The old BdForum.Net has now moved to Foorti.Org for better branding. There you can chat, shout, play games, and connect with old friends.

প্রেতের অভিশাপ

রকিব হাসান · Story
লস অ্যাঞ্জেলেসের সীমানা প্রায় ছাড়িয়ে এসেছে তিন গোয়েন্দা। জানো কোথায় এলাম? গাড়ি চালাতে চালাতে হঠাৎ বলে উঠল মুসা। তন্ময় হয়ে প্রকৃতি দেখছিল তার পাশে বসা কিশোর পাশা। ফিরে তাকাল। ফ্লেমিং রক? মুসার কথায় পেছনে বসা রবিনও কৌতূহলী হয়ে উঠল। পিঠ খাড়া করে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। কেন, ভুলে গেছ, পত্রিকায় সেদিন যে আর্টিক্যালটা পড়েছিলাম সেটার কথা? সেই যে, সেই শহরটার কথা, অদ্ভুত ভাবে গায়েব হয়ে গিয়েছিল যেখানকার সমস্ত মানুষ। ও, হ্যাঁ হ্যাঁ, মনে পড়েছে। প্রায় চেঁচিয়ে উঠল কিশোর। একটা রূপার খনিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল শহরটা। পর্বতের গভীরে। সবচেয়ে কাছের লোকালয়টাও যেখান থেকে দুশো মাইল দূরে। হ্যাঁ, মাথা ঝাঁকাল রবিন। সিবিল ওঅয়েরর সময় আবিষ্কৃত হয় খনিটা। আর খনিটাকে ঘিরে শহরের সুদিন ছিল আঠারোশো তেষট্টি থেকে আঠারোশো পঁচাত্তর সাল পর্যন্ত। তারপর রাতারাতিই একদিন গায়েব হয়ে গেল শহরের সব লোক। আর বলতে হবে না, কিশোর বলল। সবটাই এখন মনে পড়েছে। খবরটা দিয়েছিল এসে একজন স্বর্ণসন্ধানী। ক্ষুধা-তৃষ্ণা আর পরিশ্রমে আধপাগল হয়ে ধুঁকতে ধুঁকতে এসে ঢুকেছিল টাকসন শহরে। ফ্লেমিং রকের পাশ দিয়ে নাকি এসেছিল সে। জানিয়েছিল, শহরটার সমস্ত লোক নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে। আর নিরুদ্দেশটাও স্বাভাবিক উপায়ে হয়নি, কিশোরের মুখ থেকে কথা কেড়ে নিল রবিন। গোছগাছ করে চলে যাওয়া যাকে বলে তা নয়। বাড়িঘরের সমস্ত জিনিসপত্র ফেলে গেছে। আসবাব, কাপড়-চোপড় যেখানে যা ছিল, সব রয়েছে। স্বর্ণসন্ধানী লোকটা যখন শহরে ঢুকেছিল, খাবারের পাত্রও তখন স্টোভে চাপানো। গরম। যেখানে যা থাকার কথা সব কিছুই ছিল, ছিল না কেবল মানুষ। লোকটার কথায় কান দিল না কেউ, রবিনের মুখ থেকে আবার কথা কেড়ে নিল কিশোর। ভাবল, অতিরিক্ত রোদ, ক্ষুধা-তৃষ্ণা আর একাকিত্ব লোকটার মাথার বারোটা বাজিয়ে দিয়েছিল। পাগল হয়ে গিয়েছিল সে। একজন রিপোর্টার তো গিয়েছিল ফ্লেমিং রকে খোঁজ নিতে, মুসা বলল, তাই না? হ্যাঁ, জবাব দিল কিশোর। কয়েকজন অভিযাত্রীকে সঙ্গে দিয়ে নিজের ছেলেকে পাঠিয়েছিলেন একজন খবরের কাগজের সম্পাদক। বেরোনোর জন্যে উপযুক্ত সময় ছিল না সেটা। শীত আসার সময় হয়ে গিয়েছিল। ফলে তুষারপাতের মধ্যে পড়ে গিয়েছিল ওরা। বাড়ি ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছিল। বসন্তকালে আবার চালাল অভিযান। কিন্তু শহরবাসীদের খুঁজে পাওয়া তো পরের কথা, শহরটাই খুঁজে বের করতে পারেনি ওরা। দুনিয়ার বুক থেকে স্রেফ উধাও হয়ে গেল পুরো একটা শহর ভর্তি লোক। মুসা বলল। আশ্চর্য! এখন অবশ্য লোকে ব্যাপারটাকে সিরিয়াসলি নিতে আরম্ভ করেছে, কিশোর বলল। একেকজন একেক কথা বলছে। ইনডিয়ানদের যারা দেখতে পারে না, তাদের বক্তব্য, খুনে ইনডিয়ানরা এসে চড়াও হয়েছিল শহরবাসীর ওপর। মেরেকেটে সাফ করে দিয়ে গেছে ওদের। এটা মেনে নেয়া যায় না। তার কারণ ওই এলাকার আশেপাশে যত ইনডিয়ান বসতি আছে বা ছিল, তাদের কেউই তেমন শত্রু ছিল না শেতাঙ্গদের, ঘৃণা করত না। তা ছাড়া এতবড় একটা ভয়ঙ্কর আক্রমণ চালানোর পর সেটা গোপন করে ফেলা সম্ভব ছিল না কোনমতেই। কেউ বলে প্লেগ ছড়িয়েছে, রবিন থামতে কিশোর বলল। মড়ক লেগে সাফ হয়ে গিয়েছিল পুরো শহর। দুচারজন অধিবাসী অবশিষ্ট যা ছিল তারা মড়ক ছড়ানোর ভয়ে লাশগুলোকে কবর দিয়ে বাড়িঘর সব পুড়িয়ে মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু এ রকম কিছু ঘটলে কোন না কোনভাবে সেটা বাইরের জগতে চলে আসতই, রবিন বলল। এমন একটা খবর চাপা থাকতে পারে না। কিন্তু কারও মুখে কখনও এ ধরনের কোন খবর শোনা যায়নি। আবার কেউ কেউ বলছে আরও অদ্ভুত কথা। সরকার নাকি ওখানে গোপন কোনও গবেষণা চালানোর জন্যে লোকগুলোকে সরিয়ে দিয়েছে অন্য জায়গায়। সেটাও চাপ থাকার কথা নয়। কি গবেষণা, কোথায় সরানো হলো, কিছুই জানা যায়নি কোনদিন। হুঁ, মাথা দোলাল কিশোর। পুরো ঘটনাটাই রহস্যাবৃত থেকে গেল এ শতকের গোড়া পর্যন্ত। তারপর আবার নতুন করে শুরু হলো ফ্লেমিং রক নিয়ে আলোচনা। ঘটনাচক্রে দুজন লোক গিয়ে ঢুকে পড়ল ওই শহরে। পরস্পরকে চিনত না ওরা। বিভিন্ন সময়ে শহরে ঢুকেছিল দুজনে। ফিরে এসে অবিকল এক গল্প বলেছে। দুজনেই শহরটা দেখেছে রাতের বেলা। প্রথমে ওদের চোখে পড়ে একটা আলো, অনেক ওপর থেকে ঝুলছে। আলো দেখে দেখে কাছে গিয়ে দেখে ফ্লেমিং রক হোটেলের টাওয়ারে ঝুলছে একটা লণ্ঠন… থাক থাক, আর বলার দরকার নেই। বাধা দিল মুসা। বলেই করলাম ভুল। এ সব ভূতুড়ে কান্ডকারখানা… মুসার কথা কানে তুলল না কিশোর। তাকে এখন কথার নেশায় পেয়েছে। পেছন ফিরে রবিনের দিকে তাকাল। আর্টিক্যালে কি লিখেছে, মনে আছে না? ওই লোকগুলো ঘরে ঢুকে দেখে এক আজব দৃশ্য। স্বর্ণসন্ধানী লোকটা যা যা বলেছিল, অবিকল এক রকম কাণ্ড। স্টোভে হাঁড়ি চাপানো, খাবার রান্না হচ্ছে। বাড়িঘরের নমুনা দেখে মনে হচ্ছিল মাত্র কয়েক মিনিট আগে বাসিন্দারা জায়গা ছেড়ে গেছে। সবই আছে, নেই কেবল কোন জীবন্ত প্রাণী। মানুষ তো নেইই, একটা কুকুর কিংবা মরুভূমির একআধটা কাঁকড়াবিছেও চোখে পড়ল না তাদের। পুরোপুরি একটা মৃত শহর। এবং তারপর সেই লোক দুজনও মাসখানেকের মধ্যেই রহস্যময় ভাবে উধাও হয়ে যায়, যোগ করল রবিন। আর কোন খোঁজই পাওয়া গেল না তাদের। সে-ই শেষ। এ ঘটনার পর ফ্লেমিং রক দেখে এসেছে বলে দাবি করেনি আর কেউ। গাড়ি রাখতে বলল কিশোর। ব্রেক কষল মুসা। রবিনের দিকে ফিরে তাকাল কিশোর। আমি যা ভাবছি তুমিও কি তাই ভাবছ? মাথা ঝাঁকাল রবিন। মুসার দিকে তাকাল একবার। তারপর আবার তাকাল কিশোরের দিকে। হ্যাঁ। জায়গাটা থেকে যখন দূরে নই আমরা, কিংবা বলা যায় জায়গাটার কাছাকাছি চলে এসেছি, একবার ঢু মেরে গেলে ক্ষতি কি? খাইছে! বলো কি? আঁতকে উঠল মুসা। জেনেশুনে ওই ভূতের শহরে ঢুকব ওদের দলে সামিল হতে? সেটাও তো একটা অভিজ্ঞতা হবে, কিশোর বলল। ভূত দেখার এতবড় সুযোগটা ছাড়ি কেন? নাকি ভোটাভুটি করতে চাও? গণতান্ত্রিক অধিকার? অধিকার আর পাচ্ছি কোথায়? নিমের তেতো করল মুসার কণ্ঠে। তিনজনের মধ্যে দুজনই তো ভোট দিয়ে বসেই আছো যাওয়ার পক্ষে। আমি দিলেই বা কি না দিলেই কি? দিলে একটা জিনিস ভাল হবে, হেসে বলল কিশোর। আমাদের দলে চলে আসতে পারলে। একা একা অন্য দলে থাকাটা কি ঠিক? গীয়ার লিভারে ধরে আবার হ্যাঁচকা টান মারল মুসা। ঝাঁকি দিয়ে চলতে শুরু করল গাড়ি। ওর রাগ দেখে হেসে ফেলল কিশোর। হাইওয়ে থেকে মোচড় দিয়ে পাশের একটা রাস্তায় গাড়ি নামিয়ে আনল মুসা। মাইল তিরিশেক যাওয়ার পর আরেকটা কাঁচা রাস্তায় পড়ল। সোজাসুজি পবর্তের ওপরে উঠে গেছে রাস্তাটা। ভীষণ এবড়োখেবড়ো পথ। প্রচণ্ড ঝাঁকি। এ কি রাস্তা নাকি! বাপরে বাপ! রাস্তা আসলে নয়ও। মাটিতে তৈরি হয়েছে গরুতে টানা গাড়ির চাকার গভীর দুটো খাজ। তার মধ্যে চাকা ফেলে টেনে নিয়ে যেতে হচ্ছে। ভাগ্যিস ফোর-হুইল ড্রাইভ গাড়ি ভাড়া করেছিলাম, কিশোর বলল। নইলে এ রাস্তায় অসম্ভব ছিল চালানো। আর খাবারগুলো তো জোর করেই নিলাম আমি, মুসা বলল। তোমরা তো নিতেই চাচ্ছিলে না। কাজে লাগবে না এখন? কিন্তু কথা হলো, যে রাস্তা দিয়ে গাড়ি চালাতেই এত কষ্ট হচ্ছে, সেটা ধরে গরুর গাড়ি চলে কি করে? নিশ্চয় হাতির সাইজের একেকটা গরু, মন্তব্য করল রবিন। গায়ে দানবের জোর। তবে যা-ই বলো, দারুণ একটা অভিযানের পূর্বাভাস পাচ্ছি। সামনের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আচমকা গুঙিয়ে উঠল মুসা। কি হলো? চমকে উঠল কিশোর। দেখছ না, বৃষ্টি শুরু হয়েছে, শক্ত হাতে স্টিয়ারিং চেপে ধরে রেখে মুসা বলল। এ সব এলাকায় বৃষ্টির মানে জানো? মাটি এত শুকনো আর কঠিন, সহজে পানি শুষে নিতে পারে না। পর্বতের ওপর থেকে গড়িয়ে নামা পানিতে চোখের পলকে বন্যা হয়ে যাবে। ঠিকই বলেছে মুসা। তথ্যটা কিশোরেরও জানা। অন্য চিন্তায় ছিল বলে এদিকে খেয়াল ছিল না তার। এ সব অঞ্চলে বছরে মাত্র কয়েকবার বৃষ্টি হয়। কিন্তু যখন হয়, ঢল নামে। খুলে যায় যেন আকাশটা। মেঘের বুকে যত পানি জমা হয়, যত তাড়াতাড়ি পারে ছেড়ে দিয়ে যেন বাঁচতে চায়। প্রাকৃতিক দুর্যোগের আলামত সবার আগে টের পায় বন্য প্রাণীরা! এতক্ষণ যাদেরকে প্রায় চোখেই পড়ছিল না, এখন তাদেরকেই দেখা যেতে লাগল পালে পালে। পানি থেকে বাঁচার জন্যে উঁচু অঞ্চলের দিকে ছুটে চলেছে ওরা। হরিণ, খটাশ আর অন্যান্য রোমশ প্রাণীদের ছুটতে দেখা গেল উদ্ধশ্বাসে। শুরু হলো প্রবল বর্ষণ। দেখতে দেখতে রাস্তার গভীর খাঁজ দুটো ভরে গেল পানিতে। পূর্ণ গতিতে বিরামহীন ভাবে চলছে উইন্ডশীল্ড ওয়াইপার। কিন্তু কোনমতেই কুলিয়ে উঠতে পারছে না জানালার কাঁচ বেয়ে নেমে যাওয়া পানির প্রবল স্রোতের সঙ্গে। চোখের পাতা সরু করে এনে দৃষ্টি তীক্ষ্ণ করে সেই পানির চাদরের মধ্যে দিয়ে সামনে দেখার চেষ্টা চালাচ্ছে মুসা। একটা উঁচু পাথুরে জায়গায় উঠে এল। গ্র্যাচ করে ব্রেক কষল। বিস্মিত। কিশোর, দেখো দেখো, সামনে ওই যে আলো দেখা যাচ্ছে। চেঁচিয়ে উঠল সে। আরে দুলছে দেখো, রবিনেরও চোখে পড়েছে আলোটা। পাশের জানালার দিকে তাকিয়ে আছে। সেই লোকগুলোর বর্ণনার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে, তাই না? এবং তারপর একদিন রহস্যজনক ভাবে নিখোঁজ হয়ে গেল দুজনে, আনমনে বিড়বিড় করল মুসা। আর কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি ওদের! আলোটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কিশোর বলল, কিসের আলো জানিই না আমরা এখনও। আদৌ ওটা ফ্লেমিং রক শহর কিনা, তাই বা শিওর হচ্ছি কি করে? তা-ও তো কথা। তাহলে কি করব এখন? আগে বাড়ো। কাছে না গেলে তো বোঝা যাবে না। অচেনা জায়গা। রাস্তার অবস্থা ভাল না। খুব ধীরে ধীরে চালাতে শুরু করল মুসা। কিন্তু কিছুদূর গিয়েই ব্রেক কষল আবার। কিশোর, দেখো! ওই যে সাইনবোর্ডটা! ঢোক গিলল সে। মলিন, ভাঙা তক্তাটার দিকে তাকিয়ে রইল ওরা। হেডলাইটের আলোয় পড়া যাচ্ছে খোদাই করা লেখাগুলো: ফ্লেমিং রক অ্যারিজোনা লোকসংখ্যা: ৪৭৭ খাইছে। চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে মুসা। চারশো সাতাত্তর জন নারী-পুরুষ, ছেলেমেয়ে, বাচ্চাকাচ্চা মুহূর্তে গায়েব হয়ে গেল! এ কি বিশ্বাস করা যায়? ঘটনাটা যখন ঘটেছে, না করেই বা কি করব, চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল কিশোর। দেখা যাক, আমরা ওদের খুঁজে বের করতে পারি কিনা। এত বছর পর দেখতে ওদের কেমন লাগবে আল্লাহই জানে। কেমন আর লাগবে? ফাঙ্গাস পড়া কঙ্কাল। গলা কেঁপে উঠল মুসার। কিশোর, আমার ভাল্লাগছে না যেতে। চলো ফিরে যাই। এতখানি এসে আর পিছিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে না, জবাব দিল কিশোর। রবিনের দিকে ফিরল। রবিন, কি বলো? কেমন যেন ভয় ভয় করছে আমার এখন, নিচু স্বরে জবাব দিল রবিন। কিন্তু এতদূর এসে ফিরে যাব? রহস্যটার একটা কিনারা করে যাওয়াই উচিত। চলো, অন্তত ঝুলন্ত আলোটা কিসের দেখে যাওয়া যাক। বৃষ্টি কিছুটা কমে এসেছে। বাতাসের বেগও কম। গ্লাভ কম্পার্টমেন্ট থেকে টর্চ বের করে নিয়ে নেমে পড়ল তিনজনে। এগিয়ে চলল। ঝিরঝিরে বৃষ্টিতে খুব শীঘ্রি একটা বিল্ডিঙের অবয়ব চোখে পড়ল ওদের। ওই যে, ঠিকই আছে, চারপাশে টর্চের আলো ফেলতে ফেলতে কিশোর বল। শহরটাই এটা। ফ্লেমিংরক। আর ওইটা বোধহয় এই হোটেলের টাওয়ার, টর্চের আলো ফেলে দেখাল রবিন। দেখো, আলোটা এখনও ঠিক আগের মতই দুলছে। নাড়াচ্ছে না তো কেউ? সেটা জানতে হলে ওখানে উঠতে হবে, কিশোর বলল। ও-ওখানে উঠবে! সাহস পাচ্ছে না মুসা। হ্যাঁ, নাহলে দেখব কি করে? মুখে বললেও মনে মনে ভয় যে একেবারে পাচ্ছে না কিশোর, তা নয়। হোটেলের বারান্দায় উঠল তিন গোয়েন্দা। লবিতে ঢুকল। কি আছে দেখার জন্যে না থেমে সোজা উঠে এল দোতলায়। সেখান থেকে ছাতে। কাউকে দেখা গেল না সেখানে। লণ্ঠনটা যদি কেউ নাড়িয়েও থাকে, নেই এখন। চলে গেছে। লণ্ঠনটা আছে। কিন্তু আলো নেই। নিবে গেছে। কাঁচটা ছুঁয়ে দেখল কিশোর। এখনও গরম। মেরু বেয়ে ঠাণ্ডা শিহরণ বয়ে গেল তিনজনেরই। ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল মুসা, দেখা তো হলো। এখন কি? লণ্ঠন দুলিয়েছে যে লোকটা, তাকে খুঁজে বের করব, কিশোর বলল। চলো, নিচে চলো। আশেপাশেই কোথাও আছে সে। সিঁড়ি বেয়ে আবার নেমে এল ওরা। সমস্ত হোটেলে খুঁজতে শুরু করল। ডাক দিল কিশোর, এই যে ভাই শুনছেন? কেউ আছেন? জবাব পেল না। একটা জিনিস লক্ষ করল, স্বর্ণসন্ধানী যা যা বলেছিল সব ঠিক। একটা বর্ণও বাড়িয়ে বলেনি। জিনিসপত্র যেখানে যা থাকার সব আছে। কাপড় ঝুলছে আলনা থেকে। বিছানায় পরিষ্কার চাদর পাতা। রান্নাঘরে জ্বলন্ত স্টোভের ওপরে খাবার রান্না হচ্ছে। পরস্পরের দিকে তাকাতে লাগল ওরা। চোখে অবিশ্বাস। কথা বলতে ভয় পাচ্ছে। লবি ধরে যাওয়ার সময় অ্যাশট্রেতে একটা জলন্ত সিগারেটের টুকরো দেখতে পেল। হঠাৎ কানে এল বিচিত্র শব্দ। যান্ত্রিক হাঁস প্যাক-প্যাক করছে। দেখতে পেল ওটাকে। ডাকতে ডাকতে পর্দার নিচ থেকে বেরিয়ে আসছে একটা খেলনা হাঁস। মেঝে ধরে হাস্যকর ভঙ্গিতে হেলেদুলে এগিয়ে এসে মুসার জুতোয় ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেল ওদের পায়ের কাছে। নিচু হয়ে খেলনাটা তুলে নিল কিশোর। কিন্তু আর চালু করতে পারল না। দম দেয়ার চাবিটা নেই। আস্তে করে আবার মেঝেতে রেখে দিল হাসটা। হাত কাঁপছে। কিশোর, মানুষজন আছে এখানে, কম্পিত কণ্ঠে বলল মুসা। জ্যান্ত মানুষ। যারা দম নেয়, কথা বলে, খায়দায়। কিন্তু কোথায় ওরা? অসহায় ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকাল কিশোর। জানি না। তবে খোঁজা বন্ধ করা যাবে না। খুঁজতে থাকল ওরা। পেছনের দরজা দিয়ে এসে হোটেলের রান্নাঘরে ঢুকল। কাদামাখা পায়ের ছাপ দেখতে পেল মেঝেতে। বাইরে থেকে লবিতে ঢোকার পর ওদের যেমন ছাপ পড়েছিল এ ছাপগুলোও তেমনি। বিগফুটের পায়ের ছাপ, রসিকতার চেষ্টা করল রবিন। পাহাড়ী অঞ্চলেই তো থাকে ওরা। হাসল না অন্য দুজন। বিগফুটেরা বুনো, কিশোর বলল। ওরা জুতো পরে না। তা ছাড়া বিগফুট নামেও যেমন বিগ, বাস্তবেও তেমন বড়। ওরা জুতো পরলে ছাপগুলো অনেক বড় হত।এগুলো স্বাভাবিক মানুষের পায়ের ছাপের সমান। পুরো হোটেলটা তন্নতন্ন করে খুঁজল ওরা। সবখানেই মানুষ বসবাসের তাজা চিহ্ন দেখতে পেল, কিন্তু কোন মানুষ চোখে পড়ল না। অবশেষে আবার বেরিয়ে এল বাইরের অন্ধকারে। চারপাশে টর্চের আলো ফেলে দেখতে লাগল কিশোর। কিছু কিছু বাড়ির সামনে কেরোসিনের বাতি আছে, দেখো। চলো, জ্বালাই। রাতের বেলা তো আর কোথাও যাওয়া সম্ভব হবে না। বরং আলো জ্বেলে এই মৃত শহরটারই কোথায় কি আছে দেখি। তাই করি, আর কোন উপায় নেই যখন, রবিন বলল। মুসা কিছু বলল না। তবে কিশোর আর রবিন যখন এগোল, সে-ও চলল ওদের সঙ্গে সঙ্গে। হ্যারিকেন জ্বালানো মোটেও কঠিন হলো না। ঝেড়ে-মুছে ঝকঝকে করে তেল ভর্তি করে রেখে দেয়া হয়েছে। বৃষ্টি থেমে গেছে। কেমন বিষণ্ণ একটা অসুস্থ চাঁদ উঁকি দিল মেঘের ফাঁকে। কিন্তু অস্থির মরুর আবহাওয়া বিদ্যুতের চমক দেখিয়ে, বজ্রের গর্জন তুলে আবারও বৃষ্টির হুমকি দিয়ে চলেছে ওদের। যেন বলতে চাইছে, এত খুশি হওয়ার কিছু নেই। এখনও কাজ শেষ হয়নি আমাদের। গীর্জাটার দিকে এগোল গোয়েন্দারা। হোটেল থেকে মাত্র দুটো বাড়ি পরেই। খুব সাধারণ একটা আয়তাকার বাড়ি। ওপরে ঘূণ্টাঘরের মাথায় দুটো খুঁটি বানিয়ে তাতে ঘণ্টা ঝুলানোর ব্যবস্থা করেছে শহরের স্থানীয় ছুতোর। ওরা গীর্জায় ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে ঘণ্টা বাজতে আরম্ভ করল। বৃষ্টিভেজা রাতের বাতাসে কাঁপা কাঁপা ভূতুড়ে শব্দ ছড়িয়ে দিতে থাকল। আতঙ্কিত হয়ে হুড়মুড় করে গীর্জা থেকে বেরিয়ে এল তিনজনেই। চোখ তুলে ওপরের ঘন্টাটার দিকে তাকাল। বেজেই চলেছে ঘন্টা। অসম্ভব। ইমপসিবল। ফিসফিস করে বলল রবিন। আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। ঘন্টার রশি ধরে টান দিচ্ছে কেউ, ঘন ঘন নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটতে শুরু করল কিশোর। বাতাস নেই যে বাতাসে দোল খেয়ে নিজে নিজে বেজে উঠবে। দুই সহকারীকে নিয়ে আবার গীর্জায় ঢুকল সে। দৌড়ে উঠে এল ঘন্টাঘরে, যাতে ওদের ফাঁকি দিয়ে পালাতে না পারে লোকটা। সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল ঘণ্টা। রশি ধরে টান দিল মুসা। নড়লও না ঘণ্টাটা। বহুকাল ব্যবহার না করলেই কেবল এমন করে অনড় হয়ে থাকে। মনেই হয় না এক মুহূর্ত আগেও বাজছিল ওটা। বিমূঢ়ের মত সিঁড়ি বেয়ে নামছে আবার ওরা, দড়াম করে পেছনে বন্ধ হয়ে গেল ঘন্টাঘরের দরজা। ভীষণ ভাবে চমকে গেল ওরা। বাবাবাবাব্বাতাসে। তাই না কিশোর? মুসা বলল। বাতাস কোথায় দেখলে? কিশোর বলল। বাতাস তো স্তব্ধ। গীর্জার পেছন দিকে চলে এল ওরা। দরজার গায়ে একটা তীর বিদ্ধ দেখে দ্বিতীয়বার চমকানোর পালা। ফ্লেমিং রকের মানুষগুলোকে পাইকারী ভাবে খুন করে গেছে বুনো ইনডিয়ানরা, এ ধারণার কথাটা মনে পড়তেই বরফের মত যেন জমে গেল ওরা। তোতোত্তোমার কি মনে হয়, এটা কোনও ধরনের হুঁশিয়ারি? কিশোরকে জিজ্ঞেস করল মুসা। কিসের হুঁশিয়ারি পাল্টা প্রশ্ন করল কিশোর। তবে মুসাকে নয়, নিজেকেই। ওর বাস্তববাদী মন কিছুতেই অলৌকিক কোন কিছু মেনে নিতে পারছে না। নিজেকেই যেন বোঝাতে লাগল, কোন ধরনের ঠগবাজির শিকার হয়েছি আমরা। সত্যি কথাটা জানা গেলে দেখা যাবে, ব্যাখ্যাটা অতি সহজ। মনে আছে, একবার এক পাগল চিত্রপরিচালকের খপ্পরে পড়েছিলাম? সিনেমার সেট সাজিয়ে আমাদের দিয়ে অভিনয় করিয়ে গোপনে ছবি তুলে নিয়েছিল? এটাও সে-রকম কোন কিছু হতে পারে। সিনেমা কিংবা টিভি নাটকের সেট। হলে তো ভালই হত, রবিন বলল। কিন্তু হোটেলের টাওয়ারে লণ্ঠন জ্বলে থাকা, গীর্জার ঘন্টা বাজানো…কি করে সম্ভব? তার প্রশ্নের জবাব দিতে পারল না কেউ। গীর্জা থেকে বেরিয়ে এসে শহরের রাস্তা ধরে হেঁটে চলল তিন গোয়েন্দা। এরপর কোথায় যাব? মুসার প্রশ্ন। অবশ্যই খুঁজতে, দৃঢ়কণ্ঠে জবাব দিল কিশোর। এর একটা বিহিত করতেই হবে। এত বড় একটা রহস্যের সমাধান না করেই চলে যাব?…এক কাজ করা যাক। তিনজনে মিলে একই জায়গায় খোঁজার চেয়ে ভাগাভাগি হয়ে যাই চলো। তাতে অল্প সময়ে অনেক বেশি জায়গা দেখা হয়ে যাবে। আ-আমি বাপু পারব না। দুই হাত নেড়ে বলল মুসা। একা একা যেতে পারব না আমি। আরে যাও যাও, কিছু হবে না, সাহস দিয়ে বলল কিশোর ভূতে খেয়ে ফেলবে না তোমাকে। না খাক, ঘাড় তো মটকাতে পারে? কথা না বাড়িয়ে যাও তো। কি আছে, তেমন সম্ভাবনা দেখলে গলা ফাটিয়ে চিৎকার শুরু কোরো। তোমাকে উদ্ধার করতে ছুটে যাব আমরা।