “চলুন, ভদ্রলোককে একবার দেখেই যাই।”
উপরে গিয়ে দেখলুম, সদানন্দবাবু তাঁর শোবার ঘরে চুপচাপ একটা ইজিচেয়ারে বসে আছেন। বললুম, “কেমন আছেন সদানন্দবাবু?”
সদানন্দবাবু কোনও উত্তর দিলেন না। আমার সঙ্গে যে আরও একজন রয়েছে, এটা দেখেও ইজিচেয়ার থেকে তিনি উঠে দাঁড়ালেন না পর্যন্ত। যেমন বসে ছিলেন, তেমনি বসেই রইলেন।
বললুম, “ইনি মিস্টার চারু ভাদুড়ি। বিখ্যাত গোয়েন্দা, ব্যাঙ্গালোরে থাকেন। দিন কয়েকের জন্যে কলকাতায় এসেছেন। আমার একজন বিশিষ্ট বন্ধু।”
সদানন্দবাবু ফ্যালফ্যাল করে আমাদের দিকে তাকিয়ে রইলেন, একটি কথাও বললেন না।
নীচে নামতে বিষ্টুচরণের সঙ্গে দেখা। সদর দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের দেখে বলল, “কী বিপদ, বলুন তো। কাল রাত্তির থেকে আমাকে বাইরে বেরুতে দিচ্ছে না। আজ সকালে বাজার করতে বেরুচ্ছিলুম, তা যে লোকটা পাহারায় রয়েছে, সে আমাকে আটকে দিল। বলল, ‘বাহার জানেকা হুকুম হ্যায় নহি।’ কমলির বেবিফুড ফুরিয়েছে, তাও বাইরে যেতে দিচ্ছে না। মেয়েটা কি না-খেয়ে মরবে নাকি?”
বললুম, “বাইরে যাবার দরকার কী। সদানন্দবাবুর স্ত্রী যে কমলির জন্যে দুটিন দুধ আনিয়ে রেখেছেন, তা তো আপনিও সেদিন শুনলেন। উপরে গিয়ে তার একটা নিয়ে এলেই তো হয়।”
বিষ্টুচরণ বলল, “তা তো হয়ই। কিন্তু আমার বোন যে আমাকে উপরে যেতে দিচ্ছে না।”
বললুম, “তাই তো, বড় মুশকিল হল দেখছি। তা এক কাজ করুন, কমলিকেই বরং উপরে পাঠিয়ে দিন।”
ভাদুড়িমশাইকে নিয়ে রাস্তা পেরিয়ে আমাদের বাড়িতে এসে ঢুকলুম। এ-বাড়ির সদর দরজা সব সময় খোলাই থাকে। দোতলায় উঠবার আগে একবার ঘুরে দাঁড়িয়েছিলুম; তখন চোখে পড়ল, বিষ্টুচরণ আবার তাদের বাড়ির দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে, কিন্তু থানা থেকে যে পাহারাদারটিকে সেখানে মোতায়েন রাখা হয়েছে, বিষ্টুকে সে বাড়ি থেকে বেরুতে দিচ্ছে না।
উপরে উঠে আমাদের বৈঠকখানা ঘরে এসে ঢুকলুম আমরা। বাসন্তী একটা ম্যাগাজিনের পাতা ওলটাচ্ছিল; বুঝলুম যে, তার রান্নাবান্নার পাট শেষ হয়েছে। আমাদের দেখে ম্যাগাজিনটা নামিয়ে রেখে সে উঠে দাঁড়াল। ভাদুড়িমশাই বললেন, “আরে বোসো, বোসো। … কৌশিক কোথায়?”
বাসন্তী বলল, “পারুলের ঘরে বসে গল্প করছে। ডেকে দেব?”
পাশের ঘর থেকে টুকরো-টুকরো কথা আর হাসির শব্দ ভেসে আসছিল। ভাদুড়িমশাই মৃদু হাসলেন। তারপর বললেন, “থাক্, ডেকে দেবার দরকার নেই। বাকি সবাই আসুন, তখন ডেকে দিলেই হবে।”
বাসন্তী বলল, “তা হলে বরং একটু চা করি আপনার জন্যে?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “তারও এখন দরকার নেই। প্রায় ছ’টাই তো বাজে। ওরা এখুনি এসে পড়বেন। তখন চা দিলেই চলবে।”
মিনিট দশেকের মধ্যে ডাক্তার চাকলাদার এসে পৌঁছলেন। তার একটু বাদেই গঙ্গাধর সামন্ত আর ডাক্তার গুপ্ত। কৌশিককেও ডেকে পাঠানো হল।
এক প্রস্ত চা হয়ে যাবার পরে সামন্ত বললেন, “এবারে তা হলে কাজের কথা শুরু হোক।”
ভাদুড়িমশাই বলেন, “আজ শুক্রবার। মার্চের আজ শেষ দিন, ৩১ তারিখ। নকুলচন্দ্র খুন হয়েছে গত শুক্রবার। গত শুক্রবার ছিল ২৪ মার্চ। কখন খুন হয়েছে? না রাত তিনটে নাগাদ। লাশ পরীক্ষা করে অন্তত সেই কথাই বলা হয়েছে, ইংরেজি মতে রাত বারোটার পরেই নতুন তারিখ শুধু হয়ে যায়। নকুল তা হলে ২৫ মার্চ খুন হয়। তার দু’ঘন্টা বাদে সদানন্দবাবু দেখতে পান যে, তার ডেডবডিটা সিঁড়ির তলায় লুটিয়ে পড়ে আছে। অবশ্য সদানন্দবাবু যা বলছেন, তাতে মনে হয়, ও যে জ্যান্ত নকুল নয়, তার ডেডবডি, তা তিনি তখনও জানতেন না।”
গত রাত্রে যে-সব কথা হয়েছিল, আর সেইসঙ্গে প্রকাশ পেয়েছিল যে-সব নতুন তথ্য, তাতে গঙ্গাধর সামন্তর চিন্তাভাবনার পেন্ডুলামটি দেখলুম একেবারে বিপরীত বিন্দুতে গিয়ে পৌঁছেছে। তিনি বললেন, “এতে আর মনে হওয়া-টওয়ার কী আছে, সদানন্দবাবু নিশ্চয় মিথ্যে কথা বলেননি।”
কৌশিকের এও একটা মস্ত দোষ যে, সে হাসি চাপতে পারে না।
সামন্ত তার দিকে তাকিয়ে বললেন, “হাসছেন যে?”
কৌশিক বলল, “হাসব না? দু’দিন আগেই যাঁকে আপনি চড়-থাপ্পড় মারবার ব্যবস্থা করেছিলেন, এখন তো দেখছি তাঁর সম্পর্কে আপনার ধারণা একেবারে উল্টে গেছে।”
সামন্ত বললেন, “সে তো আমি ভুল করেছিলুম। তা ভুলটা ঠিক-সময়ে শুধরেও নিয়েছি, তা-ই বা ক’জনে করে? এখন তো বুঝতেই পারছি যে, এটা একটা ফ্রেম-আপ, নির্দোষ একটা মানুষের ঘাড়ে দোষ চাপাবার চক্রান্ত।”
কৌশিক আবার কিছু বলতে যাচ্ছিল, ভাদুড়িমশাই কাল রাত্তিরের মতোই আবার তাকে মৃদু ধমক দিয়ে বললেন, “কী হচ্ছে কৌশিক! যা বলছি, একটু মন দিয়ে শোনো। মিস্টার সামন্ত কাল বলছিলেন যে, চোদ্দো-আনা কাজই মিটে গেছে, বাকি মাত্র দু-আনা। কিন্তু সেই দু-আনার গুরুত্ব মোটেই কম নয়, হয়তো সবচেয়ে বেশি। কাজটা কী? না মার্ডার-ওয়েপনটা খুঁজে বার করতে হবে। যতক্ষণ না তার হদিশ করা যাচ্ছে, খুনির বিরুদ্ধে একটা ওয়াটারটাইট কেসও ততক্ষণ দাঁড় করানো যাচ্ছে না। যা দিয়ে ওভাবে মাথা ফাটানো যেতে পারে, এমন জিনিস অবশ্য ও-বাড়ি থেকে বিস্তর আটক করা হয়েছে, কিন্তু ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় তার একটাও যে ওতরায়নি, সেটা ভুলে যাচ্ছ কেন?”