…মুসা, তুমি ওদিকটা দেখো। আমি ডানে যাচ্ছি। রবিন, তুমি বায়ে। আধ ঘন্টা পর ঠিক এইখানে মিলিত হব আমরা। ঠিক আছে? কারও জবাবের অপেক্ষা না করে হাঁটতে শুরু করল কিশোর। ডান দিকে চলে গেল সে। রবিন চলল বাঁ দিকে। কিশোরের মত অতটা আত্মবিশ্বাস বা সাহস সে দেখাতে পারছে না। তবে কমও দেখাচ্ছে না। মুসা রওনা হলো সোজা। পর পর কয়েকটা বাড়ি-ঘরে ঢুকে খুঁজে দেখল সে। ফ্লেমিং রকের স্বাভাবিক দৃশ্য। স্টোভে আগুন জ্বলছে। কোথাও খাবার রান্না হচ্ছে, কোথাও টেবিলে গরম খাবার সাজানো। ডিনারের সময় খাবার ফেলে চলে গেছে যেন বাসিন্দারা। তারপর স্কুল হাউসটাতে এসে ঢুকল সে। এখানকার সবচেয়ে ভূতুড়ে বিল্ডিং এটা। নিখুঁত ভাবে সাজানো ছোট ছোট ডেস্কের সারি। সেগুলোতে বই খুলে পড়ে আছে। কালির দোয়াতের মুখ খোলা। পাশে কালিতে ভিজানো পালকের কলম। বাতাসে ফড়ফড় করছে খোলা বইয়ের পাতা। ব্ল্যাকবোর্ডের নিচে রাখা চক আর মোছার ন্যাকড়া। টীচারের শেষ মেসেজ লেখা রয়েছে বোর্ডে: মঙ্গলবার, ১৭ সেপ্টেম্বর। তার নিচে আজকের করণীয় শব্দ দুটোর নিচে লেখাপড়ার যে সব ফিরিস্তি রয়েছে, তার মধ্যে ভূত শব্দটা দেখা গেল। খুবই যুক্তিসঙ্গত মনে হলো মুসার কাছে। এখানকার কাণ্ড-কারখানার সঙ্গে ভূতের মিলই সবচেয়ে বেশি। যা সব ঘটছে, কেবল ভূতুড়ে বললেই এ সবের সঠিক ব্যাখ্যা করা সম্ভব। স্কুল থেকে বেরিয়ে এল সে। আরও কয়েকটা বাড়িঘরের পাশ কাটিয়ে এল। ভেতরে ঢোকার প্রয়োজন মনে করল না। বোঝা যাচ্ছে, কেউ নেই ওগুলোতে। ঢুকলে সেই একই রকম দৃশ্য দেখতে পাবে, সেটাও জানা। একটা বড় বাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়ে গেল সে। জেনারেল স্টোর বলে মনে হলো বাড়িটাকে। ঢুকবে কি ঢুকবে না ভাবতে ভাবতে ঢোকার সিদ্ধান্তই নিয়ে ফেলল। মনে হলো এর মধ্যে ফ্লেমিং রক রহস্য সমাধানের কোন সূত্র পাওয়া যেতে পারে। দরজায় ঠেলা দিল সে। কাঁচকোচ করে উঠল কজা। মন বলছে, ঢুকো না, ঢেকো না, পালাও। কিন্তু পালাল না সে। বরং দরজা খুলে ভেতরে পা রাখল। প্রচণ্ড বাড়ি লাগল মাথায়। চোখের সামনে আঁধার হয়ে এল দুনিয়া। জ্ঞান ফিরল এক সময়। মাথার পেছনে ব্যথা। কতক্ষণ বেহুঁশ হয়ে ছিল বুঝতে পারল না। উঠে বসে কপালে হাত বোলাল। হঠাৎ করেই মনে হলো তার, ঘরে একা নয় সে। ধড়াস ধড়াস করতে লাগল বুকের মধ্যে। পাগল হয়ে গেল যেন হৃৎপিণ্ডটা। মাথার পেছনে হাত চলে গেল নিজের অজান্তে। ফুলে উঠেছে জায়গাটা। আঠা আঠা কি যেন লাগল হাতে। রক্ত, কোন সন্দেহ নেই। আবার চিত হয়ে শুয়ে পড়ে চোখ মুদল মুসা। স্পষ্ট অনুভব করছে, ঘরে অন্য কেউ আছে। তাকে যে বাড়ি মেরেছে সেই লোকটা? জ্ঞান ফিরতে দেখলে এখন কি করবে সে? আবার বাড়ি মেরে খতম করে দেবে? আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে মুসা। কিন্তু প্রচণ্ড কৌতূহলের কাছে পরাজিত হলো ভয়। আস্তে করে একটা চোখ মেলল। বেহুশ হয়ে পড়ে যাওয়ার সময় হাত থেকে পড়ে গিয়েছিল টর্চটা। মেঝেতেই পড়ে আছে ওটা এখন। তবে নেভেনি, জলেই আছে। সেই আলোর আভায় ঘরের মধ্যে যতখানি সম্ভব একটা চোখ বোলাল সে। সারি দিয়ে কিংবা স্তূপ করে রাখা হয়েছে নানা রকম পণ্য। পাতলা ধূলোর আস্তর পড়ে আছে সেগুলোতে। আরেকটু দৃষ্টি সরাতেই লোকটাকে চোখে পড়ল তার। নানা ধরনের ক্যান্ডি সাজানো বড় একটা কাঁচের বাক্সের সামনে দাঁড়ানো লোকটা। ইনডিয়ান যোদ্ধা। কোমরের কাছে এক টুকরো কাপড় জড়ানো শুধু, এ ছাড়া সারা গা খালি গলায় রঙিন পুঁতির মালা। হাতে একটা খাটো কুড়াল, ইনডিয়ানদের ভাষায় টমাহক বলে এগুলোকে। কুড়ালটা কোপ মারার ভঙ্গিতে উদ্যত নয়। ঝুলিয়ে রেখেছে নিচু করে। এক হাত থেকে আরেক হাতে কুড়ালটা চালান করে দিল লোকটা। মুসার মনে হলো, বাস্তব নয়, দুঃস্বপ্নের মধ্যে রয়েছে। মনে মনে গুঙিয়ে উঠল সে। খোদা! এটা স্বপ্নই হোক। লোকটার গায়ের রঙ গাঢ় বাদামী। সুগঠিত শরীর। প্রায় চৌকোণা সুন্দর চেহারা। কপালে বাধা ইনডিয়ানদের হেডব্যান্ড, তাতে নীলকান্তমণি খচিত। বেশ রাজকীয় মনে হলো লোকটাকে। তবে ভয়ে মাথা গরম হয়ে যাওয়ার কারণে মুসা লক্ষ করল না, লোকটার ভাবভঙ্গিতে ভয় পাওয়ার মত কিছু নেই। আলতো করে ধরে রাখা টমাহকটার দিকে তাকিয়ে একমনে প্রার্থনা করতে লাগল সে; খোদা, ওই কুড়ালটা নামিয়ে রাখুক লোকটা! পুরো ব্যাপারটাই স্বপ্ন হোক। কিংবা হোক তার গরম হয়ে ওঠা মগজের অতিকল্পনা। এই সময় কথা বলে উঠল যোদ্ধা। খুব ভারী সুনিয়ন্ত্রিত কণ্ঠস্বর। কিন্তু তার মধ্যেও কোথায় যেন একটা গরমিল রয়েছে। কেমন ভূতুড়ে আর নাটকীয় কথাবার্তা, পবিত্র ভূমিতে অনুপ্রবেশ করেছ তোমরা! যেদিন থেকে চুরি গেছে এই ভূমি, সেদিন থেকেই অভিশাপ নেমেছে এখানে, চলবে যতদিন না এখানে ঘাস গজানো বন্ধ হবে। আমার গোত্রের বিরুদ্ধে যে নৃশংসতা প্রদর্শন করেছে বর্বর মাতাল খনিশ্রমিকেরা, তার শাস্তি তাদেরকে পেতেই হবে। ঘরবাড়ি সব তাদের থেকেও যুগ-যুগান্তর ধরে ঘরহারা হয়ে ঘুরে বেড়াতে হবে। উঠে বসল মুসা। হাঁ করে তাকিয়ে রয়েছে লোকটার দিকে। ওকে বাস্তবও লাগছে, আবার অবাস্তবও। কোনমতে বের করে দিল যেন প্রশ্নটা, কিকিক্কি হয়েছিল ওদের? তার প্রশ্নের জবাব দিল না ইনডিয়ান যোদ্ধা। যেন শুনতেই পায়নি। তারমত করে সেই একই স্বরে বলে গেল, তোমাকে আর তোমার দুই বন্ধুকে মাপ করে দেয়া হবে। তবে এক শর্তে। ফিরে গিয়ে এখানে যা যা দেখে গেল সব জানাতে হবে বাইরের পৃথিবীর মানুষকে। যাও, এখন চলে যাও। কেঁপে উঠল মুসা। চলে যাও শব্দ দুটো বড়ই মধুর শোনাল তার কানে। যাওয়ার জন্যে তো সে রেডিই, বরং এ রকম একটা কথা শুনতে পাবে সেটাই আশা করেনি। তবে কিছু বলল না লোকটাকে। হেডব্যান্ড খুলে নিয়ে সাবধানে ভাঁজ করল লোকটা। এগিয়ে গিয়ে রেখে দিল কাউন্টারের ওপর। এটা নিয়ে যাও। তোমাকে দিলাম। তারপর হঠাৎ করেই যেন বাতাসে মিলিয়ে গেল লোকটা। বসেই আছে মুসা। একটা আঙুলও নড়াতে পারছে না যেন। কিশোর আর রবিন এখন কোথায়? এখানে এখন চলে এলে ভাল হত। আরেকটা ভাবনা মাথায় আসতেই চমকে উঠল সে। তাই তো! ওরাও যদি ওরই মত বিপদে পড়ে থাকে? কিংবা তার চেয়ে বেশি বিপদে? কে জানে, হয়তো এ মুহূর্তে তার সাহায্য ওদের ভীষণ প্রয়োজন। লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল সে। পা দুটো দেহের ভর রাখতে চাইছে না। টলমল করে উঠল। পড়ে গেল না। জখমটা মারাত্মক নয়। মাথার পেছনে হাত দিল আবার। শুকিয়ে শক্ত হয়ে গেছে রক্ত। জট বেঁধেছে চুলে। বমিটমি আসছে না। তারমানে শুধু চামড়া কেটেছে, খুলিতে তেমন চোট লাগেনি। ভাঙেনি, কিংবা ফেটেও যায়নি। কি ভাবে লাগল আঘাতটা? টমাহক দিয়ে বাড়ি মেরেছিল ইনডিয়ান যোদ্ধা? উঁহু। তার আচরণে সেটা মনে হয়নি। তা ছাড়া ওই কুড়ালের সামান্য ছোঁয়া লাগলেও ধূলি কেটে দুই ভাগ হয়ে যেত। ভয়ঙ্কর, মারাত্মক অস্ত্র। হতে পারে, বাতাসের ধাক্কায় বন্ধ হতে গিয়ে দরজার পাল্লাই বাড়ি মেরেছে তার মাথায়। টর্চটা তুলে নিল সে। একটা পুরানো আমলের কয়লা তোলার অনেক বড় হাতা পড়ে থাকতে দেখল। এ সব দিয়ে সে-যুগে মানুষ কয়লা নিয়ে গিয়ে ফেলত তাদের ফায়ারপ্লেস আর চুলার মধ্যে। আলোর রশ্মি চারপাশে ঘুরিয়ে আনল সে। ডজনখানেক হাতা ঝুলতে দেখল দরজার পাশের দেয়ালে। একটা হাতা হুক থেকে খুলে পড়ে আছে। হুঁ, আনমনেই মাথা দোলাল সে, মাথায় বাড়ি লাগার রহস্য ভেদ হলো। দরজা খোলার সময় ঠেলা লেগে কোনভাবে হুক থেকে খুলে গিয়েছিল হাতাটা, মাথায় এসে পড়েছে। ফ্রেমিং রকে রাত দুপুরে ঘুরে বেড়ানোর খেসারত। আর আমি ভাবলাম কিনা ভূতের কাণ্ড! কিশোর আর রবিনকে বলা যাবে না এ কথা। হাসাহাসি করবে ওরা। তবে ভূত যে একটা সত্যিই এসেছিল, তাতে কোন সন্দেহ নেই। কাউন্টারের কাছে এসে দাঁড়াল মুসা। হেডব্যান্ডটা পড়ে আছে। দ্বিধা করতে করতে হাত বাড়িয়ে তুলে নিল। জিনিসটা বাস্তব। ভূতুড়ে কিংবা স্বপ্নের মধ্যে হাতে নিয়েছে মনে হলো না। দীর্ঘ একটা মুহূর্ত জিনিসটার দিকে তাকিয়ে রইল সে। তারপর পকেটে ভরল। রওনা হলো দরজার দিকে। বাইরে যখন বেরোল, তখনও মৃদু মৃদু কাঁপছে তার শরীর। মাথার ভেতরটা পরিষ্কার হয়নি পুরোপুরি। বুক ভরে টেনে নিল রাতের ঠাণ্ডা তাজা বাতাস। দপদপ করছে মাথার পেছনটা। চিৎকার করে ডাকল রবিন আর কিশোরের নাম ধরে। কোলা ব্যাঙের স্বর বেরোল। বেশি দূর গেল না তার দুর্বল কণ্ঠ। কোন জবাবও এল না। আবার ডাকল সে। এটুকু পরিশ্রমেই বে করে চক্কর দিয়ে উঠল মাথা। ঘোলাটে হয়ে গেল দৃষ্টি। ভুলভাল দেখতে আরম্ভ করল। অন্ধকারে বহু লোকের জ্বলন্ত চোখ দেখতে পেল। তাদের কণ্ঠস্বর, কথাবার্তা কানে আসছে যেন। মনে হচ্ছে তাকে ঘিরে রেখেছে সবাই। হাঁটাচলা করছে আশপাশ দিয়ে। মাথা ঝাড়া দিয়ে মাথার ভেতরের মাকড়সার জালের মত ঘোলাটে ভাবটা ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করল সে। লক্ষ করল, যে চোখগুলোকে এতক্ষণ মানুষের চোখ মনে করেছে, সেগুলো আসলে মরুভূমির নিশাচর প্রাণীর চোখ। ওদের ডাক, হাঁটাচলার শব্দকে ভেবেছে মানুষের শব্দ। খাবার খুঁজে বেড়াচ্ছে অসংখ্য কাঠবিড়ালী আর ইঁদুর। হুটোপুটি করছে। আশ্চর্য! মানুষের ঘোলাটে মগজ কত অসম্ভব দৃশ্যই না দেখিয়ে ছাড়ে। বাস্তব জিনিসগুলোকে কি ভাবে অবাস্তব করে তোলে। বেরিয়ে এসে আবার চিৎকার করে রবিন আর কিশোরের নাম ধরে ডাকল। সাড়া পেল না এবারেও। গেল কোথায় ওরা? কোথায় গিয়ে বিপদে পড়ল? না পাওয়া পর্যন্ত খুঁজতে হবে। প্রতিটি ঘরে ঢুকে দেখতে হবে। খুঁজে বের করতেই হবে ওদের। * রবিনও ওদিকে বাড়ির পর বাড়ি খুঁজে চলেছে। আলো ফেলে ফেলে দেখছে। নতুন কিছুই চোখে পড়ল না। ফ্লেমিং রকের সেই একই রকম স্বাভাবিক দৃশ্য। তাই বলে খোঁজায় বিরতি দিল না। জেদ চেপে গেছে তার। এই রহস্যের কিনারা করতেই হবে। বড় আরেকটা ঘরে ঢুকল সে। একটা সেলার দেখতে পেল এখানে। মাটির নিচের ঘর। ঢোকার দরজা একটাই, কিন্তু বড় বড় দুটো পাল্লা রয়েছে তাতে। ভেতরে ঢুকে দেখবে ঠিক করল। দরজা দুটো খুলতে বেশ কষ্ট হলো। ভারী কাঠের পাল্লা। মরচে পড়ে আড়ষ্ট হয়ে আছে কজা। উঁকি দিয়ে দেখল রবিন। নানা রকম যন্ত্রপাতি, পুরানো কাঠের টুকরো, আর কিছু ভাঙা আসবাবপত্র পড়ে আছে ঘরটাতে। ঢুকে পড়ল সে। পরক্ষণেই বরফের মত জমে গেল। পা দিয়ে বসার পর বুঝতে পারল কিসের গায়ে পা দিয়েছে। সাপ। সাপটাও তার মতই চমকে গেছে। কুণ্ডলী পাকিয়ে দরজার কাছে পড়ে ছিল। অন্ধকারে বিশ্রাম নিচ্ছিল বোধহয়। টর্চের আলোয় চকচক করছে খুদে খুদে দুটো চোখ। ডায়মন্ডব্যাক র‍্যাটলার। ফণার পেছনে হীরার টুকরোর মত ছাপ মারা বলেই এ রকম নাম দেয়া হয়েছে। র‍্যাটলম্নেককে সংক্ষেপ কবে বলা হয় ব্যাটলার। ভাগ্য ভাল, সাপের গায়ে পায়ের পুরো চাপ পড়েনি। কেবল ছোঁয়া লেগেছে। পা ফেলতে গিয়ে টের পেয়েই মাঝপথে যে ভাবে ছিল সেভাবেই রেখে দিয়েছে পাটা। চাপ লাগলে এতক্ষণে শিওর ছোবল মেরে বসত। ডায়মন্ড র‍্যাটলারের ছোবল খাওয়ার অর্থ নিশ্চিত মৃত্যু। দরদর করে ঘাম ঝরতে শুরু করল কপাল বেয়ে। পাথরের মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে রবিন। কানে আসছে হুটোপুটির শব্দ। ঘরের মধ্যে দৌড়াদৌড়ি করছে অসংখ্য ইঁদুর। এ রকম একটা খুনে সাপের সঙ্গে বাস করে এখনও বেঁচে আছে কি করে ইঁদুরগুলো ভেবে অবাক লাগল তার। একটা ইঁদুর দৌড়ে এসে ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে গেল সাপটার ফুটখানেক দূরে। চকচকে চোখ মেলে এক মুহূর্তের জন্যে তাকিয়ে দেখল সাপ আর রবিনের হাতের আলো দুটোকেই। তারপর বিরাট এক লাফ দিল সরে যাওয়ার জন্যে। চোখের পলকে ছোবল মারল সাপটা। কিন্তু মিস করল। নিরাপদে ইঁদুরটা চলে গেল ঘরের কোণে। সুযোগটা রবিনও হাতছাড়া করল না। ছোবল মারতে গিয়ে সাপের মুখটা বেশ খানিকটা দূরে সরে গিয়েছিল। রবিনের পায়ের দিকেও নজর ছিল না। ইঁদুরের মত অতটা না হলেও, বেশ বড়সড় একটা লাফ দিয়েই রবিনও পিছিয়ে চলে এল। একটা সেকেন্ডও আর দেরি করল না ওখানে। দৌড়ে বেরিয়ে এল ঘর থেকে। * একই ভাবে বাড়িঘরের মধ্যে খুঁজতে খুঁজতে শহরের জেলখানার কাছে এসে দাঁড়াল কিশোর। ঢুকে পড়ল ভেতরে। সামনের দিকের একটা বড় ঘরকে বানানো হয়েছে অফিস আর ওয়েইটিং কম। পেছনে আসামী রাখার দুটো ঘর। দেয়ালে দেয়ালে আলো ফেলে দেখতে লাগল কিশোর। এক জায়গায় লেখা রয়েছে: গ্র্যাফিটি, ১৮৩০ স্টাইল। বেশির ভাগ শব্দই ইনডিয়ান, ড্রয়িংগুলোও তাই। আপনমনেই বিষণ্ন হাসি হাসল কিশোর। লিখে অভিশাপ দেয়া হয়েছে নিশ্চয়। ড্রয়িং একে শেতাঙ্গ জবরদখলকারীদের জাদু করে তাদের শাস্তি দিতে চেয়েছে। বোঝা গেল এই জেলখানা তৈরি হয়েছে মূলত ইনডিয়ানদের তরে রাখার জন্যেই। ইতিহাসে পড়েছে, প্রচুর শয়তানি আর চালাকি কছিল ততকালীন শেতাঙ্গরা। সস্তা মদ খাইয়ে প্রথমে মাতাল করেছে ইনডিয়ানদের। মাতাল অবস্থায় তাদেরকে দিয়ে অপরাধ করিয়েছে। তারপর আসামী করে এনে ভরে রেখেছে জেলখানায়। আটকে থাকার সুযোগে দখল করে নিয়েছে ওদের বাড়িঘর, জমিজমা সব। প্রথম সেলটায় এসে ঢুকল সে। কানে এল পেছনে দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার শব্দ। চরকির মত পাক খেয়ে ঘুরে দাঁড়াল। খোলার চেষ্টা করল দরজাটা। অনড় রইল পাল্লা। জেলখানার ভেতরে আটকা পড়ল সে। আশেপাশে মানুষ তো দূরের কথা, একটা প্রাণীকেও চোখে পড়ল না তার। সামান্যতম বাতাসও ঢুকছে না যে বাতাসে ধাক্কা দিয়ে দরজা লাগাবে। তাহলে? মেরুদণ্ডে শীতল শিহরণ বয়ে গেল তার। শেষে আর কোন উপায় না দেখে মুসা আর রবিনের নাম ধরে গলা ফাটিয়ে চিৎকার শুরু করল। কিন্তু কোন জবাব এল না। সাড়া এল না কারও কাছ থেকে। শহরের দূরতম প্রান্তে চলে এসেছে সে। এখান থেকে তার চিৎকার কারও কানে পৌঁছবে না। আরেকটা ভাবনা মাথায় আসতে শঙ্কিত হয়ে পড়ল সে। ওরা দুজনও কোন রকম দুর্ঘটনার শিকার হয়নি তো? নিজের চেয়ে ভয়টা ওদের জন্যে বেশি বেড়ে গেল তার। সে নিজে আটকা পড়েছে জেলখানায়। ওরাও যদি কোথাও এমন করে আটকে পড়ে, কেউ বাঁচাতে আসবে না ওদের। কেউ কাউকে মুক্ত করতে পারবে না। ফ্লেমিং রকের অভিশাপের শিকার কি ওরাও হতে যাচ্ছে? * ডাকতে ডাকতে জেলখানার কাছে চলে এসেছে মুসা। রবিনও জায়গামত গিয়ে কিশোর আর মুসাকে না পেয়ে এদিকেই আসছে। মুসার ডাক কানে ঢুকতেই ছুটতে শুরু করল সে। জেলখানার আরও কাছে আসার পর ক্ষীণ একটা ডাক কানে এল মুসার। কান পেতে শুনল কোনদিক থেকে আসছে। দৌড় দিল জেলখানার দিকে। আবার ডাকতেই আবারও সাড়া এল। কথাগুলো বুঝতে পারল এবার। কিশোর বলছে, মুসা, আমি এখানে। জেলখানার দরজার দিকে দৌড় দিল সে। একছুটে ঢুকে পড়ল ভেতরে। কিশোরকে গরাদের ওপাশে দেখে থমকে গেল প্রথমে। তারপর হাসতে শুরু করল। হাসির কি হলো। যসির কি হলো? ভুরু নাচাল কিশোর। আগে বের করো আমাকে। তারপর যত খুশি হেসে। ওই যে, তোমার মাথার পেছনে দেয়ালে ঝোলানো রয়েছে চাবি। মুসা ঘুরে দাঁড়ানোর আগেই ঢুকে পড়ল রবিন। কিশোরের শেষ কথাটা কানে গেছে তার। দেয়াল থেকে চাবি খুলে নিয়ে সেলের দরজা খুলতে এগোল। দরজার তালায় চাবি ঢোকাল সে। মোচড় দিল। দেখে, তালাটা খোলা। ঠেলা দিতেই পাল্লাটাও খুলে গেল। অবাক হয়ে তাকাল কিশোরের দিকে। তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেল নাকি? দরজা তে খোলাই আছে। হাঁ করে ওর দিকে তাকিয়ে রইল কিশোর। বিমূঢ়ের মত মাথা নাড়তে নাড়তে বলল, ছিল না। এক মিনিট আগেও ছিল না। তোমরা মনে করেছ আমি চেষ্টা করিনি? বহু ভাবে চেষ্টা করে দেখেছি, খুলতে পারিনি। ঢুকলে কি ভাবে? জিজ্ঞেস করল মুসা। দেয়ালে টর্চের আলো ফেলে দেখতে দেখতে ঢুকে পড়লাম, কিশোর বলল আমি ঢুকতেই পেছনে আপনাআপনি লেগে গেল দরজাটা। আশেপাশে কেউ ছিল না। বাতাস ছিল না। কি ভাবে বন্ধ হলো, জিজ্ঞেস কোরো না আমাকে। জবা দিতে পারব না। জিজ্ঞেস আমি করবও না, বিড়বিড় করে বলল মুসা। কারণ আমি জানি দরজাটা কে বন্ধ করেছে! দেয়ালের অবস্থা দেখো, টর্চের আলো ফেলল কিশোর। কি সব লিখে রেখেছে। মানে করতে পারবে এ সবের? শব্দগুলো কিছুই বুঝলাম না। তবে ড্রয়িংগুলোর মানে বোঝা যাচ্ছে। দেখার জন্যে তো ভেতরে ঢুকতে হবে, মুসা বলল। এখান থেকে দেখতে পাচ্ছি না দেয়ালের লেখা। আমি ঢুকতে পারব না। আবার যদি লেগে যায় দরজাটা? তা-ও তো কথা, চিন্তিত ভঙ্গিতে মাথা দোলাল কিশোর। রবিন বাইরে থাকলে অবশ্য খুলে দিতে পারবে। দেখা গেল রবিনও খুলতে পারল না, তখন? ভূতের ওপর বিশ্বাস নেই। ওর কোন যুক্তি মেনে চলে না। তালা আটকে দিলে তখন আর বেরোনোর জো থাকবে না। থাক তাহলে, ঢোকার দরকার নেই, বেরিয়ে আসতে আসতে বলল কিশোর ঝুঁকি নিতে রাজি নয়। বসার ঘরের দেয়ালেও প্রচুর লেখা আছে। ঘরের প্রতিটি দেয়ালে, প্রতিটি কোণে আলো ফেলে ফেলে দেখল ওরা। একট লেখায় আলো ফেলে থেমে গেল রবিন। জোরে জোরে পড়তে আরম্ভ করল আজকের দিনে, সাদা মানুষদের ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ৩ এপ্রিল ১৮৭২ সালে ছয়জন ইনডিয়ান যোদ্ধাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়েছে ঘোড়া চুরি অপরাধে, যে অপরাধটা করেইনি ওরা। আগামীকাল আমরা যাচ্ছি আমাদের ভাইদের সঙ্গে সাদা মানুষের দেয়া বিচারের রায়ে মৃত্যুদণ্ড ভোগ করতে। শিরচ্ছে করে হত্যা করা হবে আমাদের। এই অন্যায়ের বিচার হবে, এর শাস্তি ভোগ করতেই হবে ওদের। পুরো ফ্লেমিং রকের ওপর নামবে চিরকালের অভিশাপ। স্বর্গ থেকে নেমে আসবেন মহান প্রেত, এই অন্যায়ের বিচার করতে। আমাদের মহান পিতৃভূমি থেকে বিতাড়িত করবেন সাদা মানুষরে, সেই সব ভূমি, যেগুলো ফেঁড়ে কেটে খনি বানিয়েছে ওরা, তছনছ করে ছেড়েছে। ফ্লেমিং রককে মহাকাশের কালে শূন্য গর্ভে বিলীন করে দেবেন মহান প্রেত। ফ্যানটাস্টিক। চিৎকার করে উঠল কিশোর। পকেট থেকে নোটবুক আর পেন্সিল বের করে দ্রুত টুকে নিল কথাগুলো। তারপর চোখ পড়ল দেয়ালের লিখনের ওপর, যেটা থেকে পড়েছে রবিন। দুর্বোধ্য ইনডিয়ান ভাষা দেখে চোখ কপালে উঠল তার। রবিন। কণ্ঠস্বর ফিসফিসানিতে নেমে এল কিশোরের, কি করে পড়লে তুমি? তোমার তো এই ইনডিয়ান ভাষা জানার কথা নয়। মাথা ঝাড়া দিয়ে মগজের ভেতর থেকে কি যেন দূর করতে চাইল রবিন। কি জানি। মনে হলো, কে যেন আমার ভেতরে ঢুকে লেখাগুলোর মানে করে দিল ইংরেজিতে। আশ্চর্য! কথাগুলো বানিয়ে বলোনি তো? উঁহু, মাথা নাড়ল মুসা, বানিয়ে বলেনি ও। এ ধরনের অভিশাপের কথা একটু আগে আমিও শুনে এলাম। একজন ইনডিয়ান যোদ্ধার মুখে। কার মুখে? ইনডিয়ান যোদ্ধা। জেনারেল স্টোরে গিয়ে ঢুকেছিলাম। দরজার পাশে ঝোলানো কয়লার হাতারবাড়ি খেয়ে বেহুশ হয়ে গেলাম। হুঁশ ফিরলে দেখি একজন ইনডিয়ান যোদ্ধা হাতে টমাহক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটু দূরে। ও আমাকে জানাল ফ্লেমিং রকে ইনডিয়ানদের ওপর শ্বেতাঙ্গদের অত্যাচারের কারণে অভিশাপ নেমেছে তাদের ওপর। চিরকালের জন্যে অভিশপ্ত হয়ে থাকতে হবে তাদের। কোনদিন রেহাই পাবে না। মুক্তি পাবে না এভিশপ্ত অবস্থা থেকে। সে আমাকে শর্ত দিয়েছে, এ সব কথা যদি বাইরের দুনিয়াকে জানার কথা দিই, তাহলে এখান থেকে মুক্তি পাব আমরা। তারপর? লোকটা কই? উধাও হয়ে গেল। স্রেফ মিলিয়ে গেল বাতাসে। তারমানে..