কৌশিক চুপ করে রইল। চাকলাদার বললেন, “মিস্টার সামন্ত কাল বলছিলেন যে, মার্ডার-ওয়েপনের একটা হদিশ শিগগিরই করে ফেলতে পারবেন।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “করে ফেলতে পারলে নিশ্চয় বলতেন আমাদের। মনে হচ্ছে, এখনও হদিশ করতে পারেননি। কিন্তু সে-কথা থাক। সে-দিন সকালে পাঁচ নম্বর বাড়িতে যাঁরা গিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে একমাত্র ডাক্তার চাকলাদার ছাড়া বাকি চারজনকে—মানে কিরণবাবু, মিস্টার সামন্ত, ডাক্তার গুপ্ত আর কৌশিককে আমি চারটে রিপোর্ট লিখে ফেলতে বলেছিলুম, এও বলে দিয়েছিলুম যে, ওখানে সেদিন যা-কিছু তাঁরা দেখেছেন কি শুনেছেন, রিপোর্টে সব ডিটেলসে লিখতে হবে। কে কোথায় দাঁড়িয়ে ছিল, কিংবা বসে ছিল, কিংবা কার কথায় কার কী প্রতিক্রিয়া হয়েছিল, তাও বাদ দেওয়া চলবে না। অর্থাৎ আমি চেয়েছিলুম যে, গোটা ব্যাপারটার একটা সর্বাঙ্গীণ বর্ণনা আপনারা আমাকে দিন। সে-দিন সকালে ঘটনাস্থলে উপস্থিত না-থাকা সত্ত্বেও যাতে সবটা আমি ভিশুয়ালাইজ করতে পারি।”
কৌশিক বলল, “আমি কিছু বাদ দিইনি মামাবাবু। যা-কিছু আমার চোখে পড়েছে সবই আমার রিপোর্টের মধ্যে আছে।”
সামন্ত বললেন, “আমিও তো সবই জানিয়েছি আমার রিপোর্টে। কিছু বাদ পড়েছে বলে তো মনে হয় না।”
ভাদুড়িমশাই আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনার সম্পর্কে আমার কোনও ভাবনা নেই। আপনার তো ওই যাকে বলে ফোটোগ্রাফিক মেমারি। যা-কিছু দেখেন শোনেন, সব একেবারে মাথার মধ্যে গেঁথে থাকে।”
বললুম, “থ্যাঙ্ক ইউ। আশা করি সবই আমার রিপোর্টের মধ্যে আছে, কোনও কিছু বাদ পড়েনি।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “তিনটি রিপোর্টই আমি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়েছি। একটা কথা বলতেই হবে, কারও কথার সঙ্গেই অন্য-কারও কথার বিশেষ পার্থক্য বিরোধ কিংবা অসঙ্গতি কোথাও নেই। সেটা খুবই ভাল কথা। অমন কোনও বিরোধ কি অসঙ্গতি থাকলে আমাকে ধাঁধায় পড়ে যেতে হত। ক্রমাগত ভাবতে হত কার কথাটা ভুল, এঁর না ওঁর। না, তেমন কোনও ধাঁধায় আমাকে পড়তে হয়নি। কিন্তু রিপোর্টগুলি পড়ে আমি যে খুব সন্তুষ্ট হতে পেরেছি, তাও নয়। কেন জানি না, কেবলই আমার মনে হচ্ছে, যা আপনারা লিখেছেন, তার মধ্যে কোথাও কিছু-একটা ফাঁক রয়েছে, কিছু একটা ব্যাপার বাদ পড়েছে। এমন কোনও ব্যাপার, যাকে তিনজনের একজনও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বা উল্লেখযোগ্য মনে করেননি। কোনও তুচ্ছ বা মাইনর ব্যাপার। মানে এমন কোনও ব্যাপার, এই ঘটনার সঙ্গে সরাসরি যাকে একটা কার্যকারণের সূত্রে গাঁথা যায় বলে কেউ কল্পনাই করতে পারে না। একটু ভেবে দেখুন তো এমন-কিছু কি সেখানে আপনারা দেখেছিলেন কিংবা শুনেছিলেন?”
“না, মামাবাবু।” কৌশিক বলল, “কিছুই আমি বাদ দিইনি। সবকিছুই তুমি জানাতে বলেছিলে, তাই সবকিছুই আমার রিপোর্টে আমি জানিয়েছি। এমন কী, জায়গার একটা নকশা এঁকে সেটাও গেঁথে দিয়েছি আমার রিপোর্টের সঙ্গে।”
“তা দিয়েছিস ঠিকই,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিরণবাবু আর মিস্টার সামন্তও খুঁটিনাটি কথা কিছু কম জানাননি। বাট্ আই জাস্ট কান্ট গেট রিড অভ্ দিস ফিলিং দ্যাট নান্ অভ্ ইউ টাচ্ড অল দি পয়েন্টস, ইউ মিস্ড সামথিং সামহোয়্যার অ্যালং দি ওয়ে। এমন-কিছু, যা এই কেসটার পক্ষে খুবই ভাইটাল।”
চুপ করে রইলুম। বারবার ভাবতে লাগলুম, কী বাদ দিয়েছি। কিন্তু অনেক ভেবেও কোনও কূলকিনারা করতে পারলুম না।
ভাদুড়িমশাই একটা সিগারেট ধরালেন, ধোঁয়া ছাড়লেন কিছুক্ষণ। তারপর অনুযোগের সুরে বললেন, “ডাক্তার গুপ্ত, আপনাকেও আমি কিন্তু একটা রিপোর্ট লিখে দিতে বলেছিলুম। আপনি সেটা আজও দিলেন না।”
ডাক্তার গুপ্ত লজ্জিত গলায় বললেন, “লিখলে তো দেব। লেখাই হয়ে ওঠেনি।”
“সময় করে উঠতে পারেননি, নিশ্চয়? আপনি যা ব্যস্ত মানুষ!”
ডাক্তার গুপ্ত বললেন, “না না, সময়ের ব্যাপার নয়, কাগজ-কলম নিয়ে লিখতে বসেছিলুম ঠিকই। কিন্তু কী লিখব, সেটাই ঠিক বুঝতে পারছি না। এক ওই লাশ ছাড়া আর কোনও-কিছুই তো তেমন নজর করে দেখিনি। আর দেখবেই বা কী করে? মন দিয়ে কিছু দেখবার কি শুনবার উপায়ই তো ছিল না।”
“কেন, উপায় না-থাকার কী হল? রিপোর্ট পড়ে তো মনে হয় অন্যেরা অনেক-কিছুই দেখেছেন। শুনেছেনও অনেক-কিছু।”
ডাক্তার গুপ্ত বললেন, “তা হলে বুঝতে হবে, হয় ওঁদের সর্দি হয়ে নাক বুজে গিয়েছিল, আর নয়তো এমনিতেই ওঁদের ঘ্রাণশক্তি তেমন প্রবল নয়।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “তার মানে?”
“আরে মশাই, সে এক উৎকট গন্ধ! কোনও-কিছু দেখব অথবা শুনব কী, গন্ধের দাপটে যেন পাগল-পাগল লাগছিল। মনে হচ্ছিল, পালাতে পারলে বাঁচি, নয়তো অন্নপ্রাশনের ভাত পর্যন্ত মুখে উঠে আসবে। ওরেব্বাপ রে বাপ, কী গন্ধ, কী গন্ধ!”
ভাদুড়ি আমার দিকে তীব্র চোখে একবার তাকালেন। তারপর সামন্ত আর কৌশিকের দিকে। বললেন, “কই, কারও রিপোর্টেই তো গন্ধের কথা নেই। কীসের গন্ধ?”
কৌশিক বলল, “পচা মাছের। নকুলের তো মাছের ব্যবসা, আর বাড়িতেই ছিল তার আড়ত। সেখানে মাছ পচে গিয়ে অতি উৎকট গন্ধ ছড়াচ্ছিল।”
শুনে দুই হাতে নিজের মাথাটাকে আঁকড়ে ধরে গুম হয়ে কিছুক্ষণ বসে রইলেন ভাদুড়িমশাই। তারপর মিনিট কয়েক বাদে যখন নিজের শরীরটাকে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন, তখন দেখলুম, তাঁর মুখচোখের চেহারা একেবারে পালটে গিয়েছে। বললেন, “আমারই ভুল হয়েছিল। যা দেখেছেন, যা শুনেছেন, শুধু তারই কথা লিখতে বলেছিলুম আমি, আর আপনারাও শুধু তা-ই লিখেছেন। গন্ধের কথাটা আপনারা কেউই বলেননি। …ডাক্তার গুপ্ত, আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। আপনি রিপোর্ট লেখেননি বটে, কিন্তু সবচেয়ে যেটা জরুরি খবর, শেষপর্যন্ত সেটা আপনার কাছেই পাওয়া গেল। এখন দেখা যাক, আমি যা ভাবছি সেটা ঠিক কি না।”
কৌশিকের দিকে তাকালেন ভাদুড়িমশাই। বললেন, “হ্যাঁ রে কৌশিক, নকুলের বাড়িতে তার ব্যাবসাপত্রের যে-সব হিসেব, কাগজ আর সিদ পাওয়া গেছে, সেগুলি নিয়ে এসেছিস তো?”
কৌশিক তার অ্যাটাশে-কেস খুলে সুতো দিয়ে বাঁধা কিছু কাগজপত্র, খানকয় খাতা আর দুটো ফ্ল্যাট-ফাইল বার করে ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “এই নাও। এগুলি কিন্তু আজ মিস্টার সামন্তকে ফেরত দিতে হবে।”
কাগজপত্র আর খাতা একপাশে সরিয়ে রেখে ফ্ল্যাট ফাইল দুটো টেনে নিলেন ভাদুড়িমশাই। প্রথম ফাইলটায় রাখা কাগজপত্রগুলি দ্রুত একবার দেখে নিলেন। তারপর সেটাকে নামিয়ে রেখে হাতে তুলে নিলেন দ্বিতীয় ফ্ল্যাট ফাইলটা। সেটাকে আর উল্টে-পাল্টে দেখবার দরকার হল না। মুখের ভাব দেখে মনে হল যে, যা খুঁজছিলেন তিনি, ফাইলের একেবারে গোড়াতেই সেটা পেয়ে গেছেন। ফাইল থেকে সেটা তিনি খুলে নিলেন। একটা ক্যাশমেমো। সেটার উপরে চোখ বুলিয়ে টেনে নিলেন জমা-খরচের খাতা। দুটোকে মিলিয়ে দেখলেন। তারপর আপন মনে বললেন; “ও, এই তা হলে ব্যাপার!”
স্বগতোক্তিটা সামন্তও শুনতে পেয়েছিলেন। তিনি বললেন, “কী ব্যাপার?”
ভাদুড়ি তাঁর কথার কোনও জবাব দিলেন না। কৌশিককে বললেন, “হ্যাঁ রে, লাশ যেখানে পড়ে ছিল, সেখানে মেঝে থেকে যা-যা কুড়িয়ে এনেছিস, তার মধ্যে কিছু কাঠের গুঁড়োও তো দেখলুম। শুকনো নয়, ভিজে গুঁড়ো। ওগুলো ভিজল কী করে? মেঝের উপরে কি জল ছিল নাকি?”