তারমানে, বিশ্বাস করতে পারছে না কিশোর, সত্যিই একটা ভূত দেখেছ তুমি? হ্যাঁ। সে যে এসেছিল, তার প্রমাণও আছে আমার কাছে। পকেট থেকে হেডব্যান্ডটা টেনে বের করল মুসা। আমাকে এটা উপহার দিয়ে গেছে সেই ইনডিয়ান যোদ্ধা। হেডব্যান্ডটা হাতে নিয়ে দেখতে লাগল কিশোর। কেমন বিমূঢ়ের মত হয়ে গেছে। অবিশ্বাস্য। অনেকক্ষণ পর মুখ খুলল সে। দুই সহকারীর দিকে তাকাল। বিশেষ করে মুসার দিকে। আর কি করতে বলেছে সে? এখান থেকে চলে যেতে। আমি আর রবিন থাকি, তুমি গিয়ে শেরিফকে ডেকে নিয়ে এসো। না, জোরে জোরে মাথা নাড়ল মুসা। সেটা বোধহয় ঠিক হবে না। সকাল হলে দেখা যাবে শহরটাই নেই, আবার গায়েব। বোকা বনতে হবে তখন আমাদের। তা ছাড়া শেরিফকে ডাকাডাকি করতে গেলে সেই ইনডিয়ান যোদ্ধা রেগে গিয়ে ক্ষতি করে বসতে পারে আমাদের। গম্ভীর ভঙ্গিতে মাথা দোলাল কিশোর। কি যেন ভাবছে। হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে উঠল মুখ। আরেক কাজ করি না কেন? চলো, গাড়িতে গিয়ে বসে থাকি। কাটিয়ে দিই রাতটা। ভোরের আলো ফুটলে যদি দেখি তখনও রয়েছে শহরটা, ছবি তুলে নেব পটাপট। তাতে প্রমাণ করতে পারব, ফ্লেমিং রক নামে একটা শহর সত্যিই ছিল এক সময়। দারুণ। চমৎকার! একমত হয়ে মুঠো ঝাঁকাল রবিন। চলো, বেরিয়ে যাই, তাগাদা দিল মুসা। এ শহরে থাকতে আর একটা মুহূর্তও ইচ্ছে করছে না আমার। * নিরাপদেই গাড়িতে ফিরে এল ওরা। আধো ঘুম আধো জাগরণের মাঝে কোনমতে কাটিয়ে দিল রাতটা। সকাল হলো। আলো ফুটল। সূর্য উঠল। তারপরেও যখন শহরটা মিলাল না, কেন যেন খানিকটা হতাশই হলো ওরা। গ্লাব কম্পার্টমেন্ট থেকে ৩৫এম এম ক্যামেরাটা বের করল কিশোর। প্রায় পুরো ফিল্মটাই খরচ করে ফেলল রহস্যময় শহরটার ছবি তুলে। টেলিফটো লেন্স লাগিয়ে হোটেল, জেনারেল স্টোর, স্কুলহাউস, গির্জা, জেলখানার ছবি তুলল। যাক, হয়ে গেল কাজ, সন্তুষ্ট হয়ে ক্যামেরাটা রেখে দিল সে। এখন আর লোকে অবিশ্বাস করতে পারবে না আমাদের। কিন্তু মুসার মুখে হাসি নেই। এ শহরের গল্প তো গিয়ে আগেও লোকে বলেছে। লাভটা হয়েছে কি? মাঝখান থেকে নিজেরাই গায়েব। আমাদের বেলায়ও যদি সেরকম কিছু ঘটে? ঘটবে না, কিশোর বলল। তোমার ইনডিয়ান ভূত-বন্ধুটি তো শর্তই দিয়েছে, শ্বেতাঙ্গদের অত্যাচারের কথা বাইরের দুনিয়াকে গিয়ে জানালে ছেড়ে দেবে আমাদের। আমার ধারণা, বেঁচে থাকতে ভাল লোক ছিল লোকটা। আমাদের ওপর সুনজর আছে তার। অবাক হয়ে কিশোরের দিকে তাকাল রবিন। এ সব ভূতপ্রেতের কথা তুমি বিশ্বাস করছ? করতে ইচ্ছে করছে, জবাব দিল কিশোর। কি করব বলো? হয়তো ফ্লেমিং রক শহরটাই এর জন্যে দায়ী। যাক, খুশি হলো মুসা, ভূত সম্পর্কে তোমার মানসিক অবস্থার পরিবর্তনে আমি খুশি। বেশি খুশি হয়ো না, সাবধান করল রবিন। আবেগের বশে এখন বলছে বটে, বাড়ি গিয়েই দেখবে বদলে গেছে। ইঞ্জিন স্টার্ট দিল মুসা। রাস্তার খাঁজকাটা সেই দাগে চাকা ফেলেই চালাতে হলো গাড়ি। দিনের বেলা এখন ভালমত দেখতে পারছে চারপাশটা। পথ কোথাও উঁচু কোথাও নিচু। কোথাও পাহাড়ের ওপর দিয়ে গেছে, কোথাও উপত্যকা ধরে। একটা পাহাড়ের মাথায় গাড়ি উঠলে শেষবারের মত ফ্লেমিং রককে দেখার জন্যে ফিরে তাকাল কিশোর। মুসা! রবিন। চিৎকার করে উঠল সে। শহরটা নেই। ব্রেক প্যাডালের ওপর প্রায় দাঁড়িয়ে গেল মুসা। ঝাঁকি খেয়ে থেমে গেল গাড়ি। সে আর রবিন একই সঙ্গে ঘুরে তাকাল, দেখার জন্যে। সত্যিই নেই শহরটা। * হুঁ, ভূতুড়েই। দিন কয়েক পর ঘটনাটার কথা শুনে বলল ওদের বন্ধু টম। কিংবা টাইম-ডিসটশন জাতীয় কোন কিছুর খপ্পরে পড়েছিলাম, কিশোর বলল। কিছুক্ষণের জন্যে কোনও ধরনের স্পেস হোলেও ঢুকে গিয়ে থাকতে পারি আমরা। শেরিফকে দেখিয়েছ ছবিগুলো? কোত্থেকে দেখাব? ওঠেইনি। মানে? তুমি নিজের হাতে তুলেছিলে বলেছ। হ্যাঁ, বলেছি। কিন্তু একটা ছবিও স্পষ্ট হয়নি। সব ঘোলা। একটু দুরে সোফায় বসে নীরবে তাকিয়ে রয়েছে মুসা আর রবিন। ওদের দিকে একবার তাকিয়ে টমের দিকে চোখ ফেরাল কিশোর। শহর তো দূরের কথা, আশেপাশের পাহাড়-পর্বত, আকাশ কোন কিছুই ওঠেনি। তাহলে ব্যাখ্যাটা কি এর? প্রশ্ন করল বিমূঢ় টম। এমন হতে পারে না, পত্রিকায় লেখাটা পড়ে ফ্লেমিং রক গেঁথে গিয়েছিল তোমাদের মগজে, তারপর রাতবিরেতে দুর্যোগের মধ্যে ওই পাহাড়ের ওপরে গাড়িতে বসে পুরো ব্যাপারটাই কল্পনা করে নিয়েছ তোমরা? তিনজনের অবিকল এক রকম কল্পনা? পকেট থেকে হেডব্যান্ডটা টেনে বের করল মুসা। তা ছাড়া এটা কি? কল্পিত জিনিস কি বাস্তবে আসতে পারে? দেখতে তো জিনিসটা নতুনই লাগছে, টম বলল। কয়েক বছরের বেশি ব্যবহার করেনি। হ্যাঁ, তাই, মাথা ঝাঁকাল মুসা। ভেতরের দিকটায় অ্যাপাচি ইনডিয়ানদের কিছু শব্দ লেখা রয়েছে। একজন ইনডিয়ান বন্ধুর কাছে নিয়ে গিয়েছিলাম অনুবাদ করানোর জন্যে। তাতে যার নামটা লেখা রয়েছে তিনি একজন ইনডিয়ান সর্দার। ফ্লেমিং রকে খুন করা হয়েছিল তাঁকে এপ্রিলের চার তারিখে, আঠারোশো বায়ার সালে। মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল শ্বেতাঙ্গ খনিশ্রমিকেরা। মুসার হাত থেকে হেডব্যান্ডটা নিয়ে দেখতে লাগল টম। ভেতরের লেখাটা দেখে বলল, যদূর জানি, ইনডিয়ানরা লেখার জন্যে এ ধরনের কালি ব্যবহার করে না। তারমানে বোকা বানানো হয়েছে তোমাদের। উঁহু, মাথা নাড়ল রবিন। বোকা বানানো হয়নি। ইনডিয়ানরা সাদা মানুষের কালি ব্যবহার করত সেখানে। সাদা মানুষদের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর। তারপরেও সন্দেহ নিরসনের জন্যে সব রকম পরীক্ষা আমরা চালিয়েছি। একজন কেমিস্টের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ব্যান্ড। কালি পরীক্ষা করে তিনি জানিয়েছেন, দেখতে নতুনের মত লাগলেও এ ধরনের কালি উৎপাদন আঠারোশো আশি সালের পরে একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে। জবাব হারাল টম। কিশোরের দিকে তাকাল। যে দুটো লোক তোমাদের আগে ফ্লেমিং রকে গিয়েছিল, তাদের কি হয়েছে কোন খোঁজ পেয়েছ? নাহ। ওরা স্রেফ নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে। কোন সূত্র রেখে যায়নি। ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলল টম। উঠে রওনা হলো টেলিফোনের দিকে। কোথায় যাচ্ছ? জিজ্ঞেস করল কিশোর। চেনাজানা সবাইকে ফোন করে জানিয়ে দিতে, জবাব দিল টম, যাতে সর্বক্ষণ নজর রাখে তোমাদের ওপর। আমরা যারা ফ্লেমিং রকে যাইনি তাদের কাউকে সঙ্গে না নিয়ে কিছুদিন বেরোতে পারবে না তোমরা। বলা যায় না, কখন গায়েব হয়ে যাও। . কাকতাড়ুয়া ইঞ্জিনে বোধহয় কোন সমস্যা হয়েছে, মুসা, বিরক্তকণ্ঠে বলল কিশোর পাশা। পিকনিক করতে পাহাড়ে গিয়েছিল তিন গোয়েন্দা। সারাদিন ওখানেই ছিল। এখন বাড়ি ফিরছে। সাঁঝ ঘনিয়েছে। আকাশে প্রকাণ্ড থালার মত চাঁদ। রাস্তার পাশের যব খেত ঝলমল করছে চাঁদের আলোয়। মনের আনন্দে গাড়ি চালাচ্ছিল মুসা, হঠাৎ ইঞ্জিনে গোলমাল। থেমে গেছে গাড়ি। গ্যাস পেডালে চাপ দিল মুসা। ইঞ্জিনে কোন সাড়া নেই। হতাশ ভঙ্গিতে এদিক-ওদিক মাথা নাড়ল সে। মাঝ রাস্তায় এমন ঝামেলার কোন মানে হয়। একশো মাইলের মধ্যে কোন মানুষজন আছে বলে তো মনে হয় না। হঠাৎ বিদঘুটে আওয়াজ করে উঠল ইঞ্জিন। তারপর চুপ। গাড়ি থেকে নেমে পড়ল ওরা। স্পোর্টস সেডানটাকে ঠেলতে ঠেলতে রাস্তার ধারে একটা খাদের কাছে নিয়ে এল। টর্চ লাইট দিয়ে ইঞ্জিন পরীক্ষা করে দেখল। স্টার্ট দেয়ার চেষ্টা করল আরেকবার। লাভ হলো না। বৃথা চেষ্টা। হাল ছেড়ে দিল কিশোর। গ্যারেজে নিয়ে যেতে হবে। ঠেলে তো আর নিতে পারব না, মুসা বলল। রশি বেঁধে টেনে নিতে হবে। কিন্তু এখানে গ্যারেজ কই? চারদিকে চোখ বোলাল রবিন। উত্তেজিত গলায় বলে উঠল, ভাগ্যটা ভালই বলতে হবে, কিশোর। ওই দেখো, মাঠে একজন লোক। চাষা-টাষা হবে হয়তো। ওকে জিজ্ঞেস করে দেখা যেতে পারে, গ্যারেজ কোথায় আছে। গাড়িটাকে টেনে নেয়ার ব্যবস্থাও হয়তো করতে পারবে। হাত দিয়ে যব খেত দেখাল মুসা। মাঠের মাঝখানে লম্বা একটা আকৃতি দেখতে পেল কিশোর। দাঁড়িয়ে আছে। মানুষই মনে হচ্ছে। দূর থেকে ভাল বোঝা যাচ্ছে না। চলো, লোকটার কাছে যাই, প্রস্তাব দিল মুসা। পরামর্শটা মনে ধরল কিশোরের। রাস্তা পার হয়ে মাঠে নেমে পড়ল তিনজনে। এখানে ওখানে খোঁড়া গর্ত। চাষ করা জমিন। মাঠের মাঝখানে চলে এল ওরা। এখানেই দাঁড়িয়ে আছে লোকটা। ঠিক এই সময় কালো মেঘের আড়ালে ঢাকা পড়ে যেতে লাগল চাঁদ। তবে লোকটাকে দেখতে অসুবিধে হলো না কারও। চেহারা দেখে মুখ হাঁ হয়ে গেল ওদের। লোকটার মাথায় বালতির মত উঁচু হ্যাট, গায়ে ছেঁড়াখোঁড়া কালো কোট প্যান্ট, পায়ে কালো জুতো। কালো চোখে কটমট করে তাকিয়ে আছে ওদের দিকে। লম্বা, বাঁকানো নাক, মুখটা অস্বাভাবিক সাদা। লম্বা হাত সোজা সামনে ধরে রেখেছে। বাঁকা আঙুল। যেন শিকারী পাখির নখওয়ালা থাবা। গা ছমছম করে উঠল মুসার। কিশোরের মনে হলো শিরদাঁড়া বেয়ে ঠাণ্ডা পানির স্রোত নামছে। রবিনেরও কেমন যেন লাগতে লাগল। নিজেদের অজান্তেই কয়েক পা পিছিয়ে গেল ওরা। চাঁদকে গ্রাস করে ফেলেছে প্রকাণ্ড কালো মেঘটা। অন্ধকার হয়ে এল চারপাশ। চোখ কুঁচকে তাকাল দুই গোয়েন্দা। লোকটাকে দেখার চেষ্টা করছে। অদ্ভুত লোক, বিড়বিড় করল মুসা। বাজি ধরে বলতে পারি ব্যাটা কোন ভূতুড়ে বাড়িতে থাকে। আশপাশে আর কাউকে দেখতে পাচ্ছি না, ফিসফিস করল কিশোর। অদ্ভুত মনে হলেও ওর কাছেই সাহায্য চাইতে হবে। পা বাড়াল কিশোর। তার সঙ্গে রবিন। মুসা লোকটার কাছে গিয়ে বলল, এই যে ভাই, আমাদের গাড়িটা হঠাৎ নষ্ট হয়ে গেছে। ওটাকে গ্যারেজে নিয়ে যাবার জন্যে সাহায্য দরকার। কোন জবাব নেই। বাতাস শব্দ তুলে বয়ে গেল যব খেতের ওপর দিয়ে। বুক ঢিবঢিব করছে ওদের। ভয় লাগছে। এখানেই থাকি, নিচু গলায় বলল মুসা। লোকটাকে চিনি না আমরা। জানি না কোন বদ মতলব আছে কিনা তার। পিছু ঘুরলেই যদি ঘাড়ের ওপর লাফিয়ে পড়ে! কিন্তু লোকটা গেল কোথায়? হিসিয়ে উঠল মুসা। এত অন্ধকার! ব্যাটা আমাদের পেছনে ঘাপটি মেরে নেই তো? ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাল ও। হঠাৎ মেঘের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল চাঁদ। আবার আলোর বন্যায় ভেসে গেল যব খেত। ভৌতিক চেহারাটাকে এবার পরিষ্কার দেখা গেল। ওটা একটা কাঠের খুঁটির গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হ্যাঁটের নিচে বেরিয়ে পড়েছে খড়। বাঁকানো আঙুলগুলো তারের তৈরি। সাদা মুখটা রং করা। কাকতাড়ুয়া! দারুণ অবাক কিশোর। একটা কাকতাড়ুয়ার ভয়ে মরছি আমরা! কিন্তু ওটাকে অবিকল মানুষের মত লাগছে, বলল মুসা। এমন নিখুঁত জিনিস বানাল কে? ভয়ে আমার হার্টবিট বেড়ে গেছে। আমারও, মুসা। তবে কাকতাড়ুয়া যেহেতু আছে, কাছেপিঠে খামার বাড়িও থাকার কথা। চলো, খামার বাড়ি-টাড়ির খোঁজ মেলে কিনা দেখি। তিনজনে হাঁটা শুরু করেছে এমন সময় খনখনে কণ্ঠে কে যেন বলে উঠল, সাবধান! ভীষণ বিপদ! বাঁচতে চাইলে এখুনি এখান থেকে পালাও? থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল ওরা। কিশোরের ঘাড়ের পেছনের চুলগুলো সরসর করে খাড়া হয়ে গেল। গলা শুকিয়ে গেল মুসার। রবিনের বুকের মধ্যে ধড়াস ধড়াস করছে। বাকরুদ্ধ হয়ে কাকতাড়ুয়ার দিকে তাকিয়ে রইল ওরা। কথাগুলো বেরিয়েছে ওটার মুখ থেকেই! বাতাসে কাকতাড়ুয়ার কোট উড়ছে পতপত করে, পা নড়ছে। চাঁদের আলোয় মনে হলো হাসছে ওটা। বিদ্রুপের হাসি। আঙুলগুলো বাঁকা করে সামনে বাড়ানো, যেন খামচি দিয়ে ধরার ইচ্ছে। আমি যা শুনেছি তোমরাও কি তাই শুনেছ, মুসা? কাঁপা গলায় প্রশ্ন করল কিশোর। হ্যাঁ, জবাব দিল মুসা। কিন্তু কাকতাড়ুয়া যে কথা বলতে পারে, রবিন বলল, শুনিনি কোনদিন! পরীক্ষা করে দৈখি। সত্যি ওটা কথা বলেছে কিনা তা জানা যাবে। কিশোর জিজ্ঞেস করল কাকতাড়ুয়াকে, আমাদেরকে পালাতে বললে কেন? কেন পালাব? কিসের বিপদ? জবাব দিল না কাকতাড়ুয়া। আগের মতই তাকিয়ে রইল কটমট করে। কিশোর আরও কয়েকটা প্রশ্ন করল। চুপ হয়ে রইল কাকতাড়ুয়া। শুধু বাতাসের শব্দ ছাড়া আর সব নিশ্চুপ। খামোকাই সময় নষ্ট করছি, বিড়বিড় করল কিশোর। খড়ের তৈরি জিনিস কি আর কথা বলতে পারে? চলো, মুসা। চলো, বলল মুসা। কিন্তু যাব কোন দিকে এদিক-ওদিক তাকাল কিশোর। খেতের শেষ প্রান্তে বড় একটা দালান চোখে পড়ল। ওটা নিশ্চয়ই খামার-বাড়ি, বলল সে, চলো। ওখানেই যাই। তাই ভাল। সায় দিল মুসা। এই ভূতুড়ে জায়গা থেকে পালাতে পারলে বাঁচি। কাকতাড়ুয়াকে পেছনে রেখে দালানটার দিকে পা বাড়াল তিন গোয়েন্দা। মাঝে মাঝেই মেঘ চাঁদকে ঢেকে ফেলছে বলে চলার গতি মন্থর ওদের। অন্ধকারে এবড়োখেবড়ো গর্তে ভরা মাঠ দিয়ে হাঁটা কঠিন। বার কয়েক মাটির টিবিতে পা হড়কে পড়ে যাচ্ছিল ওরা। পাহাড়ে চড়ার চেয়েও বিশ্রী কাজ, একটা গর্ত লাফ মেরে টপকাতে টপকাতে মতব্য করল মুসা। ঠিক বলেছে। সায় দিল কিশোর। এরচেয়ে বেপোর্ট হিলসে ওঠা সহজ, বলল রবিন। এমন সময় পায়ের শব্দ কানে এল। কেউ দৌড়ে আসছে ওদের পেছন পেছন। কনুই দিয়ে কিশোরকে গুঁতো মারল মুসা। ফিসফিস করে বলল, কেউ আমাদের পিছু নিয়েছে। বুঝতে পারছি, ফিসফিস করেই জবাব দিল কিশোর। পায়ের শব্দ আমিও শুনেছি। তবে অনুসরণকারী যে-ই হোক খারাবি আছে তার কপালে। পেছন ফিরে দেখল না ওরা, গুনে গুনে দশ কদম এগোল। যব খেতের মাঝ দিয়ে কেউ আসছে। শোনা যাচ্ছে পায়ের শব্দ। ঠিক দশ কদম যাবার পরে ঘুরে দাঁড়াল তিন গোয়েন্দা। কারাতে মারের কায়দায় দাঁড়িয়ে গেছে আত্মরক্ষার জন্যে। আসন্ন হামলার জন্যে প্রস্তুত। তবে মেঘে ঢাকা চাঁদের আবছা আলোয় কাউকে দেখতে পেল না। পায়ের শব্দ আর শোনা যাচ্ছে না। ঠোঁট কামড়াল কিলোর। বেহুদা কল্পনা করে আমরা খামোকই ভয় পাচ্ছি, মুসা। কি জানি! নীরস শোনাল মুসার গলা। তোমার কথাই হয়তো ঠিক। বাতাসের শব্দ শুনে ভাবছি কেউ আমাদের পিছু নিয়েছে। তা ছাড়া এখানে আমাদের পিছু নিতেই বা যাবে কে? ওর কথা মাত্র শেষ হয়েছে, এমন সময় যব গাছের বড় একটা অংশ দুদিকে ভাগ হয়ে গেল। একই সঙ্গে মেঘের আড়াল থেকে আত্মপ্রকাশ করল চাঁদ। চাঁদের আলোয় দেখা গেল ঠোঁটে সেই বিশ্রী জ্জিপের হাসি নিয়ে ওদের সামনে হাজির হয়ে গেছে কাকতাড়ুয়াটা। দৃশ্যটা দেখে আতঙ্কে জমে গেল তিন গোয়েন্দা। পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। বিস্ফারিত দৃষ্টিতে চেয়ে আছে ভৌতিক মূর্তিটার দিকে। দুহাতে যব গাছগুলোকে দুপাশে ঠেলে ধরে একটা গর্তে দাঁড়িয়ে আছে ওটা। নিঃশব্দে হাসছে। হঠাৎ রাতের নিস্তব্ধতা চিরে খনখনে গলায় হেসে উঠল কাকতাড়ুয়া। তীব্রতর হয়ে উঠল আওয়াজ। তারপর হঠাৎই থেমে গেল। দ্বিতীয়বার কথা বলল কাকতাড়ুয়া। কর্কশ শোনাল কণ্ঠ, ওই বাড়িতে যেয়ো না। এখুনি চলে যাও। নইলে কপালে অনেক দুর্ভোগ আছে। দুই গোয়েন্দা আগের মতই দাঁড়িয়ে আছে। কথাগুলো সত্যি শুনেছে কিনা বিশ্বাস করতে পারছে না। কাকতাড়ুয়া ছেড়ে দিল যব গাছ। গাছগুলোর আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল ভয়ঙ্কর মুখটা। দ্রুত মিলিয়ে গেল দুটন্ত পায়ের আওয়াজ। পায়ের শব্দে সংবিৎ ফিরে পেল যেন তিন গোয়েন্দা। কাকতাড়ুয়াটা যেখান থেকে উঁকি দিয়েছে দৌড়ে গেল সে-জাযগায়। কিন্তু কিছুই দেখতে পেল না ওরা। ওনতেও পেল না। ওটার পিছু নেব, চেঁচিয়ে বলল কিশোর। কিন্তু যাব কোন দিকে? রবিনের প্রশ্ন। যেখানে ওটাকে প্রথম দেখেছিলাম সেখানে। ছুটল ওরা। দৌড়াতে দৌড়াতে চলে এল আগের জায়গায়। এখানেই কাকতাড়ুয়াটাকে দেখে গেছে। কিন্তু খালি কাঠের খুঁটিটা দাঁড়িয়ে আছে। কাকতাড়ুয়াটা নেই! হতভম্ব হয়ে গেল দুই গোয়েন্দা। বেদম হাঁপাচ্ছে। তবে যতটা না পরিশ্রমে তারচেয়ে বেশি ভয়ে। কিশোর, আমরা সত্যি কি অশরীরী কিছু দেখছি? কেঁপে গেল মুসার কণ্ঠ। আর অস্বাভাবিক কিছু কি শুনছি? অবাক শোনাল রবিনের কণ্ঠ। অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে এদিক-ওদিক মাথা নাড়ল। জবাব দিল না কিশোর। ভূতুড়ে এ সব কাণ্ডকারখানার মাথামু কিছু সে-ও বুঝতে পারছে না। মাঠের মধ্যে কাকতাড়ুয়াটাকে খুঁজে বেড়াল ওরা। কোথাও দেখতে পেল না। শেষে ঠিক করল খামারবাড়িতেই যাবে। খামারবাড়িতে কেউ থাকলে কাকতাড়ুয়া রহস্যের জবাব হয়তো সে দিতে পারবে। প্রেতের অভিশাপ খামারবাড়িটা বেশ বড়। কতগুলো গাছ-পালার মধ্যে কাঠের বাড়ি। তবে খুবই দৈন দশা। বাড়ির জানালায় কোন আলো জ্বলছে না। সিঁড়ি বেয়ে বারান্দায় উঠে এল মুসা। দরজার কলিংবেল টিপল। ভিতরে কোথাও তীক্ষ্ণ শব্দে বেজে উঠল বেল। কিন্তু কারও সাড়া মিলল না। আবার বেল বাজাল মুসা। এবারও কোন সাড়া নেই। মনে হয় বাড়িতে কেউ নেই, বলল কিশোর। তবে নিশ্চিত না হয়ে চলে যাওয়া ঠিক হবে না। পেছন দিকে কেউ থাকতে পারে, রবিন বলল। চলো। ওদিকটা ঘুরে দেখি। বারান্দার সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এল ওরা। চক্কর দিল বাড়িটাকে ঘিরে। কিন্তু জীবনের চিহ্নমাত্র নেই কোথাও। ছোট ছোট গুলো পেঁচিয়ে যাচ্ছে পা, কাঁটা গাছের খোঁচা লাগছে হাতে। সেই সাথে কানের পাশে মশার ভনভনানি তো আছেই। গত কয়েক বছরেও এ বাড়ি কেউ সাফ-সুতরো করেনি মনে হচ্ছে, অসন্তোষের গলায় বলল কিশোর।, জবাবে কেউ কিছু বলার আগেই ভয়ঙ্কর একটা চিৎকার ভেসে এল। আঁতকে উঠল ওরা। কি-কি ওটা? কাঁপা গলায় প্রশ্ন করল মুসা। জানি না। কাকতাড়ুয়ার চিৎকার নয়তো? বিড়বিড় করল রবিন। কাছের একটা গাছ থেকে ডানা ঝাপটানোর শব্দ শোনা গেল। একটা পেঁচা। উড়ে আসছে গাছটা থেকে। বসল একটা ঝোঁপের ওপর। গোল গোল, বড় বড় চোখে কটমট করে তাকাল ওদের দিকে। তারপর ডানা ঝাঁপটে বুক হিম করা চিৎকারটা দিল আবার। দুই গোয়েন্দা পরস্পরের দিকে তাকিয়ে ফ্যাকাসে যসি হাসল। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। বাড়ি চক্কর দেয়া শেষ। আবার চলে এসেছে বারান্দায়। বৃথা খোঁজাখুঁজি। মানুষ জন নেই। গলা ফাটিয়ে কেউ কি আছেন? বলে ডাকাডাকি করল। কোন জবাব এল না। ফোন করা দরকার, বলল মুসা। কাছেপিঠের কোন গ্যারেজে খবর না দিলেই নয়। কিন্তু সমস্যা হলো বাড়ির ভেতরে ঢুকব কি করে? দরজা ভেতর থেকে ছিটকানি দেয়া। জানালা দিয়ে যে ঢুকব তারও উপায় নেই, হতাশ শোনাল কিশোরের কণ্ঠ। অনেক উঁচুতে জানালা! এদিক ওদিক তাকিয়ে রবিনও কোন উপায় বের করতে পারল না। উপায় একটা আছে, মুসা বলল। পেঁচাটা যে গাছ থেকে উড়ে এসেছে, লক্ষ করেছি ওটার একটা ভাল চিলেকোঠার জানাল ছুঁই ছুঁই করছে। জানালা খোলা থাকলে গাছ বেয়ে উঠে গেলেই হলো। তারপর ভেতরে ঢুকে পড়ব। গাছটার নিচে চলে এল ওরা। প্রথমে মুসা চড়ল গাছে। উঁচু ডালে দাঁড়িয়ে নিশ্চিত হয়ে নিল ওটা ওর ওজনের চাপে ভেঙে পড়বে না। তারপর জানালা ছুঁই ছুঁই ডালের ওপর চলে এল। হাত বাড়িয়ে জানালার কাঁচ স্পর্শ করল। ধাক্কা দিল। কাঅ্যাঅ্যাচ শব্দে খুলে গেল জানালা। ভাগ্য ভাল আমাদের, কিশোর আর রবিনকে উদ্দেশ্য করে বলল মুসা। জানালা খোলা। চলে এসো। গাছে উঠে পড়ল কিশোর। চলে এল মুসার পেছনে, মগডালে। খোলা জানালা দিয়ে চিলেকোঠার ঘরে ঢুকে পড়ল মুসা। তাকে অনুসরণ করল অন্য দুজন। ভিতরে ঢুকে পকেট থেকে পেন্সিল টর্চ বের করল ওরা। টর্চের আলোয় বুঝতে পারল বেশ বড়সড় ঘর এটা। খালি। মেঝের ওপর ধুলোর ঘন আস্তরণ। মেঝেতে কারও পায়ের ছাপ দেখছি না, বলল কিশোর। তার মানে অনেক দিন কেউ এ ঘরে ঢোকেনি। চিলেকোঠার দরজায় টর্চ মারল রবিন। এ ঘরে ফোন নেই। নিচে আছে কিনা দেখে আসি। দরজার দিকে পা বাড়িয়েছে ওরা, এমন সময় ছাদ থেকে কিচকিচ শব্দ ভেসে এল। কালো কালো কি যেন ছাদের কড়ি-বর্গা থেকে নেমে এসে উড়তে লাগল ওদের মাথার ওপর। বাবাগো, ভূত! বলে চিৎকার দিয়ে মেঝে লক্ষ্য করে ডাইভ দিল মুসা। খেয়ে গিয়ে তার সঙ্গে সঙ্গে কিশোর আর রবিনও ঝাঁপ দিল মেঝেতে। শিকার ফস্কে যাওয়ায়ই যেন দিক পরিবর্তন করল হামলাকারীরা, আবার উঠে গেল ছাদে। বর্গা ধরে ঝুলতে লাগল। সেই সাথে অনবরত কিচকিচ শব্দ করেই চলেছে। ভ্যাম্পায়ার! বাদুড়ের রূপ ঘরে আছে! রুদ্ধশ্বাসে বলল মুসা। জলদি ভাগো! ওঠো না, সাবধান করল কিশোর। হামাগুড়ি দিয়ে এগোও। ভূত না হলেও আবার আক্রমণ চালাতে পারে ওরা। চিলেকোঠার মেঝের ওপর হামাগুড়ি দিয়ে এগোল তিন গোয়েন্দা। দরজার সামনে পৌঁছে দ্রুত খুলে ফেলল কবাট। হামাগুড়ি দিয়েই বেরিয়ে এল ঘর থেকে। তারপর বন্ধ করে দিল দরজা। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছে ওরা, চোখে পড়ল আরেকটা দরজা। ওটা খুলে একটা হলরূমে ঢুকে পড়ল তিনজনে। আমার কি মনে হয় জানো? বলল কিশোর। বাড়িটা পরিত্যক্ত। মেঝেতে কার্পেট নেই, হলরূমে কোন আসবাব নেই। ইলেকট্রিসিটি নেই…। হঠাৎ হলরূমের শেষ মাথায় কিসের যেন শব্দ হলো। থেমে গেল কিশোর। দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়াল। পা টিপে টিপে এগোল দরজার দিকে। দরজাটা ভেড়ানো। ধাক্কা মেরে দরজা খুলল কিশোর। টর্চ জ্বালল। এ ঘরটাও খালি। মেঝেতে টর্চের আলো ফেলল সে। হাসতে লাগল। ওই যে ভূতুড়ে শব্দের উৎস! একটা ইঁদুর। মানুষের সাড়া পেয়ে দৌড়ে পালাল মেঝের গর্তে। এদিকের সবগুলো ঘর একে একে আলাদা ভাবে পরীক্ষা করে দেখল ওরা। দোতলায় কেউ নেই, কাজ শেষ করে জানাল মুসা। আমিও কাউকে দেখতে পাইনি, রবিন বলল। হু, গম্ভীর ভঙ্গিতে মাথা দোলাল কিশোর। এবার নিচতলাটা দেখা দরকার। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এল ওরা, ঢুকল ডাইনিং রূমে। অন্যান্য ঘরগুলোর মত এটাও খালি এবং ধুলোয় ভর্তি। তবে এ ঘরে পায়ের ছাপ চোখে পড়ল ওদের। দেখো দেখো, পায়ের ছাপ! বলে উঠল উত্তেজিত রবিন। কেউ এখানে ছিল! ফিসফিস করে বলল কিশোর। এবং মাত্র কিছুক্ষণ আগে! ঢোক গিলল মুসা। টর্চের আলোয় পায়ের ছাপগুলো পরীক্ষা করল ওরা। ছাপগুলো রান্নাঘর হয়ে খিড়কির দরজার দিকে চলে গেছে। দরজাটা বন্ধ। আর দ্বিতীয় পায়ের ছাপ এসে মিশেছে লিভিং রুমে। পায়ের ছাপগুলো একজনেরই, মন্তব্য করল কিশোর। খিড়কির দরজা দিয়ে ঢুকেছিল সে। আবার বেরিয়ে গেছে ও পথেই। মেঝেতে টর্চের আলো ফেলে আঁতকে উঠল মুসা। মেঝেতে কতগুলো খড় পড়ে রয়েছে। কেউ এ ঘরে খড়ের গাদা নিয়ে ঢুকেছিল। নাকি কাকতাড়ুয়াটাই…? গায়ে কাঁটা দিল তার। যে-ই হোক, এখনও এ বাড়িতেই রয়েছে সে। সম্ভবত বেসমেন্টে। যেখানেই থাক, খুঁজে বের করব ওটাকে, দৃঢ়কণ্ঠে বলল কিশোর। রহস্যের সমাধান না করে যাচ্ছি না। ঠিক বলেছ, বলল বটে রবিন, কিন্তু মুখ শুকিয়ে গেছে ওর। রান্নাঘরে ফিরে এল ওরা। লক্ষ করল আরও কিছু পায়ের ছাপ চলে গেছে বেসিমেন্টের দরজার দিকে। তারপর নেমে গেছে সিঁড়ি বেয়ে। সিঁড়ির শেষ মাথায় এসে দাঁড়িয়ে পড়ল ওরা। ভয়ে ভয়ে চোখ বুলাল চারপাশে। বেসিমেন্ট অর্থাৎ মাটির নিচের ঘরে কেউ নেই। ধুলো জমেছে পুরো হয়ে। জানালায় মাকড়সার জাল। এখান থেকে উঠান বা বাগানে যাবার কোন দরজা চোখে পড়ল না। পায়ের ছাপ চলে গেছে ফিউজ বক্সের ধারে। ফিউজ বক্স পরীক্ষা করল কিশোর। তার ছেঁড়া। ইলেকট্রিসিটি থেকে থাকলেও বাতি জ্বালানোর কোন উপায় নেই। পায়ের ছাপের মালিক এখান থেকে চলে গেছে সিঁড়ির দিকে, দেখেটেখে বলল সে। সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল ওরা। যেতে যেতে রবিন বলল, ফোনটোন তো দেখলাম না এখানে। কাজেই সাহায্য পাচ্ছি না আমরা। কাঁধ ঝাঁকাল কিশোর। দুটো কাজ করতে পারি আমরা এখন। হয় গাড়িতে ফিরে যেতে পারি, নয়তো এখানেই রাত কাটাতে পারি। তবে এখানে রাত কাটানোই বোধহয় ভাল হবে। মেঝেতে শুতে আমার কোন অসুবিধে নেই। হাই তুলল মুসা। আমারও নেই। খুব ঘুম পাচ্ছে। শোয়ার মত জায়গা যখন আছেই আর দেরি করি কেন? সে জ্যাকেট খুলে ভাঁজ করল। তারপর মাথার নিচে দিল। বালিশের কাজ দেবে জ্যাকেটটা। রবিন আর কিশোরও তা-ই করল। শোয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ঘুমিয়ে পড়ল ওরা। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দুঃস্বপ্ন দেখল, কিশোর। দেখল গাড়িতে করে একটা বাড়ি খুঁজে বেড়াচ্ছে ওরা। মুসা গাড়ি চালাচ্ছে। কিন্তু রাস্তা হারিয়ে ফেলেছে বলে খুঁজে পাচ্ছে না বাড়িটা। লোকজনকে জিজ্ঞেস করেও লাভ হচ্ছে না। বদমেজাজী লোকগুলো প্রশ্নের জবাব দিচ্ছে না। হঠাৎ পেছন থেকে অদ্ভুত গলায় কে যেন বলে উঠল, যে বাড়িটা তোমরা খুঁজছ ওটা ডান দিকে। মোড় ঘোরো। মোড় ঘুরে নাক বরাবর চলে যাও। বাড়িটা দেখতে পাবে। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল কিলোর। দেখল পেছনের সীটে বসে আছে সেই কাকতাড়ুয়াটা। ভৌতিক মূর্তিটা ওদের দিকে তাকিয়ে খনখনে গলায় হেসে উঠল। সরু, লম্বা টুপির ডগায় টোকা মেরে বলল, কাউকে জিজ্ঞেস করার দরকার নেই। আমি তোমাদের বলে দিচ্ছি কি ভাবে যেতে হবে। ডান দিকে টার্ন নাও। মুসা জানে ডান দিকে খাড়া খাদ। সে বাম দিকে হুইল ঘোরাল। তর ডান দিকেই ঘুরে গেল গাড়ি। গতি কমাতে ব্রেক চেপে ধরল। কমার বদলে বেড়ে গেল স্পীড। আতঙ্কিত হয়ে দেখল সোজা খাদের দিকে এগিয়ে চলেছে গাড়ি। গতি ক্রমে বেড়েই চলেছে। পেছনের সীটে বসা কাকতাড়ুয়াটা হেসে উঠল ভয়ঙ্কর গলায়। খাদের কিনার লক্ষ্য করে ছুটে গেল গাড়ি। পরক্ষণে ডিগবাজি খেয়ে শূন্যে উঠে পড়ল, সাঁ সাঁ করে নিচে পড়তে শুরু করল, নেমে যেতে থাকল খাদের অতল অন্ধকারের দিকে। পড়ছে তত পড়ছেই! প্রতি সেকেন্ডে খাদের বিকট হ বড় হয়ে উঠছে। বিজয় উল্লাসে চিৎকার করে উঠল কাকতাড়ুয়াটা। কানে হাত চাপা দিল কিশোর। খাদের পাথরের ওপর আছড়ে পড়ে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে ওদের গাড়ি। মারা যাবে ওরা। ঘুম ভেঙে গেল কিশোরের। কোথায় আছে বুঝতে সময় লাগল। ভয়ানক দুঃসপ্ন! ভাবল সে। কাকতাড়ুয়ার ভয় পেয়ে বসেছে আমাকে। হঠাৎ বারান্দার কাঠের মেঝেতে ক্যাচকোচ শব্দ উঠল। কে যেন হেঁটে আসছে সামনের জানালার দিকে। উঠে বসল কিশোর। কাকতাড়ুয়া! জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। মুখে বিকৃত হাসি। এখনও কি স্বপ্ন দেখছি? ঢোক গিলল কিশোর। নাকি সত্যিই ঘটছে এ সব কর্কশ সুরে ফিসফিস করল ভয়ঙ্কর মূর্তিটা। এক্ষুণি এ বাড়ি ছেড়ে চলে যাও। শেষবারের মত সাবধান করছি। জানালা থেকে মুখ সরাল কাকতাড়ুয়া। অদৃশ্য হয়ে গেল। লাফ দিয়ে উঠে বসল কিশোর। দৌড়ে চলে এল দরজায়। জং ধরা ছিটকানি খুলতে সময় লাগল। এক ছুটে বারান্দায় বেরিয়ে এল। চারপাশে তাকাতে লাগল। দরজা খোলার শব্দে ঘুম ভেঙে গেছে মুসা আর রবিনেরও। ওরাও চলে এসেছে। চোখ ডলতে ডলতে জিজ্ঞেস করল মুসা, কি হয়েছে? ঘটনাটা খুলে বলল কিশোর। কাকতাড়ুয়াটা হঠাৎ কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল বুঝলাম না। ওই তো! হাত তুলে দেখাল মুসা। যব খেতের সামনে দাঁড়িয়ে আছে ওটা। ঝলমলে চাঁদের আলোয় কাকতাড়ুয়ার কুৎসিত চেহারাটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। এসো আমার সঙ্গে! চিৎকার করে বলল ওদেরকে কাকতাড়ুয়া। তারপর মাঠের দিকে ছুটতে লাগল। ওর পিছু নেব, বলল কিশোর। ওকে ধরতে হবে। নইলে এ সব রহস্যময় কাণ্ডকারখানার কোন সদুত্তর মিলবে না। ঠিক! রবিন বলল। মুসাও তার সঙ্গে একমত। যেখান থেকে অদৃশ্য হয়ে গেছে কাকতাড়ুয়া সেদিক লক্ষ্য করে দৌড় দিল ওরা। রাতের আকাশে কালো মেঘের আনাগোনা আরও বেড়েছে। ঝড় হবে মনে হচ্ছে। গাছের চূড়ায় হাওয়ার মাতম। যব খেতে ঢুকে পড়ল ওরা। কাকতাড়ুয়া হেলান দিয়ে ছিল যে কাঠের খুঁটির সাথে, সেখানে এসে দেখল খুঁটি খালি। নেই ওটা। হতাশ ভঙ্গিতে কাধ ঝাঁকাল কিশোর। কাকতাড়ুয়া কোথায় গেছে তাই জানি না। কোথায় খুজব ওকে? ভূতের মতই হুটহাট করে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে, মুসা বলল। নিশ্চয় ভূত। ভূত হোক আর যাই হোক ওকে খুঁজে বার করতেই হবে। এক কাজ করি-তিনজন তিনদিকে যাই। কারও চোখে কিছু পড়লেই চিৎকার করে জানাব। অন্য দুজন ছুটে যাব তখন তার দিকে। কি বলো? ঠিক আছে, সায় দিল মুসা আর রবিন। ডান দিকে মোড় নিল কিশোর, যব খেতের আরও গভীরে ঢুকে পড়ল। সাবধানে হাঁটছে মুসা আর রবিন। দুহাতে গাছ ঠেলে সরাতে সরাতে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে চারপাশে। দূরে কোথাও কড়াৎ শব্দে বাজ পড়ল, আকাশে পলকের জন্যে ঝলসে উঠল রূপালী বিদ্যুৎ। চাঁদের আলো মেঘের আড়াল থেকে সামান্যই মুখ দেখানোর সুযোগ পাচ্ছে। ছায়া ছায়া অন্ধকার এখন যব খেতে। মুসার কাছে সব কেমন অপার্থিব, ভূতুড়ে লাগছে। শিরশির করে উঠল গা। ভূতদের জনন্য আদর্শ একটি রাত, মনে মনে ভাবল ও। শক্তিশালী বাতাস এক ধাক্কায় সরিয়ে দিল মেঘ, হঠাৎ ঝলমলে জ্যোৎস্নায় ভরে গেল যব খেত। একটা যব গাছের গায়ে এক টুকরো কাপড় আটকে আছে। বাতাসে ফড়ফড় করে উড়ছে। ওদিকে দৃষ্টি আটকে গেল মুসার। টুকরোটা হাতে নিয়ে বুঝতে পারল এটা কাকতাড়ুয়ার সেই শতছিন্ন কালো কোটের অংশ। কাকতাড়ুয়া ঐদিকে এসেছে বুঝতে পারল সে। হয়তো খেতের মধ্যে কোথাও ঘাপটি মেরে আছে। লাফ মেরে ঘাড়ে পড়বে। কথাটা ভাবতেই বুক ঢিবঢিব শুরু হয়ে গেল তার। তবে থামল না সে। এগিয়ে চলল। বারবার ডানে বামে তাকাচ্ছে। হাত দুটো সামনে বাড়ানো। সম্ভাব্য হামলার জন্যে প্রস্তুত। তবে ভূত-প্রেতের বিরুদ্ধে কুংফু-কারাতে কতটুকু কাজে লাগবে ভেবে সন্দিহান মুসা। বেশ খানিকটা পথ হাঁটার পরেও কিছু ঘটল না দেখে মুসা ধারণা করল কাকতাড়ুয়াটা বোধহয় এ তল্লাটে নেই। ঠিক তখনই ওর সামনে খচমচ করে একটা শব্দ হলো। শস্যের ডগা দুলছে। কিছু একটা এগিয়ে আসছে ওর দিকে। তাকে দেখতে পাচ্ছে না মুসা। পাঁজরের গায়ে দমাদম পিটতে শুরু করল হৃৎপিণ্ড, বেড়ে গেছে হার্টবিট। দাঁড়িয়ে পড়ল মুসা। অপেক্ষা করছে। কাকতাড়ুয়াকে দেখামাত্র চিৎকার করে জানান দেবে কিশোর আর রবিনকে। খচমচ শব্দটা ক্রমে কাছিয়ে এল। মুখ হাঁ করল মুসা, চিৎকার দিতে যাবে এই সময় যব গাছের ফাঁক দিয়ে একটা লাফিয়ে পড়ল ওর সামনে। পেছন পেছন একটা শিয়াল। শিয়ালটা ধাওয়া করেছে খরগোশকে। দুটো প্রাণীই ঝড়ের বেগে ছুটে গেল মুসার সামনে দিয়ে। পেশীতে ঢিল পড়ল আবার ওর। খচমচ শব্দটা আবারও হচ্ছে। আবার ফিরে আসছে জানোয়ার দুটো। প্রথমে খরগোশটাকে দেখা গেল। এক দৌড়ে একটা গর্তের মধ্যে ঢুকে পড়ল ওটা। পরমুহূর্তেই হাজির হলো শিয়ালটা। তবে দেরি করে ফেলেছে সামান্য। শিকার হারিয়েছে বুঝতে পেরে হাল ছেড়ে দিতে বাধ্য হলো ওটা। শিয়ালের ভঙ্গিতে জোরে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ঘুরে রওনা হয়ে গেল উল্টো দিকে। অকারণ ভয় পেয়েছে ভেবে মনে মনে হাসল মুসা। তারপর আবার কাকতাড়ুয়ার খোঁজে যাত্রা শুরু করল। ওদিকে যব খেতের মাঝ দিয়ে নিঃশব্দে এগোচ্ছে কিশোর। প্রতিটি পা ফেলছে সাবধানে। গর্তেটর্তে যাতে পড়ে না যায় সে-ব্যাপারে সতর্ক। এক জায়গার জমিন কাদায়। ওখানে পায়ের ছাপ চোখে পড়ল। ছাপগুলো চলে গেছে একটা ঝোঁপের দিকে। সেদিকটায় যব গাছগুলো আরও ঘন। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এল কিশোরের। এ কাকতাড়ুয়ার পায়ের ছাপ হয়েই যায় না। ছাপগুলো যেখানে শেষ হয়েছে, সে-জায়গায় পা টিপে টিপে চলে এল সে। হঠাৎ যব গাছের পেছনে একটা আকৃতি দেখতে পেল। উপুড় করা বালতির মত টুপি পরা মূর্তি। কাকতাড়ুয়া! মট করে কিশোরের পায়ের নিচে একটা শুকনো ডাল ভাঙল। পাই করে ঘুরে দাঁড়াল কাকতাড়ুয়া। হার্টবিট বেড়ে গেল কিশোরের, গলা শুকিয়ে কাঠ। মুসা! রবিন! জলদি এসো! কাকতাড়ুয়াটা এখানে! গলা লম্বা করে চিৎকার করতে লাগল কিশোর। ওর কথা শেষ হবার আগেই ছুটতে শুরু করল ভৌতিক মৃর্তিটা। পিছু নিল কিশোর। কাকতাড়ুয়ার পায়ের শব্দ ক্রমে ক্ষীণ হয়ে এল। অনেক দূরে চলে গেছে। তবে একটু পরেই আবার বাড়তে লাগল শব্দটা। ওটা আমাকে লক্ষ্য করেই ছুটে আসছে, ভাবল কিশোর। এবার নির্ঘাত হামলা চালাবে। তবে আমিও ওকে ছাড়ছি না। জাপটে ধরব। পায়ের শব্দ লক্ষ্য করে ছুটতে লাগল কিশোর। মেঘের আড়ালে ঢাকা পড়েছে চাঁদ। অন্ধকার হয়ে গেছে যব খেত। এমন সময় কে যেন ঝাঁপিয়ে পড়ল ওর গায়ে। শক্ত হাতে জাপটে ধরল। কিশোরও ছাড়ল না। হামলাকারীকে সে-ও জাপটে ধরল প্রাণপণে। জড়াজড়ি করে দুজনেই পড়ে গেল মাটিতে। রীতিমত কুস্তি শুরু হয়ে গেল। লড়াইয়ের একটা পর্যায়ে দুজনেই কুস্তির প্যাঁচ থেকে নিজেদেরকে ছাড়িয়ে নিল। হিংস্র আক্রোশে আবার পরস্পরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে যাচ্ছে, তখুনি চাঁদ বেরিয়ে এল মেঘের আড়াল থেকে। এবং সেই সঙ্গে রবিনও এসে দাঁড়াল ওখানে। হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল একটা মুহূর্ত। পরক্ষণে চিৎকার করে উঠল, আরে কি করছ তোমরা? পাগল হয়ে গেছ নাকি? নিজেরা নিজেরাই মারামারি! তোমাকে আমি কাকতাড়ুয়া ভেবেছিলাম! ঢোক গিলল মুসা। আমিও তো তোমাকে কাকতাড়ুয়া ভেবেছি! হাঁপাচ্ছে কিশোর। হাসতে শুরু করল রবিন। হাসিটা সংক্রামিত হলো অন্য দুজনের মাঝেও। তবে কাকতাড়ুয়াটাকে দেখেছি আমি, হাসি থামলে বলল মুসা। পালিয়েছে। ওটার চেহারা আর দেখব বলে মনে হচ্ছে না। তবু আরেকবার খুঁজে দেখতে অসুবিধে কি? কিশোর বলল। আপত্তি করল না কেউ। এবার একসঙ্গে থেকে খোঁজ চালাল ওরা। কিন্তু ব্যর্থ হলো অভিযান। কাকতাড়ুয়ার টিকিটিরও দেখা মিলল না। আবার আগের জায়গায়, কাঠের খুঁটির কাছে ফিরে এল তিনজনে। অদ্ভুত ব্যাপার! কাকতাড়ুয়াটা আগের মতই খুটির গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আবার কি বলবে ওটা? আপনমনে বিড়বিড় করল মুসা। ওকে জিজ্ঞেস করো তো আমাদের পিছু নিয়েছে কেন? রবিনকে উদ্দেশ্য করে বলল কিশোর। জিজ্ঞেস করল রবিন। জবাব মিলল না। কাকতাড়ুয়া নিশূপ। ঠোঁট কামড়াল কিশোর। খামারবাড়িতে ফিরে যাব। ওখানে বসে সিদ্ধান্ত নেব এরপর কি করব। যব খেতের শেষ মাথায় চলে এসেছে ওরা, গোটা আকাশ জুড়ে লকলকিয়ে উঠল বিদ্যুৎ। তীব্র আলোয় সাদা হয়ে গেল পুরো এলাকা। পরক্ষণে বিকট শব্দে বাজ পড়ল। আঘাত হেনেছে পুরানো খামারবাড়িটিতে। বিস্ফোরিত হলো ছাদ। দাউ দাউ জ্বলে উঠল আগুন। লেলিহান শিখা এক লাফে উঠে গেল আকাশে। দৃশ্যটা আতঙ্কিত করে তুলল গোয়েন্দাদেরকে। তবু বাড়ি লক্ষ্য করে ছুটল ওরা। বাড়ির কাছে এসে দেখল ওটা জ্বলন্ত চুম্নিতে পরিণত হয়েছে। ধসে পড়েছে ছাদ, কড়ি-বর্গা দাউ দাউ করে জ্বলছে, জ্বলন্ত তক্তা দুড়ম-দাড়ম শব্দে ছিটকে পড়ছে মাটিতে। আগাছায় ভরা ড্রাইভওয়েতে থমকে দাঁড়াল ওরা। আগুনের ভীষণ তেজ। কাছে যাওয়া যায় না। আমাদের কিছু করার নেই, বিড়বিড় করল মুসা। বাড়িটা গেছে। ভাগ্যিস বাজ পড়ার সময় বাড়ির ভেতরে ছিলাম না। শিউরে উঠল কিশোর! কাকতাড়ুয়ার পিছু না নিলে এতক্ষণে পুড়ে কাবাব হয়ে যেতাম। বাড়িটার শেষ পরিণতি তাহলে এভাবেই ঘটল, কে যেন এলে উঠল পেছন থেকে। চট করে ঘুরল ওরা। একজন লোক। একটা পিকআপের জানালা দিয়ে উঁকি মেরে দেখছে। বাড়ি ধসে পড়ার শব্দে গাড়ির আওয়াজ শুনতে পায়নি ওরা। পিকআপ থেকে বেরিয়ে এল আগন্তুক। ওদের সামনে এসে দাঁড়াল। আমি হ্যারি হ্যারিসন, নিজের পরিচয় দিল সে। পাশের খামারবাড়িটা আমার। ফায়ার ডিপার্টমেন্টকে ফোন করেই দৌড় দিয়েছি। এখুনি চলে আসবে। কিন্তু তোমরা কারা? নিজেদের পরিচয় দিল তিন গোয়েন্দা। জানাল ওদের গাড়িটা নষ্ট হয়ে পড়ে আছে রাস্তার ধারে। ও বাড়িতে ঢুকেছিলাম ফোন করার আশায়। গ্যারেজে গাড়িটা নেয়ার জন্যে সাহায্য দরকার, কিশোর বলল। কিন্তু বাড়িতে ঢুকে কাউকে দেখলাম না। কাঁধ ঝাঁকাল কম্পটন। কোত্থেকে দেখবে? বিশ বছরে কেউ এসেছে নাকি ও বাড়িতে। খালি পড়ে ছিল। ভাড়াও দিতে পারছিলাম না। বহুকাল আগেই কে জানি গুজব ছড়িয়ে দিয়েছে, ভূত বাস করে বাড়িটাতে। জায়গাটা আমার। ভাড়া দিতে না পেরে শেষে বিক্রি করে দেয়ার কথা ভাবছিলাম গত কয়েক দিন ধরে। কিন্তু হলো না। বাড়িটা তো গেল। একটা পয়সাও আর পাওয়া যাবে না ওটা থেকে। জমিটাই যা ভরসা এখন। তবে এক হিসেবে ভালই হয়েছে। বাড়িটার জন্যে জমিটাও বিক্রি করতে পারছিলাম না। যে প্রশ্নটা এতক্ষণ ধরে খেচাচ্ছিল কিশোরকে, এবার জিজ্ঞেসই করে ফেলল সে, আপনি নিজেও কি ঢোকেননি এ বাড়িতে? তা ঢুকেছি। গত কালই তো কিচেনে ঢুকেছিলাম একটা কাজে। কেন? রান্নাঘরে পায়ের ছাপ দেখেছি। লিভিং রূমে খড়ও পড়ে থাকতে দেখলাম, মুসা যোগ করল। আমি মাঠ থেকে গিয়ে সরাসরি বাড়িতে ঢুকেছি, জানাল হ্যারি হ্যারিসন। জুতোয় খড়-টড় লেগে ছিল বোধহয়। যব খেতটার মালিকও নিশ্চয় আপনি? জিজ্ঞেস করল কিশোর। হ্যাঁ। আমার নতুন খামারবাড়ি ওই পাহাড়টার পেছনে। * সকাল হয়ে গেছে। বজ্রাঘাতে ধ্বংসপ্রাপ্ত খামারবাড়ি এখন স্রেফ অঙ্গারের এক স্তূপ। পোড়া আবর্জনার ফাঁকে লকলকে জিভ বের করছে অগ্নিশিখা। ইতিমধে দমকলের একটা গাড়ি চলে এসেছে। কি ঘটেছে অল্প কথায় দমকল অফিসারকে জানিয়ে দিল হ্যারিসন। তারপর ফিরল তিন গোয়েন্দার দিকে। এখানে আর কিছু করার নেই আমাদের। আমার বাড়িতে চলো। নাস্ত খাবে। মুচকি হাসল মুসা, নাস্তা পেলে মন্দ হয় না। রবিনের দিকে তাকাল। কি বলো? নীরবে ঘাড় কাত করে সায় জানাল রবিন। মুখে হাসি। কিশোর বলল, খিদেয় আমারও পেট চোঁ চোঁ করছে। সারাটা রাত যব খেতে যে হারে ছোটাছুটি করলাম। হ্যারিসন ওদের নিয়ে পিকআপে উঠল। সামনে জায়গা হলো না চারজনের রবিন বসল সামনে। কিশোর আর মুসা পেছনের খোলা জায়গায়। ড্রাইভিং সীট থেকে মুখ বের করে পেছনে তাকিয়ে হ্যারিসন বলল, নাস্ত খেয়ে তোমাদের গাড়ি গ্যারেজে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেব। শুনে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল তিন গোয়েন্দা। যাবার পথে রবিন বলল, কাল রাতে যব খেতে কার যেন চিৎকার শুনলাম। আমার চিৎকার শুনেছ, হ্যারিসন জানাল। কুকুরটাকে ডাকবে বেরিয়েছিলাম আমি। খরগোশ দেখলেই তাড়া করে ওটা। মাঠে যা একটা কাকতাড়ুয়া বসিয়েছেন না! হেসে উঠল হ্যারিসন। কেউ ভয় পায় না। এমনকি কাকেরাও না। তবে আমরা পেয়েছি!-মনে মনে বলল রবিন। কাকতাড়ুয়ার পোশাকটা কিন্তু অদ্ভুত, আলাপ চালিয়ে গেল সে। মজা করার জন্যে ওগুলো পরিয়েছি ওটাকে, বলল হ্যারিসন। নিলামে পাওয়া কোট-প্যান্ট, জুতোজোড়াও। এরপর বাকি রাস্তাটুকু আর বিশেষ কথা হলো না। বাইরের দিকে তাকিয়ে গত রাতের কথা ভাবতে লাগল রবিন। ঘটনাগুলো যে সত্যি ঘটেছে, দিনে আলোয় এখন বিশ্বাস করা কঠিন। মিসেস হ্যারিসন তাঁর স্বামীর মতই ভাল মানুষ। উষ্ণ অভ্যর্থনা জানালে গোয়েন্দাদেরকে। পেট পুরে নাস্তা খাওয়ালেন। রকি বীচ চেনেন তিনি ছোটবেলায় বহু বুছর থেকেছেন। সে-সব নিয়ে গল্প করলেন ওদের সঙ্গে। নাস্তা খেয়ে মিসেস হ্যারিসনকে ধন্যবাদ দিয়ে বাড়ি থেকে বেরোল ওরা মিস্টার হ্যারিসন আবার ওদের নিয়ে এল ওদের গাড়ির কাছে। স্পোর্টস সেডানটা আগের মত ঠায় দাঁড়িয়ে আছে খাদের পাশে। কম্পট ওদের গাড়ির সামনের বাম্পারে একটা রশি বাধলেন। রশির অন্য প্রান্তটা বেঁধে নিলেন নিজের গাড়ির পেছনে। তারপর টেনে নিয়ে রওনা হলেন গ্যারেজে। মুসা বসল তাদের গাড়িতে, হুইল ধরে। কিশোর আর রবিন উঠল পিকআপের পেছনে। দুই পাশের চমৎকার প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে দেখতে চলল। মাইল দশেক যাবার পরে গ্যারেজের দেখা মিলল। ওদেরকে সাহায্য করার জন্যে হ্যারিসনকে বারবার ধন্যবাদ দিল তিন গোয়েন্দা। সময় আর গাড়ির পেট্রোল খরচ করার জন্যে টাকা সাধল। কিন্তু নিলেন না হ্যারিসন। বললেন, ওদের সাহায্য করতে পেরে তিনি খুশি। তারপর পিকআপ নিয়ে রওনা হয়ে গেলেন বাড়ির দিকে। কিশোরদের ভাড়া করা গাড়িটা পরীক্ষা করে দেখল গ্যারেজের মেকানিক। সমস্যাটা ফুয়েল পাম্পে। সারিয়ে দিল ত্রুটিটা। জ্যান্ত হয়ে উঠল ইঞ্জিন। গাড়িতে উঠে পড়ল তিন কিশোর। হুইল ধরল মুসা। আবার সেই যব খেতের সামনে দিয়েই তো যেতে হবে, তাই না? জিজ্ঞেস করল মুসা। মাথা ঝাঁকাল কিশোর। কাকতাড়ুয়াটাকে আবার দেখতে পারব কিনা কে জানে! হাতের চেটো দিয়ে থুতনি ঘষতে ঘষতে বিড়বিড় করল রবিন, কিশোর, ওই কাকতাড়ুয়াটাই কিন্তু এবার আমাদের জীবন বাঁচাল। মাথা ঝাঁকাল মুসা। যেন বাড়িটাতে বাজ পড়বে যে তা সে আগে থেকেই জানত। ওই বাড়ি থেকে আমাদের দূরে থাকতে সাবধান করেছিল। কিন্তু তারপরেও বাড়িতে ঢুকেছি দেখে কৌশলে বের করে এনেছিল। সশব্দে নিঃশ্বাস ফেলল কিশোর। এত সব চালাকি না করে আমাদেরকে বিপদটার কথা সরাসরি জানিয়ে দিলেই পারত। তারমানে সন্দেহ আছে তোমার? রেগে গেল মুসা। তুমি আসলেই বড় অকৃতজ্ঞ। হেসে ফেলল কিশোর। ভূতের কাছে কৃতজ্ঞ হতে বলছ? আর কোন কথা না বলে নীরবে গাড়ি চালাল মুসা। যব খেতের সামনে চলে এল। পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কাকতাড়ুয়াটাকে কাঠের খুঁটির সাথে বাঁধা অবস্থায় আগের মত দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল। নামবে নাকি? ঠাট্টার সুরে বলল কিশোর। প্রাণ বাঁচানোর জন্যে ওকে একটা ধন্যবাদ দিয়ে আসি?। মুখটা গোমড়া করে রাখল মুসা। জবাব দিল না। যব খেতের দিকে তাকিয়ে আছে তিনজনেই। পাশ দিয়ে যাবার সময় মনে হলো কাকতাড়ুয়াটা হাসছে ওদের দিকে চেয়ে। তবে ক্রুর হাসি নয়, বোকা বোকা হাসি। জাদুর পুতুল অলস ভঙ্গিতে আন্ডারগ্রাউন্ড আটলান্টায় ঘুরে বেড়াচ্ছে তিন গোয়েন্দা। বেড়াতে এসেছে রাশেদ পাশার সঙ্গে। তিনি এসেছেন জরুরী কাজে। রাস্তার মাটির নিচে কিছু দোকানপাট আর ডিপার্টমেন্টাল স্টোর নিয়ে গড়ে উঠেছে জায়গাটা। একটা দোকান থেকে লেটেস্ট হিট অ্যালবাম কিনেছে রবিন। কিশোরের হাতে বুকস্টোর থেকে কেনা একটা ব্যাগ। মুসা কিছুই কেনেনি। ইয়া বড় এক কোণ আইসক্রীম খাচ্ছে। বাপরে, চারটে বাজে, ঘড়ির দিকে তাকাল কিলোর। চলো, হোটেলে চলে যাই। গোসল করা দরকার। চাচার সাথে সাড়ে ছটায় ডিনার। মনে আছে? মাথা ঝাঁকাল মুসা আর রবিন দুজনেই। মনে আছে। অদ্ভুত দোকানটা মুসার চোখে পড়ল প্রথমে। দোকানের সামনে বড় একটা জানালা। কালো রং করা। এক কোনায় প্রমাণ সাইজের একটা নরকঙ্কাল ঝুলছে। ডিসপ্লেতে ঝাড়ফুক, ভূত-প্রেত, জাদু-মন্ত্র ইত্যাদির ওপরে নানা বই সাজানো। অ্যাই, কিশোর, আঙুল তুলে দেখাল মুসা, দেখো দেখো, সাইনবোর্ডটা: এখানে হাত দেখা হয়। চলো না, আমাদের ভাগ্যে কি আছে জেনে আসি। মুচকি হাসল কিশোর। আবারও ভাগ্য গণনা! গত বারের কথা ভুলে গেছ? জ্যোতিষী ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল, আমাদের মাথায় শিং গজাবে। তিনজনেরই। সম্ভাবনা এখনও ফুরিয়ে যায়নি, হাসল রবিন। এবার হয়তো বলবে লেজ গজাবে। স্টোরের ভেতরে ঢুকল ওরা। ডাইনীর গুহার আদলে সাজানো হয়েছে ঘরটা। মৃদু আলো ধীরে ধীরে রঙ বদলাচ্ছে, আশপাশের সব কিছু ভূতুড়ে লাগছে। ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজছে রোমাঞ্চকর মিউজিক। ঘরের দেয়ালে অদ্ভুত সব জিনিস সাজানো। কতগুলো বার দেখা গেল। সেগুলোতে নানা ধরনের লেবেল সটানোপ্রেমের আরক, ঘৃণার আরক, কর্মজীবনে উন্নতির আরক, ইত্যাদি। বড় বড় ভোলা পাত্র আছে কতগুলো। অদ্ভুত সব জিনিসে ভরা। লেখা দেখে বোঝা যায় ওগুলোতে আছে কুকুরের চুল, গোসাপের চোখ, ময়ূরের যকৃৎ, সাপের খোলস এবং ম্যানড্রেক গাছের শিকড়। শুকনো মাথাগুলো দেখো, একটা কাঁচের বাক্সে আঙুল দিয়ে দেখাল মুসা। ভয়ঙ্কর লাগছে না? সাবধান না হলে আমাদের দশাও ওগুলোর মতই হতে পারে, ঠাট্টা করল কিশোর। মুসা বলল, জায়গাটা জানি কেমন লাগছে আমার। ঠিক বোঝাতে পারব না হুঁ, তা ঠিক, মাথা দোলাল রবিন। এই ভূতুড়ে আবহর মধ্যে গা ছমছম করছে ওরও; ভয়ের কিছু নেই, এখানকার সব কিছুই সাজানো, নিজেকে মনে করিয়ে দিল ও। মনে হচ্ছে যেন অ্যাজটেকের মন্দির। বলি দেয়ার ঘর, মন্তব্য করল কিশোর। এদিক ওদিক তাকাল। কিন্তু কেউ নেই নাকি এখানে? যেন তার কথার জবাবেই খসখসে একটা কণ্ঠ ভেসে এল ঘরের দূর প্রান্ত থেকে। কি চাই? পাক খেয়ে ঘুরে গেল ওরা। দেখল ছায়ার আড়াল থেকে বেরিয়ে এসেছে এক মহিলা। পরনে গোড়ালি ঢাকা কালো আলখেল্লা, লম্বা কালো চুল ঢেকে রেখেছে মুখের একটা পাশ। মহিলার কালো চোখের তির্যক দৃষ্টি, সবুজ আইশ্যাডো আর ঠোঁটের লাল টকটকে লিপস্টিকে তাকে ভ্যাম্পায়ারের মত লাগছে। হাত দেখাতে চাই, ভয়ে ভয়ে বলল মুসা। কত লাগবে? দশ ডলার, জবাব দিল মহিলা। আমার কাছে চার ডলার আছে, বলল মুসা। চলবে এতে? ইঙ্গিতে কিশোর আর রবিনকে দেখিয়ে মহিলা বলল, তোমার বন্ধুদের কাছ থেকে নিতে পারো না? তিনজনে মিলিয়ে তিরিশ তো? মাথা নাড়ল কিশোর। আমাদের কাছেও অত টাকা নেই। চলো, মুসা, আজ আর হাত দেখানো হলো না। হাত তুলল মহিলা। তাড়াতাড়ি বলল, দাঁড়াও দাঁড়াও। তোমাদেরকে আমার ভাল লেগেছে। যা আছে, তাতেই দেখে দেব। কে আগে দেখাবে রু কুঁচকে কিশোরের দিকে তাকাল মহিলা। তুমি? মাথা কাত করল কিশোর। আমার আপত্তি নেই। এসো আমার সঙ্গে। দরজার পর্দা সরিয়ে ওদেরকে নিয়ে পেছনের ঘরে ঢুকল মহিলা। খাইছে! চমকে গেল মুসা। এ ঘরটা আগেরটার চেয়েও ভূতুড়ে। পুরো ঘর কালো মখমলে মোড়া। একটা বেগুনি রঙের বাতি জ্বলছে। সেই আলোতে সবার দাঁত আর চোখের মণিও বেগুনি দেখাল। ভয়ঙ্কর লাগল তাতে। হঠাৎ করেই মনে হতে লাগল তিন গোয়েন্দার, এখান থেকে আর বেরোতে পারবে না কোনদিন। সময় থাকতে পালাবে কিনা চিন্তা করতে লাগল মুসা। কিন্তু মহিলা ততক্ষণে নিচু একটা টেবিলে বসে পড়েছে। কিশোরকে ইশারা করল তার পাশে বসতে। টেবিলটা কালো মখমলে মোড়া। ওপরে একটা কাঁচের বড় বল। কিশোরের হাতের তালু মেলে ধরল মহিলা। চেয়ে রইল অনেকক্ষণ। টেবিলের সামনে দুটো কুশনে বসেছে রবিন আর মুসা। গভীর আগ্রহ নিয়ে দেখছে মহিলার কাজকর্ম। তোমার বয়স আঠারো, কিশোরের হাত দেখে অবশেষে বলতে শুরু করল মহিলা। তুমি সাগরের ধারের কোনও শহরে, বড় একটা বাড়িতে বাস করো। সাংঘাতিক বুদ্ধিমান তুমি, ছাত্র হিসেবে ভাল, ইলেকট্রনিক জিনিসপত্র আর কম্পিউটারে আগ্রহ। আরও একটা কাজে তুমি খুব দক্ষ, কারও ওপর নজর…অর্থাৎ সতর্ক দৃষ্টি রাখা…। এক টুকরো কাগজ আর পেন্সিল নিল সে। তোমার জন্ম তারিখ কবে বলো। বলল কিশোর। মহিলা তারিখটা লিখে কাগজের ওপর কতগুলো লাইন টানল। লাইনগুলো কাটাকুটি করে তারপর আঁকল একটা বৃত্ত। ক্রিস্টাল বলের দিকে তাকাও! হঠাৎ বলে উঠল সে। তাকাল কিশোর। তবে ভেতরে ভেতরে সতর্ক। জানে ক্রিস্টাল বল দিয়ে জ্যোতিষীরা সম্মোহন করে ফেলে। কিন্তু মহিলা সম্মোহন করল না কিশোরকে। সে-ও চেয়ে রইল ক্রিস্টাল বলের দিকে। ঝাড়া এক মিনিট ওদিকে তাকিয়ে থাকার পরে উত্তেজিত হয়ে উঠল সে। তুমি গোয়েন্দা! রেগে গেছে মহিলা। তোমরা এখানে কেন এসেছ? আমার লাইসেন্স আছে। আমি অন্যায় কিছু করছি না। পুলিস আমার কিছু করতে পারবে না। আমি পুলিসের লোক নই, ম্যাম, তাকে আশ্বস্ত করল কিশোর। আমরা আসলে শখের গোয়েন্দা। আপনার কাছে এসেছি শুধুই হাত দেখাতে। অন্য কোন মতলব নেই আমাদের। অ! স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল মহিলা। তাহলে আর কোন সমস্যা নেই। আমার কাছে অনেক প্রাইভেট ডিটেকটিভ আসে। আমি তাদের নানা সাহায্য করি। দরকার হলে তোমরাও আমাকে ভাড়া করতে পারো। তোমাদের রহস্য উঘাটনে অনেক সাহায্য করতে পারব। মনে হচ্ছে আপনার সেই ক্ষমতা আছে, সন্দিহান সুরে বলল কিশোর। আপনি আমাকে আগে কখনও দেখেননি। অথচ আমার সম্পর্কে সব বলে দিলেন। আসলে পত্রিকায় আমাদের ছবি দেখেছে, রবিন বলল। পত্রিকায় আমাদের কেসের কথা তো মাঝে মাঝেই ছাপা হচ্ছে। কড়া চোখে রবিনের দিকে তাকাল মহিলা। চেঁচিয়ে উঠল, তোমাদের নামও কোনদিন শুনিনি আমি। যা বলেছি, আমার জাদুর ক্ষমতার জোরেই বলেছি। আমার কথা বিশ্বাস হচ্ছে না, না? ঠিক আছে। হাত দেখা শেষ করি আগে। তারপর ঠিকই বিশ্বাস করবে। আবার ক্রিস্টাল বলের দিকে তাকাল মহিলা। আমি মোটর সাইকেল দেখতে পাচ্ছি। দুটো মোটর সাইকেল। তোমাদের মধ্যে একজনকে পেছনে বসিয়ে আনা হয়েছে। আবার উত্তেজিত শোনাল তার কণ্ঠ। গোয়েন্দাগিরি তোমরা আগেও বহুবার করেছ। তবে এবার তোমাদের সামনে বিপদ দেখতে পাচ্ছি আমি। ভয়ানক বিপদ! অ্যাক্সিডেন্ট? জিজ্ঞেস করল কিশোর। না। নতুন কোন কেসে জড়িয়ে পড়বে তোমরা। দেখতে পাচ্ছি-দেখতে পাচ্ছি এক চোখো একটা লোককে। নীল চোখ। সাদা গাড়িতে চড়ে সে। খুবই বিপজ্জনক লোক। তার ধারে কাছেও যেয়ো না। লোকটার কাছ থেকে সব সময় দূরে থাকবে। মহিলার কণ্ঠ ভীষণ জোরাল হয়ে উঠল, চেহারা দেখে মনে হলো সমাধিস্থ হয়ে পড়েছে সে। চোখ বোজা। যেন জানে না, কাথায় আছে। সিলভার স্টার থেকে সাবধান! ফিসফিস করল সে। ওখানে যেয়ো না। সিলভার স্টার কি? প্রশ্ন করল রবিন। জবাব দিল না মহিলা। খামচে ধরল কিশোরের হাত। ব্যথা পেল কিশোর। এক চোখো লোকটার কাছ থেকে সাবধান! ভারী নিঃশ্বাস পড়ছে মহিলার। সিলভার স্টার থেকে সাবধান! আমি…আমি সোনা দেখতে পাচ্ছি। অনেক সোনা। কিন্তু ওই সোনা অশুভ। ধরতে যেয়ো না। ধরলে…ধরলে মৃত্যু হবে! ওই সোনাকে ঘিরে আছে মৃত্যু আর…। হঠাৎ চোখ খুলল মহিলা। বিস্ফারিত চাউনি। কিশোরের দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে চেঁচিয়ে উঠল, সিম্বু! সিম্বু আছে ওখানে! ওর কাছে যেয়ো না! তারপরই চোখ উল্টে দিয়ে, অজ্ঞান হয়ে কালো মখমলে ঢাকা মেঝেতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল সে। সর্বনাশ! চেঁচিয়ে উঠল কিশোর। মুসা, রবিন-দেখো তো এখানে পানি টানির ব্যবস্থা আছে কিনা। পানি নিয়ে এসো। জ্যোতিষীর জ্ঞান ফেরাতে চেষ্টা করতে লাগল কিশোর। সিঙ্ক থেকে তোয়ালে ভিজিয়ে নিয়ে এল রবিন। ভেজা তোয়ালে দিয়ে তার মুখ মুছে দিতে লাগল কিশোর। প্রথমে ভেবেছিলাম ভঙ্গি ধরেছে, কিশোর বলল। এখন তো দেখি সত্যি সত্যি বেহুশ। কিন্তু মহিলা কি যেন বলছিল? রবিনের কণ্ঠে উদ্বেগ। হুঁশ ফিরলে জিজ্ঞেস করব, বলল কিশোর। কিছুক্ষণ পরে চোখ মেলে তাকাল মহিলা। আপনি ঠিক আছেন তো? উকণ্ঠিত গলায় জানতে চাইল কিশোর। ধীরে ধীরে মাথা দোলাল জ্যোতিষী। ভীষণ শক্তিশালী কম্পন অনুভব করছি আমি!… যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আটলান্টা ছেড়ে চলে যাও তোমরা। তোমাদের অনুরোধ করছি আমি। সিম্বুটা কে? কিশোরের প্রশ্ন। কে, জানতে চাও? আস্তে উঠে দাঁড়াল মহিলা। এসো আমার সঙ্গে। তিন গোয়েন্দাকে নিয়ে বাইরের ঘরে চলে এল সে। শেলফ থেকে কিশোরকে একটা বই বের করে দিল মহিলা। এটা পড়ো। সিম্বু কি জানতে পারবে। না, দাম দিতে হবে না। বইটা তোমাদের এমনিই দিলাম। এখন যাও। আর কোনদিন এদিকে এসো না। আমি দিব্যচক্ষে দেখতে পাচ্ছি, তোমাদের ভাগ্য খারাপ! জবাবে কিছু বলতে যাচ্ছিল কিশোর, মহিলার চেহারা দেখে চুপ হয়ে গেল। ভয় ফুটে আছে মহিলার মুখে। তাতে কোন ভণিতা নেই। চলো, দুই সহকারীকে নিয়ে দরজার দিকে পা বাড়াল কিশোর। দরজার কাছে গিয়ে ঘুরে দাঁড়াল। হাত নেড়ে মহিলাকে বলল, গুড-বাই। অ্যান্ড থ্যাংক উফ, বাঁচলাম! অদ্ভুত দোকানটা থেকে বেরিয়ে এসে যেন হাঁপ ছাড়ল মুসা। অভিজ্ঞতা একটা হলো বটে! রবিন বলল, তুমিই তো ঢুকতে চাইলে। চিন্তিত ভঙ্গিতে ঠোঁট কামড়াল কিশোর। কি যেন রয়েছে ওই মহিলা আর তার দোকানের মধ্যে। আরেকটু হলেই বিশ্বাস করে ফেলেছিলাম তার কথা। ভুরু কুঁচকাল মুসা। অবাক। তারমানে করোনি? * হোটেলে ফিরে কিশোর গেল বাথরূমে। মুসা বিছানায় চিৎ। আর রবিন শুয়ে শুয়ে মহিলার দেয়া বইটা পড়তে শুরু করল। বইটা ভুডু চর্চার ওপরে লেখা। ভুডু-তত্তের জন্ম আফ্রিকায় হলেও হাইতি দীপে এই রহস্যময় ধর্মীয় বিশাস নিয়ে চর্চা হয় বেশি। জাদুমন্ত্র, ঝাড়-ফুক, নরবলি এ সবের সাহায্যে কিভাবে বিন্নি অনুষ্ঠান করা হয় তার বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে বইটাতে। গোসল সেরে বেরিয়ে এল কিশোর। রবিন বলল, জাদু করে তোমাদের যে কারও হাত এখন ভেঙে দিতে পারি আনি। এ জন্যে শুধু একটা পুতুল দরকার হবে আমার। পুতুলের হাতে সুচ ঢুকিয়ে দিলে মনে হবে তোমাদের হাতেও সুচ ঢুকে গেছে। বাবারে-মারে বলে চেঁচানো শুরু করবে। লাফ দিয়ে উঠে বসল মুসা। না না, প্লীজ, এখন ওকাজটিও কোরো না ভাই! পাশা আঙ্কেলের সঙ্গে ডিনারের দাওয়াতটা আগে সেরে নিই। হাতে ব্যথা থাকলে খাওয়াটা আর জমবে না। হেসে ফেলল কিশোর আর রবিন। তবে, এ বিদ্যেটাতে যদি বিশ্বাস না থাকে তোর, বলল রবিন, তাহলে আর কোন ভয় নেই। তোমার ক্ষতি হবে না। অ! স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল মুসা। তাহলে এটা কি আর এমন ক্ষমতা হলো। পচা জাদু। সিম্বু কি জিনিস জানতে পেরেছ? আলমারি থেকে পরিষ্কার একটা শার্ট বের করল কিশোর। ছোট, মোটাসোটা একটা পুতুলের নাম সিম্বু, রবিন বল। ভয়ঙ্কর চোখ জোড়া কোটর ঠেলে বেরিয়ে আছে বাইরে। এই যে, ছবিও আছে। তার কাঁধের ওপর দিয়ে তাকাল কিশোর। সিম্বু দুহাত শূন্যে তুলে রেখেছে। প্রতিটি হতে দশটা করে আঙুল। পা জোড়া ফাঁক করা। পায়ে দশটা করে মোট বিশটা আঙুল। কোমরে চওড়া বেল্ট। বাপরে, চেহারা বটে। মন্তব্য করল কিশোর। তা এই সিম্বুটা আসলে কে? দুর্লভ একটা চরিত্র, ব্যাখ্যা করল রবিন। সিম্বু তার মনিবের ধনসম্পদ পাহারা দেয়। এ ধরনের পুতুল এখন পাওয়া যায় না বললেই চলে। সগ্রাহকদের কাছে খুবই মূল্যবান বস্তু। ইদানীং সিম্বুর আদলে বেশ কিছু মূর্তি তৈরি করা হয়েছে। তবে কোনটাই আসল সিম্বুর ধারে কাছে যেতে পারেনি। বইটা কিশোরকে দিল ও। নাও, তুমি পড়তে থাকো। আমি এই ফাঁকে গোসলটা সেরে আসি। কিশোর বসল বই নিয়ে। মুসাকে পড়ে শোনাল, সিম্বুর কাজ হলো সব সময় তার প্রভুর পাশে থাকা, তাকে শয়তানের হাত থেকে রক্ষা করা। কেউ সিম্বুর ক্ষতি কিংবা সে যাকে পাহারা দেয় তার ক্ষতির চেষ্টা করলে, মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ছাড়ে। একবার হাইতিতে দুটো সিম্বু পুতুল পাওয়া গিয়েছিল। মিউজিয়ামে বিক্রি করে দেয়া হয়েছিল ওগুলো। তার পর থেকেই ঘটতে শুরু করল অঘটন। যারা ওগুলোকে খুঁজে পেয়েছিল, রহস্যময় ভাবে ভয়ঙ্কর মৃত্যু ঘটল তাদের। তাতেও অঘটন বন্ধ হলো না। মিউজিয়ামের পানির পাইপ বিস্ফোরিত হতে লাগল, হাতের ভারী আস্তর খসে পড়ে কাঁচের বাক্স চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল। বাধ্য হয়ে শেষে যেখান থেকে পুতুল দুটো আনা হয়েছিল, ফিরিয়ে দিয়ে এল মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ। অবশেষে বন্ধ হলো দুর্ঘটনা। খানিক পরে মুসা আর রবিনকে নিয়ে হোটেলের লবিতে চলে এল কিশোর। রাশেদ পাশা ওখানেই আছেন। কিশোরের হাতে একটা ব্রীফকেস। ওতে তার কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র রয়েছে। তিন গোয়েন্দাকে নিয়ে হোটেল থেকে বেরিয়ে এলেন রাশেদ পাশা। রাস্তায় নেমে হাত তুলে ট্যাক্সি ডাকলেন। সিলভার স্টারে যাব, জানালেন তিনি ড্রাইভারকে। কি! চমকে উঠল কিশোর। কোথায় যাচ্ছি? এই তো কাছের একটা রেস্টুরেন্টে, বললেন রাশেদ পাশা। তোদের পছন্দ হবে। সিলভার স্টারের সী-ফুডও চমৎকার। তিন গোয়েন্দা আর কিছু না বলে চুপচাপ উঠে বসল ট্যাক্সিতে। রেস্টুরেন্টে ঢুকে কোণের দিকে একটা টেবিল দখল করল। বিকেলের ঘটনাটা চাচাকে জানাল কিশোর। সাদা গাড়িতে চড়ে নীল চোখো লোক? আনমনা ভঙ্গিতে বললেন রাশেদ পাশা। এক চোখো। মনে হয় বুঝতে পারছি মহিলা কার কথা বলেছে। কার কথা? অবাক হলো কিশোর। লোকটার নাম পিয়েরে দুপা, বললেন রাশেদ পাশা। নষ্ট একটা চোখ ঢেকে রাখে সাদা কাপড়ের টুকরো দিয়ে। সাদা মার্সিডিজ চালায়। ঠাণ্ডা মাথার ভয়ঙ্কর এক খুনী। খাইছে! বলে উঠল মুসা। যখন পেশাদার গোয়েন্দা ছিলাম, দুপার সাথে বেশ কয়েকবার টক্কর লেগেছে আমার, রাশেদ পাশা বললেন। কিন্তু লোকটা বাইন মাছের মত পিচ্ছিল। ওকে ধরার জন্যে জাল গুটিয়ে এনেছি যতবার, ততবারই ও জাল ছিঁড়ে বেরিয়ে গেছে। ওর বিরুদ্ধে ডাকাতির বহু অভিযোগ এনেছি, লাভ হয়নি। সব সময় ফস্কে গেছে। মহা ধুরন্ধর এক লোক। তার কাজে যে-ই বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে, পথের কাঁটা দূর করতে দ্বিধা করেনি কখনোই। ওর বিশেষত্ব কি? জানতে চাইল কিশোর। অ্যান্টিক চোর, জবাব দিলেন রাশেদ পাশা। বিবেক বর্জিত কিছু সগ্রাহকের কাছে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে, চড়া দামে। ধরা পড়ে যাবার ভয়ে অবশ্য ওসব সংগ্রাহক তাদের সংগ্রহের প্রদর্শনী করার সাহস পায় না কখনোই। কি এক সাংঘাতিক নেশায় যেন তবু কেনে ওরা। মহিলা জ্যোতিষী সিম্বুর কথা বলেছিল, বলল কিশোর। আর সিম্বু হলো দামী অ্যান্টিক। সব খাপে খাপে মিলে যাচ্ছে। মাথা ঝাঁকালেন রাশেদ পাশা। তার কপালে ভাঁজ পড়ল। কিন্তু দুপা কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষ। সিম্বুর অভিশাপ থেকে একশো হাত দূরে থাকার কথা তার। অবশ্য প্রচণ্ড লোভ তাকে কোন পর্যন্ত নিয়ে যাবে সেটা অনুমান করা কঠিন। আঙ্কেল, জ্যোতিষী মহিলা যে সব ভবিষ্যদ্বাণী করল, সেগুলো কি বিশ্বাস হয় আপনার? জিজ্ঞেস করল মুসা। শ্রাগ করলেন রাশেদ পাশা। কে জানে! হয়তো কিছু ঘটার আভাস পেয়েছে মহিলা। বাস্তব প্রমাণ। অভিশাপ, ভবিষ্যদ্বাণী-এ সব জিনিসে বিশ্বাস নেই আমার। তবে জগতে অব্যাখ্যাত বহু জিনিসই ঘটে। সব কিছুই হেসে উড়িয়ে দেবার উপায় নেই। সিলভার স্টারে আসার পর থেকেই মনটা খচখচ করছে আমার, দীর্ঘশ্বাস ফেলল রবিন। আমার ধারণা, কিশোর বলল, দুপা যতই কুসংস্কারাচ্ছন্ন হোক না কেন, সিম্বুকে পাবার লোভ ছাড়তে পারবে না কিছুতেই। কিশোরের কথা কানে গেল না রবিনের। সে কিশোরের কাঁধের ওপর দিয়ে তাকিয়ে আছে, চোখ বড় বড় হয়ে উঠেছে বিস্ময়ে। রবিনের দৃষ্টি অনুসরণ করে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল কিশোর। হাঁ হয়ে গেল মুখ। ওই তো সেই লোক? ফিসফিস করল সে। নীল চোখো লোকটা! রাশেদ পাশাকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতে হলো না। দুপা নিজেই এগিয়ে এল তাদের টেবিলের দিকে। মশিয়ে পাশা, আপনাকে আবার দেখে খুব খুশি হলাম, তার গলার স্বর তেলতেলে, বিরস। কিন্তু তোমাকে দেখে আমি খুশি হতে পারিনি, দুপা, বললেন রাশেদ পাশা। কি চাও? আপনারা আসার আগে এই টেবিলে এক বন্ধুকে নিয়ে বসেছিলাম আমি। সে একটা খাম নাকি ফেলে রেখে গেছে এখানে। খামটা কি আপনাদের চোখে পড়েছে? না, পড়েনি, জবাব দিলেন রাশেদ পাশা। কিছু মনে না করলে একটু উঠে দাঁড়াবেন দয়া করে? বলল লোকটা। অনিচ্ছা সত্ত্বেও উঠে দাঁড়ালেন মিস্টার পাশা। দেখাদেখি তিন গোয়েন্দাও। দুপা টেবিলের নিচে, চেয়ারের নিচে, গদির তলায় তন্নতন্ন করে খুঁজল। পেল না কিছুই। তার চেহারা কঠিন। বিরক্ত করার জন্যে দুঃখিত, মশিয়ে পাশা। তবে খামটা আপনাদের চোখে পড়ে গেলে, দয়া করে আমাকে পৌঁছে দিলে কৃতজ্ঞ থাকব। আমি জানি আপনার মত গণ্যমান্য ব্যক্তির ওপর ভরসা রাখা চলে, কি বলেন? রাশেদ পাশা কটমট করে তাকালেন ট্রুপার দিকে। খামটা আমরা পাইনি। তীক্ষ হয়ে উঠল দুপার কণ্ঠ। আমি চাই না পুলিস ডেকে আপনার এবং আপনার ছেলেদের সার্চ করাই। চেয়ারের ওপর রাখা কিশোরের ব্রীফকেসের দিকে ইঙ্গিত করল সে। ওটাতে নেই তো? রাশেদ পাশা বসে পড়েছিলেন, লাফিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। ন্যাপকিনটা টেবিলে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বললেন, আমি জানি না তোমার খামে কি আছে। তবে মনে হচ্ছে ওটা পড়তে পারলে খুশিই হবে পুলিস। যাও, ডেকে নিয়ে এসো পুলিসকে। আমরা অপেক্ষা করছি। ঘেৎ-ঘোৎ করে উঠল দুপা, বিড়বিড় করে কি যেন বলল। বোধহয় গোয়েন্দাদের মজা দেখাবে বা এ রকম কিছু। তারপর জুতোর গোড়ালিতে ভর করে চরকির মত পাক খেয়ে ঘুরে দাঁড়াল। চলে গেল যেদিক থেকে এসেছিল সেদিকে। এতে কি প্রমাণ হলো? রবিনের প্রশ্ন। জ্যোতিষীর কাছে গেলে জবাব মিলতে পারে, ঠাট্টা করল কিশোর। ব্যাপারটা অদ্ভুত, চিন্তিত ভঙ্গিতে বললেন রাশেদ পাশা। আমার ধারণা দুপা বা সিম্বুকে নিয়ে আরও ঘটনা ঘটবে। সিম্বু সম্পর্কে আর কি জানো, চাচা? কিশোর জিজ্ঞেস করল। আটলান্টা রাজ্যের অনেকেই জানে সিম্বুর কথা। গৃহযুদ্ধের আগে এই পুতুলটাকে নিয়ে একটা গুজব চালু হয়েছিল, রাশেদ পাশা বললেন। ধনী এক বুড়ো বাস করত এখনকার রূট থ্রী-এইটি রোডের ধারে, বিশাল এক বাড়িতে। আপনার বলে কেউ ছিল না বুড়োর। কালো চামড়ার এক চাকরকে নিয়ে থাকত বিশাল বাড়িতে। চাকরটাকে পছন্দ করত বুড়ো। চাকরটারও ছিল বুড়োর জন্যে জান-প্রাণ। ভুডু ম্যাজিকে বিশ্বাস করত চাকরটা। তার মালিককেও সে ভুডু চর্চায় উৎসাহিত করে তোলে। যা হোক, গৃহযুদ্ধ শুরু হলে ইউনিয়ন আর্মি হামলা চালায় দক্ষিণ এবং পুবে। বুড়ো তার ধন-সম্পদের কি দশা হবে তা ভেবে খুবই দুশ্চিন্তায় পড়ে যায়। খুবই স্বাভাবিক, মুচকি হাসল কিশোর। সোনার টাকা, মোহর-যা কিছু ছিল তার, সব গলিয়ে সোনার বার বানিয়ে মাটিতে পুঁতে রাখে বুড়ো। সে-সব পাহারা দেয়ার জন্যে ওগুলোর সঙ্গে রেখে দেয় একটা সিম্বু পুতুল। পুতুলটা বানিয়ে দিয়েছিল তার কালো-চাকর। ইউনিয়ন আর্মিকে ঠেকাতে পাথরের দেয়ালও তুলেছিল বুড়ো। কিন্তু ঠেকাতে পারেনি। সৈন্যরা বাড়িতে ঢুকে খুন করে বুড়ো আর তার চাকরকে। তবে যদ্দুর জানি, সোনা-দানার সন্ধান আজতক কেউ পায়নি। দারুণ গল্প! রবিন বলল। সেই গুপ্তধনের খোঁজ করেনি কেউ? করেছে নিশ্চয়। আমি জানি না, জবাব দিলেন রাশেদ পাশা। তবে কেউ ওগুলোর খোঁজ পেলে মূল্যবান সিম্বু পুতুলটাও পেয়ে যাবে। তা পাবে, মুসা বলল। সেই সঙ্গে অভিশাপের শিকারও হওয়া লাগবে হয়তো। নীরব হয়ে গেল চারজনেই। চুপচাপ খাওয়া শেষ করল। তারপর এয়ারপোর্টে গেল তিন গোয়েন্দা, রাশেদ পাশাকে পৌঁছে দিতে। রাশেদ পাশা নিউ ইয়র্কে যাবেন বিশেষ কাজে। যাবার পথে কেন যেন অস্বস্তি লাগতে লাগল কিশোরের। অদ্ভুত এক অনুভূতি। ট্যাক্সির রিয়ার ভিউ মিররে চোখ রেখে বলল, কেউ আমাদের পিছু নিয়েছে। সামনের ট্রাফিক লাইটে দাঁড়াতেই চেনা গেল লোকটাকে। সাদা একটা মার্সিডিজ, কিশোরদের ট্যাক্সির প্রায় গা ঘেঁষে দাঁড়াল। এক চোখে সেই লোকটা। হয়তো ভেবেছে তার খামটা মেরে দিয়েছি আমরা! নিচু স্বরে বলল রবিন। মনে হয়, চিন্তিত ভঙ্গিতে মাথা দোলালেন রাশেদ পাশা। আমাদেরকে খুন করার ইচ্ছে থাকলেও অবাক হব না। সাবধানে থাকতে হবে। বিশেষ করে তোমাদের।