কৌশিক বলল, “মেঝের উপর জল পড়েছিল নিশ্চয়। আমরা যখন যাই, তখন দেখেছিলুম যে, জায়গাটা কাদা-কাদা মতন হয়ে আছে। ধুলোবালির উপরে জল পড়ে তারপর শুকিয়ে গেলে যেমন হয় আর কি।”
ভাদুড়িমশাই সামন্তের দিকে তাকিয়ে বললেন, “কৌশিক যা বলছে, সেটা সত্যি?”
সামন্ত বললেন, “এটা উনি ঠিকই বলছেন। জায়গাটা দেখে আমারও মনে হয়েছিল যে, এ-রকম কাদা-কাদা হয়ে আছে কেন, কারও হাত থেকে জল পড়েছিল নাকি?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “জল পড়ে গিয়েছিল, তাই না? মানে সেইরকমই মনে হয়েছিল, কেমন?”
“হ্যাঁ, সেইরকম মনে হয়েছিল।”
মস্ত একটা নিশ্বাস ফেললেন ভাদুড়িমশাই। বললেন, “তা হলে জেনেই রাখুন সামন্তমশাই, যা নিয়ে আপনি খুব ভাবনায় রয়েছেন, সেই মার্ডার-ওয়েপনেরও একটা হদিশ হয়তো করতে পেরেছি! তবে কিনা আমার অনুমানটা যদি সত্যি হয়, তবে যতই না কেন খুঁজে মরুন, সেই অস্ত্রটির সন্ধান আপনি কোনওদিনই পাবেন না।”
“কেন, কেন, পাব না কেন? সেটা যাবে কোথায়? এ তো আর রামানন্দ সাগরের টিভির রামায়ণের ওয়েপন নয় যে, শত্রুকে বিনাশ করেই মহাকাশে ভ্যানিশ করে যাবে! মার্ডার-ওয়েপনটা নিশ্চয় ডানা গজিয়ে উড়ে যাবার জিনিস নয়।”
“আমি কি বলছি যে, ওটা উড়ে গেছে?”
“তা হলে?”
“আরে মশাই, ওটা উড়ে যায়নি, গলে গেছে!”
সামন্ত তখনও হাঁ করে তাকিয়ে আছেন দেখে ভাদুড়িমশাই বললেন, “এখনও বুঝতে পারছেন না?”
ডাক্তার গুপ্তই আমাদের সকলের হয়ে কথা বললেন। “উনি একা কেন, সম্ভবত আমরা কেউই কিছু বুঝতে পারিনি। অন্তত আমি যে পারিনি, এটা স্বীকার করতে আমার কিছু লজ্জা নেই।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “কেন, তা হলে ঘটনাগুলোকে পরপর সাজিয়ে নিন। নকুল খুন হয় মোটামুটি রাত তিনটের সময়। ইংরেজি মতে ২৫ মার্চ, ইন দি আর্লি আওয়ার্স অভ দি মর্নিং। খুন হবার ঘন্টা কয়েক আগে শেয়ালদা আইস ডিপো থেকে পঁচিশ কেজি বরফ কেনা হয়েছিল। এই ক্যাসমেমোটাই তার প্রমাণ। ক্যাসমেমোর তারিখ দেখছি ২৪ মার্চ। জমাখরচের খাতায় ওই একই তারিখে রবফ কেনার টাকাটা লেখা হয়েছে। টাকার অঙ্কের পাশে লেখা রয়েছে, ‘বিষ্টুকে পঁচিশ কেজি বরফ খরিদ করিবার জন্য দেওয়া হইল।’ খাতায় ওটাই শেষ এন্ট্রি।”
কৌশিক মৃদু-মৃদু হাসছিল। মনে হল, সে একটা কিছু আঁচ করেছে। আমি কিন্তু কিছুই আন্দাজ করতে পারছিলুম না। ডাক্তার গুপ্ত, চাকলাদার আর সামন্তর মুখ দেখে বুঝলুম, তাঁদের অবস্থাও আমার চেয়ে খুব-একটা ভাল নয়।
ভাদুড়িমশাই একটা সিগারেট ধরালেন। বুকের মধ্যে খানিকটা ধোঁয়া টেনে নিলেন। তারপর গলগল করে সেটাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, “এতক্ষণ যা বললুম, সেটা তথ্য, সেটা প্রমাণ করা যায়।। এবারে এইসব তথ্যের ভিত্তিতে আমরা কয়েকটা ব্যাপার অনুমান করে নিতে পারি। প্রথমেই বলি, জমাখরচের খাতায় ওটাই যেহেতু শেষ এন্ট্রি, তাই মনে হয়, টাকাটা সেদিন অর্থাৎ ২৪ মার্চ বিকেল কিংবা সন্ধে নাগাদ বিষ্টুকে দেওয়া হয়। দুপুরে নকুল ঘুমোত, তা আমরা জানি। সম্ভবত ঘুম থেকে উঠে বিষ্টুকে সে টাকাটা দেয়, খাতায় সেটা লিখে রাখে, তারপর বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। বিষ্টু সম্ভবত তখনই বরফ কেনেনি। কিনেছিল বরফের দোকান বন্ধ হবার খানিক আগে। দোকানপাট দশটার পরে সাধারণত খোলা থাকে না। আমার ধারণা, দোকান বন্ধ হবার মুখে-মুখে বরফটা কিনে বিষ্টু বাড়ি ফিরে আসে। অভ্যাসবশত ক্যাসমেমোটা সে গেঁথেও রাখে ফ্ল্যাট-ফাইলে।”
ডাক্তার গুপ্ত বললেন, “তারপর?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “নকুল কেন পঁচিশ কেজি বরফ কিনতে দিয়েছিল, তা আপনাদের না-বুঝবার কথা নয়। মাছের কারবারি বরফ কেনে মাছের ঝুড়িতে বরফ চাপা দেবার জন্যে। গরমে যাতে মাছ না পচে যায়। আর বিষ্টু যে টাকা পেয়েই বরফ কিনতে বেরিয়ে পড়েনি, যতটা সম্ভব দেরি করে বেরিয়েছিল, সেটাও আমরা অনুমান করতে পারি।”
কেন?”
“সে জানত যে, বরফ যত দেরি করে কিনবে, সেটা গলে গিয়ে আকারে ছোট আর ওজন কম হয়ে যাবার সম্ভাবনা ততই কম। তাও সে নিশ্চিন্ত হয়নি, পানের দোকানে যেমন করে, সেইভাবে সেও সেই বরফের চাঙড়টাকে কাঠের গুঁড়ো দিয়ে ঢেকে রেখেছিল।
“তারপর?”
“তারপর আর কী, নকুল তো মত্তাবস্থায় রোজই মাঝরাত্তিরে বাড়ি ফিরত। সেদিন ফিরল আরও দেরি করে। ফিরে খানিক চেঁচামেচিও করল, তারপর শুয়েও পড়ল যথারীতি। বিষ্টু কিন্তু ঘুমোল না। সে জেগে রইল। জেগে অপেক্ষা করতে লাগল নকুল কখন বাথরুমে যায়, সেই মুহূর্তটির জন্য।”
ভাদুড়িমশাই তাঁর সিগারেটে শেষ টান দিয়ে সেটাকে অ্যাশট্রেতে পিষে দিলেন। তারপর বললেন, “নকুল মোটামুটি রাত-তিনটে নাগাদ একবার ঘুম থেকে উঠে বাথরুমে যেত। কিন্তু সেদিন সে চেঁচামেচি করেছিল রাত দুটো পর্যন্ত। দুটোর পরে ঘুমিয়ে আবার তিনটে নাগাদ ঘুম থেকে ওঠা একটু অস্বাভাবিক ব্যাপার। তাই আমার ধারণা নকুল সেদিন দুটোর পরে শুয়েছিল বটে, কিন্তু ঘুমোয়নি। ঘন্টাখানেক শুয়ে থেকে তিনটে নাগাদ সে ঘর থেকে বেরিয়ে বাথরুমে ঢোকে। কিন্তু সে টের পায়নি যে, সে গিয়ে বাথরুমে ঢুকবার সঙ্গে-সঙ্গেই বিষ্টুও অন্ধকারে তার ঘর থেকে নিঃশব্দে বেরিয়ে সিঁড়ির দু’ধাপ উপরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে, বাথরুম থেকে তার বেরিয়ে আসার মুহূর্তটির জন্যে। বাথরুমের আলো নিবিয়ে নকুল বাইরে বেরিয়ে আসবামাত্র সিঁড়ির উপর থেকে বিষ্টু তার মাথা ‘কাটিয়ে দেয়। বেচারা নকুল! ব্রহ্মতালু ফেটে যাওয়ায় সে আর চিৎকার করে উঠতে পারেনি; মুখ থেকে কোনও শব্দ বেরুবার আগেই সে মেঝের উপরে লুটিয়ে পড়ে।”
সামন্ত বললেন, “তা তো বুঝলুম, কিন্তু মাথাটা ফাটানো হল কী দিয়ে?”