…আগামী কদিন কি প্ল্যান তোদের, কিশোর? কি করবি ভাবছিস? কোস্টের দিকে যাব। সৈকতে ঘুরে বেড়াব। দেখি, আরও কি কি করা যায়। যা-ই করিস, সাবধানে থাকিস। বলা যায় না… আর কয়েক মিনিটের মধ্যে এয়ারপোর্টে পৌঁছে গেল ওরা। পিয়েরে ট্রুপার টিকিটিও দেখা গেল না আর আশেপাশে। চাচাকে প্লেনে তুলে দিয়ে আবার ট্যাক্সি নিল কিশোর। হোটেলে ফিরে এল তিন গোয়েন্দা। রাস্তার ওপারে দুপার গাড়িটা দেখতে পেল কিশোর। লোকটা আসলে চায় কি? মুসার প্রশ্ন। লোকটা বোধহয় ধরেই নিয়েছে আমরা তার খাম চুরি করেছি। তাই পিছু ছাড়ছে না, কিশোর বলল। লোকটার ওপর আমাদেরও নজর রাখতে হবে। ট্যাক্সি ভাড়া চুকিয়ে হোটেলে ঢুকল ওরা। রূমে এসে ব্রীফকেসটা বিছানার ওপর ছুঁড়ে ফেলা কিশোর। ওটার দিকে তাকাতেই চোখ স্থির হয়ে গেল রবিনের। কিশোর! ব্রীফকেসের নিচে কি যেন লেগে আছে। চিৎকার করে উঠল সে। কি এটা? একটা খাম। আটকে আছে ব্রীফকেসের তলায়। আরি! কিশোরও অবাক। এটা এল কোত্থেকে! খামটা খুলে নিল সে। বুঝতে পেরেছি। ব্রীফকেসের গায়ে কোন ভাবে লেগে গিয়েছিল চিবানো চিউয়িং গাম। তাতে আটকে গেছিল খামটা। চেয়ারেই পড়ে ছিল ওটা, মিথ্যে বলেনি দুপা। বড়ই কাকতালীয় ঘটনা। এবং অদ্ভুত। খোলো তো দেখি! তাড়া দিল মুসা। ভেতরে কি আছে দেখার জন্যে তর সইছে না আমার। খাম খুলল কিশোর। ভেতরে জরাজীর্ণ, মলিন এক টুকরো কাগজ। তাতে অদ্ভুত কিছু কথা লেখা ছড়ার ঢঙে। কিশোর জোরে জোরে পড়ে শোনাল: ভাবছ ওটা আছে হেথায়। খুঁজলে পাবে নাকো সেথায় পাহাড় বেয়ে ওঠা মাথায় আবার নামে নিচে। অনেক গভীর শিকড় যেথায় পাহারা দেয় সিম্বু সেথায় সোনা চুরির ফন্দি ছাড়ো মানে মন কেটে পড়ো নইলে আছে দুঃখ অনেক বাঁচবে নাকো কেউ। অবাক হয়ে গেল ওরা। রাশেদ আঙ্কেল যে বুড়ো লোকটার গল্প বলেছে এটা নিশ্চয় তার কাজ। অবশেষে বলল রবিন। ওই লোক তার ক্রীতদাসের সাহায্যে সোনাদানা লুকিয়ে রেখেছিল। পাহারার ব্যবস্থা করেছিল সিম্বুকে দিয়ে। জ্যোতিষীর ভবিষ্যদ্বাণীর সাথে ধাপে ধাপে মিলে যাচ্ছে, ফাঁকা শোনাল মুসার কণ্ঠ। আমরা লোভে পড়ে গুপ্তধনের সন্ধানে বেরোলেই অভিশাপ নেমে আসবে আমাদের ওপর। দূর, তোমার অভিশাপ! কে বিশ্বাস করে? মুখ ঝামটা দিল রবিন। যা-ই বলল, অদ্ভুত কিছু যে ঘটছে এখানে, তাতে কোন সন্দেহ নেই। কি বলল, কিশোর? চিন্তিত ভঙ্গিতে নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটতে কাটতে ফিরে তাকাল কিশোর, হুঁ। আমাদের এখন কি করা উচিত তাহলে? রবিনের প্রশ্ন। হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল কিশোর। ব্যাপারটার শেষ দেখে ছাড়ব। সোনা যদি পেয়েই যাই পুলিস বা কোন চ্যারিটির হাতে তুলে দেব। জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল কিশোর। দুপা ওদের দিকে নজর রাখছে কিনা দেখার জন্যে পর্দার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিল। বৃষ্টি শুরু হয়েছে, জানাল সে। আমাদের বন্ধুটি এখনও আগের জায়গায় দাঁড়িয়ে-না না, চলে যাচ্ছে। ভেবেছে হয়তো ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে আমরা কোথাও বেরোব না। আকাশ ফুটো করে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামল। গাছের শাখায় ঝোড়ো হাওয়ার মাতামাতি। চলো, এই সুযোগে বেরিয়ে পড়ি, প্রস্তাব দিল মুসা। রেইনকোট আছে। কাজেই ভিজতে হবে না বৃষ্টিতে। আর ক্যাম্পিং-এর জন্যে গর্ত খোঁড়ার কিছু যন্ত্রপাতি নিয়ে এসেছিলাম। ওগুলোও নেব সাথে। প্রস্তাবটা মন্দ না, নিমরাজি হলো কিশোর। ঠিক আছে, চলো। চুপচাপ হোটেলে বসে থাকতে ভাল্লাগবে না। দেখেই আসি সিম্বুকে পাওয়া যায় কিনা। কয়েক মিনিট পরে হোটেলের পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে এল ওরা। এখানে ওদের বাইক রেখেছে। সাবধানে মোটর সাইকেল দুটো নিয়ে উঠে এল মেইন রোডে। তাকাল এদিক-ওদিক। নাহ্, সাদা মার্সিডিজের চিহ্নও নেই কোথাও। রাস্তা প্রায় জনমানবশূন্য। গন্তব্য বুড়োর বাড়ি। ভাগ্য ভালই বলতে হবে। একটু পরেই থেমে গেল বৃষ্টি। মেঘ সরিয়ে দিয়ে হেসে উঠল ঝলমলে চাঁদ। নদীর ধারে চলে এসেছে ওরা। নদীর পাশের সরু রাস্তায় ঢুকে পড়ল। অনেকটা পথ যাবার পর চোখে পড়ল বুড়োর বাড়ি। রাস্তা মেরামতির কাজ চলছে। বড় বড় সব যন্ত্রপাতি। খানিক দূরে একটা পাথুরে দেয়াল। ঘিরে রেখেছে বুড়োর শতাব্দী প্রাচীন বাড়িটাকে। মোটর সাইকেল থামাল ওরা। হেঁটে ঢুকে পড়ল গেট দিয়ে। চাঁদটাকে আড়াল করে দিতে শুরু করেছে মেঘ। বাতাস উঠছে। একটু পরেই আবার নামল বৃষ্টি। বাহু, দারুণ! বিরক্ত কণ্ঠে বলে উঠল মুসা। এই আসে এই যায়! টর্চ জ্বেলে এগোচ্ছে ওরা। বড় বড় ওক গাছের ডালে ঝুলে থাকা এক ধরনের শ্যাওলার কারণে বিঘ্নিত হচ্ছে যাত্রা। টর্চের আলোতে খুব কম জায়গাই আলোকিত হচ্ছে। কানের পাশে নিশাচর পাখি তীক্ষ্ণ গলায় ডেকে উঠে দারুণ চমকে দিল ওদেরকে। ডাকতে ডাকতে বৃষ্টির মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল। ঘ্যাঙর-ঘ্যাঙ কোরাস ধরেছে ব্যাঙ। হাঁটু ডুবে যাওয়া গভীর জলায় নেমে পড়েছে কিশোর। পায়ের নিচে পিচ্ছিল কি একটা কিলবিল করে উঠল। আঁতকে উঠল ও। এক লাফে উঠে এল তীরে। কি হলো? জানতে চাইল রবিন। সাপ! বিড়বিড় করল কিশোর। গোখরো! আরেকটু হলেই গেছিলাম। পুরানো বাড়িটার কাছাকাছি এসেছে ওরা, এমন সময় মড়মড় করে একটা ডাল ভেঙে গেল। মুসা দেল ডালটা সোজা রবিনের গায়ে পড়তে যাচ্ছে। সাবধান করে দেয়ার সময় নেই। প্রচণ্ড এক ধাক্কা মারল রবিনকে। ছিটকে পড়ে গেল রবিন। বিশাল মোটা ডালটা এক সেকেন্ডের জন্যে তার শিকার হারাল। ডালটার দিকে তাকিয়ে শিউরে উঠল রবিন। আরেকটু হলে আমিও গেছিলাম, খসখসে গলায় বলল ও। কিশোরের দিকে তাকাল মুসা। সিম্বু পুতুলের কারণে মিউজিয়ামে দুর্ঘটনাগুলোর কথা মনে পড়ে গেছে তার। ফিরে যাবে নাকি? নাহ? ওই তো সামনেই বাড়িটা। ওটাকে এখন আর বাড়ি বলা যায় না। দেয়ালগুলো শুধু খাড়া হয়ে আছে, ছাদ অদৃশ্য। এবড়োখেবড়ো মেঝে। আবর্জনা, ভাঙা কাঠ আর অন্যান্য পরিত্যক্ত জিনিসপত্রে বোঝাই মাটির নিচের ঘরটা। ভাবছ ওটা আছে হোথায়, খুঁজলে পাবে নাকো সেথায়, পাহাড় বেয়ে ওঠো মাথায়, আবার নামো নিচে, বিড়বিড় করে ছড়াটা আওড়াল কিশোর। ছোটখাট একটা পাহাড়ের মত টিলার মাথায় চড়ে তরাইয়ের চারপাশে চোখ বোলাল। বেশির ভাগটাই সমতল। নেমে কোন দিকে যেতে হবে? জানতে চাইল রবিন। মনে হয় বাড়ির পেছন দিকে যেতে বলেছে। চলো, দেখে আসি। দেখা গেল বাড়ির পেছন থেকে মাটি ঢালু হয়ে নেমে গেছে। অনেক গভীর শিকড় যেথায়, পাহারা দেয় সিম্বু সেথায়, এবার আবৃত্তি করল রবিন। কিসের শিকড়? এদিকে কোনও বড় গাছটাছ তো চোখে পড়ছে না। রূট সেলারের কথা বলেনি তো? বলে উঠল কিশোর। ঠিক! তা-ই বুঝিয়েছে। সেলার শব্দটা ইচ্ছে করে বাদ দিয়েছে। গুপ্তধন শিকারীকে ধোকা দেবার জন্যে। রূট মানে শিকড়। সেলার বাদ দেয়াতে শুধু গাছপালাই খুঁজে বেড়াবে যারা গুপ্তধন খুঁজতে আসবে। আমরাও সেই ধোকায় পড়ে গিয়েছিলাম।…আগেকার দিনে ঘর-বাড়িতে রূট সেলার থাকত বলে জানতাম। লোকে শাক-সজি রাখত রূট সেলারে। তখন তো আর ফ্রিজ আবিষ্কার হয়নি। তা ঠিক, মাথা দোলাল রবিন। প্রশ্ন হলো, রূট সেলারটা কোথায়? চলো, ওই টিলায় উঠে লাফালাফি করি, বুদ্ধি দিল কিশোর। ফাপা হলে শব্দ শুনেই বোঝা যাবে। কিন্তু টিলায় চড়ব কেন? মুসার প্রশ্ন। পাহাড় বেয়ে ওঠো মাথায়, আবার নামে নিচে, বলে স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছে ছড়াকার, জবাব দিল কিশোর। সেজন্যেই উঠব। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, ওই টিলার নিচেই কোনখানে আছে গুপ্তধন। পাহাড়ের গায়ে লাফালাফি করতে গিয়ে কাদা মেখে ভূত হয়ে গেল তিনজনেই। ঘণ্টাখানেক এ ভাবেই চলল। হঠাৎ মুসা বলে উঠল, দাঁড়াও। দাঁড়াও। এখানে ফাপা একটা আওয়াজ শুনেছি। খুড়ে দেখা যাক। পরের আধঘণ্টা নিবিষ্ট মনে মাটি খুঁড়ে চলল তিন গোয়েন্দা। পরিশ্রমের ফল মিলল অবশেষে। মাটি সরে বেরিয়ে এল কাঠ। আধ চা কাঠে শাবল দিয়ে বার কয়েক গুতো মারতেই ভেঙে গেল। টর্চের আলোতে একটা গর্ত দেখতে লে ওরা। বারো ফুট মত গম্ভীর হবে। খালি গর্ত। গুঙিয়ে উঠল মুসা। খামোকাই এত খাটলাম! এক মিনিট, বলল কিশোর। এখানেই কোথাও আছে। নইলে এত খাটতে যেত না বুড়ো। রূট সেলারের কাঠের মেঝের নিচেই রেখেছে সোনার বারগুলো। সঙ্গে করে আনা টুল কিট থেকে রশি বের করল কিশোর। রশির এক মাথায় হক লাগিয়ে মাটিতে গাঁথল। রশি বেয়ে প্রায় বারো ফুট নিচে নেমে এল। মেঝেতে আবার ঠুকতে শুরু করল ফাপা আওয়াজ শোনার আশায়। এবার বেশিক্ষণ পরিশ্রম করতে হলো না। শুনতে পেল প্রত্যাশিত শব্দটা। কুঠরির কাঠের তক্তা ভেঙে খুলে ফেলেছে ওরা, এ সময় রূট সেলারে ঢুকতে শুরু করল বৃষ্টির পানি। পরিস্থিতি আরও খারাপ করে দেয়ার জন্যেই যেন ওপরের একটা গর্তে জমা পানিও উপচে গিয়ে ঢাল বেয়ে গড়িয়ে পড়তে শুরু করল সেলারে। দেখতে দেখতে গোড়ালি ডুবে গেল ওদের। ক্রমেই বাড়ছে পানি। এখানে থাকলে তো দেখছি ডুবে মরব, মুখ অন্ধকার হয়ে গেছে রবিনের। জ্যোতিষীর কথাই শেষ পর্যন্ত ফুলে যাবে মনে হচ্ছে! সত্যি চলে যেতে চাইছ? জিজ্ঞেস করল কিশোর। দেখি আরেকটু, গুপ্তধন পাওয়ার আশা কিশোরের মতই ছাড়তে পারল না রবিনও। দেয়ালের আরেকটা তক্তা খুলে আনল মুসা। পাহাড়ের গায়ে একটা সুড়ঙ্গ চোখে পড়ল। উচ্চতায় পাঁচ ফুটেরও কম। ওপরের দিকে উঠে গেছে সুড়ঙ্গটা। ফলে পানি ওটার নাগাল পাবে না। বুড়ো এটা তৈরি করে রেখে গেছে, বলল কিশোর। জানত, বৃষ্টি হলে পানি ঢুকতে পারে। তাই এমন জায়গায় বানিয়েছে, যাতে পানি না জমে। মাথা নিচু করে সুড়ঙ্গের মধ্যে ঢুকে পড়ল ওরা। দশ ফুট যাবার পরে বাম দিকে মোড় নিল। ধীরে ধীরে এগোতে লাগল হামাগুড়ি দিয়ে। কড়াৎ করে বাজ পড়ল। এবং ঠিক ওই মুহূর্তে অযাচিত ভাবে সিম্বুর মুখোমুখি হলো ওরা। একটা লোহার সিন্দুকের ওপর চুপ করে বসে রয়েছে ছোট্ট মূর্তিটা। হাঁ করে তাকিয়ে রইল তিনজনেই। সিন্দুকে কি বারগুলো আছে?–সবার মনেই খেলে গেল একই প্রশ্ন। বাক্সটা খুলব? ফিসফিস করে যেন নিজেকেই প্রশ্ন করল কিশোর। কি-কি-কিন্তু, সিম্বুর অভিশাপ… ভয়ে কথা শেষ করতে পারল না মুসা। বাক্সটা খুললে যদি…! রবিনও ভয় পাচ্ছে। সিম্বুর কদাকার ছোট্ট মুখটার দিকে তাকিয়ে ভয় লাগছে ওদের। ফিসফিস করে বলল কিশোর, সিম্বু, আমরা তোমার কোন ক্ষতি করতে আসিনি। তোমার সোনা চুরি করার ইচ্ছেও আমাদের নেই। আমরা শুধু দেখতে চাই বাক্সের ভেতরে সোনাগুলো আছে কিনা। আস্তে করে মূর্তিটা এক পাশে সরিয়ে রাখল কিশোর। বাক্স খোলার চেষ্টা করল। খুব মজবুত তালা। ওদের কাছে এই তালা খোলার যন্ত্র নেই। এখন কি করা? সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে কিশোরের দিকে তাকাল রবিন। সিম্বুকে নিয়ে যেতে পারি আমরা… কথা শেষ হলো না তার। বিকট শব্দে বাজ পড়ল আবার। রূট সেলারে পানি জমছে জানা কথা, কিশোর বলল। বেশি দেরি করলে ভরে যাবে। বেরোনোর উপায় থাকবে না আমাদের। তারচেয়ে চলো এখন চলে যাই। কাল বৃষ্টির পানি নেমে গেলে আবার আসা যাবে। তালা খোলার যন্ত্র নিয়ে আসব কাল। ঠিক বলেছ, সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল মুসা। স্বস্তি পেল সিম্বুর প্রহরায় রাখা সোনা দেখতে গিয়ে তাকে রাগিয়ে দিতে হলো না বলে। প্যাসেজওয়ে ধরে পিছিয়ে এল ওরা। রূট সেলারে ঢুকল। পানিতে থই থই করছে সেলার। গর্ত থেকে পানি রানোর ব্যবস্থা করতে না পারলে সকালের মধ্যে সেলার পুরো ডুবে যাবে, নিচের দিকে তাকিয়ে বলল কিশোর। শাবল দিয়ে খুঁচিয়ে সেলার থেকে পানি সরে যাওয়ার জন্যে একটা মুখ তৈরি করল ওরা। সেলারের ছাত যাতে ভেঙে ধসে পড়তে না পারে, সেজন্যে তক্তা দিয়ে আটকে রাখার ব্যবস্থা করল। করলাম তো, চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল কিশোর, কিন্তু থাকবে কিনা জানি না। চলে, যাওয়া যাক। দড়ি বেয়ে ওপরে উঠে এল ওরা। মোটর সাইকেলে চড়ে হোটেলে ফিরল ওরা। কারও নজরে পড়ল না। দুপার সাদা মার্সিডিজটাও দেখতে পেল না কোথাও। ঘণ্টাখানেক পরে রকি বীচ থেকে অপ্রত্যাশিত একটা ফোন এল। কিশোরের চাচী মেরিচাচীকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অ্যাক্সিডেন্ট করেছেন। অপারেশন লাগবে। চাচাকে খবর পাঠাল কিশোর। তক্ষণি বাড়ি যেতে তৈরি হলো। আফসোস করে বলল, সিম্বুর সোনা দেখা আর হলো না আমাদের। যাকগে, কি আর করা! চাচী ভাল হয়ে গেলে আবার আসব। এখন আমি এয়ারপোর্টে ফোন করছি টিকেটের জন্যে। পরদিন সকালের ফ্লাইটের টিকেট পেল ওরা। এয়ারপোর্টে আসার পথে লক্ষ করল পিছু পিছু সাদা মার্সিডিজটাও আসছে। বাজি ধরে বলতে পারি, আমাদেরকে চলে যেতে দেখে খুবই অবাক হচ্ছে দুপা, রবিন বলল। * মাসখানেক পরে তিন গোয়েন্দার হেডকোয়ার্টারে বসে গল্প করছে কিশোর, মুসা রবিন ও ওদের বন্ধু বিড ওয়াকার। সিম্বুর গল্প শুনে বিড জিজ্ঞেস করল, সোনার বারগুলো দেখতে গিয়েছিলে আর? গিয়েছিলাম, জবাব দিল কিশোর। তবে যেতে দেরি করে ফেলেছিলাম। মানে? ভুরু কোঁচকাল বিড। তুলে নিয়ে গেছে নাকি কেউ গুপ্তধনগুলো? না, মাথা নাড়ল কিশোর। বুড়োর বাড়ির পাশে যে রাস্তাটা বানানো হচ্ছিল, দেখে এসেছিলাম, পরের বার গিয়ে দেখি সেটা তৈরি হয়ে গেছে। বুড়োর বাড়ি ভেঙে ফেলেছে। টিলা সমান করে বাড়ির ওপর দিয়ে চলে গেছে ছয় লেনের, কংক্রিটের ঝকঝকে রাস্তা। তারমানে, হতাশ হলো বিড, বুড়োর গুপ্তধন চিরকালের জন্যে চাপা পড়ে গেল মাটির নিচে। গম্ভীর ভঙ্গিতে মাথা দোলাল কিশোর। হ্যাঁ। সিম্বু আর মনিবের জিনিস বেশ ভালমতই পাহারা দিয়ে রেখেছে। মনে হয় কাউকে ছুঁতে দেয়নি। দুপাকেও না। . ভূতের জাহাজ মোটর বোট নিয়ে সাগরে বেড়াতে বেরিয়েছে তিন গোয়েন্দা। সময় পেলেই এ রকম বেরোয়। তবে আজ সাগরের মতিগতি সুবিধের ঠেকছে না। মাথায় সাদা ফেনা নিয়ে ফুঁসে উঠছে ঢেউ। বোটের গায়ে ধাক্কা খেয়ে ছিটকে উঠছে পানি। কপালে হাত রেখে ঢেউ দেখতে দেখতে কিশোর বলল, ঝড় আসবে মনে হচ্ছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তীরে ফিরে যাওয়া দরকার। হাতের চেটো দিয়ে মুখ থেকে পানির ছিটা মুছল মুসা। হাল ধরে রেখে বলল, হ্যাঁ। সন্ধ্যাও হয়ে আসছে। তবে তীর থেকে বেশি দূরে নই আমরা। বাড়ি ফিরে যাই চলো। আমি ইঞ্জিনের স্পীড বাড়াচ্ছি। রবিন কিছু বলল না। তাকিয়ে আছে ঢেউয়ের দিকে। মোটর বোট নিয়ে বেড়াতে বেরোয় ওরা, ঝড়-টর দেখে না তা-ও না। তবে সে-সম্ভাবনা দেখলেই দ্রুত উপকূলে ফিরে আসে। অ্যাকসিলারেটরে চাপ বাড়াল মুসা। গতি পেয়ে লাফ মেরে ছুটল মোটর বোট। হঠাৎ খকখক করে কাশতে শুরু করল ইঞ্জিন। তারপর থেমে গেল। স্থির হয়ে পানিতে ভাসতে লাগল বোট। ইঞ্জিন স্টার্ট দেয়ার চেষ্টা করল মুসা। কাজ হলো না। নাহ্, হচ্ছে না, হতাশ ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল মুসা। কোথাও কিছু গড়বড় হয়ে গেছে। ইঞ্জিনের ঢাকনা খুলে দেখতে শুরু করল সে। কাজ শেষ করে মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলল, কই, কোথাও তো কোন গলদ দেখতে পাচ্ছি না। ট্রান্সমিশন, তেল, গ্যাস-সবই ঠিক আছে। ইঞ্জিন স্টার্ট নিচ্ছে না কেন? রবিনের প্রশ্ন। সাহায্য দরকার আমাদের। সাঁতার কেটে তো আর তীরে পৌঁছুতে পারব না, কিশোর বলল। শিপ-টু-শোর রেডিও ট্রান্সমিটারের সুইচ অন করল সে। কিছুই ঘটল না। কয়েকবার সুইচ অন-অফ করল। পরীক্ষা করে দেখলতার, ব্যাটারি। রেডিওতেও কোন সমস্যা দেখতে পাচ্ছি না, বিড়বিড় করল কিশোর। কিন্তু এটাও অকেজো হয়ে পড়েছে! অদ্ভুত ব্যাপার তো! এ কেমন ঝামেলায় পড়লাম। সাঁঝের আঁধার ঘনিয়ে আসছে। সেই সাথে বাড়ছে বাতাস। বেড়ে যাচ্ছে ঢেউয়ের তীব্রতাও। ঢেউয়ের আঘাতে অসহায়ের মত পানিতে দোল খাচ্ছে বোট। আকাশে চাঁদ দেখা যাচ্ছে না। কালো মেঘ ঢেকে রেখেছে নক্ষত্রপুঞ্জ। ঠাণ্ডায় গায়ে কাটা দিতে লাগল ওদের। শীত করছে। অবস্থা দেখে তো মনে হচ্ছে সারা রাত এখানেই কাটাতে হবে, অস্পষ্ট স্বরে বলল রবিন। ঢেউয়ের ধাক্কায় বোট উন্টে না গেলেই বাঁচি। কেউ যে আমাদের এখান থেকে উদ্ধার করে নিয়ে যাবে সে-চান্সও নেই, মুখ কালো হয়ে গেছে কিশোরের। এক হাত দূরের জিনিসও দেখা যায় না। জাহাজ-টাহাজ এলেও আমাদের দেখতে পাবে না। হঠাৎ অন্ধকার কুঁড়ে কালো, প্রকাও কি একটা ওদের সামনে ছুটে আসতে লাগল। কর্কশ একটা কণ্ঠ ভেসে এল সাগর থেকে কে তোমরা? জাহাজ! উল্লসিত হয়ে উঠল মুসা। আমাদেরকে দেখতে পেয়েছে। মুখের সামনে দুই হাত জড় করে এনে চিৎকার করে জবাব দিল, আমরা সাগরে আটকা পড়েছি। আমাদেরকে আপনাদের জাহাজে তুলে নেবেন? দাঁড়াও। আসছি, জবাব এল। কালো পাহাড়ের মত জিনিসটা এগিয়ে এল ওদের দিকে, থেমে পড়ল বোটের পাশে। জাহাজটা বিশাল। বাতাসে দুলতে থাকা লণ্ঠনের আলোয় গলুই চোখে পড়ছে। তার নিচে সাদা অক্ষরে লেখা: অ্যাড্রিয়াটিক পাঞ্চ। অদ্ভুত নাম! বিড়বিড় করল রবিন। বোট লক্ষ্য করে জাহাজ থেকে একটা.