ভাদুড়িমশাই অবাক হয়ে সামন্তর দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। মনে হল, সামন্ত যে ব্যাপারটা এখনও বুঝে উঠতে পারেননি, এটাই যেন তিনি বিশ্বাস করে উঠতে পারছেন না। কিন্তু কৌশিকের মতো তিনি আর ঠাট্টা করলেন না সামন্তকে। একটু ক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “মাথা ফাটানো হল বরফের একটা বিশাল চাঙর দিয়ে, মাছের উপর চাপা দেবার জন্যে যা কেনা হয়েছিল, কিন্তু সে-কাজে যা ব্যবহার করা হয়নি বলেই ঝুড়ির সমস্ত মাছ সেদিন গরমে পচে যায়। তা নইলে ‘অমন উৎকট’ গন্ধ ওখানে ছড়িয়ে পড়ত না।”
কৌশিক বলল, “সিঁড়ির নীচে যে কাদা-কাদা হয়ে গিয়েছিল সে তা হলে ওই বরফ-গলা জলের জন্যেই?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “নিশ্চয়ই। সিঁড়ির নীচে ধুলোময়লার সঙ্গে ওই যে কাঠের গুঁড়ো ছড়িয়ে ছিল, যার খানিকটা তুই ওখান থেকে কুড়িয়ে এনেছিলি, সেও আসলে বরফের চাঙড়টা যা দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছিল, সেই কাঠের গুঁড়ো।”
কৌশিকের প্রশ্নের জবাব দিয়ে আবার গঙ্গাধর সামন্তর দিকে তাকালেন ভাদুড়িমশাই। বললেন, “কেন যে তখন বলছিলুম যে, মার্ডার ওয়েপনটা উড়ে না-গেলেও গলে গিয়েছে, আশা করি সেটা এবারে আপনি বুঝতে পেরেছেন। হাজার চেষ্টা করেও অস্ত্রটা আর আপনি খুঁজে বার করতে পারবেন না।”
সামন্ত বললেন, “তা না-পারলেও ক্ষতি নেই। অন্য যা-সব প্রমাণ আমাদের হাতে রয়েছে, তা-ই যথেষ্ট।”
*
এই কাহিনির ছোট্ট একটা পরিশিষ্ট রয়েছে। সেটা না-জানিয়ে আমি ঠিক শান্তি পাচ্ছি না। সেই রাত্রেই বিষ্টুচরণ ও যমুনাকে খুন ও তাতে সহযোগিতার দায়ে এখন গ্রেফতার করা হয়, যমুনার মেয়ে কম্লি অর্থাৎ কমলাকে নিয়ে তখন একটা সমস্যা দেখা দিয়েছিল। দু’বছরের বাচ্চা মেয়ে, তাকে কোথায় রাখা হবে। যমুনা ইচ্ছে করলে মেয়েকে সঙ্গে নিয়েই হাজতে যেতে পারত, তার তরফে সে-রকম দাবি তোলা হলে পুলিশেরও তা মেনে না-নিয়ে উপায় ছিল না। কিন্তু যমুনাই কম্লিকে সঙ্গে নিতে রাজি হয়নি। মেয়েটা তা হলে কোথায় থাকবে। যমুনার মা-বাপ নেই, থাকার মধ্যে আছে একটা ভাই, ‘তার অবস্থা ভাল নয়, সে কলকাতায় এসে দিদির কাছে আশ্রয় পায়নি, জামাইবাবু তাকে দূর-দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছিল, সে এখন ইটের ভাটায় মজুর খাটে। কমলিকে তার কাছে পাঠানো যায় কি না, জিজ্ঞেস করতে ঝাঁঝিয়ে উঠে যমুনা বলে, “তার চেয়ে এক কাজ করুন, মেয়েটাকে আমার এই আঁশবটিতে কেটে গঙ্গার জলে ভাসিয়ে দিন।” বলে সে আর দেরি করে না, বিষ্টুচরণের পিছন-পিছন হেঁটে গিয়ে পুলিশ ভ্যানে উঠে পড়ে।
ব্যাপার দেখে গঙ্গাধর সামন্ত বললেন, “এ তো মহা ফ্যাসাদ হল মশাই, মেয়েটাকে তা হলে বরং সরকারি হোমে বা কোনও অনাথ আশ্রমে-টাশ্রমে পাঠিয়ে দিই। আপনারা কী বলেন?”
আমি আর শম্ভুবাবু চুপচাপ সব দেখছিলুম। শম্ভুবাবু বললেন, “আমরা আর কী বলব?”
কুসুমবালা সম্ভবত দোতলায় সিঁড়ির রেলিঙের পাশে দাঁড়িয়ে সব শুনছিলেন। এই সময়ে তিনি নীচে নেমে আসেন। এসে গঙ্গাধর সামন্তকে বলেন, “আপনি অনাথ-আশ্রমের কথা কী বলছিলেন?”
সামন্ত বললেন, “কমলিকে কোথায় রাখা হবে, সেই কথা হচ্ছিল। ভাবছি ওকে আমাদের কোনও হোমে আর নয়তো মাদার টেরিজার আশ্রমে পাঠিয়ে দেব।”
কুসুমবালা বললেন, “না। কমলি এ-বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও যাবে না। ওকে আমি উপরে নিয়ে যাচ্ছি, ও আমার কাছে থাকবে।”
ডাক্তার চাকলাদারকে নিয়ে ইতিমধ্যে আর-একদিন ভাদুড়িমশাইয়ের কাছে গিয়েছিলুম। কৌশিকও বাড়িতে ছিল। চাকলাদারকে দেখে সে বলল, “শুনেছেন তো? আপনার চেম্বারে যে ফিংগার-প্রিন্ট পাওয়া গেছে, সেটা বিষ্টুরই। ওটা না-পাওয়া গেলেও অবশ্য ক্ষতি ছিল না। সাক্ষ্যপ্রমাণ যেভাবে সাজিয়ে নিয়ে তারপর সামন্তর হাতে তুলে দিয়েছি, তাতে কেস্ একেবারে পাকা। ফাঁসি হয়তো হবে না, তবে যাবজ্জীবন হবেই।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “কালই ব্যাঙ্গালোর ফিরছি। আপনারা সেই কবে গিয়েছিলেন, সে কি আজকের কথা? পারুলের পরীক্ষা শেষ হলে সবাই আর-একবার চলে আসুন। দেখতে পাবেন যে, শহরটা কত পালটে গেছে।”
বিদায় নেবার সময় কৌশিকের হাত ধরে খুব ঝাঁকিয়ে দিয়ে চাকলাদার বললেন, “যেমন মামা, তেমনি ভাগ্নে। নরাণাং মাতুলক্রমঃ।”
পরে রাস্তায় নেমে তাঁর মরিস মাইনরের দরজা খুলতে খুলতে নিচু গলায় বললেন, “অবশ্য নারীরাও অনেক সময় অন্তত চেহারায় তাদের মাতুলের মতো হতে পারে। তবে কিনা এই আমাদের বিষ্টুচরণের মতো গ্রাম সম্পর্কের মামা হওয়া চাই।”
বাড়ি ফিরে দেখি, সদানন্দবাবু আমাদের বৈঠকখানা ঘরে বসে বাসন্তীর সঙ্গে কথা বলছেন। আমি তো অবাক। জামিনে ছাড়া পাবার পর থেকে আর রাস্তাঘাটে তাঁকে দেখাই যায়নি। কাজের মেয়েটিই বাজার করে দিত; মাদার ডেয়ারির দুধও এনে দিত সে-ই। রাস্তায় বার হওয়া তো দূরের কথা, সদানন্দবাবু শুনেছিলুম দোতলা থেকে নীচেই নাকি নামতে চান না।
আমি গিয়ে বৈঠকখানা ঘরে ঢুকতেই সদানন্দবাবু দাঁড়িয়ে উঠে বললেন, “অবাক হচ্ছেন তো?”
বললুম, “তা যে একটু হইনি, তা নয়।”
সদানন্দবাবু বললেন, “সব শুনেছি। কিন্তু কী যে বলব, বুঝতে পারছি না। যে-ক’টা দিন বেঁচে আছি, আপনার কাছে ঋণী হয়ে রইলুম। …একটা কথা; বউমা যা বললেন, তাতে বুঝতে পারছি, ভাদুড়িমশাই কিছু নেবেন না। কিন্তু কৌশিকবাবুও তো কম দৌড়ঝাঁপ করেননি, অন্তত তাঁর ফি’টা তো দেওয়া দরকার।”
বললুম, “কৌশিককেও কিছু দিতে হবে না। আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলুম। তাতে সে বলল, এ-কেসটায় টাকা নিতে মামাবাবুর নিষেধ আছে। তবে কিনা ওর কিছু খাপত্তর তো হয়েছে, অন্তত সেটা যাতে নেয় তা আমি দেখব।”
সদানন্দবাবু চট করে তাঁর মুখটা নামিয়ে নিলেন। বুঝতে পারলুম, চোখে যে জল এসে পড়েছে, ভদ্রলোক আমাকে সেটা দেখতে দিতে চান না। আস্তে-আস্তে তিনি দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। তারপর সেখান থেকেই হঠাৎ ফিরে দাঁড়িয়ে বললেন, “যাবার আগে একটা অনুরোধ করে যাই। কম্লি যে বিষ্টুর মেয়ে, সেটা যেন কখনও প্রকাশ না পায়। নিতান্ত দরকার না হলে আদালতে যাতে ওর প্রসঙ্গটা না ওঠে, দয়া করে সেটাও একটু দেখবেন।”
বললুম, “আমার আর চাকলাদারের ব্যাপারে আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। তা ছাড়া গঙ্গাধর সামন্তকেও বলব যে, কম্লি হ্যাজ টু বি কেপ্ট আউট অভ্ দিস। সামন্ত তো মানুষ মোটেই খারাপ নন। কমলির ভবিষ্যতের কথা ভেবে তিনি এই অনুরোধটা নিশ্চয় রাখবেন।”
ফলে সদানন্দ বসু আবার শেষরাত্রে ঘুম থেকে উঠে লোহার-বল-বসানো সেই লাঠিটা হাতে নিয়ে নতুন উদ্যমে শুরু করে দিয়েছেন তাঁর মর্নিং ওয়াক।
(সমাপ্ত)