দড়ির মই ছুঁড়ে দেয়া হলো। মইটা দুহাতে ধরে ফেলল কিশোর। দ্রুত উঠে এল ওপরে। বোটের সাথে মই বেঁধে ফেলল মুসা। রবিনকে উঠে যাওয়ার সুযোগ দিল। তারপর নিজেও অনুসরণ করল তাকে। লাফ মেরে জাহাজের রেলিং টপকাল তিনজনে। দাঁড়াল এসে প্রকাণ্ড ওক কাঠের ডেকে। পুরানো আমলের লণ্ঠনের মিটমিটে আলোয় দেখল এটা একটা পাল তোলা জাহাজ। বাতাসে পতপত করে উড়ছে পাল। মূল মাল খাড়া উঠে গেছে অন্ধকার আকাশে। একটা কাঠের সিঁড়ির মাথা গিয়ে ঠেকেছে হুইল হাউজে। ডেকে বেশ কয়েকজন রুক্ষ চেহারার নাবিক। সবার পরনে পুরানো আমলের পোশাক। দাঁড়িয়ে আছে নিঃশব্দে। ভ্রু কুঁচকে দেখছে ওদেরকে। একজনের হাতে একটা হাপুন। অস্ত্রটা ভীতিকর ভঙ্গিতে দোলাল সে। ট্রেনিং শিপ, নিচু গলায় দুই সহকারীকে বলল কিশোর। মনে হচ্ছে। এমন ভূতুড়ে ট্রেনিং শিপ জীবনে দেখিনি আমি, ফিসফিস করল মুসা। নোনা পড়া জ্যাকেট গায়ে এক লোক এগিয়ে এল ওদের সামনে। লোকটা লম্বা, মুখভর্তি কালো দাড়ি। তীক্ষ্ণ, কালো চোখ। কথা বলার সময় গলার স্বর শুনে গোয়েন্দারা বুঝল, খানিক আগে এই লোকই ওদের পরিচয় জানতে চেয়েছিল। নাম কি তোমাদের? কর্কশ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল লোকটা। নিজেদের পরিচয় দিল কিশোর। ঘোৎ-ঘোৎ করে উঠল লোকটা। তোমরা যে-ই হও তাতে আমার কিছু এসে যায় না। সাহস করে জানতে চাইল রবিন, আপনি কে? আমি এডওয়ার্ড নাইল। অ্যাড্রিয়াটিক পাঞ্চের ক্যাপ্টেন। তিমি শিকারী জাহাজ এটা। আমরা এসেছি নাটুকেট থেকে। ওখানেই ফিরে যাচ্ছি আবার। শক্ত সমর্থ কয়েকজন লোক দরকার আমাদের। তোমাদেরকে দিয়ে কাজ হবে মনে হচ্ছে। নানটুকেট না পৌঁছা পর্যন্ত তোমরা আমার ক্রু হিসেবে কাজ করবে। অবাক হয়ে পরস্পরের দিকে তাকাল তিন গোয়েন্দা। এ লোক বলছে কি? উনবিংশ শতাব্দীর পরে আর কোন পাল তোলা তিমি শিকারীর জাহাজ তৈরি করা হয়নি। লোকটা ঠাট্টা করছে ভেবে কিশোর বলল, ক্যাপ্টেন নাইল, আপনার জাহাজে থাকতে আসিনি আমরা। আমাদের ইঞ্জিন খারাপ হয়ে গেছে। মেরামতের জন্যে লোক দরকার। দয়া করে যদি বোটটা সহ আমাদের তীরে পৌঁছে দেন, কৃতজ্ঞ থাকব। ইঞ্জিন? ইঞ্জিন আবার কি জিনিস? খেঁকিয়ে উঠল নাইল। লোকটা কি রসিকতা করছে নাকি! কিশোর বলল, জাহাজ চালাতে আপনার শক্তির দরকার হয় না? গাধা নাকি! হয় না মানে? শক্তি ছাড়া জাহাজ চলে? সেজন্যেই তো বাতাস দরকার, আর বাতাসের শক্তিকে ব্যবহার করার জন্যে পাল! গমগমে গলায় বলল ক্যাপ্টেন। এ ছাড়া সাগরে জাহাজ চালাতে আর কোনও শক্তি জোগাড় করতে পারবে তুমি? আরেকটা কাজ অবশ্য করা যায়-সাগরে লগি ঠেলে জাহাজ চালাতে পারো। ক্যাপ্টেনের কথা শুনে হো হো হাসিতে ফেটে পড়ল নাবিকরা। নাইলও হাসছে। যেন খুব মজার একটা রসিকতা করে ফেলেছে। লোকগুলো ভারী অদ্ভুত! রাগ লাগল কিশোরের। চলো। এই পাগলদের সঙ্গে থাকার চেয়ে নিজেদের বোটে নেমে যাই। উত্তাল ঢেউয়ের মধ্যে ঝুঁকি নিয়ে ভেসে থাকব, সে-ও ভাল। রেলিং-এর ধারে ছুটে এল ওরা। যেখান দিয়ে মই বেয়ে উঠেছে। উঁকি দিল। সাথে সাথে জমে গেল যেন। বোটটা নেই! ধরো ওদেরকে! নাইল হুকুম দিল তার দেরকে। ধরো! ধরো! নাবিকরা ছুটে এসে ধরে ফেলল তিন গোয়েন্দাকে। জোর করে নিয়ে এল মাঝ ডেকে। ক্যাপ্টেন নাইল গনগনে মুখ নিয়ে দাঁড়াল ওদের সামনে। তোমাদের মতলব ভালই বুঝতে পারছি আমি, কর্কশ কঠে বলল সে। তোমরা অন্য তিমি শিকারীদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হতে চাইছ। কিন্তু সে-সুযোগ আর পাবে না। পাঞ্চেই থাকতে হবে তোমাদেরকে আমরা কেপ হন হয় প্রশান্ত মহাসাগরে যাচ্ছি। তোমাদেরকে তিমি শিকারী বানিয়েই ছাড়ব। আমাদের কথা না কালে স্রেফ হাওরের মুখে ছুঁড়ে ফেলে দেব। অবাক লাগছে কিশোরের। না বলে পারল না, প্রশান্ত মহাসাগরেই তো রয়েছি আমরা। আবার যাব কি ওখানে? আমাকে জাহাজ চালানো শেখাবে, না? খেঁকিয়ে উঠল ক্যাপ্টেন। চল্লিশ বছর ধরে সাগরে সাগরে ঘুরছি, আমাকে সাগর চেনাবে। আর একটা কথা বলেই কি ভাল হবে না বলে দিলাম। নাইলের হুমকি তিন গোয়েন্দার মেরুদণ্ডে ঠাণ্ডা শিহরণ জাগাল। কিশোরের মনে হলো একদল পাগলের কবলে পড়েছে। মুসা আর রবিনের মনে শচ্ছে জ্যান্ত দুঃস্বপ্ন দেখছে। হুইল হাউজের দিকে ঘুরল নাইল। চেঁচিয়ে আদেশ দিল, ডেভিড পুকার। এখানে এসো। বিশালদেহী, মোটাসোটা এক নাবিক হাজির হলো হুইল হাউজের সামনে। সিঁড়ি বেয়ে নেমে এল ডেকে। নাইল তাকে হুকুম করল তিন গোয়েন্দাকে নিচে নিয়ে যেতে। ডিউটির জন্যে প্রস্তুত করতে হবে। পুকার নিয়ে চলল ওদের। পেছন থেকে ভেসে এল ক্যাপ্টেন এবং তার আজব নাবিকদের ভৌতিক হাসি। আমি ফাস্ট মেট, সিঁড়ি বেয়ে নামার সময় নিজের পরিচয় দিল পুকার। ডিউটি যখন থাকবে না, তখন তোমরা কোথায় থাকবে দেখিয়ে দিচ্ছি। এ সব কি ঘটছে কিছুই বুঝতে পারছি না, মুসা বলল। কি ঘটছে ঠিকই জানো তোমরা, কড়া গলায় বলল ফাস্ট মেট। না, জানি না! প্রতিবাদ করল কিশোর। সিঁড়ির শেষ মাথায় এসে ঘুরে দাঁড়াল পুকার। ধমকে উঠল, তাহলে আগে জেনে নাও কি কি করতে হবে তোমাদের। সব সময় নির্দেশ মেনে চলবে। নির্দেশ অমান্যকারী নাবিককে সাগরে, হাঙরের মুখে ছুঁড়ে ফেলে দেয়া হয়। ক্যাপ্টেন নাইলের হুমকির কথা মনে পড়তে কেঁপে উঠল রবিন। ওদের নিয়ে ক্রুদের লিভিং কোয়ার্টার্সে চলে এল পুকার। বেশ বড় ঘর। দেয়ালের সাথে লাগানো কতগুলো বাঙ্ক। প্রতিটি বাঙ্কের নিচে ঝুলছে একটা করে হারপূন। হারপূনের পাশে বর্ষাতি আর সাউথ ওয়েস্টার। ঝড় বাদলার দিনে চামড়ার জ্যাকেটের ওপর বর্ষাতি চাপাতে হয়। মাথা ঢাকতে হয় সাউথ ওয়েস্টার দিয়ে। * ওই খালি বাঙ্ক তিনটে তোমাদের, হাত তুলে দেখাল ফাস্ট মেট। ডেকে কাজ করার জন্যে রেডি হয়ে তাড়াতাড়ি চলে এসো। হুকুম দিয়ে চলে গেল সে। চলতে শুরু করেছে জাহাজ, টের পেল ওরা। কাঁচকোচ করছে কড়িকাঠ, দুলছে এদিক-ওদিক। মাথার ওপর একটা লণ্ঠন জ্বলছে মিটমিট করে। চর্বি আর তেলের গন্ধ আসছে ওটা থেকে। তিমির তেল, মন্তব্য করল রবিন। সায় দেয়ার ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকাল কিশোর। গোয়েন্দাগিরি করতে গিয়ে সব ধরনের জ্বালানি ব্যবহার করার অভিজ্ঞতা হয়েছে ওদের। তাই গন্ধ পেয়েই বুঝতে পেরেছে লণ্ঠন জ্বলছে তিমির তেলে। যদ্দুর জানি, বলল কিশোর, কেরোসিনের ব্যবহার শুরু হবার পর থেকে তিমির তেলের প্রয়োজন ফুরিয়েছে। তাহলে ওটা এল কোত্থেকে? আসলে ঘটছে কি এখানে? কিছুই বুঝতে পারছি না, জবাব দিল মুসা। তবে মন বলছে সাবধানে থাকা দরকার। ভূত-প্রেত… আরে ধুত্তেরি তোমার ভূত-প্রেত! খেঁকিয়ে উঠে তাকে থামিয়ে দিল কিপোর। সারাক্ষণ খালি ভূতের ভয়… বাঙ্কে এসে শুয়ে পড়ছে নাবিকরা। তাদের দিকে হাসি মুখে তাকাল রবিন। কিন্তু ওর দিকে ভাবলেশহীন মুখে তাকিয়ে রইল তারা। আমরা এখানে নতুন, ভাব জমানোর চেষ্টা করল জো। কিন্তু পাথর-মুখ করেই থাকল জাহাজীরা। নাবিকরা শুনেছি হাসিখুশি থাকে, বিড়বিড় করল কিশোর। কিন্তু এরা তো কবরের লাশ একেকটা। বললেই তো খেপো, গম্ভীর কঠে মুসা বলল। কিন্তু না বলেও পারছি না। লোকগুলোর মতই জাহাজটাকেও ভূতুড়ে মনে হচ্ছে আমার। এ জাহাজে বেশিদিন থাকতে হলে আর ভূতের প্রয়োজন পড়বে না, বলার সময় গলার স্বর কেঁপে উঠল রবিনের। নিজেরাও ভূত হয়ে যাব। সমর্থন পেয়ে খুশি হয়ে তুড়ি বাজাল মুসা, এতক্ষণ ধরে ঠিক এই কথাটাই বোঝাতে চাইছি আমি। ওদের কাছে বসা যামার্কা চেহারার এক নাবিক তার হারপূনের ধারাল, লম্বা ফলায় তেল মাখছে। সেই সাথে পালিশ করছে কাঠের ডাটা। একটা উকো হাতে নিল সে। ঘষে ঘষে ডগাটা তীক্ষ্ণ ও ধারাল করে তুলল। উকোটা লম্বা, মাছ ধরার বঁড়শির মত বাকানো। লোকটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল কিশোর। উঁকো দেখতে দেখতে বলল, বিপদজনক অস্ত্র মনে হচ্ছে। বিপজ্জনক তো বটেই। তবে তিমির জন্যে, ঘেৎ-ঘোৎ করে উঠল লোকটা। কিছু বোকা ছাগলের জন্যেও, বাজি ধরে বলতে পারি, নইলে নাম বদলে রাখব আমার। কি নাম আপনার খাতির জমানো ভঙ্গিতে নিরীহ স্বরে জিজ্ঞেস করল কিশোর। হোগার্ট ল্যাম্বার্ট, খসখসে কণ্ঠে জবাব দিল লোকটা। কি, নাম শুনে কোন সুবিধে হলো, বোকা হাগল? ল্যাম্বার্টের ভাবভলি মোটেও সুবিধের পাগল না কিশোরের কাছে। আর কিছু বলল না তাকে। ওদের চেয়ে দুএক বছরের বড় এক কিশোরের সঙ্গে ভাব জমানোর চেষ্টা করল। একে ওর মত লাগছে না। তোমার নামটা কি, ভাই? বাফার। আমি নিউ বেডফোর্ড থেকে এসেছি। আমার বাপ-দাদারা বহু কালের পুরানো তিমি শিকারী। এক প্রশ্ন করে তিনটের জবাব পেয়ে গিয়ে উৎসাহ বেড়ে গেল কিশোরের। জিজ্ঞেস করল, আহা, এডওয়ার্ড পাঞ্চের ব্যাপারটা কি, বলো তো? বিস্মিত দেখাল বাফারকে। কেন, এটা নানৗঁকেটের একটা তিমি শিকারী জাহাজ। যাচ্ছে কোথায়? কেপ হর্ন। কিন্তু আমাকে এ সব প্রশ্ন করছ কেন? জাহাজ কোথায় যাচ্ছে যদি না-ই জানো তাহলে উঠলে কেন? কিশোর কিছু বলার আগেই রবিন বলে উঠল, আমি তো জানতাম, কেপ হর্নে তিমি শিকার করা হত উনবিংশ শতব্দীতে। আরও অবাক হলো বাফার। তা তো বটেই। আর এটা তো উনবিংশ শতাব্দীই। ১৮৫০ সাল। বাফারের কথা শুনে হাঁ হয়ে গেল তিন গোয়েন্দা। ওদের কথা শুনছিল ল্যাঘাট। মুখ বাকিয়ে বলল, কোন্ সাল তা-ও জানে না! এমন বোকা তো জীবনে দেখিনি। বাফার ছাড়া বাকি সবাই তিন গোয়েন্দার বোকামিতে হেসে উঠল। খনখনে, ভৌতিক হাসি। গা শিরশির করে উঠল গোয়েন্দাদের। কিন্তু রেগে গেল মুসা। নাবিকদের দিকে তাকিয়ে ফেটে পড়ল, আমরা জানি এটা কোন্ সাল! আর এখান থেকে যে এখুনি চলে যাওয়া উচিত তা-ও জানি। আপনারা থাকুন আপনাদের অ্যাড্রিয়াটিক পাঞ্চ আর তিমি নিয়ে। আমরা গেলাম… কটমট করে ওর দিকে তাকিয়ে থেকে আচমকা ঝটকা দিয়ে হারপূনটা তুলে নিল ল্যাম্বার্ট। ছুঁড়ে মারল ওকে লক্ষ্য করে। সাঁৎ করে সরে গেল মুসা। অল্পের জন্যে মিস হলো ধারাল অস্ত্রটা। ঘ্যাঁচ করে বিধল গিয়ে জাহাজের গায়ে। তিরতির করে কাঁপতে থাকল ওটার দণ্ডটা। বাপরে! আরেকটু হলেই তো গেছিলে! ঢোক গিলল রবিন। সাবধান! চেঁচিয়ে উঠল কিশোর। বিপদ এখনও কাটেনি। দলবল নিয়ে ছুটে এল ল্যাম্বার্ট। আত্মরক্ষার জন্যে তৈরি হলো তিন গোয়েন্দা। হাত বাড়িয়ে দিল কারাতে মারের ভঙ্গিতে। খেক খেক করে হেসে উঠল জাহাজীরা। ধরার জন্যে হাত বাড়াল। ঠিক সেই মুহূর্তে ডেক থেকে ভেসে এল চিৎকার। তিমি! তিমি! ওই যে, বাঁ দিকে! দোরগোড়ায় হাজির হলো পুকার। এই জলদি এসো তোমরা!…কিশোর, মুসা, রবিন-তোমরাও তোমাদের হারপূন নিয়ে ডেকে চলে এসো। আপাতত ল্যাম্বার্টের দলের হাত থেকে বেঁচে গেল তিন গোয়েন্দা। অকারণে মারমুখী হয়ে ওঠা নাবিকরা ছেড়ে দিল ওদেরকে। কিশোর, মুসা ও রবিন যার যার বাকের মাঝখান দিয়ে হেঁটে দরজার দিকে এগোল। তরতর করে উঠে গেল সিঁড়ি বেয়ে। এখনও চারদিকে অন্ধকার। তবে সাগর আগের চেয়ে শান্ত। মৃদু ঢেউয়ের ওপর দিয়ে ধীর গতিতে চলেছে জাহাজ। ক্যাপ্টেন কুপারের আদেশে দশ-বারো জন নাবিক একটা তিমি শিকারের নৌকা পানিতে ভাসানোর তোড়জোড় করছে। কপিকলের সাহায্যে শিকলে বাঁধা নৌকা নামানো হলো জাহাজের এক পাশে। খানিক নেমে শূন্যে ঝুলে রইল নৌকাটা। দেখতে দেখতে বলে উঠল কিশোর, এখানে তিমি এল কোত্থেকে? কেপ হর্ন হয়ে প্রশান্ত মহাসাগরে এসে পড়েছি, কড়া গলায় বলল ক্যাপ্টেন। এখানেই তো তিমির আড্ডা। অবাক হয়ে রবিন বলল, এক রাতের মধ্যে কেপ হর্ন পৌঁছা কি সম্ভব? অ্যাটমিক জেট প্লেনের পক্ষেও এত দ্রুত চলা সম্ভব না। জেট প্লেন! জিনিসটা কি? ক্যাপ্টেনের কণ্ঠে সন্দেহের সুর। আর অ্যাটমিক কথাটারই বা মানে কি? কাঁধ ঝাঁকাল রবিন। আরও একশো বছর পার না করে দিলে এ প্রশ্নের জবাব জানতে পারবেন না। মানে! কি বলছ তুমি? বলছি বিংশ শতাব্দীর কথা। জেট প্লেন জিনিসটা বিংশ শতাব্দীর আকাশ যান। ছোঁড়াটার মাথাটাই গেছে, বিড়বিড় করল নাইল। ওর কথার মাথামুণ্ডু তো কিছুই বুঝতে পারছি না। কনুই দিয়ে রবিনকে গুঁতো লাগাল কিশোর। কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, বেশি কথা বলে আর ঝামেলা বাড়িয়ে না তো। তিমি শিকারের নৌকা পানিতে ভেসে পড়তে প্রস্তুত। নাবিকরা উঠে পড়ল নৌকায়। বৈঠা ধরে বসল। পুকার চলে এল নৌকার মাঝখানে। কিশোর পাশা, হারপুন ছোঁড়ার দায়িত্ব তোমার। তুমি গলুইয়ে গিয়ে বসো, আদেশ দিল ফাস্ট মেট। মুসা আমান, তুমি ধরবে হাল। রবিন, তুমি পেছন দিকের একটা বৈঠার ধারে বসো। নৌকায় চড়ে যে যার জায়গায় বসে পড়ার পর কপিকলের লোকজন চাকা ঘুরিয়ে নৌকাটা পানিতে নামিয়ে দিল। দাড়িরা বৈঠা বাইতে শুরু করল। ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে অ্যাড্রিয়াটিক পাঞ্চ থেকে। ডেভিড পুকারের নির্দেশমত হাতল ঘুরিয়ে কোর্স ঠিক রাখছে। উদ্যত হারপূন হাতে গলুইয়ের কাছে দাঁড়িয়ে আছে কিশোর। ওই যে তিমির ফোয়ারা! তিমির ফোয়ারা! তারস্বরে চেঁচিয়ে উঠল পুকার। মুসা, বাঁ দিকে ঘুরাও। তাড়াতাড়ি বয়ে কাটল মুসা। কই, আমি তো কিছু দেখছি না। কানা নাকি? বেঁকিয়ে উঠল পুকার, তোমার কিছু দেখার দরকার নেই। যা বলছি করো। নইলে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেব সাগরে। অন্ধকার পানিতে বাঁ দিকে মোড় নিয়ে ছুটে চলল নৌকা। মাথার ওপরে কালো মেঘের আড়াল থেকে উঁকি দিচ্ছে একটা তারা। বৈঠা পানিতে পড়ছে আর উঠছে ছন্দময় গতিতে। এই যে এসে পড়েছি, ঘোষণা করল পুকার। কিশোর পাশা, হারপূন ছোড়ো। এদিক-ওদিক মাথা নাড়ল কিশোর। কই, তিমি কই? কিসের গায়ে ছুঁড়ব? ওই যে তিমি। ছুঁড়লেই বুঝবে কিসের গায়ে পড়েছে, খেক খেক করে উঠল ফাস্ট মেট। হারপূন ছুঁড়ল কিশোর। তারপর রশি ধরে টে। তুলল অস্ত্রটা। কোন কিছুর গায়ে হারপূন বেঁধেনি দেখে মন মনে খুশি হলো ও। রাগে কাঁপতে লাগল পুকার। তিমিটাকে মিস করেছ তুমি! ইচ্ছে করে ওটাকে পালিয়ে যেতে দিয়েছ। কিশোরের কথা সমর্থন করে রবিন বলল, আমারও কিন্তু কোন তিমি চোখে পড়েনি। নিশ্চয় তারমানে ভুল দিকে নৌকা ঘুরিয়েছ! চিৎকার করে উঠল পুকার। দাঁড়াও, জাহাজে ফিরে নিই। তারপর বোঝাব মজা। ক্যাপ্টেনের কাছে নালিশ করে তিনজনের পিঠের চামড়া না ছাড়িয়েছি তো আর কি বলব-নাও, ঘোরো এখন। পুরো এক পাক ঘোয়রা। আবার দেখা যেতে পারে তিমিটাকে। এবার যদি মিস করো কিশোর পাশা, তাহলে… দাঁতে দাঁত চাপল ফার্স্ট মেট। হাল ঘুরিয়ে আবার নৌকার মুখ ঘোরাল মুসা। ছপাৎ-ছপাৎ দাঁড় ফেলছে দাড়িরা। গলুইয়ে দাঁড়িয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সাগরে চোখ বোলাচ্ছে কিশোর। নৌকাটা চক্কর মেরে মেরে ঘুরতেই থাকল। তিমির চিহ্নও দেখা গেল না আর। হাল ছেড়ে দিল পুকার। জাহাজে ফিরে যাওয়ার হুকুম দিল। জাহাজের কাছে এসে গা ঘেঁষে দাঁড়াল নৌকা। ওপর থেকে দড়িতে বাধা হুক নামিয়ে দেয়া হলো। সেগুলোতে আটকে আবার জাহাজে তুলে নেয়া হলো নৌকা। আগের জায়গায় ঝুলিয়ে রাখা হলো। তিমিটাকে মারতে পারিনি ক্যাপ্টেন, ক্ষোভের সঙ্গে রিপোর্ট করল পুকার। এ জন্যে ওই ছোকরা তিনটে দায়ী। এ কথা শুনে রেগে আগুন হলো নাইল। হুকুম দিল, জেলে ভরে তালা দিয়ে রাখোগে! তিন গোয়েন্দাকে ঠেলা-ধাক্কা মেরে নিচে নিয়ে আসা হলো। একটা শিক লাগানো ছোট ঘরে ঢোকানো হলো। এটাই জাহাজের জেলখানা। সশব্দে বন্ধ হয়ে গেল দরজা। ওদেরকে একা রেখে চলে গেল জাহাজীরা। তিমির তেল ভরা একটা লণ্ঠন মিটমিট করে জ্বলছে গারদে। গোটা দুয়েক কাঠের বাঙ্ক আর মাঝখানে একটা ছোট টেবিল ছাড়া আর কোন আসবাব নেই ঘরটাতে। বাঙ্কে বসল। পরস্পরের দিকে তাকাতে লাগল। ঘটনা দেখছি জটিল থেকে জটিলতর হয়ে উঠছে, মন্তব্য করল মুসা। একটা ভূতুড়ে জাহাজের কতগুলো নাবিক-ভূতের হাতে আমরা এখন বন্দী। আর এজন্যে দায়ী একটা ভূতুড়ে তিমি, খিটখিটে গলায় যোগ করল রবিন। নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটতে কাটতে কিশোর বলল, অথচ পুকার বলছে সে তিমিটাকে দেখেছে। আমাদেরকে ফাঁসানোর জন্যে বলেছে, এ তো সোজা কথা। আর নাইল যে ওর কথাই বিশ্বাস করবে সেটাও স্বাভাবিক। তবে আমার কি মনে হয় জানো-পুকার নিজেই একটা ভূত। কিশোরের দিকে তাকাল মুসা। ওরা আমাদের নিয়ে কি করবে বলো তো? জবাবে নিচের ঠোঁটে একটা টান দিয়ে ছেড়ে দিল কিশোর। বুঝতে পারছি না। চুপ হয়ে গেল তিনজনেই। নাইলের হুমকির কথা ভাবছে ওরা। নাইল আমাদেরকে হাঙর দিয়ে খাওয়াবে বলেছে, নীরবতা ভাঙল মুসা। হারে-ভূত বলে আবার কিছু নেই তো? আর ওগুলো নিশ্চয় মানুষখেকো নয়? হাঙরের মানুষখেকো হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি, বলল কিশোর। সেটা আসল হাঙরই হোক, কিংবা ভূতুড়ে…। হঠাৎ সিঁড়িতে পায়ের শব্দ শোনা গেল। লাফিয়ে সিধে হয়ে বসল ওরা। পায়ের আওয়াজ ক্রমে কাছিয়ে আসছে। একটু পরেই লোকটাকে দেখা গেল। ল্যাম্বার্ট। ডান হাতে একটা হারপূন। ঘরের মাঝখানে চলে এল তিন গোয়েন্দা। লোকটা কোন মতলবে এসেছে দেখতে চায়। তোমাদের দোষেই আজ তিমিটাকে হারাতে হলো, নাক সিটকাল ল্যাম্বার্ট। কিভাবে নৌকা বাইতে হয়, কিভাবে হারপূন দিয়ে মাছ শিকার করতে হয়, কিছু জানো না তোমরা। আমি থাকলেই হয়েছিল আজ। তিমির বাপও আমার হাত থেকে বাঁচতে পারেনি কোনদিন। মুচকি হাসল কিশোর। আপনার বদলে হারনার হিসেবে আমাকে পাঠানোটা আসলে সহ্য হচ্ছে না আপনার। শুনে মুখ লাল হয়ে গেল ল্যাম্বার্টের। হারপূন ছুঁড়ে মারল দুই গরাদের ফাঁক দিয়ে। ব্যাপারটা আগেই আঁচ করতে পেরেছিল মুসা। চট করে টেবিলটা দুহাতে তুলে ধরল, ঢালের মত করে। টেবিলে লাগল হারপূন। এত জোরে আঘাত হানল, কাঠ ফুটো করে ফেলল ধারাল ফলা। কয়েক ইঞ্চির জন্যে মুসার গায়ে বিধল না। টেবিলটা নামিয়ে রাখল সে। হাতের চেটো দিয়ে মুখের ঘাম মুছল। একটানে টেবিল থেকে খুলে আনল হারপূন। ল্যাম্বার্ট, এ নিয়ে দ্বিতীয়বার হলো। আর ছাড়ব না তোমাকে, বলেই হারপূন তুলল ল্যাম্বার্টকে সই করে। বেগতিক দেখল ল্যাম্বার্ট। ধীরে ধীরে পিছু হঠল সে। তারপর আচমকা ঘুরে দাঁড়িয়ে সিঁড়ি বেয়ে ছুটে পালাল। গারদের এক কোনায় হারপূনটা ছুঁড়ে ফেলে দিল মুসা। হাসতে হাসতে বলল, সত্যি সত্যি মারতাম না। তয় দেখালাম শুধু। তবে জিনিসটা আর হাতে নিতে দিচ্ছি না ওকে। তিমি শিকারে যাবার সময় ফাস্ট মেটকে হারপূন হারানোর কি ব্যাখ্যা দেবে তাই ভাবছি। এমন সময় আবার কার পায়ের শব্দ শোনা গেল সিঁড়িতে। আবার বোধহয় এসেছে ল্যাম্বার্ট, নিচুস্বরে বলল রবিন। মারামারি করতে। কিংবা হারপূনটা ফেরত নিতে। বেশ। এবার আমরাও প্রস্তুত, হারপূন তুলে নিল কিশোর। আত্মরক্ষার ভঙ্গিতে বাগিয়ে ধরল অস্ত্রটা। তবে আগন্তক ল্যাম্বার্ট নয়, বাফার। ওকে দেখে হারপূন নামাল কিশোর। জেলখানার দিকে আসার সময় বারবার পেছন ফিরে দেখছে বাফার। আমার এখানে আসা উচিত হয়নি, ফিসফিস করল বাফার। আমার ডিউটি এখন ওপরে। তোমাদের একটা জরুরী কথা জানাতে এসেছি? কি? জানতে চাইল রবিন। ক্যাপ্টেন তোমাদেরকে এখনই হাঙরের মুখে ফেলে দিত। জেলে পুরে রাখার কারণ তোমাদেরকে তার দরকার হতে পারে। তবে নানটুকেটে ফেরার আগে হাঙরের মুখে ফেলবেই, তাতে কোন সন্দেহ নেই। তারমানে তার আগেই আমাদেরকে এখান থেকে কেটে পড়তে হবে, কিশোর বলল। তুমি আমাদের সাহায্য করবে? দরকার হলে লড়াই করব, বুকে চাপড় দিয়ে বলল মুসা। বিনা যুদ্ধে নাহি দেব… এদিক-ওদিক মাথা নাড়ল বাফার। আমি সাধারণ একজন ডেকহ্যান্ড। তোমাদেরকে রা করার ক্ষমতা আমার নেই। আর মুক্তি পেলেও লাভ হবে না। কারণ এখন আমরা মাঝ সমুদ্রে। কি করবে তোমরা? হাজার মাইল পথ সাঁতার কেটে ডাঙায় উঠবে? তিমি শিকারের নৌকা নিয়ে পালাতে পারি, উত্তেজিত গলায় বলল রবিন। আবার মাথা নাড়ল বাফার। হুইল হাউজ আর ডেকে সব সময়ই কেউ না কেউ নজর রেখে চলেছে। ধরা পড়ে যাবে। তা ছাড়া নৌকা পানিতে নামানোও এক দুঃসাধ্য ব্যাপার। শব্দ না করে পারবে না। যাকগে, তোমাদেরকে কয়েকটা প্রশ্ন করতে চাই করো, কিশোর বলল। শত হলেও তুমি ঝুঁকি নিয়ে নিচে এসেছ। সাবধান করে দিয়েছ আমাদের। তোমরা এমন অদ্ভুত ভাবে কথা বলছ কেন? জানতে চাইল বাফার। এটা ১৮৫০ সাল। অথচ তোমরা বিংশ শতাব্দীর কথা বলছ। পালের বদলে অন্য শক্তির কথা বলছ। ঘটনাটা কি? দ্রুত দৃষ্টি বিনিময় করল দুই গোয়েন্দা। এ সব কি বলছে ছেলেটা? ওকে যে আমরা ভূত ঠাউরে বসে আছি তা বলা যাবে না, ফিসফিস করে কিশোরের কানে কানে বলল মুসা। মাথা আঁকাল কিশোর। সত্যি কথা বলব? বাফারকে বলল সে, এটা আসলে কোন সাল সেটাই শিওর হতে পারছি না আমরা। দেয়ালে ঝোলানো একটা ক্যালেন্ডার দেখাল বাফার। বড় বড় অক্ষরে তাতে লেখা: ১৮৫০ সাল। এর মানেটা দাঁড়াচ্ছে, বিড়বিড় করল মুসা, এই জাহাজটাতেই কেবল সময় বদলে গেছে। পিছিয়ে গেছে। এখানে থাকলে এই সালটাকেই মেনে নিতে হবে আমাদের। ভুরু কুঁচকে গেল বাফারের। তোমরা পাগলা গারদ-টারদ থেকে পালিয়ে আসোনি তো? উদ্বিগ্ন শোনাল তার কণ্ঠ। না, পাগলা গারদ থেকে পালাইনি, তাকে আশ্বস্ত করল কিশোর। তবে এই জাহাজ থেকে পালাতে চাই। সায় দেয়ার ভঙ্গিতে মাথা দোলাল বাফার। পরে যদি সম্ভব হয় সাহায্য করব তোমাদের। এখন ডিউটিতে যেতে হবে, কথা শেষ করে সিঁড়ি বেয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল সে। মাথার নিচে হাত রেখে বাঙ্কে শুয়ে পড়ল কিশোর। আরেকটা বাঙ্কে গিয়ে বসল রবিন। টেবিলের ওপর উঠে বসল মুসা। পা ঝোলাতে লাগল। ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো আলোচনা করতে লাগল ওরা। বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করল। সমস্যাটা হলো, মন্তব্য করল কিশোর, ভূত না আসল মানুষ সেটাই বুঝতে পারছি না। মনে হচ্ছে একদল পাগলের সঙ্গে চলেছি আমরা। কিন্তু ওদের কাজ কর্ম দেখে তো পাগল বলেও মনে হচ্ছে না। ভূত! ভূত! কোন সন্দেহই নেই আমার, মুসা বলল। তুমি তো আর বিশ্বাস করবে না। নাকি কোনও ধরনের টাইম মেশিনের মধ্যে পড়ে গেলাম আমরা? রবিনের প্রশ্ন। বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের রহস্যময় কোন কিছুতে? এক টানে সময়কে পার করে নিয়ে এসেছে ১৮৫০ সালে! মাথা চুলকাল মুসা। তা তো বুঝলাম। কিন্তু আবার নিজেদের সময়ে ফিরে যাব কি করে? চালাকি করতে হবে আরকি আমাদের, রবিন বলল। ক্যাপ্টেন নাইল আমাদেরকে এখান থেকে বের করলে এমন ভান করব যেন আমরা খুব ভাল নাবিক। জাহাজের নানা কাজে লাগছি দেখলে হয়তো তার মন বদলাতেও পারে। তখন নিশ্চয় আর আমাদের সমুদ্রে ছুঁড়ে ফেলার চিন্তা করবে না। বুদ্ধিটা মন্দ না, হাতঘড়িতে নজর বোলাল কিশোর। আমরা জাহাজে উঠেছি মাত্র কয়েক ঘণ্টা। এর মধ্যে এত কিছু ঘটল কি করে? জবাবে মুসা কিছু বলতে যাচ্ছিল, হঠাৎ গা-টা কেন যেন শিরশির করে উঠল। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। নাবিকের পোশাক পরা এক লোককে ওদের জেলখানার দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অবাক হয়ে গেল। মুসার দৃষ্টি অনুসরণ করে একই দিকে তাকাল কিশোরও। লোকটা নীরবে তাকিয়ে আছে ওদের দিকে। ভূতুড়ে একটা আকৃতি। মুখটা অস্বাভাবিক সাদা। সরু, সাদা সাদা লম্বা আঙুল দিয়ে চেপে ধরেছে জেলের গরাদ। চেহারায় কোন ভাবান্তর নেই। নীল চোখ জোড়া স্থির। লোকটা এখানে এল কি করে? জড়ানো গলায় বলল মুসা। সিঁড়িতে ওর পায়ের শব্দ পাইনি। উঠে বসল কিশোর। আমিও না। রবিন বলল, লোকটাকে এ জাহাজের কেউ মনে হচ্ছে না। তার পেছন পেছন যাওয়ার জন্যে হঠাৎ ইশারা করল ওদেরকে রহস্যময় আগন্তুক। কে আপনি? প্রশ্ন করল কিশোর। আপনার সঙ্গে আমাদের যেতে বলছেন কেন? বেরোতে যে বলছেন, বেরোব কি করে? ইঙ্গিতে বন্ধ দরজাটা দেখাল মুসা। ফাস্ট মেট দরজায় তালা মেরে রেখে গেছে। চাবি আছে নাকি আপনার কাছে? ওদেরকে তাজ্জব করে দিয়ে তালায় হাত রাখল লোকটা। খুলে গেল তালা। টান দিয়ে দরজাটা খুলে ফেলল সে। কোঁচকানো চামড়াওয়ালা আঙুল দিয়ে আবার বেরোনোর ইশারা করল লোকটা। খাইছে! চাবি ছাড়াই তালা খুলে ফেলল! মুখ হাঁ হয়ে গেছে মুসার। দেখাই যাক না ওর সঙ্গে গিয়ে, কিশোর বলল। মুক্তির পথ দেখিয়েও দিতে পারে। কিংবা নতুন কোনও বিপদের পথ। অতএব সাবধান। সায় দেয়ার ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকাল তার দুই সহকারী। জেল থেকে বেরিয়ে এল তিনজনে। নিঃশব্দে আবার দরজা লাগিয়ে দিল ওদের ভৌতিক পথ প্রদর্শক। তালাটা তুলে লাগিয়ে দিল জায়গামত। তারপর হেঁটে গেল সিঁড়ির ধারে। উঠতে শুরু করল। সিঁড়ি বেয়ে ওঠার সময় কোন শব্দ হলো না। অস্বাভাবিক নীরবতায় গা ছমছম করতে লাগল তিন গোয়েন্দার। মুসার হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে। তলপেট শিরশির করছে রবিনের। কিশোরের শিরদাঁড়া বেয়ে যেন বরফের পানি নামছে। সিঁড়ির শেষ ধাপ টপকে লোকটা উঠে গেল ডেকে। এগিয়ে গেল জাহাজের সামনের দিকে। তিন গোয়েন্দাও উঠল। দাঁড়িয়ে পড়ল সিঁড়ির দোরগোড়ায়। উঁকি মেরে দেখল কাছে-পিঠে কেউ আছে কিনা। অন্ধকারে শুধু টিমটিম করে লণ্ঠন জ্বলছে। খালি ডেক। নিঃশব্দে ঘুরে দাঁড়াল রহস্যময় আগন্তুক। আবার ইশারা করল তিন গোয়েন্দাকে। অনুগতের মত লোকটার পেছন পেছন ডেক ধরে এগোল ওরা। বড় বড় ঢেউ ধাক্কা মারছে জাহাজের গায়ে। জাহাজের কিনার ঢেউয়ের দোলায় উঠছে আর নামছে। নিচে তাকাল ওরা। ঢেউগুলো মাথায় সাদা ফেনা নিয়ে যেন টগবগ করে ফুটছে। দূরের তারাশূন্য অন্ধকার আকাশ থেকে ভেসে এল নাম না জানা নিশাচর পাখির তীক্ষ্ণ চিৎকার। থেমে দাঁড়াল ভূতুড়ে লোকটা। স্থির দৃষ্টিতে তাকাল তিন গোয়েন্দার দিকে। পলকহীন চাহনি। এরপর কি করবে নোকটা ভাবল কিশোর। ধাক্কা মেরে ফেলে দেবে না তে! আঙুল তুলে জাহাজের পেছন দিকটা দেখাল আগন্তুক। ওদিকটা অন্ধকার। চোখ কুচকে ওদিকে তাকিয়ে রইল তিন গোয়েন্দা। অস্পষ্ট ভাবে আরেকটা জাহাজ দেখা গেল। ওদের জাহাজটার পেছন পেছন আসছে। রহস্যময় আগন্তুক সাগরের দিকে ইশারা করল। তারপর জাহাজটা দেখাল। লোকটা কি বলতে চাইছে বুঝে ফেলল মুসা। ও বলছে আমরা যেন সাঁতার কেটে ওই জাহাজে উঠে পড়ি। জাহাজটা কাছেই আছে। চলো, সাগরে নেমে পড়ি। রেলিং বেয়ে উঠে পড়ল সে, ডাইভ দেবে পানিতে। ওর হাত ধরে ফেলল কিশোর। দাঁড়াও। দাঁড়াও। লোকটা সত্যি এটাই বোঝাতে চেয়েছে কিনা সে-ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে নিই আগে। লোকটার দিকে ঘুরল ওরা। কিন্তু অদৃশ্য হয়ে গেছে আগন্তক! বোকা বনে গেল ওরা। আবার ঘুরে তাকাল পেছন দিকে। অন্য জাহাজটাকেও দেখা যাচ্ছে না আর। ভীষণ অবাক হয়ে গেল ওরা। দেখার জন্যে রেলিঙে উঠেছিল মুসা, নেমে এল সেখান থেকে। সত্যি কি এ সব আমাদের চোখের সামনে ঘটছে? জিজ্ঞেস করল সে। নাকি দৃষ্টি বিভ্রমের শিকার হচ্ছি? জানি না, জবাব দিল কিশোর। এমন সময় পেছন থেকে কে যেন কথা বলে উঠল, বড় বেশি ঝুঁকি নিয়ে ফেলেছ তোমরা। পাক খেয়ে ঘুরে দাঁড়াল তিন গোয়েন্দা। বাফারকে দেখতে পেল! চেহারায় উদ্বেগ। আমি হুইল হাউজের ডিউটিতে ছিলাম, জানাল সে। তাই তোমাদের দেখে ফেলেছি। জেলখানা থেকে কিভাবে বেরিয়ে এলে বুঝতে পারছি না। ধরা পড়লে কপালে কিন্তু সত্যি খারাবি আছে তোমাদের। বোকা বোকা গলায় জানতে চাইল মুসা, নাবিক লোকটা কোথায় গেল দেখেছ? নাবিক? তোমাদের দুজনকে ছাড়া ডেকে তো আর কাউকে চোখে পড়েনি আমার। আর যে জাহাজটা আমাদের পিছু নিয়ে আসছিল ওটা? প্রশ্ন করল কিশোর। এমন ভাবে ওদের দিকে তাকাল বাফার, যেন ওরা পাগল হয়ে গেছে। এদিকে জাহাজ! তোমাদের উল্টোপাল্টা কথাবার্তা শুনে এখন আমারই পাগল হওয়ার জোগাড় হয়েছে।…•াও, নিচে গিয়ে বিশ্রাম নাও। যে কোন সময় ডিউটি দিতে চলে আসতে পারে পুকার। তার চোখে পড়ে গেলে ভীষণ বিপদ হবে। চলে গেল বাফার। জেলখানায় ফিরে এল আবার তিন গোয়েন্দা। দরজাটা লাগিয়ে দিল কিশোর। দরজা বন্ধ হতে তালাটাও আপনা-আপনি লেগে গেল। দরজাটাও দেখছি ভূতুড়ে! বিড়বিড় করল কিশোর। যে যার বাঙ্কে শুয়ে পড়ল ওরা। ভাবছে একের পর এক ঘটে যাওয়া অদ্ভুত ঘটনাগুলো নিয়ে। বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করছে। রবিন কথা বলল প্রথম। নাবিকটা প্রেতাত্মা জাতীয় কিছু হতে পারে। শিউড়ে উঠল মুসা। ভূতুড়ে জাহাজে প্রেতাত্মা! ভয়ঙ্কর ব্যাপার। বলা নেই কওয়া নেই, কড়াৎ করে বাজ পড়ল কোথাও। জাহাজটা দুলতে শুরু করল ভীষণ ভাবে। ডেক থেকে ভেসে এল চিৎকার-চেঁচামেচি। পুকার নেমে এল নিচে। চেঁচিয়ে বলল, ঝড় শুরু হয়েছে। ডেকে চলে এসো সবাই। জেলখানার দরজা খুলে দিল সে। যাও, ডেকে যাও, জলদি। সবাইকেই দরকার। দৌড়ে চলে গেল পুকার। ঘুমানোর ঘরে ছুটে ঢুকল তিন গোয়েন্দা। যার যার বাঙ্কের কাছে রাখা বর্ষাতি, মাথায় সাউথ ওয়েস্টার আর পায়ে রাবার বুট গলিয়ে উঠে এল ওপরে। আলকাতরার মত কালো আকাশ। মুষলধারায় বৃষ্টি হচ্ছে। ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। সেই সাথে চলছে গুড়ুম গুডুম বজ্রপাত। প্রবল বাতাসে বিশাল ঢেউ উঠছে সাগরে। ঢেউয়ের আঘাতে থরথর করে কাঁপছে জাহাজ। ঢেউ ভেঙে পড়ছে গলুইয়ের ওপর দিয়ে। ভাসিয়ে দিচ্ছে ডেক। মুখের সামনে দুই হাত জড় করে ধরে তারস্বরে চেঁচাচ্ছে ক্যাপ্টেন নাইল। হুকুমের পর হুকুম দিয়ে চলেছে নাবিকদের। ঝটপট পাল গুটিয়ে ফেলল কয়েকজন নাবিক। আর কয়েকজন নিচে নামার গর্তের মুখের ঢাকনা আটকে দিল পেরেক ঠকে, যাতে ভেতরে পানি ঢুকতে না পারে। অনেকেই বাতাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে রেলিং ধরে ধরে জাহাজের সামনের দিক থেকে পেছনে যাবার চেষ্টা করছে। পুকার এসে জানাল, জাহাজের খোলে ফুটো হয়ে গেছে। এই ছেলেগুলোকে নিয়ে যাও, তিন গোয়েন্দাকে দেখিয়ে বলল ক্যাপ্টেন। ফুটো মেরামত করুক। ফার্স্ট মেটের সঙ্গে দেখতে গেল ওরা। দেখল খোলের একটা তক্তা ভেঙে গেছে। পানি ঢুকছে হুড়মুড় করে। মেঝের কয়েক ইঞ্চি ইতিমধ্যেই ডুবে গেছে পানিতে। কিশোর পাশা, লকার থেকে পাম্পটা নিয়ে এসো, হুকুম করল পুকার। কোনার ওই ব্যারেলে পাম্প করে পানি ফেলো তুমি আর রবিন। মুসা আমান, আমার সঙ্গে এসো। ফুটো মেরামত করতে হবে। যন্ত্রপাতি রাখার একটা বাক্স নিয়ে এসে ফুটোর কাছে ফেলল পুকার। এক টুকরো তক্তা নিয়ে ফুটোর ওপর চেপে ধরল। বাক্স থেকে হাতুড়ি বের করে পেরেক ঠকে তক্তাটা আটকে দিতে শুরু করল মুসা; দু হাতে দ্রুত কাজ করছে সে। একেক বাড়িতে একেকটা করে পেরেক বসিয়ে দিচ্ছে তক্তায়। দেখতে দেখতে ফুটোটা বন্ধ করে ফেলল দুজনে মিলে। খোলে পানি ঢোকা বন্ধ হলো। গুড! মুসার প্রশংসা না করে পারল না পুকার। ওদিকে খোলের লকার থেকে পাম্প নিয়ে এসেছে কিশোর। ছোট, হস্ত চালিত যন্ত্র। অনেক পুরানো মডেল। টিউবওয়েলের হাতলের মত হাতল। সেটাকে ওপরে-নিচে করে পাম্প করতে হয়। এ জিনিস এর আগেও দেখেছে সে, তবে রকি বীচ মিউজিয়ামে। পাম্পের সঙ্গে হোস পাইপ যুক্ত করে পানি সেচতে শুরু করল সে। সেচা পানি ফেলতে লাগল খালি ব্যারেলে। অল্পক্ষণের মধ্যে ভরে গেল একটা ব্যারেল। দ্বিতীয় আরেকটা ব্যারেলে পাইপের মুখ ঢোকাল কিলোর। ওকে সাহায্য করছে রবিন। এই ব্যারেলটাও কানায় কানায় ভরে গেল। মেঝের পানিও শেষ। ভালই তো দেখালে, পুকার বলল। ঠিক আছে, যাও এবার। ওপরে যাও। ওখানে যারা আছে তাদের সঙ্গে হাত লাগাওগে। ডেকে উঠে এল তিন গোয়ে দা। লক্ষ করল ঝড়ের বেগ কমে গেছে অনেক। থেমে গেছে বৃষ্টি, বাতাসের তীব্রতা কমছে। ঢেউয়ের মাতামাতিটাও আর আগের মত নেই। বড় বাঁচা বেঁচে গেছি, নাবিকদের বলল ক্যাপ্টেন নাইল। তবে ক্ষতিটা কম করেনি। জাহাজের যে সব জায়গায় ক্ষতি হয়েছে, মেরামত করে ফেলে। বৃষ্টি নেই। অকারণে ভারী বর্ষাতি আর গায়ে চাপিয়ে রাখার কোন মানে হয় না। খুলে রেখে এল তিন গোয়েন্দা। দেখল, ঝড়ে জাহাজের ক্ষতি হওয়া জায়গাগুলো মেরামত করে ফেলেছে নাবিকেরা। মূল মাস্তুলের পালের একটা দড়ি ছুটে গেছে। ওপরে উঠে সেটা লাগানোর চেষ্টা করছে একজন নাবিক। কিশোরের দিকে তাকাল ক্যাপ্টেন নাইল। কিশোর পাশা, আড়কাঠের উল্টো দিকে উঠে যাও তো। ওকে সাহায্য করো। মাস্তুলের সাথে লাগানো সরু সিঁড়ি বেয়ে উঠে এল কিশোর। আড়কাঠে চড়ে বসল। লোকটাকে চিনতে পারল এতক্ষণে। ল্যাম্বার্ট। ঠিকঠাক মত কাজ করবে বলে দিলাম, অবজ্ঞার ভঙ্গিতে কিশোরকে বলল ল্যাম্বার্ট। পালের দড়িটা ধরো। গিট দাও…ওই যে ওই জায়গাটায়। জবাব দিল না কিশোর। ওর দিকের পালের প্রান্তটা পতপত করে উড়ছে বাতাসে। ওটাকে ধরতে হলে তাকে আড়কাঠের ওপর উঠে দাঁড়িয়ে হাত লম্বা করে দিতে হবে। মাত্র কাপড়টা ধরেছে ও, এমন সময় পাল ধরে হ্যাঁচকা টান মারল ল্যাম্বার্ট। ভারসাম্য হারাল কিশোর। আড়কাঠ থেকে পড়ে যাওয়ার জোগাড় হলো তার। আতঙ্কিত হয়ে পড়ল মুসা ও রবিন। ডেকের ওপর ছিটকে পড়তে যাচ্ছে কিশোর। তবে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল ওরা, যখন দেখল শেষ মুহর্তে আড়কাঠটা ধরে ফেলেছে কিশোর। জাহাজের দুলুনির তালে তালে মালটাও দুলছে। কিশোরও ঝুলে থেকে দুলতে লাগল। তারপর শরীরের সমস্ত শক্তি জড় করে প্রাণপণ চেষ্টায় একটা পা রাখল আড়কাঠে। উঠে এল ওটার ওপর। আপনি আমাকে ইচ্ছে করে ফেলে দিচ্ছিলেন। কঠোর কণ্ঠে বলে উঠল কিশোর। খিকখিক করে হাসল ল্যাম্বার্ট। আমি ফেলব? আড়কাঠে বি ভাবে কাজ করতে হয় জানো না তুমি। তাই পড়ে গেছ। জানি কি জানি না দেখাচ্ছি আপনাকে, ওকে চ্যালে করে বসল কিশোর। আপনার আগেই পাল খাটাব আমি। কিছুদিন আগে কোস্ট গার্ড ট্রেনিং শিপে তার দুই সহকারী কাজ করে এসেছে কিশোর। জানে কি ভাবে পাল খাটাতে হয়। বাতাসে উড়তে থাকা পালের অংশটা থাবা দিয়ে ধরে ফেলল ও। ওটার ধাতব ফুটোয় চামড়ার ফালি ঢুকিয়ে দিল। ফালিটা গোল করে আড়কাঠের হুকের মধ্যে ঢোকাল। তারপর গিট দিয়ে দিল শক্ত করে, নাবিকরা যে ভাবে দেয়। ব্যস, হয়ে গেল পাল খাটানো। কাজ শেষ করে মইয়ের কাছে চলে এল কিশোর। ল্যাম্বার্টের তখন শোচনীয় অবস্থা। কিশোর যখন মই বেয়ে ডেকে নেমে এসেছে, তখনও পাল নিয়ে যুদ্ধ করছে ল্যাম্বার্ট। চমৎকার দেখিয়েছ, কিশোর পাশা, পুকার বলল। সে সবই দেখেছে। ল্যাম্বার্ট ভুল করেছে। ওর তুলনায় তুমি অনেক বেশি দক্ষ। এক নম্বরের তিমি শিকারী হতে পারবে তুমি। মুচকি হাসল কিশোর। মুসা আর রবিনের কাছে সরে এসে ফিসফিস করে বলল, প্ল্যানটা কাজে লাগছে। অন্তত ফার্স্ট মেটের মন গলাতে পেরেছি। আশা করি আমাদের পক্ষ নিয়ে এখন ক্যাপ্টেনের কাছে কথা বলতে দ্বিধা করবে না। বলবে আমাদের সাগরে ছুঁড়ে ফেলা উচিত হবে না। কারণ আমরা কাজের লোক। আমারও তাই ধারণা, নিচু গলায় বলল রবিন। তবে বিপদ নিশ্চয় কাটেনি এখনও আমাদের… ক্যাপ্টেনের চিৎকারে থেমে গেল সে। এই, এদিকে এসো, হাত নেড়ে ডাকল ক্যাপ্টেন। তাড়াহুড়া করে তার কাছে চলে এল রবিন। যাও, ক্রোজ নেস্টে গিয়ে বসো, হুকুম দিল ক্যাপ্টেন। তাহিতির কাছাকাছি এসে পড়েছি মনে হচ্ছে। ডাঙা কত দূরে জানা দরকার। আন্দাজে চলতে গিয়ে পাহাড়ে ধাক্কা খেতে চাই না। তীক্ষ্ণ নজর রাখবে। প্রবাল প্রাচীরে ধাক্কা খেয়ে ডুবে মরতে চাই না। নাবিকদের ভঙ্গিতে আই, আই, স্যার, বলে মূল মাস্তুলের দিকে ছুটল রবিন। মই বেয়ে উঠতে লাগল। আড়কাঠ আর মাস্তুলের সবচেয়ে ওপরের পাল পার হয়ে এল। মাস্তুলের মাথায় ঝোলানো একটা ঝুড়িতে উঠে বসল। এটাকেই বলে ক্রোজ নেস্ট। এখান থেকে সাগরের চতুর্দিকে নজর রাখা হয়। সাগরের অনেক দূর পর্যন্ত চোখে পড়ে। তবে রাতের বেলা অন্ধকারে খুব বেশিদূর দৃষ্টি চলে না। ঝুড়িতে বসে চোখ টানটান করে রাখল সে। আবছা অন্ধকারে দেখার চেষ্টা করছে। জাহাজের দুলুনির, সঙ্গে সঙ্গে ঝুড়িটাও দুলছে। জাহাজ যখন কাত হচ্ছে, মাস্তুল কাত হচ্ছে, দুলতে দুলতে প্রায় পানির ওপর চলে আসছে তখন ঝুড়ি। জাহাজ সোজা হলেই আবার অনেক ওপরে উঠে যাচ্ছে। ভীষণ বেকায়দা এক অবস্থা। অনেক সময় কোনও নাবিককে শাস্তি দেবার জন্যেও অতিরিক্ত সময় এই ঝুড়িতে বসিয়ে রাখা হয়। ঝুড়ির বেকায়দা আসন, সেই সঙ্গে নোনা পানি মেশানো ঝোড়ো বাতাসের প্রচণ্ড ঝাপটা। অস্থির লাগছে রবিনের। চোখ কড়কড় করছে। আহোয়, নিচ থেকে ভেসে এল ক্যাপ্টেনের নাবিক-সুলভ হাঁক। কিছু দেখছ? পানি ছাড়া আর কিছু তো দেখছি না, জবাব দিল রবিন। অন্ধকারে বেশি দূর নজরও যায় না। তাহিতির দেখা অবশ্যই মিলবে, চেঁচিয়ে বলল ক্যাপ্টেন। অন্ধকার হলেও। দেখার সঙ্গে সঙ্গে জানাবে আমাকে। পাহারা দিতে লাগল রবিন। হঠাৎ রাতের আবছা পর্দা ভেদ করে কালো একটা কাঠামো ফুটে উঠতে শুরু করল। মনে হলো পানিতে ভেসে রয়েছে জিনিসটা। নিশ্চয়ই ডাঙায় উত্তেজিত হয়ে উঠল রবিন। আহোয়। নিচে কেউ আছেন! ডেকের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলল সে। ডাঙা দেখা যাচ্ছে। ডানে! ডানে!…জাহাজ ঘোরান! ডেক থেকে ওর কথার প্রতিধ্বনি করল কিশোর, ডাঙা ডাঙা! জাহাজ ঘোরাতে বলছে। সঙ্গে সঙ্গে আদেশ শোনা গেল ক্যাপ্টেনের। হুইল ধরেছে যে, তাকে বলছে জাহাজ ঘোরাতে। ডানে ঘুরে গেল জাহাজ। ঢেউয়ের সাথে পাল্লা দিয়ে ছুটতে লাগল। ঠিক সামনেই ডাঙা! চিৎকার করে জানাল রবিন। বায়ে ঘোরান এখন। ওর কথারই পুনরাবৃত্তি করল ডেকে দাঁড়ানো কিশোর। যে লোকটা হুইল ধরেছে, তাকে কি যেন বলতে শোনা গেল। ওপর থেকে রবিনের মনে হলো একা কুলাতে পারছি না এ রকম কিছু বলল লোকটা। আদেশ দিল ক্যাপ্টেন, মুসা আমান, তুমি যাও, ওকে সাহায্য করোগে। আই আই, স্যার, বলে এক মুহূর্ত দেরি না করে দৌড় দিল মুসা। ক্যাপ্টেন বলল, নাক বরাবর সোজা চলে। ডাঙার দিকে। পাল টানটান করো। গতি বাড়াও। এ-কি পাগলামি! শুনে গা হিম হয়ে গেল কিশোরের। ক্যাপ্টেন কি আত্মহত্যা করতে চাইছে নাকি? জাহাজসুদ্ধ সবাইকে ডুবিয়ে মারতে চাইছে। প্রচণ্ড বেগে ছুটতে শুরু করল জাহাজ। কালচে কাঠামোটা ভীতিকর গতিতে কাছে চলে আসছে। আরও কাছে যেতে বোঝা গেল, তাহিতির ভূখও নয় ওটা। সাগরের মাঝখানে প্রবালের দ্বীপ। ভয়ানক গতিতে প্রবাল প্রাচীরে এসে ধাক্কা মারল জাহাজ। বিকট শব্দে ভেঙে পড়ল মূল মাল আছড়ে পড়ল দড়ি-দড়ার জঙ্গলের ওপর। ক্রোজ নেস্ট থেকে ছিটকে পড়ল রবিন। দড়ি আঁকড়ে ধরে পতন ঠেকাল কোনমতে। তবে পুরোপুরি বাঁচতে পারল না। দড়াম করে এসে পড়ল ডেকে, কিশোরের পাশে। রবিন! রবিন! উৎকণ্ঠিত কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল কিশোর। ভয় নেই, আমি ঠিকই আছি, জবাব এল রবিনের। ভয় পেয়েছিল হাড়গোড় একটাও আও থাকবে না। কিন্তু তেমন কিছুই হয়নি দেখে হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। দৌড়ে এল মুসা। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, শয়তানিটা ইচ্ছে করে করেছে ক্যাপ্টেন। আমাদের ঝামেলায় ফেলার জন্যে। বাফার বলেছে আমাকে… তার কথা শেষ হওয়ার আগেই শোনা গেল ক্যাপ্টেনের গর্জন। গালি দিয়ে বলল, সর্বনাশ করেছিস তোরা! আমার জাহাজের বারোটা বাজিয়েছিস! তোদের আমি ছাড়ব না! কিন্তু আমি তো ঠিক মতই জানিয়েছি, কোন দিকে যেতে হবে… প্রতিবাদ করতে গেল রবিন। কিশোরও বোঝানোর চেষ্টা করল ক্যাপ্টেনকে। কিন্তু কে শোনে কার কথা। গর্জন থামল না ক্যাপ্টেনের। একগুয়ে ভঙ্গিতে বলতে থাকল, তোরা আমার জাহাজ ধ্বংস করেছিস! তোরা বিদ্রোহী! তোদের আমি ছাড়ব না! নাবিকদের দিকে ফিরে আদেশ দিল, ওদের সাগরে ফেলে দাও। হাঙরে ছিঁড়ে খাক। বিকৃত আনন্দে চিৎকার করতে করতে ছুটে এল কয়েকজন নাবিক। ল্যাম্বার্টের দলের লোক এরা। এদের মধ্যে ল্যাম্বার্টকেও দেখা গেল। সবাই মিলে জাপটে ধরল তিন গোয়েন্দাকে। ঠেলা-ধাক্কা মেরে নিয়ে চলল রেলিং-এর ধারে। হঠাৎ একটা অদ্ভুত ছায়ামূর্তিকে দেখা গেল এ সময়। এসে দাঁড়াল ওদের পাশে। সেই লোকটা, যে ওদেরকে জেলখানা থেকে বের করে এনেছিল। তারপর রহস্যময় ভাবে উধাও হয়ে গিয়েছিল ডেক থেকে। ভাবলেশহীন মুখে ওদের দিকে তাকিয়ে আছে লোকটা। অদ্ভুত একটা কাণ্ড করল। আঙুল তুলে নাবিকদের ইঙ্গিতে বোঝাতে লাগল কোন দিকে ফেলতে হবে বন্দিদের। চ্যাংদোলা করে তুলে নিয়ে তিন গোয়েন্দাকে পানিতে ছুঁড়ে ফেলল নাবিকেরা। পানিতে পড়ার জন্যে তৈরি হয়েছিল গোয়েন্দা। কিন্তু পড়ল কাঠের মেঝেতে। হতবুদ্ধি হয়ে গেল তিনজনেই। উঠে বসল। তাকাতে লাগল চারপাশে। যখন দেখল, নিজেদের মোটরবোটেই রয়েছে, বাকহারা হয়ে গেল একেবারে। ভূতুড়ে জাহাজ অ্যাড্রিয়াটিক পাঞ্চের চিহ্নও নেই কোথাও। দিগন্তে ভোরের আভাস। ভালমত খেয়াল করে দেখে বুঝল, রকি বীচের কাছাকাছিই রয়েছে ওরা। বোকার মত পরস্পরের মুখের দিকে তাকাতে লাগল তিনজনে। বোটের ইঞ্জিনের কাছেই বসে আছে মুসা। ইগনিশনে মোচড় দিল। সঙ্গে সঙ্গে গর্জে উঠল মোটর। কিশোর দেখল, রেডিওটাও ঠিক মতই কাজ করছে। অকেজো জিনিস হঠাৎ করেই ঠিক হয়ে গেল কি ভাবে? বিড়বিড় করল কিশোর। অতি সহজ জবাব, বলে উঠল মুসা। কাল সন্ধ্যায় ভূতে নষ্ট করে দিয়েছিল এগুলো। সকাল বেলা ভূতের আসর কেটে যেতেই আবার ঠিক হয়ে গেছে সব। সত্যিই কি পুরো একটা রাত একটা ভূতুড়ে জাহাজে কাটিয়ে এলাম? এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না রবিন। এখনও কি সন্দেহ আছে তাতে? ভুরু নাচাল মুসা। আসলে স্বপ্ন দেখেছি, ভূতের জাহাজ, এ কথাটা মানতে রাজি না কিশোর। ১৮৫০ সালের একটা তিমি শিকারী জাহাজের স্বপ্ন। দুঃস্বপ্ন, শুধরে দিল রবিন। তিনজনেই কি দুঃস্বপ্ন দেখলাম? মুসার প্রশ্ন। একই সময়ে? অবিকল এক স্বপ্ন? তার এ প্রশ্নের জবাব দিতে পারল না কিশোর কিংবা রবিন।